মঙ্গলবার বিকেল সাড়ে চারটা। জাপানের কিয়ুশু দ্বীপের কুমামোতো অঞ্চলে তখন চলছিল যে যার মতো স্বাভাবিক জীবনযাপন। হঠাৎ পায়ের নিচের মাটি কেঁপে উঠল প্রবল দুলুনিতে। যাঁরা সেই মুহূর্তের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেছেন, তাঁদের ভাষায় মনে হয়েছিল শক্ত মাটি যেন মুহূর্তেই তরল হয়ে গেছে, পায়ের নিচে যেন সমুদ্রের ঢেউ। এক বাসিন্দা পরে জানিয়েছিলেন, ঘরের টিভি সেটটাও তাঁর গায়ের ওপর হুড়মুড়িয়ে পড়ে গিয়েছিল। এভাবেই শুরু হয় এক বিভীষিকাময় রাতের, যার রেশ এখনো কাটেনি।
জাপানের আবহাওয়া অধিদপ্তর প্রাথমিকভাবে এই ভূকম্পনের মাত্রা পরিমাপ করেছিল ৭ দশমিক ১, যদিও পরবর্তী সময়ে মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা এটিকে কিছুটা কম, ৬ দশমিক ৮ মাত্রার বলে জানিয়েছে। মাত্রা যা-ই হোক না কেন, এর ধ্বংসযজ্ঞ ছিল ভয়াবহ। সবশেষ হিসাব বলছে, এই ভূমিকম্পে প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত তেরোজন মানুষ, আর এখনো অনেকে চাপা পড়ে আছেন ধ্বংসস্তূপের নিচে। রাত জেগে চলছে তাঁদের উদ্ধারের প্রাণান্তকর চেষ্টা।
কুমামোতো প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষের বরাত দিয়ে জানা গেছে, ভূমিকম্প আঘাত হানার পর থেকে রাতভর চলা উদ্ধার তৎপরতায় প্রায় দশ হাজারের কাছাকাছি মানুষকে নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নেওয়া সম্ভব হয়েছে। তবে এখনো প্রায় সাঁইত্রিশ হাজারের কাছাকাছি পরিবার বিদ্যুৎবিহীন অবস্থায় দিন কাটাচ্ছে। বিপর্যয়ের মাত্রা বোঝা যায় রেল যোগাযোগ বিপর্যস্ত হওয়া থেকেও। জাপান রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, কিয়ুশু দ্বীপে ট্রেন চলাচল পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে ভূমিকম্পের পর থেকে। এমনকি হাইস্পিড বুলেট ট্রেনের অন্তত সাতজন যাত্রী আহত হয়েছেন বলেও জাতীয় সম্প্রচার মাধ্যম নিশ্চিত করেছে। ক্ষতিগ্রস্ত লাইনে আটকে পড়া বেশ কিছু ট্রেনের যাত্রীদের পুরো রাতটাই কাটাতে হয়েছে বগির ভেতরে, উদ্ধারের অপেক্ষায়।
সবচেয়ে হৃদয়বিদারক দৃশ্যের জন্ম দিয়েছে কুমামোতোর একটি বহুতল শপিং কমপ্লেক্স, ইয়ন মল। ভূমিকম্পের আঘাতে ভবনটি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, আর সেখানে আটকা পড়া মানুষদের উদ্ধারে চলছে টানা তল্লাশি অভিযান। এখন পর্যন্ত সেখান থেকে তিনজনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। প্রাথমিকভাবে স্থানীয় দমকল বাহিনী জানিয়েছিল, ভবনের ভেতরে একটি বিস্ফোরণের ঘটনাও ঘটেছে বলে তথ্য পাওয়া গেছে। প্রশাসনিক অঞ্চলের এক মুখপাত্র পরে জানান, মল থেকে মোট আটজনকে জীবিত উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। এদের মধ্যে চারজন মাঝারি ধরনের আহত, একজনের আঘাত সামান্য, আর একজনের অবস্থা সংকটাপন্ন—তাঁর হৃৎস্পন্দন ও শ্বাসক্রিয়া বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। উদ্ধারকারী দলগুলো এখনো নিখোঁজদের প্রকৃত সংখ্যা এবং ভবনের ভেতরে আরও কেউ আটকা আছেন কি না, তা যাচাই করার কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। দমকল বাহিনী, পুলিশ এবং জাপানের আত্মরক্ষা বাহিনী মিলে সারা রাত ধরে এই উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করেছে।
