চীনের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ইউনান প্রদেশ থেকে মিয়ানমারের ভেতর দিয়ে বঙ্গোপসাগরের উপকূল পর্যন্ত একটি অর্থনৈতিক করিডর নির্মাণের পরিকল্পনা নতুন কিছু নয়। তবে সাম্প্রতিক সময়ে এই করিডরকে ঘিরে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে যে আলোচনা শুরু হয়েছে, তা এটিকে কেবল একটি অবকাঠামো প্রকল্পের সীমায় রাখেনি; বরং দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ভবিষ্যৎ ভূরাজনীতি, বাণিজ্য এবং নিরাপত্তার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে পরিণত করেছে। চীনের উচ্চাভিলাষী ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’ (বিআরআই)-এর গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে পরিচিত চীন-মিয়ানমার অর্থনৈতিক করিডর (সিএমইসি) এখন এমন এক প্রকল্প, যার প্রভাব শুধু চীন ও মিয়ানমারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং বাংলাদেশ, ভারত, যুক্তরাষ্ট্র এবং পুরো ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের কৌশলগত সমীকরণেও এর সুদূরপ্রসারী প্রতিফলন দেখা যেতে পারে।
বিশ্ব রাজনীতিতে যোগাযোগ অবকাঠামো এখন আর কেবল উন্নয়নের প্রতীক নয়; এটি শক্তি, প্রভাব এবং অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণের অন্যতম হাতিয়ার। যে দেশ যত বেশি বন্দর, রেলপথ, মহাসড়ক ও জ্বালানি করিডর নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে, ভবিষ্যতের অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতায় তার অবস্থান ততই শক্তিশালী হবে। এই বাস্তবতা বিবেচনায় রেখে চীন গত এক দশকেরও বেশি সময় ধরে এশিয়া, আফ্রিকা ও ইউরোপজুড়ে বিশাল অবকাঠামো নেটওয়ার্ক গড়ে তুলছে। সেই নেটওয়ার্কের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সংযোগ হলো মিয়ানমারের রাখাইন উপকূলের কিয়াউকফিউ গভীর সমুদ্রবন্দর।
ভৌগোলিকভাবে চীন একটি শক্তিশালী রাষ্ট্র হলেও এর একটি বড় সীমাবদ্ধতা হলো ভারত মহাসাগরে সরাসরি প্রবেশাধিকার না থাকা। বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকা থেকে আসা অধিকাংশ জ্বালানি এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক পণ্য মালাক্কা প্রণালি হয়ে চীনে পৌঁছে। কিন্তু এই সংকীর্ণ সমুদ্রপথ যেকোনো আন্তর্জাতিক সংঘাতের সময় সহজেই ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। দীর্ঘদিন ধরেই বেইজিং এই পরিস্থিতিকে ‘মালাক্কা সংকট’ হিসেবে বিবেচনা করে আসছে। তাই বিকল্প একটি নিরাপদ পথ তৈরির লক্ষ্যেই মিয়ানমারের ভেতর দিয়ে ভারত মহাসাগরে পৌঁছানোর পরিকল্পনা বাস্তবায়নে জোর দিচ্ছে চীন।
চীন-মিয়ানমার অর্থনৈতিক করিডরের মূল পরিকল্পনা হলো ইউনানের রাজধানী কুনমিং থেকে সীমান্ত শহর মুসে হয়ে মিয়ানমারের মান্দালয় পর্যন্ত একটি বিস্তৃত যোগাযোগ নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা। সেখান থেকে একদিকে ইয়াঙ্গুন এবং অন্যদিকে রাখাইনের কিয়াউকফিউ বন্দরের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করা হবে। এই করিডরে আধুনিক মহাসড়ক, উচ্চগতির রেলপথ, শিল্পাঞ্চল, বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল এবং জ্বালানি পাইপলাইন যুক্ত থাকবে। ইতিমধ্যে কিয়াউকফিউ থেকে ইউনান পর্যন্ত তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস পরিবহনের দুটি পাইপলাইন চালু রয়েছে, যা চীনের জ্বালানি নিরাপত্তায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
