ভূগোল কখনো কখনো একটি রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় সম্পদ। প্রাকৃতিক সম্পদ, জনসংখ্যা কিংবা অর্থনৈতিক শক্তির পাশাপাশি ভৌগোলিক অবস্থানও আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে একটি দেশের গুরুত্ব নির্ধারণ করে। দক্ষিণ এশিয়ার মানচিত্রে বাংলাদেশ এমন এক অবস্থানে রয়েছে, যেখানে দক্ষিণ এশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মধ্যে একটি প্রাকৃতিক সেতুবন্ধন তৈরি করার সুযোগ রয়েছে। বহু বছর ধরেই বিশেষজ্ঞরা মনে করে আসছেন, এই ভৌগোলিক সুবিধাকে কাজে লাগাতে পারলে বাংলাদেশ কেবল একটি আঞ্চলিক অর্থনীতির অংশ নয়, বরং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, যোগাযোগ ও কৌশলগত সংযোগের অন্যতম কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হতে পারে। সেই প্রেক্ষাপটে ‘লুক ইস্ট পলিসি’ বা ‘পূর্বমুখী নীতি’ আবারও নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রায় রপ্তানি বাজারের বৈচিত্র্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। দীর্ঘদিন ধরে দেশের বাণিজ্যের একটি বড় অংশ নির্দিষ্ট কয়েকটি দেশের ওপর নির্ভরশীল। অথচ পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলো বিশ্বের সবচেয়ে দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনৈতিক অঞ্চলের মধ্যে অন্যতম। চীন, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া, সিঙ্গাপুর ও আসিয়ানভুক্ত অন্যান্য দেশের সঙ্গে যোগাযোগ সহজ হলে বাংলাদেশের রপ্তানি, বিনিয়োগ এবং শিল্পায়নের নতুন সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে।
লুক ইস্ট পলিসির মূল দর্শন ছিল পূর্বাঞ্চলের দেশগুলোর সঙ্গে সরাসরি সড়ক, রেল ও নৌ-যোগাযোগ গড়ে তোলা। মিয়ানমারকে সংযোগের কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করে বাংলাদেশকে বৃহত্তর এশীয় অর্থনৈতিক করিডোরের সঙ্গে যুক্ত করার ধারণা দীর্ঘদিন ধরেই আলোচিত। যদি এই সংযোগ কার্যকর হয়, তাহলে পণ্য পরিবহনের সময় ও ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে। এতে বাংলাদেশের উৎপাদিত পোশাক, ওষুধ, চামড়াজাত পণ্য, কৃষিপণ্য এবং অন্যান্য শিল্পপণ্য নতুন বাজারে আরও দ্রুত পৌঁছানো সম্ভব হবে।
বর্তমান বিশ্বে করিডোর কেবল একটি সড়ক বা রেললাইন নয়; এটি অর্থনীতি, প্রযুক্তি, বিনিয়োগ এবং কৌশলগত সম্পর্কের সমন্বিত অবকাঠামো। বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে যেসব অর্থনৈতিক করিডোর গড়ে উঠেছে, সেগুলোর আশপাশে নতুন শিল্পাঞ্চল, বন্দর, গুদাম, লজিস্টিকস হাব এবং প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবসা দ্রুত বিকশিত হয়েছে। বাংলাদেশও যদি এমন একটি করিডোরের অংশ হতে পারে, তাহলে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে নতুন শিল্প ও কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
চট্টগ্রাম ও মোংলা সমুদ্রবন্দর বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের প্রাণকেন্দ্র। পূর্ব এশিয়ার সঙ্গে স্থল ও সমুদ্রপথে কার্যকর সংযোগ স্থাপিত হলে এই বন্দরগুলোর কৌশলগত গুরুত্ব আরও বৃদ্ধি পাবে। পাশাপাশি ভবিষ্যতে গভীর সমুদ্রবন্দর, কনটেইনার টার্মিনাল এবং মালামাল পরিবহন ব্যবস্থার আধুনিকায়ন দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