আরেকটি মর্মান্তিক ঘটনা ঘটেছে ইয়াতসুশিরো শহরে। সেখানে একটি কাগজ উৎপাদনকারী কারখানার চিমনি ধসে পড়ায় দুজনের মৃত্যু হয়েছে, আর এখনো নয়জন কর্মীর কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি। এ ছাড়া অঞ্চলজুড়ে অন্তত পঁয়তাল্লিশটি চিকিৎসাকেন্দ্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে জানা গেছে, যা দুর্যোগ-পরবর্তী জরুরি চিকিৎসাসেবা দেওয়ার ক্ষেত্রে বাড়তি সংকট তৈরি করেছে। এমনকি সপ্তদশ শতাব্দীতে নির্মিত একটি ঐতিহাসিক দুর্গের বাইরের দেয়ালও ধসে পড়েছে ভূকম্পনের তীব্রতায়, যা এই অঞ্চলের ঐতিহাসিক ঐতিহ্যের ওপরও আঘাত হেনেছে।
দুর্যোগ মোকাবিলায় জাপান সরকার দ্রুত পদক্ষেপ নিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি বুধবার সকালে দেওয়া এক বার্তায় নিহতদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান এবং জরুরি সেবাকর্মীদের নিরলস প্রচেষ্টার জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, এখনো বহু মানুষ উদ্ধারের অপেক্ষায় রয়েছেন এবং এই মুহূর্তে প্রতিটি সেকেন্ড গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি এখন সময়ের সঙ্গে এক প্রাণান্তকর প্রতিযোগিতায় পরিণত হয়েছে। উদ্ধারকাজে সহায়তার জন্য প্রধানমন্ত্রী সাড়ে তিন হাজারের বেশি কর্মী মোতায়েন করেছেন। এই দলগুলো ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় ক্ষয়ক্ষতির প্রকৃত চিত্র নিরূপণ ও পর্যবেক্ষণের কাজ করছে। একই সঙ্গে গ্রীষ্মের তীব্র গরম আবহাওয়া অব্যাহত থাকার প্রেক্ষাপটে তিনি স্থানীয় বাসিন্দা এবং উদ্ধারকর্মীদের হিটস্ট্রোক এড়াতে প্রয়োজনীয় সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
কুমামোতোয় দীর্ঘদিন ধরে বসবাসরত এক স্কটিশ নাগরিক তাঁর অভিজ্ঞতা তুলে ধরেছেন গণমাধ্যমের কাছে। গত এক দশকে এটি তাঁর দ্বিতীয়বার এমন ভয়াবহ ভূকম্পনের সম্মুখীন হওয়া। ২০১৬ সালে এই একই অঞ্চলে আঘাত হানা প্রলয়ংকরী ভূমিকম্পের সময়ও তিনি সেখানে ছিলেন এবং সেবারও গণমাধ্যমের কাছে তাঁর অভিজ্ঞতা তুলে ধরেছিলেন। তাঁর পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, দশ বছর আগের সেই বিপর্যয়ের তুলনায় এবারের ক্ষয়ক্ষতি কিছুটা কম হলেও আতঙ্কের মাত্রা কোনো অংশে কম ছিল না। কম্পনের সময়কার বিভ্রান্তিকর অনুভূতি বর্ণনা করতে গিয়ে তিনি বলেন যে চারপাশের সবকিছু নড়তে শুরু করেছিল, যেন মাটির কঠিন ভিত্তিটাই তরলে রূপান্তরিত হয়ে গিয়েছিল সাময়িকভাবে।