কিয়াউকফিউ বন্দরকে কেন্দ্র করে চীনের আগ্রহের অন্যতম কারণ হলো এটি ভারত মহাসাগরের খুব কাছাকাছি অবস্থিত। ফলে মধ্যপ্রাচ্য থেকে আসা তেলবাহী জাহাজগুলোকে আর দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে মালাক্কা প্রণালি অতিক্রম করতে হবে না। জাহাজ থেকে তেল খালাস করে পাইপলাইনের মাধ্যমে সরাসরি ইউনান পর্যন্ত পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হবে। এতে পরিবহন ব্যয় যেমন কমবে, তেমনি যেকোনো সামুদ্রিক অবরোধের ঝুঁকিও অনেকাংশে হ্রাস পাবে। একই সঙ্গে চীনের তুলনামূলক অনুন্নত পশ্চিমাঞ্চলীয় অঞ্চলগুলো শিল্পায়ন ও বাণিজ্যে নতুন গতি পাবে।
অন্যদিকে, অর্থনৈতিক সংকট ও আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞায় জর্জরিত মিয়ানমারের সামরিক সরকারের জন্যও এই প্রকল্প অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। চীনের বিনিয়োগে নতুন শিল্পাঞ্চল, সড়ক, রেলপথ এবং বন্দর নির্মিত হলে দেশটির অবকাঠামো উন্নয়নের পাশাপাশি কর্মসংস্থান ও রাজস্ব আয় বাড়তে পারে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিচ্ছিন্ন অবস্থায় থাকা জান্তা সরকারের জন্য এটি অর্থনৈতিকভাবে একটি বড় সহায়তা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
তবে এই করিডরের বাস্তবায়ন মোটেও সহজ নয়। মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং দীর্ঘস্থায়ী গৃহযুদ্ধ বর্তমানে সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। রাখাইনসহ করিডরের বিভিন্ন অংশে জান্তা বাহিনী এবং জাতিগত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে সংঘর্ষ অব্যাহত রয়েছে। বিশেষ করে আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণে চলে যাওয়া কিছু গুরুত্বপূর্ণ এলাকা প্রকল্প বাস্তবায়নকে আরও জটিল করে তুলেছে। নিরাপত্তাহীনতার কারণে অনেক অবকাঠামো প্রকল্পের কাজ ধীর হয়ে গেছে এবং বিদেশি বিনিয়োগকারীদের মধ্যেও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
এই প্রকল্প ঘিরে পরিবেশগত এবং সামাজিক উদ্বেগও কম নয়। কিয়াউকফিউ বন্দর, শিল্পাঞ্চল এবং রেলপথ নির্মাণের কারণে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ভূমি অধিগ্রহণ, জীবিকা হারানো এবং পরিবেশের ওপর সম্ভাব্য নেতিবাচক প্রভাব নিয়ে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা ও নাগরিক সংগঠন উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। একই সঙ্গে অনেক বিশ্লেষক মনে করেন, অতিরিক্ত বিদেশি ঋণের বোঝা ভবিষ্যতে মিয়ানমারের অর্থনীতির জন্য নতুন ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
সাম্প্রতিক সময়ে এই করিডরকে ঘিরে নতুন মাত্রা যুক্ত হয়েছে বাংলাদেশের সম্ভাব্য সম্পৃক্ততা। চীনের পক্ষ থেকে মিয়ানমার হয়ে বাংলাদেশ পর্যন্ত করিডর সম্প্রসারণের প্রস্তাব আলোচনায় এসেছে। এ পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দরের সঙ্গে চীনের ইউনান প্রদেশ এবং মিয়ানমারের বাজারের সরাসরি সংযোগ স্থাপনের সুযোগ তৈরি হতে পারে। এতে বাংলাদেশের রপ্তানি, ট্রানজিট সুবিধা এবং আঞ্চলিক বাণিজ্যের নতুন সম্ভাবনা সৃষ্টি হওয়ার কথা বলা হচ্ছে।
তবে এই সম্ভাবনার পাশাপাশি রয়েছে নানা জটিলতা। মিয়ানমারের চলমান সংঘাত, রোহিঙ্গা সংকট এবং সীমান্ত নিরাপত্তা বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য বিষয়। কেবল অর্থনৈতিক লাভের হিসাব নয়, বরং জাতীয় নিরাপত্তা, আঞ্চলিক কূটনীতি এবং প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্কের ভারসাম্য বজায় রাখাও বাংলাদেশের জন্য সমান গুরুত্বপূর্ণ। ফলে যেকোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে বিষয়টি অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে মূল্যায়ন করতে হবে।
