Trial Run

ইইউর নিষেধাজ্ঞার কবলে পড়তে যাচ্ছে রাশিয়া ও মিয়ানমার

ছবি: প্রথম আলো

বিরোধীদলীয় নেতাকর্মীদের দমনপীড়ন ও ধরপাকড়ের জন্য রুশ সরকারের ওপর ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) নিষেধাজ্ঞা আরোপের আলোচনা চলছিল বেশ কয়েকদিন ধরেই। পুতিনবিরোধী রুশ নেতা আলেক্সেই নাভালনির উপর দমন নীতির পর তারা এই নিষেধাজ্ঞা আরোপের নিয়ে আলোচনা করছেন৷  এবিষয়ে শীঘ্রই সিদ্ধান্তে আসবে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।এদিকে মিয়ানমারে সামরিক বাহিনীর অভ্যুত্থান ইস্যুতেও একই সিদ্ধান্ত নিতে চলেছে সংস্থাটি। আজ সোমবার(২২ ফেব্রুয়ারি) ইইউ পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা তাদের বৈঠকে এই নীতিগত সিদ্ধান্ত নিলে আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে সেই নিষেধাজ্ঞার স্পষ্ট রূপরেখা তুলে ধরা হবে। মার্চ মাসে ইইউ শীর্ষ সম্মেলনে সেই ঘোষণা করা হতে পারে।

রাশিয়ার সঙ্গে ইইউ’র সম্পর্ক বেশ কয়েক বছর ধরে অবনতির পথে৷ এর আগে ইউক্রেনের পূর্বাঞ্চলে মালয়েশীয় বিমান ভূপাতিত হওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে রাশিয়ার ওপর অবরোধ আরোপ করেছিল ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)। ইইউসহ পশ্চিমাদের অভিযোগ ছিল, ইউক্রেনের রুশপন্থী বিদ্রোহীদের অস্ত্র ও প্রশিক্ষণ দিয়ে সহায়তা করছে রাশিয়া। আর এই বিদ্রোহীরাই ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়ে মালয়েশীয় যাত্রীবাহী বিমানকে ভূপাতিত করেছে; সেই সঙ্গে কেড়ে নিয়েছে বিমানটির ২৯৮ আরোহীর প্রাণ। তখন ইইউ রাশিয়ার অস্ত্র কেনাবেচা, সমুদ্রে জ্বালানি অনুসন্ধান ও ইউরোপের বাজারে রাশিয়ার ব্যাংকগুলোর ব্যবসা করার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিল। স্নায়ুযুদ্ধের পর রাশিয়ার ওপর এটাই সবচেয়ে কড়া নিষেধাজ্ঞা।

কিন্তু বর্তমানে রুশ বিরোধী নেতা আলেক্সেই নাভালনির বিরুদ্ধে মস্কোর পদক্ষেপগুলির কারণে উত্তেজনা আরও বাড়ছে। তার বিরুদ্ধে আদালতের সর্বশেষ রায়কেও রাজনৈতিক হিসেবে বিবেচনা করছে ইইউ। সংলাপের মাধ্যমে মতবিরোধ মেটানোর প্রচেষ্টাও বিফল হয়েছে। ইইউ পররাষ্ট্র নীতি বিষয়ক প্রধান জোসেপ বরেলের মস্কো সফরের সময় রাশিয়া ইইউ দেশের কয়েকজন কূটনীতিককে বহিষ্কারের ঘোষণা করায় ব্রাসেলসে ক্ষোভ আরও বেড়ে গেছে। এমন প্রেক্ষাপটে রাশিয়ার কিছু শীর্ষ কর্তাব্যক্তির ইউরোপে প্রবেশ, ইউরোপে তাদের সম্পদের নাগালের মতো শাস্তিমূলক পদক্ষেপ নিতে পারে ইইউ। সেইসঙ্গে বেলারুশে রাশিয়ার নীতি ও নাভালনির সমর্থকদের উপর দমন নীতির মতো কারণে এই প্রথম মানবাধিকার লঙ্ঘনের দায়ে রাশিয়ার উপর নিষেধাজ্ঞা চাপাতে পারে ইইউ।

এদিকে নিষেধাজ্ঞা আরোপের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করলে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করতে প্রস্তুত রাশিয়া। গত শুক্রবার (১২ ফেব্রুয়ারি) দেশটির পররাষ্ট্রমমন্ত্রী সের্গেই ল্যাভরভ ইউটিউব চ্যানেল সোলভাইভকে দেওয়া সাক্ষাতকারে তেমনি ইঙ্গিত করেন। সের্গেই ল্যাভরভ বলেন, ‘‘আমরা দুনিয়া থেকে স্বেচ্ছায় আলাদা হতে চাই না। কিন্তু পরিস্থিতি বিরূপ হলে, আমরা সম্পর্ক ছিন্ন করতে প্রস্তুত। শান্তি চাইলে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত থাকতেই হবে।’’

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রাশিয়াকে চাপে ফেলতে গিয়ে ইউরোপীয় দেশগুলোই না চাপে পড়ে যায়, তা-ই এখন দেখার বিষয়। কেননা, ইউরোপের বাজারে রাশিয়ার ব্যাংকগুলোর ব্যবসা করার ওপর নিষেধাজ্ঞা রাশিয়াকে লন্ডন থেকে মুখ ঘুরিয়ে অন্যদিকে নিতে বাধ্য করতে পারে। তারা চীন বা হংকংয়ের দিকে ঝুঁকতে পারে। এই নিষেধাজ্ঞায় রাশিয়ার ক্ষতি হবে সামান্যই।

