
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রথম দ্বিপাক্ষিক সফরের জন্য মালয়েশিয়া ও চীনকে বেছে নেওয়া দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনৈতিক মহলে ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি করেছে। ঐতিহাসিকভাবে বাংলাদেশের কোনো নতুন নেতার প্রথম বিদেশ সফর ভারত বা চীনকে কেন্দ্র করে হলেও, এই সফর একটি সুস্পষ্ট কূটনৈতিক বার্তা বহন করে।
‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতি: নতুন কূটনৈতিক দর্শন
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই সফরের মাধ্যমে তারেক রহমান সরকার তাদের ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতির বাস্তবায়ন শুরু করেছে। এখানে ভারত বা চীনের মধ্যে কাউকে অগ্রাধিকার না দিয়ে, বরং তৃতীয় পথ হিসেবে মালয়েশিয়াকে প্রথম গন্তব্য বেছে নিয়ে সরকার আঞ্চলিক শক্তিদ্বন্দ্বের বাইরে নিজের অবস্থান প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, “একটি নিরপেক্ষ ভিত্তি প্রতিষ্ঠা করে, ঢাকা ভারত-চীন প্রতিদ্বন্দ্বিতার তাৎক্ষণিক চাপ থেকে নিজেকে কিছুটা দূরে রাখার চেষ্টা করেছে”। এই সফর “ভূরাজনৈতিক কোণ থেকে দূরে শুরু করার ইচ্ছা” প্রকাশ করে।
মালয়েশিয়া: কূটনৈতিক বাফার
মালয়েশিয়াকে প্রথম গন্তব্য হিসেবে বেছে নেওয়া ছিল সুপরিকল্পিত কূটনৈতিক পদক্ষেপ। দেশটিতে প্রায় ৮ লাখ বাংলাদেশি কর্মী রয়েছেন, যা মালয়েশিয়ার মোট বিদেশি কর্মীবাহিনীর ৩৭ শতাংশ।
সিঙ্গাপুরভিত্তিক নীতি-পরামর্শক সংস্থা সোলারিস স্ট্র্যাটেজিজের বিশ্লেষক মোস্তফা ইজ্জউদ্দিনের মতে, কুয়ালালামপুরকে প্রথম গন্তব্য করে ভারতের উদ্বেগ কিছুটা লাঘব করার চেষ্টা করা হয়েছে, যা প্রমাণ করে যে ঢাকা আঞ্চলিক শক্তিদের সঙ্গে জড়ানোর আগে নিরপেক্ষ অর্থনৈতিক স্থানকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে।
একজন সিনিয়র মন্ত্রী নাম প্রকাশ না করার শর্তে দ্য ওয়্যারকে বলেছেন, “মালয়েশিয়াকে প্রথম গন্তব্য হিসেবে বেছে নেওয়া ভূরাজনৈতিক ভারসাম্য রক্ষার দৃষ্টিকোণ থেকে সঠিক সিদ্ধান্ত ছিল”।
চীন: কৌশলগত অংশীদারিত্বের নতুন অধ্যায়
বেইজিং সফরটি ছিল এই যুগল সফরের মূল কেন্দ্রবিন্দু। বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে ১৭টি দ্বিপাক্ষিক সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর হয়েছে বলে জানা যাচ্ছে । এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য:
-
তিস্তা নদী ব্যবস্থাপনা প্রকল্প: চীনের সহযোগিতায় তিস্তা নদীর পুনরুদ্ধার ও ব্যবস্থাপনা প্রকল্প বাস্তবায়নের আলোচনা হয়েছে। ভারত দীর্ঘদিন ধরে এই প্রকল্প নিয়ে উদ্বিগ্ন, বিশেষত সিলিগুড়ি করিডরের (চিকেন্স নেক) কাছাকাছি এলাকায় চীনের উপস্থিতি নিয়ে।
-
চীনা অর্থনৈতিক অঞ্চল (CEIZ): চট্টগ্রামে ৩৪০ মিলিয়ন ডলারের চীনা অর্থায়নে অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রকল্প অনুমোদন পেয়েছে, যা ১ লক্ষ কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে।
-
মোংলা বন্দর আধুনিকীকরণ: চীন মোংলা বন্দরের সম্প্রসারণ ও আধুনিকীকরণ প্রকল্পে অংশ নিতে সম্মত হয়েছে।
-
প্রতিরক্ষা ও সামুদ্রিক সহযোগিতা: যৌথ বিবৃতিতে “সামুদ্রিক বিষয়ে সহযোগিতা জোরদার” ও “২+২” কূটনৈতিক-প্রতিরক্ষা সংলাপ প্রক্রিয়া অন্বেষণের বিষয় উল্লেখ রয়েছে।
ভারতীয় উদ্বেগ ও প্রতিক্রিয়া
ভারতীয় গণমাধ্যম ও বিশ্লেষকরা এই সফরকে সতর্ক দৃষ্টিতে দেখছেন। হিন্দুস্তান টাইমস-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, “রহমান তার বিদেশনীতির অগ্রাধিকার সংকেত দিয়ে ভারতকে এড়িয়ে গেছেন, যা ঐতিহাসিকভাবে এই ধরনের সফরের গন্তব্য ছিল”।
ভারতের উদ্বেগের প্রধান কারণসমূহ:
-
