বাংলাদেশে ‘গুম’ শব্দটি শুধু একটি আইনি বা রাজনৈতিক পরিভাষা নয়; এটি অসংখ্য পরিবারের দীর্ঘ প্রতীক্ষা, অনিশ্চয়তা, মানসিক যন্ত্রণা এবং ন্যায়বিচারের অপূর্ণ আকাঙ্ক্ষার প্রতীক। গত এক দশকেরও বেশি সময় ধরে জোরপূর্বক গুমের অভিযোগ দেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে দেশ-বিদেশে ব্যাপক আলোচনা সৃষ্টি করেছে। ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর অনেকেই মনে করেছিলেন, হয়তো এই অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটেছে। কিন্তু দুই বছর পর নতুন করে একটি গুমের অভিযোগ সামনে আসায় সেই আশাবাদে প্রশ্নচিহ্ন তৈরি হয়েছে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ) এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে যে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে, তা শুধু একটি ব্যক্তির নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা নয়; বরং রাষ্ট্রের জবাবদিহি, আইনের শাসন এবং মানবাধিকার সুরক্ষার ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তিকে রাষ্ট্রের কোনো বাহিনী বা তাদের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ নির্দেশে আটক করার পর সেই আটকের বিষয়টি অস্বীকার করা অথবা ওই ব্যক্তির অবস্থান গোপন রাখা জোরপূর্বক গুম হিসেবে বিবেচিত হয়। এ ধরনের অপরাধকে বিশ্বের অন্যতম গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘন হিসেবে দেখা হয়। কারণ এতে একজন ব্যক্তি শুধু স্বাধীনতাই হারান না; তার পরিবারও বছরের পর বছর অনিশ্চয়তা, ভয় এবং মানসিক নির্যাতনের মধ্যে জীবন কাটাতে বাধ্য হয়। একজন মানুষ বেঁচে আছেন না মারা গেছেন—এই মৌলিক তথ্যটুকুও যখন পরিবার জানতে পারে না, তখন সেটি পুরো পরিবারকে এক ধরনের অবিরাম শাস্তির মধ্যে ফেলে দেয়।
সাম্প্রতিক আলোচিত ঘটনাটি খুলনা অঞ্চলের বাসিন্দা ৩০ বছর বয়সী মিরাজ শেখকে ঘিরে। অভিযোগ অনুযায়ী, গত এপ্রিল মাসে সুন্দরবনসংলগ্ন মোংলা এলাকার একটি স্থান থেকে তাকে কোস্ট গার্ডের সদস্যরা আটক করে নিয়ে যান। প্রত্যক্ষদর্শীরা দাবি করেছেন, তারা নিজ চোখে তাকে একটি স্পিডবোটে তুলে নিতে দেখেছেন। কিন্তু পরে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জানায়, মিরাজ তাদের হেফাজতে ছিলেন না। পরিবারের সদস্যরা বিভিন্ন দপ্তরে যোগাযোগ করেন, অভিযোগ দায়ের করেন, সংবাদ সম্মেলন করেন এবং শেষ পর্যন্ত হাইকোর্টের দ্বারস্থ হন। আদালত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে তাকে খুঁজে বের করে আদালতে হাজির করার নির্দেশও দিয়েছে। তবু এখন পর্যন্ত তার অবস্থান সম্পর্কে নিশ্চিত কোনো তথ্য প্রকাশ্যে আসেনি।
এই ঘটনাই হিউম্যান রাইটস ওয়াচের উদ্বেগের মূল কারণ। সংস্থাটি বলছে, ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর এটিই প্রথম এমন অভিযোগ, যেখানে প্রত্যক্ষদর্শীরা রাষ্ট্রের একটি বাহিনীর সংশ্লিষ্টতার দাবি করেছেন। তাদের মতে, ঘটনাটি বিচ্ছিন্ন হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং এটি প্রমাণ করতে পারে যে অতীতের সংস্কারগুলো যথেষ্ট শক্তিশালী ছিল না অথবা সেগুলো টেকসইভাবে কার্যকর করা যায়নি।
বাংলাদেশে গুমের অভিযোগ নতুন নয়। বিশেষ করে ২০০৯ সালের পর থেকে বিভিন্ন সময়ে রাজনৈতিক নেতা, কর্মী, ব্যবসায়ী, আইনজীবী, সাংবাদিক এবং সাধারণ নাগরিকের নিখোঁজ হওয়ার অসংখ্য অভিযোগ সামনে এসেছে। অনেকেই কয়েক মাস বা কয়েক বছর পর ফিরে এসেছেন। কেউ কেউ ফিরে এসে গোপন আটককেন্দ্রে নির্যাতনের অভিযোগ তুলেছেন। আবার অনেকে আর কখনও ফিরে আসেননি। এ কারণে গুমের প্রতিটি নতুন অভিযোগ স্বাভাবিকভাবেই অতীতের ঘটনাগুলোর স্মৃতি ফিরিয়ে আনে।
