এশিয়ার বিস্তীর্ণ অঞ্চলে তীব্র তাপদাহ এবার শুধু মানুষের জীবনযাত্রাকেই বিপর্যস্ত করছে না, সরাসরি আঘাত হানছে কৃষি ও খাদ্য উৎপাদনের ওপর। দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান ও হংকংয়ে সাম্প্রতিক সময়ে রেকর্ড তাপমাত্রা, দীর্ঘস্থায়ী খরা এবং অস্বাভাবিক আবহাওয়ার কারণে কৃষকরা এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হচ্ছেন, যা কয়েক দশকের অভিজ্ঞতার সঙ্গেও মেলানো কঠিন। কোথাও ক্ষেতের ফসল পচে যাচ্ছে, কোথাও গাছের ফলন নষ্ট হচ্ছে, আবার কোথাও মাটির নিচে থাকা আলুও অতিরিক্ত তাপে নরম হয়ে গলে যাচ্ছে। এ যেন জলবায়ু পরিবর্তনের সেই বাস্তব চিত্র, যেখানে তাপমাত্রার একটি সংখ্যা আর কেবল আবহাওয়ার খবর নয়—তা হয়ে উঠছে কৃষকের আয়, খাদ্যনিরাপত্তা এবং ভবিষ্যৎ জীবিকার প্রশ্ন।
দক্ষিণ কোরিয়ার ইয়াংগু কাউন্টির এক আলুচাষির অভিজ্ঞতা এই সংকটের ভয়াবহতা স্পষ্ট করে তুলেছে। সিউলের উত্তরের এই অঞ্চলে কৃষক লি সাং-হ্যুক মাটির ভেতর থেকে নরম ও গলে যাওয়া আলু তুলে ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করেছেন। তার বক্তব্যে ফুটে উঠেছে দীর্ঘদিনের কৃষিজীবনের সঙ্গে সাম্প্রতিক আবহাওয়ার অস্বাভাবিকতার তীব্র বৈপরীত্য। অতিরিক্ত তাপে শুধু মাটির ওপরের অংশ নয়, মাটির নিচের ফসলও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। যে মাটি কৃষকের ফসল রক্ষার নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে কাজ করার কথা, সেই মাটিই এখন অতিরিক্ত তাপের প্রভাবে যেন চুল্লিতে পরিণত হচ্ছে।
দক্ষিণ কোরিয়ায় পরিস্থিতির ভয়াবহতার আরেকটি বড় উদাহরণ হলো তাপমাত্রার রেকর্ড। ইয়াংসান শহরে ৪২ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড হয়েছে, যা দেশটির গত ১২০ বছরের ইতিহাসে সর্বোচ্চ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এই মাত্রার তাপমাত্রা মানুষের জন্য যেমন বিপজ্জনক, তেমনি কৃষি ও পশুপালনের জন্যও ভয়াবহ। তীব্র তাপদাহের কারণে দেশটিতে অন্তত ৩১ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। একই সঙ্গে বিপুলসংখ্যক গবাদিপশু এবং খামারের মাছ মারা গেছে। ফলে ক্ষতির পরিমাণ শুধু কৃষকের ক্ষেতের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছে না; তা ছড়িয়ে পড়ছে খাদ্য উৎপাদন, প্রাণিসম্পদ, মৎস্য এবং গ্রামীণ অর্থনীতির বিভিন্ন স্তরে।
দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট লি জায়ে মিয়ুং এই পরিস্থিতিকে ‘নতুন স্বাভাবিক’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তার বক্তব্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা উঠে এসেছে—চরম আবহাওয়া হয়তো আর বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। বরং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে অস্বাভাবিক তাপমাত্রা, দীর্ঘ খরা, অতিবৃষ্টি কিংবা আকস্মিক দুর্যোগ ভবিষ্যতের নিয়মিত বাস্তবতায় পরিণত হতে পারে। তাই শুধু একটি তাপদাহ মোকাবিলা করাই যথেষ্ট নয়; কৃষি, স্বাস্থ্য, অবকাঠামো ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার পুরো কাঠামোকেই নতুন বাস্তবতার সঙ্গে মানিয়ে নিতে হবে।
জাপানেও পরিস্থিতি কম উদ্বেগজনক নয়। দেশটির বহু অঞ্চলে তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়ে গেছে। তীব্র তাপদাহের মাত্রা বোঝাতে দেশটির আবহাওয়া বিভাগ বিশেষ সতর্কতামূলক শব্দ ব্যবহার শুরু করেছে। দীর্ঘ সময় ধরে উচ্চ তাপমাত্রা মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে যেমন কঠিন করে তুলছে, তেমনি কৃষিক্ষেত্রে তৈরি করছে নতুন অনিশ্চয়তা। প্রচণ্ড তাপে ফসলের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত হচ্ছে, মাটির আর্দ্রতা দ্রুত কমে যাচ্ছে এবং সেচের প্রয়োজন বাড়ছে। কৃষকের উৎপাদন খরচ বাড়লেও শেষ পর্যন্ত ফসলের কাঙ্ক্ষিত ফলন পাওয়া যাচ্ছে না।
হংকংয়েও তাপমাত্রার নতুন রেকর্ড তৈরি হয়েছে। সেখানে ১৮৮৪ সালের পর সর্বোচ্চ ৩৬ দশমিক ৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে। একটি শহরাঞ্চলের জন্য এই তাপমাত্রা শুধু অস্বস্তির বিষয় নয়; এটি নগরজীবন, স্বাস্থ্য এবং পরিবেশ ব্যবস্থাপনার ওপরও চাপ সৃষ্টি করে। হংকংয়ের সাবেক আবহাওয়া প্রধান লাম চিউ ইং সতর্কবার্তা ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তার বক্তব্যের মূল উদ্বেগ হলো, রেকর্ড তাপমাত্রার মতো পরিস্থিতিতেও যদি সতর্কতা ব্যবস্থা যথাযথভাবে কার্যকর না হয়, তাহলে মানুষের কাছে সেই ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা কতটা থাকবে।
তাপদাহের সবচেয়ে দৃশ্যমান ক্ষতির একটি হচ্ছে ফল ও ফসল পচে যাওয়া। দক্ষিণ কোরিয়ার কৃষকদের অভিজ্ঞতায় সেই ক্ষতির চিত্র আরও স্পষ্ট। কয়েক দশক ধরে তরমুজ চাষ করা হং কিয়ুং-হি নিজের নষ্ট হয়ে যাওয়া তরমুজ দেখিয়ে বলেছেন, ভেতরের অংশ, মিষ্টতা—সবকিছুই ঠিক ছিল। কিন্তু মাত্র কয়েক দিনের মধ্যে পরিস্থিতি পুরোপুরি বদলে যায়। তার দীর্ঘ ৫০ বছরের কৃষিজীবনে এমন ঘটনা আগে দেখেননি তিনি। এই অভিজ্ঞতা দেখিয়ে দেয়, কৃষির ক্ষেত্রে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব সবসময় ধীরে ধীরে আসে না; কখনো কখনো কয়েক দিনের অস্বাভাবিক আবহাওয়াই একটি মৌসুমের পরিশ্রমকে ধ্বংস করে দিতে পারে।