তবে এই সম্ভাবনার পাশাপাশি বাস্তবতার দিকটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম প্রতিযোগিতামূলক ভূরাজনৈতিক অঞ্চল। এখানে যুক্তরাষ্ট্র, চীন, ভারত, জাপানসহ একাধিক শক্তিধর রাষ্ট্রের কৌশলগত স্বার্থ জড়িয়ে আছে। ফলে যেকোনো নতুন করিডোর বা অবকাঠামো প্রকল্প শুধু অর্থনৈতিক বিষয় নয়; এর সঙ্গে নিরাপত্তা, কূটনীতি এবং আঞ্চলিক ভারসাম্যের প্রশ্নও যুক্ত হয়ে যায়।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির অন্যতম শক্তি হচ্ছে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখা। স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশ বিভিন্ন দেশের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলার চেষ্টা করেছে এবং কোনো একক শক্তির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল হওয়ার পরিবর্তে বহুমাত্রিক কূটনীতিকে গুরুত্ব দিয়েছে। ভবিষ্যতেও নতুন কোনো আঞ্চলিক করিডোরে যুক্ত হওয়ার ক্ষেত্রে সেই নীতিই সবচেয়ে কার্যকর হতে পারে।
মিয়ানমার এই পুরো পরিকল্পনার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কারণ ভৌগোলিকভাবে বাংলাদেশ থেকে পূর্ব এশিয়ায় স্থলপথে পৌঁছানোর সবচেয়ে বাস্তবসম্মত রুটটি মিয়ানমারের মধ্য দিয়েই যায়। কিন্তু দেশটিতে দীর্ঘদিন ধরে চলমান সংঘাত, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং নিরাপত্তা পরিস্থিতি যেকোনো বড় অবকাঠামো প্রকল্পের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। তাই টেকসই যোগাযোগ প্রতিষ্ঠার আগে সেখানে শান্তি, স্থিতিশীলতা এবং কার্যকর প্রশাসনিক পরিবেশ নিশ্চিত হওয়া জরুরি।
রোহিঙ্গা সংকটও এই বাস্তবতার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বাংলাদেশ কয়েক বছর ধরে বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা শরণার্থীকে আশ্রয় দিয়ে আসছে। ফলে মিয়ানমারের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের যে কোনো উদ্যোগে মানবিক ও নিরাপত্তা—উভয় বিষয়কেই গুরুত্ব দিতে হবে। এমন কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করা উচিত নয়, যাতে বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ কিংবা সীমান্ত নিরাপত্তা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে করিডোরের সবচেয়ে বড় সুবিধা হতে পারে আঞ্চলিক বাণিজ্যের বিস্তার। বাংলাদেশ যদি ট্রানজিট, ট্রান্সশিপমেন্ট, গুদামজাতকরণ এবং লজিস্টিকস সেবার একটি আঞ্চলিক কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠতে পারে, তাহলে বৈদেশিক মুদ্রা আয় বাড়বে। পাশাপাশি নতুন বিনিয়োগ আকৃষ্ট হবে এবং স্থানীয় শিল্পের বিকাশও ত্বরান্বিত হবে।
বাংলাদেশের তরুণ জনগোষ্ঠী দেশের সবচেয়ে বড় শক্তি। আধুনিক যোগাযোগ অবকাঠামো তৈরি হলে শুধু পণ্য পরিবহন নয়, প্রযুক্তি, শিক্ষা, পর্যটন এবং সেবা খাতেও নতুন সুযোগ সৃষ্টি হবে। আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ বাড়লে দক্ষ জনশক্তির চাহিদা বৃদ্ধি পাবে, যা কর্মসংস্থান বৃদ্ধিতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।