শেখ হাসিনার উপস্থিতি: ২০২৪ সালের অভ্যুত্থানের পর ভারতে আশ্রয় নেওয়া সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিষয়টি দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে টানাপোড়েন সৃষ্টি করছে।
-
তিস্তা প্রকল্প: চীনের সহযোগিতায় তিস্তা প্রকল্প বাস্তবায়ন ভারতের জন্য কৌশলগত উদ্বেগের বিষয়।
-
সীমান্ত উত্তেজনা: সীমান্তে অনুপ্রবেশকারী ফেরত পাঠানো ও অভিযুক্ত পুশ-ব্যাক নিয়ে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে চাপ সৃষ্টি হয়েছে।
-
দলীয় সম্পর্ক: বিএনপি ও চীনা কমিউনিস্ট পার্টির মধ্যে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর ভারতের উদ্বেগ বাড়িয়েছে।
কৌশলগত ভারসাম্য: চীন-ভারত দ্বন্দ্বে বাংলাদেশ
ভারত ও বাংলাদেশের রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই সফর ভারত থেকে বাংলাদেশের স্থায়ী বিচ্যুতি নয়, বরং একটি বহুমুখী সম্পর্ক তৈরি করার প্রচেষ্টা।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক শফি মো. মোস্তফার মতে, এই সফর “বাংলাদেশকে একটি স্বাধীন বৈদেশিক নীতি অভিনেতা হিসেবে তুলে ধরার প্রচেষ্টা”, তবে এটি “বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের অবনতি” নির্দেশ করে না। উল্লেখ্য, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সম্প্রতি ভারত সফর করেছেন, যা সম্পর্ক স্বাভাবিককরণের ইঙ্গিত দেয়।
বিদেশি উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির পরিষ্কার করেছেন যে, “যখন তাপমাত্রা কমে আসবে এবং অনুকূল পরিবেশ তৈরি হবে” তখনই ভারত সফর হবে। এটি ইঙ্গিত দেয় যে কিছু রাজনৈতিক-কূটনৈতিক সংবেদনশীলতা এখনো সমাধান করা বাকি।
দীর্ঘমেয়াদি ভূরাজনৈতিক প্রভাব
এই সফরের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ভূরাজনৈতিক দিক:
১. আঞ্চলিক প্রভাব: ভারতের পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর সঙ্গে চীনের সম্পর্ক গভীর করার প্রবণতা বাংলাদেশেও প্রসারিত হচ্ছে। নেপাল, শ্রীলঙ্কা, মালদ্বীপের মতো দেশগুলোর মতো বাংলাদেশেও চীন তার প্রভাব বিস্তার করছে।
২. বহুমুখী সম্পর্ক: সফরটি ইঙ্গিত দেয় যে বাংলাদেশ এখন প্যাসিভ ভূরাজনৈতিক যুদ্ধক্ষেত্র থেকে সক্রিয়, স্বায়ত্তশাসিত অভিনেতা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে।
৩. দীর্ঘমেয়াদি চ্যালেঞ্জ: দুই দেশের রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা সতর্ক করেছেন যে, “ভারত ও চীনের মধ্যে সম্পর্কের ভারসাম্য রক্ষা করা তারেক রহমান সরকারের জন্য প্রধান চ্যালেঞ্জ হবে”। ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষক ঋষি গুপ্ত মনে করেন, বাংলাদেশের জন্য পথ “ভারত ও চীনের মধ্যে পছন্দ হিসেবে না বরং উন্নয়ন প্রয়োজন ও দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনের একটি সাবধানী ভারসাম্য” হিসেবে দেখা উচিত।
তারেক রহমানের মালয়েশিয়া-চীন সফর বাংলাদেশের বৈদেশিক নীতির একটি কৌশলগত পরিবর্তন নির্দেশ করে। ঐতিহাসিক দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের বদলে অর্থনৈতিক বাস্তববাদ ও কূটনৈতিক স্বায়ত্তশাসনকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে এই সরকার। বিশেষজ্ঞদের মতে, “ভারত বাংলাদেশের জন্য অপরিহার্য অংশীদার থেকে যাবে”। এই সফর ভারতকে বাদ দেওয়া নয়, বরং সুসম্পর্কের বিকল্প তৈরি করার একটি প্রচেষ্টা, যাতে ভবিষ্যতে দরকষাকষির ক্ষমতা বাড়ে।
যদি এই কূটনৈতিক ভারসাম্য রক্ষা সম্ভব হয়, তবে এটি বাংলাদেশের জন্য স্বাধীন বৈদেশিক নীতির একটি সফল উদাহরণ হতে পারে। কিন্তু যদি তা ব্যর্থ হয়, তাহলে আঞ্চলিক শক্তিদ্বন্দ্বে বাংলাদেশের অবস্থান আরও জটিল হতে পারে।
আপনার মতামত জানানঃ