Trial Run

সুন্দরবন কোণঠাসা, দশ বছরে দূষণ বেড়েছে আশংকাজনক হারে

খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের গবেষণা

ছবি : ডিডব্লিউ

বনের সাথে মানুষের চিরায়ত এক বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে। কিন্তু বিপরীতভাবে বনের সাথে মানুষের রয়েছে শত্রুতাপূর্ণ সম্পর্ক। বনকে চিরায়ত শ্ত্রু হিসাবেই ব্যবহার করা হয়ে আসছে যুগযুগ ধরে। বন সাবাড় করে মানুষের আজকের যে সভ্যতা, সেটাও দাঁড়িয়ে আছে এসব বনের কারণেই। কোনো দেশের বনকে সেদেশের হৃৎপিণ্ড বলা হয়। বাংলাদেশেও সুন্দরবন নামে একটি হৃৎপিণ্ড রয়েছে। যেটাকে ক্রমাগতভাবে কোণঠাসা করে রাখা হচ্ছে আর শ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে আমাদেরই। সুন্দরবন রক্ষায় বিভিন্ন পরিকল্পনা হাতে কলমে থাকলেও বাস্তবে কার্যত হয় এর উল্টোটাই। বিশ্বের সবচেয়ে বড় এই শ্বাসমূলীয় বনটি দূষণ ও শিল্পকারখানার চাপে হুমকির মুখে পড়েছে। বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবনের ভেতর দিয়ে বয়ে যাওয়া নদীতে লবণাক্ততার সমস্যা আগে থেকেই ছিল। এবার এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে দূষণ। সম্প্রতি খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের এক গবেষণায় উঠে এসেছে যে, সুন্দরবনে গত দশ বছরে দূষণ বেড়েছে প্রায় সাত গুণ।

এই বিভাগের অধ্যাপক আবদুল্লাহ হারুন চৌধুরী বলেন, “২০১০ সালে সুন্দরবনের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত পশুর নদের প্রতি লিটার পানিতে তেলের পরিমাণ ছিল সর্বোচ্চ ১০ দশমিক ৮ মিলিগ্রাম। আর এখন তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬৮ মিলিগ্রামে; যেখানে স্বাভাবিক মাত্রা হল ১০ মিলিগ্রাম।”

তিনি বলেন, সুন্দরবনের মধ্য দিয়ে বয়ে চলা নদ-নদীর পানি ও মাটিতে দূষণ বেড়ে যাওয়ায় অনেক জায়গায় আগের মতো আর গাছের চারা গজাচ্ছে না ৷ তাছাড়া পানিতে তেলের পরিমাণ বেড়ে যাওয়ায় ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে জলজ প্রাণী৷ যেসব রুটে নৌযান চলাচল করে, ওই রুটগুলোর বনের পাশে এখন আর তেমন হরিণ, বানরসহ অন্যান্য বন্যপ্রাণী দেখা যায় না৷’’

এমনিতেই জলবায়ু পরিবর্তন ও উজান থেকে মিষ্টি পানির প্রবাহ কমে যাওয়ায় সুন্দরবনের পানি ও মাটিতে বেড়েছে লবণাক্ততা। সেই সঙ্গে বিভিন্ন কারণে বেড়েছে নদীভাঙন ও পলি পড়ার হার। তার ওপর মানুষের অবিবেচক কর্মকাণ্ডে দূষণ বাড়ছে সুন্দরবনে। এ নিয়ে উদ্বিগ্ন সুন্দরবন সংশ্নিষ্টরা।

সংশ্নিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, সুন্দরবনের চারপাশে ১০ কিলোমিটার এলাকাকে সরকার প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা (ইসিএ) ঘোষণা করলেও সেই এলাকার মধ্যে গড়ে উঠছে শিল্প প্রতিষ্ঠান। গত ৮-১০ বছরে গড়ে উঠেছে অর্ধশতাধিক ভারী শিল্প প্রতিষ্ঠান। এর মধ্যে রয়েছে সিমেন্ট ফ্যাক্টরি, এলপি গ্যাস প্লান্ট, অয়েল রিফাইনারি, বিটুমিন, সি ফুড প্রসেসিং ফ্যাক্টরি প্রভৃতি। বনের খুব কাছেই বিশালাকৃতির খাদ্যগুদাম নির্মাণ করেছে খাদ্য বিভাগ। বেশ কয়েকটি শিল্প কারখানার অপরিশোধিত তরল বর্জ্য ফেলা হচ্ছে পশুর নদে, যা চলে যাচ্ছে বনের মধ্যে নদী ও মাটিতে।

অভিযোগ রয়েছে, সুন্দরবনের বিভিন্ন নদী ও খালে দীর্ঘদিন ধরে বিষ দিয়ে মাছ শিকার করছে একটি চক্র। এর ফলে বিভিন্ন মাছের পোনা, কাঁকড়া, সাপসহ জলজপ্রাণী মারা যাচ্ছে। মাঝেমধ্যে পাচারের উদ্দেশ্যে বিষ দিয়ে হত্যা করা হচ্ছে বাঘ ও কুমির।