২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় এসে মানবাধিকার সুরক্ষার লক্ষ্যে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিল। জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে আরও স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ দেওয়া, গুমের অভিযোগ তদন্তে বিশেষ ক্ষমতা প্রদান এবং আন্তর্জাতিক কনভেনশনে যোগ দেওয়া—এসব পদক্ষেপকে ইতিবাচক অগ্রগতি হিসেবে দেখা হয়েছিল। অনেকের আশা ছিল, এর মাধ্যমে অতীতের অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত হবে এবং ভবিষ্যতে এমন ঘটনা প্রতিরোধ করা সহজ হবে।
কিন্তু পরবর্তী সময়ে নির্বাচিত সরকার ওই অস্থায়ী অধ্যাদেশগুলো স্থায়ী আইনে রূপ না দেওয়ায় নতুন বিতর্ক শুরু হয়। সমালোচকদের মতে, এর ফলে মানবাধিকার কমিশনের স্বাধীন তদন্তের ক্ষমতা কার্যত সীমিত হয়ে গেছে। নতুন আইনের প্রস্তাবে নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযোগ তদন্তের দায়িত্ব মূলত পুলিশের ওপরই রাখার পরিকল্পনা করা হয়েছে। মানবাধিকার কর্মীদের একটি অংশ মনে করেন, যেসব অভিযোগে রাষ্ট্রের বিভিন্ন সংস্থার নাম উঠে আসে, সেখানে স্বাধীন তদন্ত ব্যবস্থা না থাকলে নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাবে।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচও ঠিক এই বিষয়টিতেই জোর দিয়েছে। সংস্থাটির মতে, গুমের অভিযোগ তদন্তে এমন একটি কাঠামো প্রয়োজন, যা প্রশাসনিক বা রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত থাকবে। কারণ তদন্তের বিশ্বাসযোগ্যতা নির্ভর করে তদন্তকারী প্রতিষ্ঠানের স্বাধীনতার ওপর। যদি অভিযোগের তদন্ত এমন সংস্থার হাতে থাকে, যাদের সঙ্গে অভিযুক্ত প্রতিষ্ঠানের নিয়মিত প্রশাসনিক সম্পর্ক রয়েছে, তাহলে জনগণের আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
অন্যদিকে সরকার ও সংশ্লিষ্ট নিরাপত্তা বাহিনীগুলো বরাবরই বলে আসছে, আইন অনুযায়ী তারা কাজ করে এবং যেকোনো অভিযোগ যথাযথ প্রক্রিয়ায় তদন্ত করা হয়। সাম্প্রতিক ঘটনাতেও কোস্ট গার্ডের পক্ষ থেকে মিরাজ শেখকে আটক করার অভিযোগ অস্বীকার করা হয়েছে। ফলে একদিকে প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য, অন্যদিকে সরকারি অস্বীকৃতি—এই দুই বিপরীত অবস্থানের মধ্যে সত্য উদ্ঘাটনের দায়িত্ব এখন তদন্তকারী সংস্থা ও বিচারব্যবস্থার ওপরই নির্ভর করছে।
গুমের ঘটনাগুলোকে শুধু আইনশৃঙ্খলার বিষয় হিসেবে দেখলে পুরো চিত্রটি বোঝা যায় না। এর একটি বড় সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক দিকও রয়েছে। একজন নিখোঁজ ব্যক্তির পরিবার প্রতিদিন একই প্রশ্নের মুখোমুখি হয়—তিনি কি বেঁচে আছেন? কোথায় আছেন? কখন ফিরবেন? কোনো উত্তর না পাওয়ার এই দীর্ঘ অপেক্ষা পরিবারকে আর্থিক, সামাজিক ও মানসিকভাবে ভেঙে দেয়। অনেক শিশু বাবাকে ছাড়া বড় হয়, অনেক বাবা-মা সন্তানের অপেক্ষায় জীবন কাটিয়ে দেন, অনেক স্ত্রী বা স্বামী অনিশ্চয়তার মধ্যে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা করতে পারেন না। ফলে গুমের প্রভাব একজন ব্যক্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; এটি পুরো পরিবার এবং সমাজকে প্রভাবিত করে।
আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ও জোরপূর্বক গুমকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে। জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক কনভেনশন অনুযায়ী, সদস্য রাষ্ট্রগুলোর দায়িত্ব হলো গুমকে ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে গণ্য করা, প্রতিটি অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত করা এবং দায়ীদের বিচারের আওতায় আনা। একই সঙ্গে ভুক্তভোগী পরিবারকে সত্য জানার অধিকার নিশ্চিত করাও রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হিসেবে বিবেচিত হয়।