তবে বড় অবকাঠামো প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে ঋণ ব্যবস্থাপনা, পরিবেশগত প্রভাব, স্থানীয় জনগণের স্বার্থ এবং অর্থনৈতিক সক্ষমতার বিষয়গুলোও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। উন্নয়ন যেন দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতির ওপর অযাচিত চাপ সৃষ্টি না করে, সে বিষয়েও সতর্ক থাকতে হবে। প্রতিটি প্রকল্পের সম্ভাব্য লাভ-ক্ষতি, আর্থিক টেকসইতা এবং পরিবেশগত প্রভাব নিরপেক্ষভাবে মূল্যায়ন করা জরুরি।
আন্তর্জাতিক করিডোরে যুক্ত হওয়ার অর্থ কেবল রাস্তা নির্মাণ নয়। এর সঙ্গে কাস্টমস ব্যবস্থার আধুনিকায়ন, সীমান্ত অবকাঠামো উন্নয়ন, ডিজিটাল বাণিজ্য, নিরাপত্তা সমন্বয় এবং দক্ষ প্রশাসনিক ব্যবস্থাও প্রয়োজন। অন্যথায় অবকাঠামো থাকলেও তার পূর্ণ সুফল পাওয়া সম্ভব হবে না।
বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়া। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে প্রতিটি রাষ্ট্রই নিজ নিজ কৌশলগত ও অর্থনৈতিক স্বার্থকে গুরুত্ব দেয়। তাই বাংলাদেশেরও প্রয়োজন বাস্তববাদী, ভারসাম্যপূর্ণ এবং দূরদর্শী সিদ্ধান্ত গ্রহণ। কোনো একক শক্তির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল না হয়ে বহুপাক্ষিক সহযোগিতা ও উন্মুক্ত অর্থনৈতিক সম্পর্কই দীর্ঘমেয়াদে দেশের জন্য বেশি লাভজনক হতে পারে।
একই সঙ্গে দেশের কৃষি, শিল্প, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা এবং স্থানীয় অর্থনীতির সুরক্ষাও নিশ্চিত করতে হবে। আন্তর্জাতিক করিডোরের সুবিধা যেন কেবল বিদেশি বিনিয়োগকারীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে দেশের সাধারণ মানুষ, স্থানীয় ব্যবসায়ী এবং শিল্প উদ্যোক্তারাও পায়, সে বিষয়টি নীতিনির্ধারণে গুরুত্ব পাওয়া উচিত।
বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান একটি বড় সম্ভাবনা, তবে সেটি তখনই সম্পদে পরিণত হবে, যখন কৌশলগত দূরদর্শিতা, অর্থনৈতিক পরিকল্পনা এবং দক্ষ কূটনীতির সমন্বয় ঘটবে। একটি সফল করিডোর দেশের বন্দর, শিল্প, যোগাযোগ, পর্যটন, শিক্ষা এবং প্রযুক্তি খাতে নতুন গতি আনতে পারে। আবার ভুল পরিকল্পনা বা একপাক্ষিক সিদ্ধান্ত ভবিষ্যতে নতুন চ্যালেঞ্জও তৈরি করতে পারে।
তাই পূর্বমুখী যোগাযোগের যে সম্ভাবনা সামনে এসেছে, তাকে আবেগ নয়, বরং বাস্তবতা, তথ্য এবং জাতীয় স্বার্থের আলোকে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। বাংলাদেশ যদি নিজস্ব কৌশলগত অবস্থানকে দক্ষতার সঙ্গে কাজে লাগাতে পারে, ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করে এবং অবকাঠামোগত সক্ষমতা বৃদ্ধি করতে পারে, তাহলে ভবিষ্যতে দেশটি দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য ও যোগাযোগের কেন্দ্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে সক্ষম হবে। সেই লক্ষ্য অর্জনের জন্য প্রয়োজন সুপরিকল্পিত পদক্ষেপ, আঞ্চলিক সহযোগিতা, শক্তিশালী কূটনীতি এবং সর্বোপরি এমন একটি উন্নয়নদর্শন, যেখানে জাতীয় স্বার্থ, অর্থনৈতিক অগ্রগতি ও সার্বভৌমত্ব—এই তিনটি বিষয় সমান গুরুত্ব পায়। তাহলেই লুক ইস্ট পলিসি শুধু একটি কূটনৈতিক ধারণা হয়ে থাকবে না; বরং বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ অর্থনীতি ও আঞ্চলিক সংযোগের নতুন দিগন্ত উন্মোচনের কার্যকর ভিত্তি হয়ে উঠতে পারে।
আপনার মতামত জানানঃ