বিশেষজ্ঞরা বলেন, রুশ ব্যাংকগুলোকে আঘাত করতে গেলে সেই আঘাত পশ্চিমা বিশ্বের গায়েই লাগবে। এটা শেষ পর্যন্ত নিউইয়র্ক ও লন্ডনের মতো শহরগুলোকেই ক্ষতিগ্রস্ত করবে। কারণ, রুশরা এই প্রথমবারের মতো উপলব্ধি করবে যে বিশ্বের বড় বড় আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সহায়তা ছাড়াই তারা বাঁচতে পারবে। আরও বলেন, এসব নিষেধাজ্ঞা রুশ প্রেসিডেন্ট পুতিনের হাতকে শক্তিশালী করবে। রুশ জনগণ তাকে রক্ষাকর্তা হিসেবে মনে করে। এই নিষেধাজ্ঞার ফলে নিজ দেশে তার ক্ষমতা আরও পাকাপোক্ত হবে।

এদিকে মিয়ানমারে সামরিক অভ্যুত্থানের পর ইউরোপীয় ইউনিয়ন বাছাই করা সামরিক কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক পদক্ষেপের পরিকল্পনা করছে। বিশেষ করে সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ-বিক্ষোভ দমন করার নীতির তীব্র সমালোচনা করছে ব্রাসেলস। মিয়ানমারে সামরিক অভ্যুত্থানের পরপরই যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা অন্যান্যরা শাসিয়ে আসছিল। দেশটিতে গণতন্ত্র পুনর্বহাল না করলে, রাজনৈতিক নেতাদের মুক্তি না দিলে সামরিক নেতৃত্বের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে সরাসরি হুমকি দিয়েছিল।কিন্তু সেই হুমকি গায়ে লাগাচ্ছে না মিয়ানমারের সামরিক জান্তা। উল্টো তারা বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে শক্তিপ্রয়োগের নীতি বেছে নেয়। গণতন্ত্রের দাবিতে বিক্ষোভরত ব্যক্তিদের ওপর গত শনিবার সরাসরি গুলি চালানো হয়। এতে নিহতও হয় কয়েকজন গণতান্ত্রিক আন্দোলন দমনে রাজনীতিক-বিক্ষোভকারীদের বাড়িতে বাড়িতে হানা দিচ্ছে দেশটির সামরিক জান্তা। চলছে গ্রেপ্তার।

মিয়ানমারের সামরিক জান্তার জন্য নিষেধাজ্ঞার অভিজ্ঞতা নতুন কিছু নয়। সামরিক শাসন, রাজনৈতিক নেতাদের বন্দী কিংবা রোহিঙ্গা নিধনযজ্ঞের মতো অপকর্মের জন্য তারা আগেও একাধিকবার নিষেধাজ্ঞার আওতায় এসেছে।

২০১৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন রোহিঙ্গা ইস্যুতে মিয়ানমারের বর্তমান সেনাপ্রধান জেনারেল মিন অং হ্লাইংসহ চারজন সামরিক কমান্ডারের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেয়। নিষেধাজ্ঞায় থাকা মিয়ানমারের সেই সেনাপ্রধানই ১ ফেব্রুয়ারি সামরিক অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দিয়ে দেশটির ক্ষমতা দখল করেন। নির্বাচিত সরকারের স্টেট কাউন্সেলর অং সান সু চি, প্রেসিডেন্ট উইন মিন্টসহ শীর্ষ নেতাদের বন্দী করে এক বছরের জন্য জরুরি অবস্থা জারির মধ্য দিয়ে সামরিক জান্তা জানান দিচ্ছে, তারা এবারও সহজে যাচ্ছে না।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মিয়ানমারের জান্তা সরকারের এসব নিষেধাজ্ঞায় পিছু হটবার কথা নয়। মিয়ানমারের জেনারেলরা আগেই প্রমাণ করেছেন, নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও তারা টিকে থাকতে পারেন। তারা বলেন, অতীতে যে উদ্দেশ্য নিয়ে মিয়ানমারের জেনারেলদের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে, তারপর দেখা গেছে—অনেকাংশেই তারা অধরা থাকতে সক্ষম হয়েছেন। তাই অতীতের ধারাবাহিকতায় এবারও মিয়ানমারের জেনারেলদের ওপর নিষেধাজ্ঞা অর্থহীন হবে বলেই মনে হচ্ছে।

আরও বলেন, অন্যদিকে মিয়ানমারের ওপর ব্যাপকভিত্তিক অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হলে তাতে দেশটির সামরিক কর্তৃপক্ষের চেয়ে বরং সাধারণ জনগণই বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। আগে তেমনটাই দেখা গেছে। তা ছাড়া মিয়ানমারের সামরিক সরকারের ওপর নিষেধাজ্ঞার আরও একটা নেতিবাচক দিকও আছে। যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের নিষেধাজ্ঞার মুখে দেশটি আরও চীনমুখী হতে পারে।

এসডব্লিউ/ডিডব্লিউ/কেএইচ/২২১৯ 

ছড়িয়ে দিনঃ
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

আপনার মতামত জানানঃ