কৃষকের জন্য এমন ক্ষতি শুধু ফসল হারানোর অর্থ নয়। একটি ফসল নষ্ট হলে কৃষকের আয় কমে যায়, ঋণের বোঝা বাড়ে এবং পরবর্তী মৌসুমে বিনিয়োগ করার সক্ষমতাও দুর্বল হয়ে পড়ে। বীজ, সার, সেচ, শ্রমিক, জমি প্রস্তুত—সবকিছুর পেছনে কৃষকের অর্থ ব্যয় হয়। ফসল বিক্রি করে সেই অর্থ ফেরত পাওয়ার কথা থাকলেও জলবায়ুজনিত দুর্যোগে যদি উৎপাদন নষ্ট হয়, তাহলে কৃষককে অনেক সময় ঋণের ওপর নির্ভর করতে হয়। ফলে একটি তাপদাহের প্রভাব কয়েক মাস বা কয়েক বছরের আর্থিক সংকটে রূপ নিতে পারে।
এই বাস্তবতার কথা তুলে ধরেছেন কোরিয়ান পেজেন্টস লিগের গুয়াংজু শাখার প্রধান লি জুন-কিউং। তার মতে, বীমা যদি কৃষকের ক্ষতি পূরণ করতে না পারে, তাহলে সেই ক্ষতি সরাসরি কৃষক পরিবারের ঋণের বোঝা বাড়িয়ে দেয়। এই বক্তব্য কৃষিতে জলবায়ু ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক সামনে আনে। প্রচলিত কৃষি বীমা ব্যবস্থা অনেক ক্ষেত্রেই আকস্মিক প্রাকৃতিক দুর্যোগের ক্ষতি মোকাবিলার জন্য তৈরি হলেও ক্রমবর্ধমান তাপমাত্রা, দীর্ঘস্থায়ী তাপদাহ ও জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে তৈরি হওয়া ধারাবাহিক ক্ষতির জন্য নতুন ধরনের সুরক্ষা প্রয়োজন হতে পারে।
এখানে আরেকটি বড় প্রশ্ন হলো খাদ্যনিরাপত্তা। একটি দেশে যদি বারবার অতিরিক্ত তাপমাত্রার কারণে আলু, ফল, সবজি কিংবা অন্যান্য কৃষিপণ্য নষ্ট হতে থাকে, তাহলে স্থানীয় বাজারে সরবরাহ কমে যেতে পারে। উৎপাদন কমলে দাম বাড়ার সম্ভাবনাও তৈরি হয়। একই সঙ্গে কৃষকের আয় কমে গেলে গ্রামীণ অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। ফলে তাপদাহের প্রভাব শেষ পর্যন্ত কৃষকের জমি থেকে বাজার, বাজার থেকে ভোক্তা এবং ভোক্তা থেকে জাতীয় অর্থনীতিতে পৌঁছাতে পারে।
এশিয়ার বর্তমান পরিস্থিতি আরও গুরুত্বপূর্ণ কারণ এই অঞ্চল বিশ্বের বিপুলসংখ্যক মানুষের খাদ্য সরবরাহের সঙ্গে যুক্ত। এশিয়ার অনেক দেশ কৃষিনির্ভর এবং বিপুল জনগোষ্ঠী সরাসরি বা পরোক্ষভাবে কৃষির ওপর নির্ভরশীল। তাই জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে কৃষি উৎপাদনের অনিশ্চয়তা বাড়লে তার প্রভাব কেবল সংশ্লিষ্ট দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। আন্তর্জাতিক বাজারেও কৃষিপণ্যের সরবরাহ, মূল্য এবং বাণিজ্যিক ভারসাম্যে এর প্রভাব পড়তে পারে।
তাপদাহের সঙ্গে পানির সংকটও ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত। দীর্ঘ সময় ধরে বৃষ্টি না হলে মাটির আর্দ্রতা কমে যায়। অন্যদিকে অতিরিক্ত তাপমাত্রায় গাছের পানি হারানোর হার বেড়ে যায়। ফলে একই ফসল টিকিয়ে রাখতে আগের তুলনায় বেশি সেচের প্রয়োজন হতে পারে। এতে কৃষকের উৎপাদন খরচ বাড়ে এবং ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ বৃদ্ধি পায়। পানি সংকট যদি দীর্ঘস্থায়ী হয়, তাহলে কৃষককে ফসলের ধরন পরিবর্তন করা, জমি পতিত রাখা কিংবা কম পানি প্রয়োজন এমন ফসলের দিকে যেতে হতে পারে।