বাংলাদেশ ওই আন্তর্জাতিক কনভেনশনে যুক্ত হওয়ার মাধ্যমে বৈশ্বিক মানবাধিকার কাঠামোর সঙ্গে নিজেদের অঙ্গীকার প্রকাশ করেছে। কিন্তু আন্তর্জাতিক অঙ্গীকার বাস্তবে কতটা কার্যকর হচ্ছে, সেটিই এখন মূল প্রশ্ন। আইন প্রণয়ন, স্বাধীন তদন্ত, সাক্ষী সুরক্ষা, বিচারিক তদারকি এবং নিরাপত্তা বাহিনীর জবাবদিহি—এসব বিষয় কার্যকর না হলে শুধু কনভেনশনে স্বাক্ষর করাই যথেষ্ট নয় বলে মানবাধিকার বিশেষজ্ঞরা মনে করেন।
এই প্রেক্ষাপটে আদালতের ভূমিকাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। হেবিয়াস করপাসের মতো সাংবিধানিক প্রতিকার নাগরিকের মৌলিক অধিকারের একটি শক্তিশালী সুরক্ষা। আদালত যখন কোনো নিখোঁজ ব্যক্তিকে খুঁজে বের করার নির্দেশ দেন, তখন সেটি শুধু একটি মামলার বিচারিক পদক্ষেপ নয়; বরং রাষ্ট্রকে তার সাংবিধানিক দায়িত্ব পালনের স্মরণ করিয়ে দেওয়ারও একটি উপায়। তবে আদালতের নির্দেশ বাস্তবায়ন দ্রুত ও কার্যকরভাবে না হলে জনগণের আস্থায় প্রভাব পড়তে পারে।
বাংলাদেশের অতীত অভিজ্ঞতা দেখায়, গুমের অভিযোগের প্রতিটি ঘটনাই শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক বিতর্কে পরিণত হয়েছে। কিন্তু মানবাধিকার বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, বিষয়টি দলীয় রাজনীতির বাইরে এনে একটি মানবিক ও সাংবিধানিক প্রশ্ন হিসেবে দেখা জরুরি। কারণ যে সরকারই ক্ষমতায় থাকুক, একজন নাগরিকের জীবন, স্বাধীনতা এবং আইনের সুরক্ষা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব।
মিরাজ শেখের ঘটনা তদন্তে কী ফল আসবে, তা এখনই বলা সম্ভব নয়। আদালতের নির্দেশ, তদন্তের অগ্রগতি এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পরবর্তী পদক্ষেপই এ বিষয়ে স্পষ্ট ধারণা দেবে। তবে একটি বিষয় পরিষ্কার—যদি অভিযোগটি নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা হয় এবং সত্য উদ্ঘাটিত হয়, তাহলে সেটি শুধু একটি পরিবারের জন্য নয়, পুরো দেশের মানবাধিকার ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ হবে। আবার অভিযোগ ভিত্তিহীন প্রমাণিত হলেও সেটি স্বচ্ছ তদন্তের মাধ্যমেই প্রতিষ্ঠা করা প্রয়োজন। কারণ স্বচ্ছতা ছাড়া কোনো পক্ষই জনগণের পূর্ণ আস্থা অর্জন করতে পারে না।
দুই বছর পর নতুন করে গুমের অভিযোগ সামনে আসা বাংলাদেশের জন্য একটি সতর্কবার্তা। অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে এমন একটি ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি, যেখানে কোনো নাগরিকের নিখোঁজ হওয়ার অভিযোগ অমীমাংসিত অবস্থায় বছরের পর বছর পড়ে থাকবে না। আইনের শাসন তখনই অর্থবহ হয়, যখন অভিযোগকারী, অভিযুক্ত এবং সাধারণ জনগণ—সবাই বিশ্বাস করতে পারে যে সত্য উদ্ঘাটনের জন্য একটি স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও কার্যকর প্রক্রিয়া বিদ্যমান আছে। সেই বিশ্বাস পুনর্গঠনই এখন বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি। মানবাধিকার রক্ষা, জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং নাগরিকের সাংবিধানিক অধিকার সুরক্ষিত রাখার মাধ্যমে সেই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা সম্ভব। আর সেটিই হবে এমন একটি রাষ্ট্র গঠনের ভিত্তি, যেখানে কোনো পরিবারকে আর প্রিয়জনের অনিশ্চিত প্রত্যাবর্তনের অপেক্ষায় অসহায় দিন গুনতে না হয়।
আপনার মতামত জানানঃ