বিশ্ব রাজনীতিতে এমন কিছু নেতা আছেন, যাদের প্রতিটি সিদ্ধান্ত শুধু নিজের দেশের নয়, পুরো বিশ্বের ভবিষ্যতের ওপর প্রভাব ফেলে। ডোনাল্ড ট্রাম্প সেই বিরল নেতাদের একজন। তাঁর সমর্থকদের কাছে তিনি একজন শক্তিশালী, আপসহীন এবং “আমেরিকা ফার্স্ট” নীতির প্রতীক। অন্যদিকে সমালোচকদের চোখে তিনি এমন একজন নেতা, যার অপ্রত্যাশিত সিদ্ধান্ত, কঠোর ভাষা এবং সামরিক শক্তি ব্যবহারের প্রবণতা আন্তর্জাতিক অস্থিতিশীলতা বাড়িয়ে দিতে পারে। তাই সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম, গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং কূটনৈতিক মহলে একটি প্রশ্ন বারবার ফিরে এসেছে—ট্রাম্পের নেতৃত্ব কি বিশ্বকে আরও নিরাপদ করছে, নাকি আরও ঝুঁকিপূর্ণ?
এই প্রশ্নের সহজ কোনো উত্তর নেই। কারণ ট্রাম্প নিজে খুব কম ক্ষেত্রেই নতুন যুদ্ধ শুরুর ঘোষণা দিয়েছেন; বরং তিনি বহুবার বলেছেন, তিনি “অন্তহীন যুদ্ধ” (Forever Wars) চান না। কিন্তু বাস্তবে তাঁর পররাষ্ট্রনীতি, সামরিক সিদ্ধান্ত, মিত্রদের প্রতি সমর্থন এবং প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান একাধিক সংঘাতকে আরও জটিল করেছে বলে সমালোচকেরা অভিযোগ করেন।
গাজা যুদ্ধ এ বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু। ট্রাম্প দীর্ঘদিন ধরেই ইসরায়েলের অন্যতম শক্তিশালী রাজনৈতিক সমর্থক হিসেবে পরিচিত। তাঁর প্রশাসনের সময় জেরুজালেমকে ইসরায়েলের রাজধানী হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া, মার্কিন দূতাবাস স্থানান্তর এবং পরবর্তী সময়ে ইসরায়েলের নিরাপত্তার পক্ষে ধারাবাহিক অবস্থান মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে গভীর প্রভাব ফেলেছে। সমর্থকদের মতে, এটি যুক্তরাষ্ট্রের ঐতিহ্যগত মিত্রকে রক্ষা করার নীতি। কিন্তু সমালোচকেরা মনে করেন, এতে ফিলিস্তিন প্রশ্নে যুক্তরাষ্ট্রের নিরপেক্ষতা আরও দুর্বল হয়েছে এবং কূটনৈতিক সমাধানের পথ সংকুচিত হয়েছে। আন্তর্জাতিক জনমত জরিপেও দেখা গেছে, গাজা ইস্যুতে ট্রাম্পের অবস্থান বিশ্বের অনেক দেশে নেতিবাচকভাবে মূল্যায়িত হয়েছে।
ইরান ইস্যুতে ট্রাম্পের অবস্থান আরও কঠোর। তাঁর প্রথম মেয়াদে যুক্তরাষ্ট্র ২০১৫ সালের পারমাণবিক চুক্তি (JCPOA) থেকে বেরিয়ে যায় এবং “সর্বোচ্চ চাপ” (Maximum Pressure) নীতি গ্রহণ করে। এরপর নিষেধাজ্ঞা, সামরিক উত্তেজনা এবং পারস্পরিক হুমকি দুই দেশের সম্পর্ককে নতুন মাত্রায় নিয়ে যায়। দ্বিতীয় মেয়াদে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযান, ইরানের পাল্টা প্রতিক্রিয়া এবং যুদ্ধবিরতির ভেঙে পড়া নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বহু বিশ্লেষক মনে করেন, এই সংঘাত শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার এবং আন্তর্জাতিক নিরাপত্তাকেও ঝুঁকির মুখে ফেলেছে।
তবে সমর্থকদের যুক্তিও উপেক্ষা করা যায় না। তাঁদের মতে, ট্রাম্পের কঠোর নীতিই ইরানকে আরও সতর্ক থাকতে বাধ্য করেছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিপক্ষদের কাছে একটি শক্ত বার্তা পৌঁছে দিয়েছে। তাঁদের বিশ্বাস, দুর্বল কূটনীতির চেয়ে শক্ত অবস্থান অনেক সময় সংঘাত প্রতিরোধে কার্যকর হয়। কিন্তু সমালোচকেরা পাল্টা বলেন, শক্ত অবস্থান যদি কূটনৈতিক পথকে সংকুচিত করে, তবে দীর্ঘমেয়াদে যুদ্ধের ঝুঁকিই বাড়ে।