জলবায়ু বিজ্ঞানীদের সতর্কবার্তাও তাই গুরুত্বের সঙ্গে নেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে। গ্রিনহাউস গ্যাসের নিঃসরণ কমানো না গেলে এ ধরনের চরম আবহাওয়ার ঘটনা আরও বাড়তে পারে বলে তারা সতর্ক করেছেন। অর্থাৎ বর্তমান তাপদাহকে কেবল একটি মৌসুমি ঘটনা হিসেবে দেখলে সমস্যার গভীরতা বোঝা যাবে না। এটি বৃহত্তর জলবায়ু পরিবর্তনের একটি লক্ষণ, যার প্রভাব ভবিষ্যতে আরও বিস্তৃত হতে পারে।
তবে শুধু বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণ নিয়ে আলোচনা করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। কৃষিকে নতুন বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর জন্য প্রয়োজন বাস্তবভিত্তিক অভিযোজন। তাপসহনশীল জাতের ফসল উদ্ভাবন, উন্নত সেচব্যবস্থা, মাটির আর্দ্রতা ধরে রাখার প্রযুক্তি, কৃষি আবহাওয়া পূর্বাভাস, দ্রুত সতর্কতা ব্যবস্থা এবং কার্যকর কৃষি বীমা—সবকিছুকে সমন্বিতভাবে এগিয়ে নিতে হবে। কৃষককে শুধু দুর্যোগের পরে সহায়তা দিলে হবে না; দুর্যোগের আগেই প্রস্তুতি নেওয়ার সক্ষমতা তৈরি করতে হবে।
দক্ষিণ কোরিয়ার মাটির নিচে নরম হয়ে যাওয়া আলু কিংবা কয়েক দিনের মধ্যে নষ্ট হয়ে যাওয়া তরমুজ তাই নিছক কৃষিপণ্যের ক্ষতির গল্প নয়। এগুলো একটি পরিবর্তিত জলবায়ুর দৃশ্যমান সংকেত। যে কৃষক পাঁচ দশক ধরে একই জমিতে চাষ করে আবহাওয়ার নিয়ম চিনেছেন, তার অভিজ্ঞতাও যখন হঠাৎ অকার্যকর হয়ে পড়ে, তখন বুঝতে হয় পরিবেশের পরিবর্তন কতটা গভীরে পৌঁছেছে।
এশিয়ার এই তীব্র তাপদাহ ভবিষ্যতের জন্য একটি সতর্ক সংকেতও বটে। আজ দক্ষিণ কোরিয়ার কৃষক যে সমস্যার মুখোমুখি, আগামী দিনে তা অন্য দেশের কৃষকেরও বাস্তবতা হতে পারে। অতিরিক্ত তাপ, খরা, পানির সংকট ও ফসলহানি একে অন্যের সঙ্গে যুক্ত হয়ে খাদ্যব্যবস্থার ওপর বড় চাপ তৈরি করতে পারে। তাই জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলার প্রশ্নটি এখন আর কেবল পরিবেশ রক্ষার আলোচনায় সীমাবদ্ধ নেই; এটি খাদ্য, অর্থনীতি, কৃষকের জীবন ও মানুষের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার প্রশ্নে পরিণত হয়েছে।
মাটির নিচে আলু সিদ্ধ হয়ে যাওয়ার দৃশ্য তাই আমাদের সামনে একটি কঠিন প্রশ্ন রেখে যায়—প্রকৃতি কি বদলে যাচ্ছে, নাকি আমরা সেই পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে ব্যর্থ হচ্ছি? উত্তর যাই হোক, সময় দ্রুত ফুরিয়ে আসছে। কারণ তাপমাত্রার প্রতিটি নতুন রেকর্ডের সঙ্গে ঝুঁকির পরিধিও বাড়ছে। আর সেই ঝুঁকির সবচেয়ে বড় বোঝা বহন করছেন মাঠে থাকা কৃষকরাই।
আপনার মতামত জানানঃ