প্রতিবছর সুন্দরবন ভ্রমণে যাচ্ছেন অসংখ্য পর্যটক। সবশেষ ২০১৯-২০ অর্থবছরে সুন্দরবন ভ্রমণ করেছিলেন এক লাখ ৭৩ হাজার পর্যটক। কিন্তু সচেতনতার অভাবে অনেক পর্যটক চিপসের প্যাকেট, পলিথিন, পানি ও কোমল পানীয়ের বোতল, খাবারের উচ্ছিষ্ট অংশ, খাবারের প্যাকেট, ওয়ানটাইম প্লেট ও গ্লাস ফেলছেন বনের মধ্যে মাটি ও নদীতে। এ ছাড়া উচ্চ শব্দে গান বাজানো হচ্ছে পর্যটকবাহী কিছু কিছু জলযানে। বনের মধ্যে বুঝে কিংবা না বুঝে হৈচৈ করেন কিছু পর্যটক। এর সবকিছুর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে বনের ওপর।

পর্যটকেরা শুধু নন, স্থানীয় হোটেল ও দোকানদারেরাও প্লাস্টিক ও থার্মোকলের ব্যবহার দেদার করছেন। সুন্দরবনের পরিবেশ বাঁচাতে এ সবের উপরে নিয়ন্ত্রণের কোনও চেষ্টা বা সচেতনতা বাড়াতে প্রচার চোখে পড়ছে না প্রশাসনের তরফে— এমনটাই অভিযোগ বহু মানুষের।

সুন্দরবনের কুমির ও ডলফিনের পরিমাণ কমে আসছে উল্লেখ করে প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা না নিলে রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের কারণে সুন্দরবনের বায়ু, পানি ও মাটিদূষণ বাড়বে। কয়লা পরিবহনের জন্য সুন্দরবনের ভেতরে নৌযান চলাচল বেড়ে যাবে। এ ছাড়া নৌপথ চালু রাখতে পশুর নদ খনন করায় সেখানকার ছয় প্রজাতির ডলফিন ও কুমির আরও ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের কারণে সুন্দরবনের সম্ভাব্য ক্ষতির কারণ মনে করা হচ্ছে। রামপাল প্রকল্পের আশপাশে অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠান তাদের কারখানা স্থাপন করছে। এর ফলে ইতিমধ্যে সুন্দরবনের ভেতর দিয়ে জাহাজ চলাচল বেড়ে গেছে। সামনের দিনগুলোয় তা আরও বাড়বে। ইতিমধ্যে কিছু জাহাজ দুর্ঘটনার শিকার হয়ে সুন্দরবনে জ্বালানি তেল ছড়িয়ে পড়েছে। অন্যান্য রাসায়নিক পণ্যবাহী জাহাজডুবিও হচ্ছে। এসব দূষণ সুন্দরবনের প্রাণীদের বসতি এলাকা ক্ষতিগ্রস্ত করছে। ডলফিন, কুমিরসহ অন্যান্য জলজ প্রাণীর বিচরণও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

শিল্প কারখানা স্থাপন, যান্ত্রিক নৌযান চলাচল, বিষ দিয়ে মাছ শিকারসহ বিভিন্ন তৎপরতা বনের গাছপালা, বন্যপ্রাণী ও জলজ প্রাণীর ওপর প্রভাব পড়ছে। সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা বনবিভাগ ও প্রশাসনের বিভিন্ন দপ্তরের সমন্বয়হীনতায় সুন্দরবনে পরিবেশগত ঝুঁকি বাড়ছে বলে মনে করেন৷ তারা মনে করেন,  বনের ইসিএ এলাকায় স্থাপিত অনেক শিল্প কারখানা ও বনের মধ্য দিয়ে জলযান চলার কারণে সুন্দরবনে দূষণ বেড়েছে। দূষণের কারণে এর জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়লেও কর্তৃপক্ষের টনক নড়ছে না। সরকারকে শুধু সাংবিধানিক দায়িত্ব থেকে নয়, আন্তর্জাতিক অঙ্গীকারের অংশ হিসেবে সুন্দরবনবিনাশী সব প্রকল্প বাতিল করতে হবে বলে মনে করেন তারা। তারা বলেন, দেশে এখন এমন পরিস্থিতি দাঁড়িয়েছে যারা সুন্দরবন রক্ষায় কথা বলে, তাদেরই সরকারি লোকজন ও সরকারের বিভিন্ন পক্ষ থেকে শত্রু হিসেবে দেখা হচ্ছে। কিন্তু এই সুন্দরবন রক্ষার দায়িত্ব সরকার-জনগণ সবার।

এসডব্লিউ/বিএন/কেএইচ/১৪২৮ 

ছড়িয়ে দিনঃ
  • 36
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    36
    Shares

আপনার মতামত জানানঃ