আফগানিস্তানের ঘটনাও ট্রাম্পের উত্তরাধিকারের একটি বড় অংশ। তাঁর প্রশাসন তালেবানের সঙ্গে দোহা চুক্তি করে, যার মাধ্যমে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের ভিত্তি তৈরি হয়। সমর্থকদের মতে, দীর্ঘ দুই দশকের যুদ্ধ শেষ করার জন্য এটি ছিল বাস্তববাদী পদক্ষেপ। কিন্তু সমালোচকদের মতে, দ্রুত সেনা প্রত্যাহারের রূপরেখা তালেবানের ক্ষমতায় ফেরার পথ সহজ করে দেয় এবং আফগানিস্তানের রাজনৈতিক কাঠামো ভেঙে পড়ার ঝুঁকি বাড়ায়। যদিও চূড়ান্ত প্রত্যাহার তাঁর উত্তরসূরি প্রশাসনের সময় সম্পন্ন হয়, তবুও এই চুক্তি নিয়ে বিতর্ক আজও অব্যাহত।
ইয়েমেন ও হুথি ইস্যুতেও ট্রাম্প প্রশাসন কঠোর অবস্থান নিয়েছে। লোহিত সাগরে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল, আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং ইরান-সমর্থিত গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে সামরিক চাপ তাঁর নীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সমর্থকেরা বলেন, বৈশ্বিক বাণিজ্য রক্ষায় এটি প্রয়োজনীয় ছিল। সমালোচকদের মতে, এতে আঞ্চলিক সংঘাত আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা বেড়েছে।
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে ট্রাম্পের অবস্থানও বিশ্বজুড়ে আলোচনার বিষয়। তিনি একদিকে দ্রুত যুদ্ধ শেষ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, অন্যদিকে ন্যাটো মিত্রদের প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়ানোর জন্য চাপ সৃষ্টি করেছেন। তাঁর সমর্থকদের মতে, ইউরোপের নিরাপত্তার দায় এককভাবে যুক্তরাষ্ট্রের হওয়া উচিত নয়। কিন্তু সমালোচকেরা মনে করেন, ন্যাটো নিয়ে তাঁর কঠোর বক্তব্য পশ্চিমা জোটের ঐক্যে প্রশ্ন তুলেছে।
চীনের ক্ষেত্রে ট্রাম্প বাণিজ্য, প্রযুক্তি এবং কৌশলগত প্রতিযোগিতাকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যান। শুল্ক আরোপ, প্রযুক্তি কোম্পানির ওপর বিধিনিষেধ এবং সরবরাহ শৃঙ্খল পুনর্বিন্যাসের নীতি বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় প্রভাব ফেলে। সমর্থকেরা বলেন, চীনের অর্থনৈতিক উত্থানের মোকাবিলায় এটি প্রয়োজনীয় ছিল। সমালোচকেরা মনে করেন, এর ফলে বৈশ্বিক বাণিজ্য অস্থিতিশীল হয়েছে এবং অর্থনৈতিক উত্তেজনা বেড়েছে।
উত্তর কোরিয়ার ক্ষেত্রে ট্রাম্পের নীতি ছিল ব্যতিক্রমধর্মী। তিনি একদিকে কিম জং-উনের সঙ্গে ঐতিহাসিক বৈঠক করেন, অন্যদিকে কঠোর নিষেধাজ্ঞাও বজায় রাখেন। এই দ্বৈত কৌশলকে কেউ সাহসী কূটনীতি বলেছেন, আবার কেউ বলেছেন এটি স্থায়ী সমাধান আনতে পারেনি।
ট্রাম্পের সমালোচনার আরেকটি বড় কারণ তাঁর সিদ্ধান্ত গ্রহণের ধরন। অনেক গবেষক ও কূটনৈতিক বিশ্লেষক মনে করেন, তিনি প্রথাগত কূটনৈতিক প্রক্রিয়ার চেয়ে ব্যক্তিগত সম্পর্ক, আকস্মিক ঘোষণা এবং চাপের রাজনীতিকে বেশি গুরুত্ব দেন। তাঁদের মতে, এতে মিত্র ও প্রতিপক্ষ—উভয় পক্ষের জন্যই নীতির পূর্বাভাস কঠিন হয়ে পড়ে। আবার সমর্থকদের মতে, এই অপ্রত্যাশিত কৌশলই প্রতিপক্ষকে বিভ্রান্ত করে এবং যুক্তরাষ্ট্রকে দর-কষাকষিতে বাড়তি সুবিধা দেয়।