ভারতও এই করিডরকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। কিয়াউকফিউ বন্দরে চীনের শক্তিশালী উপস্থিতিকে নয়াদিল্লি ভারত মহাসাগরে বেইজিংয়ের কৌশলগত বিস্তারের অংশ হিসেবে দেখে। অনেক বিশ্লেষক এটিকে ‘স্ট্রিং অব পার্লস’ কৌশলের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান বলে উল্লেখ করেন, যার মাধ্যমে চীন ভারতকে ঘিরে বন্দর ও অবকাঠামোর একটি নেটওয়ার্ক তৈরি করছে। এর জবাবে ভারতও মিয়ানমার হয়ে উত্তর-পূর্ব ভারতের সঙ্গে সংযোগ বাড়াতে বিভিন্ন অবকাঠামো প্রকল্প বাস্তবায়নের চেষ্টা করছে।
শুধু ভারত নয়, যুক্তরাষ্ট্র এবং ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের অন্যান্য মিত্র দেশও এই করিডরের অগ্রগতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। তাদের আশঙ্কা, ভারত মহাসাগরে চীনের বাণিজ্যিক উপস্থিতি ভবিষ্যতে সামরিক প্রভাবেও রূপ নিতে পারে। যদিও বেইজিং বরাবরই দাবি করে আসছে, এই প্রকল্প সম্পূর্ণ অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং আঞ্চলিক সংযোগ বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে নেওয়া হয়েছে।
বর্তমান বাস্তবতায় করিডরের অনেক পরিকল্পনা এখনো কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ। নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতি, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা প্রকল্পের গতি কমিয়ে দিয়েছে। তারপরও চীন এই উদ্যোগ থেকে সরে আসার কোনো লক্ষণ দেখায়নি। বরং দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত বিনিয়োগ হিসেবে তারা ধাপে ধাপে প্রকল্প বাস্তবায়নের পথ খুঁজছে।
বিশ্লেষকদের মতে, আগামী এক দশকে এশিয়ার অর্থনৈতিক মানচিত্রে সবচেয়ে বড় পরিবর্তনগুলোর একটি ঘটতে পারে যোগাযোগ অবকাঠামোকে কেন্দ্র করে। সেই পরিবর্তনের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকতে পারে চীন-মিয়ানমার অর্থনৈতিক করিডর। এটি সফল হলে শুধু চীনের জ্বালানি নিরাপত্তা নয়, পুরো অঞ্চলের বাণিজ্য প্রবাহ, বিনিয়োগের ধারা এবং ভূরাজনৈতিক ভারসাম্যেও বড় পরিবর্তন আসতে পারে।
বাংলাদেশের জন্য বিষয়টি তাই একই সঙ্গে সম্ভাবনা ও সতর্কতার। একদিকে আঞ্চলিক সংযোগ, রপ্তানি বৃদ্ধি এবং নতুন বাজারে প্রবেশের সুযোগ রয়েছে; অন্যদিকে রয়েছে কূটনৈতিক ভারসাম্য, নিরাপত্তা এবং জাতীয় স্বার্থ রক্ষার কঠিন চ্যালেঞ্জ। তাই করিডরে যুক্ত হওয়ার প্রশ্নে অর্থনৈতিক সুবিধার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি ভূরাজনৈতিক বাস্তবতাকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে।
বঙ্গোপসাগরকে ঘিরে নতুন এই ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতা ভবিষ্যতে এশিয়ার শক্তির ভারসাম্য কোন দিকে নিয়ে যাবে, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা কঠিন। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট—চীন-মিয়ানমার অর্থনৈতিক করিডর আর শুধু একটি অবকাঠামো প্রকল্প নয়; এটি ভবিষ্যতের আঞ্চলিক রাজনীতি, অর্থনীতি এবং কৌশলগত প্রতিযোগিতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। বাংলাদেশের জন্যও এই পরিবর্তন গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ এবং বিচক্ষণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের সময় এখনই।
আপনার মতামত জানানঃ