
বাংলাদেশ আজ বিশ্বের সবচেয়ে বড় কওমি মাদ্রাসা শিক্ষার কেন্দ্র—এই তথ্য যতটা গর্বের, ঠিক ততটাই উদ্বেগেরও। কারণ যে গতিতে এই ধারার প্রতিষ্ঠান ও শিক্ষার্থী বাড়ছে, তার সমান্তরালে বাড়েনি রাষ্ট্রীয় তদারকি—আর এই ফাঁক গলেই বছরের পর বছর ধরে ঘটে চলেছে শিশু নির্যাতনের একের পর এক ঘটনা।
সংখ্যায় বিশ্বের বৃহত্তম কেন্দ্র
দেড় শতাব্দী আগে ভারতের দেওবন্দে যে ধর্মীয় শিক্ষাধারার সূচনা হয়েছিল, আজ তার সবচেয়ে বড় কেন্দ্র বাংলাদেশ। দেশের বৃহত্তম কওমি শিক্ষা বোর্ড বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়ার তথ্য অনুযায়ী, তাদের অধীনে নিবন্ধিত মাদ্রাসার সংখ্যা প্রায় ৩২ হাজার ৭৩০টি, যেখানে শিক্ষার্থী প্রায় ৭০ লাখ। অন্যান্য বোর্ড মিলিয়ে দেশে মোট কওমি প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ৪০ হাজার ছাড়িয়েছে।
তুলনায় ভারতে জমিয়তে উলামায়ে হিন্দের অধীনে রয়েছে ২০ হাজার ৯০০টি প্রতিষ্ঠান ও ২৩ লাখ ৭১ হাজার শিক্ষার্থী, আর পাকিস্তানে ২৭ হাজার ৪৮টি মাদ্রাসায় শিক্ষার্থী ২৪ লাখ। অর্থাৎ প্রতিষ্ঠান ও শিক্ষার্থী—উভয় সূচকেই বাংলাদেশ এখন শীর্ষে, পাকিস্তানের প্রায় তিন গুণ।
প্রবৃদ্ধির গতিও নজরকাড়া। বেফাকের কেন্দ্রীয় পরীক্ষায় অংশগ্রহণকারী শিক্ষার্থীর সংখ্যা ২০২২ সালের ২ লাখ ২৫ হাজার থেকে বেড়ে এ বছর দাঁড়িয়েছে ৩ লাখ ৫৪ হাজারে—চার বছরে প্রায় ৫৭ শতাংশ বৃদ্ধি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মো. আব্দুস সালামের মতে, দারিদ্র্য ও বিনা খরচে আবাসিক শিক্ষার সুযোগই এই প্রবৃদ্ধির মূল চালিকাশক্তি—প্রান্তিক ও শ্রমজীবী পরিবারগুলোর কাছে এটি এখন একটি বাস্তবসম্মত বিকল্প।
নিয়ন্ত্রণহীনতার মূল্য: শিশুরাই সবচেয়ে অরক্ষিত
কিন্তু এই বিস্তারের সবচেয়ে অন্ধকার দিকটি লুকিয়ে আছে একটি তথ্যে—দেশের প্রায় ৪০ হাজার কওমি মাদ্রাসার সিংহভাগই এখনো সরকারি নিবন্ধন কাঠামোর বাইরে। কেবল দাওরায়ে হাদিস স্তর ২০১৮ সাল থেকে স্বীকৃতি পেয়েছে; নিম্ন ও মধ্যম স্তর এখনো কার্যত কোনো রাষ্ট্রীয় তদারকির আওতায় নেই।
এই তদারকিহীনতার প্রত্যক্ষ পরিণতি ভোগ করছে শিশুরাই। বেশির ভাগ কওমি মাদ্রাসা আবাসিক হওয়ায় শিশু যৌন নির্যাতনের ঝুঁকি এখানে তুলনামূলক বেশি বলে জানাচ্ছে অনুসন্ধানী প্রতিবেদনগুলো। কোনো সরকারি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে না থাকায় অভিযুক্ত শিক্ষকরা জামিনে বেরিয়ে সহজেই আবার শিক্ষকতায় ফিরতে পারেন—নেই কোনো কেন্দ্রীয় নজরদারি বা নিষেধাজ্ঞার ব্যবস্থা।
আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত বছর মাদ্রাসায় যৌন নিপীড়নের শিকার হয়েছে অন্তত ৫২ জন শিশু, যাদের মধ্যে তিনজন মারা গেছে। এটি কেবল নথিভুক্ত সংখ্যা—প্রকৃত চিত্র নিঃসন্দেহে আরও ভয়াবহ, কারণ সামাজিক লজ্জা, ধর্মীয় আবেগ, স্থানীয় প্রভাব ও বিচারহীনতার শঙ্কায় বহু ঘটনা কখনোই অভিযোগ পর্যন্ত পৌঁছায় না বলে বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরাম (বিএসএএফ) ও আসকের পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে।
সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনা এই চিত্রকেই স্পষ্ট করে। চট্টগ্রামের একটি কোরআন একাডেমিতে ২০১৯-২১ সালে ছয়জন ছাত্রীকে ধর্ষণের দায়ে এক শিক্ষককে ২০২৫ সালে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। ঢাকার দক্ষিণখানে আট বছর বয়সী এক মাদ্রাসা ছাত্রকে ধর্ষণের অভিযোগে ২০২৫ সালে গ্রেফতার হয়েছেন আরেক শিক্ষক। শুধু চলতি বছরের মে মাসেই মাদ্রাসায় ধর্ষণের শিকার হয়েছে ১৮ শিশু এবং ধর্ষণ-পরবর্তী হত্যার শিকার হয়েছে একজন।
রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ প্রশ্নে বিভক্ত অবস্থান
এই বাস্তবতার মুখেও নিবন্ধন প্রশ্নে কওমি ধারার নেতৃত্বের অবস্থান স্পষ্টতই দ্বিধাবিভক্ত। সিলেট অঞ্চলের কওমি বোর্ড আযাদ দ্বীনি এদারায়ে তালিমের মহাসচিব মাওলানা আব্দুল বাছির সরাসরি সরকারি নিয়ন্ত্রণের বিপক্ষে অবস্থান নিয়ে বলেছেন, নিবন্ধনের আওতায় গেলে ভবিষ্যতে সরকার সিলেবাস চাপিয়ে দিতে পারে বলে তাদের আশঙ্কা।
অন্যদিকে চট্টগ্রাম নেছারিয়া কামিল মাদ্রাসার সাবেক অধ্যক্ষ জয়নুল আবেদীন জুবাইরের মতো শিক্ষাবিদরা মনে করেন, রাষ্ট্রীয় অডিট ও মান নিয়ন্ত্রণের আওতায় না এলে এই খাতে জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা কার্যত অসম্ভব। খোদ বেফাকের মহাপরিচালক মাওলানা উবায়দুর রহমান খান নদভীও স্বীকার করেছেন, ব্যক্তিগত উদ্যোগে যথাযথ তদারকি ছাড়াই মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠার প্রবণতায় প্রাতিষ্ঠানিক বিশৃঙ্খলা তৈরি হচ্ছে এবং শিশু অধিকার নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।
বাংলাদেশ যখন বিশ্বের বৃহত্তম কওমি শিক্ষা কেন্দ্র হয়ে উঠছে, তখন এই প্রশ্নটি আর এড়ানো যায় না—৭০ লাখের বেশি শিশু-কিশোর যে ব্যবস্থায় শিক্ষা নিচ্ছে, সেখানে তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায় কার? ধর্মীয় স্বকীয়তা রক্ষা আর শিশুর সুরক্ষা নিশ্চিতকরণ—এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করা এখন আর নীতিনির্ধারকদের জন্য ঐচ্ছিক বিষয় নয়, বরং জরুরি দায়িত্ব।
আপনার মতামত জানানঃ