সাম্প্রতিক আন্তর্জাতিক জরিপে দেখা গেছে, অনেক দেশেই ট্রাম্পের পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে আস্থা কমেছে। বিশেষ করে গাজা, ইরান এবং রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের মতো ইস্যুতে তাঁর সিদ্ধান্ত আন্তর্জাতিক জনমতের একটি বড় অংশের কাছে নেতিবাচকভাবে মূল্যায়িত হয়েছে। তবে একই সঙ্গে কিছু দেশে তাঁকে দৃঢ় নেতা হিসেবেও দেখা হয়। অর্থাৎ ট্রাম্প সম্পর্কে বৈশ্বিক মতামত গভীরভাবে বিভক্ত।
একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ট্রাম্পকে ঘিরে প্রচলিত অনেক দাবির মধ্যে কিছু তথ্যগতভাবে সঠিক নয়। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ফিলিপাইনে তিনি কোনো যুদ্ধ শুরু করেননি। আবার গাজা যুদ্ধও তাঁর দ্বারা শুরু হয়নি। তবে বিভিন্ন সংঘাতে তাঁর নীতি, বক্তব্য, অস্ত্র সহায়তা, কূটনৈতিক অবস্থান বা সামরিক সিদ্ধান্ত সংঘাতের গতিপথকে প্রভাবিত করেছে কি না—সেটি নিয়েই মূল বিতর্ক।
বিশ্ব রাজনীতির বাস্তবতা হলো, কোনো একটি সংঘাতের জন্য এককভাবে একজন নেতাকে দায়ী করা কঠিন। যুদ্ধের পেছনে ঐতিহাসিক বিরোধ, আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা, অর্থনৈতিক স্বার্থ, সামরিক জোট এবং বহু রাষ্ট্রের সিদ্ধান্ত একসঙ্গে কাজ করে। তবুও এটি অস্বীকার করার উপায় নেই যে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হিসেবে ট্রাম্পের সিদ্ধান্ত বিশ্ব রাজনীতিতে অসাধারণ প্রভাব ফেলে।
তাহলে কি ট্রাম্প বিশ্বের “সবচেয়ে বিপজ্জনক ব্যক্তি”? এই প্রশ্নের উত্তর তথ্য দিয়ে চূড়ান্তভাবে দেওয়া সম্ভব নয়, কারণ এটি একটি মূল্যায়ন, প্রমাণিত সত্য নয়। তবে এটুকু নিশ্চিতভাবে বলা যায়, তিনি বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে প্রভাবশালী, বিতর্কিত এবং বিভাজন সৃষ্টি করা রাজনৈতিক নেতাদের একজন। তাঁর সমর্থকেরা তাঁকে শক্তি, জাতীয় স্বার্থ এবং দৃঢ় নেতৃত্বের প্রতীক হিসেবে দেখেন। সমালোচকেরা তাঁকে এমন একজন নেতা মনে করেন, যার নীতি বিশ্বকে আরও অনিশ্চয়তা, সামরিক উত্তেজনা এবং কূটনৈতিক সংকটের দিকে ঠেলে দিতে পারে।
ইতিহাস শেষ পর্যন্ত ট্রাম্পকে কীভাবে মূল্যায়ন করবে, তা নির্ভর করবে তাঁর সিদ্ধান্তগুলোর দীর্ঘমেয়াদি ফলাফলের ওপর। যদি তাঁর নীতির মাধ্যমে বড় সংঘাতগুলো শান্তিপূর্ণ সমাধানের পথে এগোয়, তাহলে তাঁকে একজন বাস্তববাদী কৌশলবিদ হিসেবে দেখা হতে পারে। আর যদি এসব সিদ্ধান্ত নতুন যুদ্ধ, দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা এবং আন্তর্জাতিক বিভাজন বাড়ায়, তাহলে ইতিহাস তাঁকে এক ভিন্ন আলোয় বিচার করবে। এই কারণেই ট্রাম্পকে নিয়ে বিতর্ক শুধু যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির বিষয় নয়; এটি আজ বৈশ্বিক নিরাপত্তা, কূটনীতি এবং ভবিষ্যৎ বিশ্বব্যবস্থার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয়।
আপনার মতামত জানানঃ