
বাংলাদেশের ‘লুক ইস্ট’ (পূর্বমুখী) নীতি—যার মূল লক্ষ্য পূর্ব এশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করা—বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে সম্ভবত এর জন্মলগ্নের চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ভূরাজনৈতিক পরিবর্তন, অর্থনৈতিক বাস্তবতা এবং জলবায়ু সংকট—এই তিনটি কারণের সম্মিলনে নীতিটির প্রাসঙ্গিকতা কয়েকগুণ বেড়েছে।
নীতিটি নতুন নয়, তবে বর্তমান সময়ে এর জরুরি প্রয়োজনীয়তা কয়েকটি স্তরে বিশ্লেষণ করা যায়:
১. ভূরাজনৈতিক সাম্যাবস্থা রক্ষা:
ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে যখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও ভারতের মতো শক্তিধর রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতা চরমে, তখন বাংলাদেশের জন্য কূটনৈতিক বৈচিত্র্য আনা অনিবার্য। ‘লুক ইস্ট’ নীতি বাংলাদেশকে এই প্রতিযোগিতার মাঝে ভারসাম্য রক্ষার সুযোগ দেয়—একদিকে চীনের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক গভীর করা, অন্যদিকে ভারত ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নিরাপত্তা ও কৌশলগত সম্পর্ক অটুট রাখা। এর মাধ্যমে ঢাকা নিজের স্বাধীন বৈদেশিক নীতি পরিচালনার জায়গাটি ধরে রাখতে পারছে।
২. স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উত্তরণের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা:
২০২৬ সালে বাংলাদেশ এলডিসি থেকে উত্তীর্ণ হওয়ার পথে, যার ফলে পশ্চিমা বাজারে বাণিজ্য সুবিধা হারানোর শঙ্কা রয়েছে। এই নীতি সে ক্ষেত্রে একটি কার্যকর ‘হেজিং’ কৌশল হিসেবে কাজ করছে। আসিয়ান (আসিয়ান) ব্লকের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি এবং প্রাচ্য অর্থনীতিগুলোর সঙ্গে নতুন বাণিজ্য করিডোর তৈরি করলে বাংলাদেশ তার রপ্তানি বাজার ও প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) উভয়ই বহুমুখী করতে পারবে।
৩. আঞ্চলিক সংযোগ ও অবকাঠামো উন্নয়ন:
পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর কাছে রয়েছে বিপুল পুঁজি ও অভিজ্ঞতা। বাংলাদেশের মেগা প্রকল্পগুলোয় এই পুঁজি ও প্রযুক্তি কাজে লাগানো অত্যন্ত জরুরি। দ্বিপাক্ষিক উদ্যোগের পাশাপাশি বাংলাদেশ-চীন-ভারত-মিয়ানমার (বিসিআইএম) অর্থনৈতিক করিডোরের মতো উদ্যোগগুলো বাংলাদেশকে এই অঞ্চলের একটি গুরুত্বপূর্ণ ট্রানজিট হাবে পরিণত করার সম্ভাবনা বহন করে, যা দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মধ্যে সেতুবন্ধন তৈরি করবে।
৪. জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা ও প্রযুক্তি স্থানান্তর:
জলবায়ু ঝুঁকির দিক থেকে বাংলাদেশ বিশ্বের সামনের সারির দেশগুলোর একটি। অন্যদিকে, পূর্ব এশিয়ার অনেক দেশ নবায়নযোগ্য জ্বালানি, সবুজ প্রযুক্তি এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় বিশ্বনেতা। এই নীতির মাধ্যমেই বাংলাদেশ টেকসই উন্নয়ন, অভিযোজন প্রকল্প ও প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি ও অর্থায়ন পেতে পারে।
৫. রোহিঙ্গা সংকটে কূটনৈতিক সমর্থন লাভ:
মিয়ানমার আসিয়ানের সদস্য। রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন ও এই সংকটের স্থায়ী সমাধানে আসিয়ানের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই ‘লুক ইস্ট’ নীতি বাংলাদেশের জন্য একটি অপরিহার্য কূটনৈতিক হাতিয়ার, যার মাধ্যমে আসিয়ানকে এই সমস্যা সমাধানে আরও সক্রিয়ভাবে সম্পৃক্ত করা সম্ভব।
‘পূর্বমুখী’ নীতি এখন আর কোনো কূটনৈতিক অলঙ্কার নয়; এটি বাংলাদেশের বাস্তবিক প্রয়োজন। বহুমুখী বিশ্বে বাংলাদেশের নিজের অবস্থান নির্ধারণ, অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত করা এবং সীমান্ত পেরিয়ে আসা চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলার মূল চাবিকাঠি হলো এই নীতি। তাই ভূরাজনীতি, অর্থনীতি ও কূটনীতি—তিন ক্ষেত্রেই এই নীতির সফল বাস্তবায়ন এখন আগের চেয়েও বেশি সময়োপযোগী ও জরুরি।
আপনার মতামত জানানঃ