কুমামোতো জাপানের চারটি প্রধান দ্বীপের একটি কিয়ুশুর অন্তর্গত একটি শহর। আয়তনের বিচারে জাপানের তৃতীয় বৃহত্তম এবং জনসংখ্যার নিরিখে দ্বিতীয় জনবহুল দ্বীপ এই কিয়ুশু, যেখানে বাস করেন লাখো মানুষ। ফলে এই অঞ্চলে বড় ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগ ঘটলে তার প্রভাব পড়ে বিপুলসংখ্যক মানুষের জীবনযাত্রায়।
ভূতাত্ত্বিক বিশ্লেষণে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই সাম্প্রতিক ভূমিকম্পের সঙ্গে ২০১৬ সালের স্মৃতি জড়িত। সেবার এপ্রিল মাসে মাত্র দুই দিনের ব্যবধানে ৬ দশমিক ৫ ও ৭ দশমিক ৩ মাত্রার দুটি শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হেনেছিল একই অঞ্চলে, যাতে কয়েকশ মানুষের প্রাণহানি ঘটেছিল। জাপানের আবহাওয়া অধিদপ্তরের এক কর্মকর্তা জনসাধারণকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়ে সেই ২০১৬ সালের ভূমিকম্প সিরিজের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন, যেখানে মোট ২৭৮ জন মানুষ প্রাণ হারিয়েছিলেন। বিশেষজ্ঞদের ধারণা, সেই সময়কার ভূমিকম্পগুলো ফুতাগাওয়া ও হিনাগু নামের দুটি ফল্ট জোনের সঙ্গে সম্পর্কিত ছিল।
টোকিও বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূমিকম্প গবেষণা প্রতিষ্ঠানের একজন অধ্যাপক জাতীয় সম্প্রচার মাধ্যমকে জানিয়েছেন যে সাম্প্রতিক এই কম্পনটি হিনাগু ফল্ট জোনেরই একটি অংশ থেকে উদ্ভূত হয়েছে বলে প্রাথমিক পর্যালোচনায় দেখা যাচ্ছে। ভূতত্ত্ববিদ্যার আরেকজন অধ্যাপক একটি সংবাদ সংস্থাকে জানান যে ২০১৬ সালের ভূমিকম্পগুলো সেই সময় হিনাগু ফল্ট জোনের ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করেছিল, আর সেই সঞ্চিত চাপেরই ফলাফল হিসেবে এবার ফল্ট জোনের একটি অংশ সক্রিয় হয়ে উঠেছে বলে তাঁরা মনে করছেন। এই তত্ত্ব সত্যি হলে বলা যায়, প্রকৃতির অভ্যন্তরে দশ বছর ধরে জমে থাকা এক নিঃশব্দ শক্তিই শেষ পর্যন্ত বিস্ফোরিত হয়েছে মঙ্গলবারের এই কম্পনে।
বাসিন্দারা জানিয়েছেন, মূল ভূমিকম্পের পর থেকে একের পর এক আফটারশক অনুভূত হচ্ছে, যা মানুষের মনে স্থায়ী এক আতঙ্কের জন্ম দিয়েছে। ঘুমাতে যাওয়ার আগে বা কাজে ফেরার চেষ্টার মধ্যেও বারবার মাটি কেঁপে ওঠায় স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় ফেরা কঠিন হয়ে পড়েছে সবার জন্য। আবহাওয়া অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা তাই বারবার সতর্ক করছেন, যেন মানুষ বাড়তি ভূকম্পনের আশঙ্কা মাথায় রেখে সতর্ক থাকেন এবং নিরাপদ স্থানে অবস্থান করেন।
এই মুহূর্তে কুমামোতোর মানুষের কাছে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন একটাই—ধ্বংসস্তূপের নিচে এখনো যাঁরা আটকা আছেন, তাঁদের কতজনকে জীবিত উদ্ধার করা যাবে। সময় যতই গড়াচ্ছে, ততই কঠিন হয়ে উঠছে এই কাজ। তবু দমকলকর্মী, পুলিশ ও সেনাসদস্যদের প্রাণান্তকর প্রচেষ্টা থেমে নেই। বিদ্যুৎবিহীন ঘরে, পানির অভাবে আর অবিরাম আফটারশকের আতঙ্কে দিন কাটানো হাজারো মানুষের জন্য এখন একটাই প্রার্থনা—মাটি যেন আর না কাঁপে, আর উদ্ধারকারীদের হাত যেন পৌঁছে যায় প্রতিটি আটকে পড়া মানুষের কাছে, সময় থাকতেই।
আপনার মতামত জানানঃ