
প্রবাসী রোহিঙ্গা যুবকরা (জেনারেশন জেড) শুধু মানবিক দুর্ভোগের পাত্র নয়; তারা নিজেদের রাজনৈতিক সত্ত্বা ও দায়বদ্ধতার ভাষ্য তৈরি করছে। সাম্প্রতিক প্রতিবাদগুলি ক্যাম্পে ক্রমবর্ধমান সহিংসতা এবং জবাবদিহিতার অভাবের বিরুদ্ধে তাদের ক্রমবর্ধমান ক্ষোভকে প্রতিফলিত করে।
কক্সবাজারের শরণার্থী শিবিরে এক নতুন রাজনৈতিক সত্তার উত্থান
শরণার্থীরা সাধারণত মানবিক দুর্ভোগের কিংবা সীমান্ত নিরাপত্তার আলোচনায় আবদ্ধ। কিন্তু কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্পে একটি নতুন প্রজন্ম উঠে দাঁড়িয়েছে—যারা নিজেদেরকে নিছক সাহায্যের প্রতীক্ষায় থাকা মানুষ নয়, বরং রাজনৈতিক সত্তা হিসেবে দাবি করছে। রোহিঙ্গা জেনারেশন জেড নামে পরিচিত এই তরুণদের আন্দোলন শুধু ক্যাম্পের সহিংসতা ও নিরাপত্তাহীনতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদই নয়; এটি শরণার্থী শিবিরগুলোর সুপ্রতিষ্ঠিত ক্ষমতা কাঠামোকে চ্যালেঞ্জ জানানোর এক বিরল ও ঐতিহাসিক প্রচেষ্টা।
মোহাম্মদ উল্লাহর মৃত্যু: নীরবতা ভাঙার অনুঘটক
২০২৬ সালের ৯ এপ্রিল আন্দামান সাগরে মালয়েশিয়াগামী একটি নৌকাডুবিতে প্রায় ২৫০ জন রোহিঙ্গা নিখোঁজ বা নিহত হন। তাদের মধ্যে ছিলেন মোহাম্মদ উল্লাহ—একজন তরুণ রোহিঙ্গা যিনি ক্যাম্পের প্রভাবশালী একটি গোষ্ঠীর হুমকির শিকার হয়েছিলেন এবং জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থার (ইউএনএইচসিআর) কাছে সুরক্ষা চেয়েও নিরাপত্তাহীনতায় ভুগতে ভুগতে শেষ পর্যন্ত সমুদ্রপথে পালাতে বাধ্য হন।
মোহাম্মদ উল্লাহর মৃত্যু ক্যাম্পের তরুণদের জন্য আরেকটি সামুদ্রিক বিপর্যয় ছিল না; এটি ছিল এক কাঠামোগত ব্যর্থতার শেষ পরিণতি। তাঁর মৃত্যুর ঘটনাই তরুণদের মধ্যে রাজনৈতিক সংগঠনের সূচনা ঘটায়।
ক্যাম্পের ভেতরের ক্ষমতার দ্বন্দ্ব
রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোর শাসনব্যবস্থা জটিল ও বহুস্তরবিশিষ্ট। ক্যাম্প-ইন-চার্জ, সশস্ত্র পুলিশ ব্যাটালিয়ন, গোয়েন্দা সংস্থা, শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার (আরআরআরসি), ইউএনএইচসিআর এবং ইউনাইটেড কাউন্সিল অফ রোহাং (ইউসিআর)-এর মতো প্রতিনিধিত্বমূলক সংস্থাগুলোর মাধ্যমে এই শিবিরগুলো পরিচালিত হয়। কিন্তু তরুণদের মতে, এসব সংস্থার মধ্যে জবাবদিহিতার রেখা অস্পষ্ট এবং এগুলো মূলত ক্যাম্পের রাজনৈতিক অভিব্যক্তি নিয়ন্ত্রণে কাজ করে, অন্তর্নিহিত সমস্যার সমাধানে নয়।
ইউসিআর: ‘রাষ্ট্র-তত্ত্বাবধানে নৃত্য’
২০২৫ সালে গঠিত ইউনাইটেড কাউন্সিল অফ রোহাং (ইউসিআর)-এর নির্বাচনকে তরুণরা গণতন্ত্রের আভাস মাত্র বলে মনে করে। দ্য ডিপ্লোম্যাট-এর একটি বিশ্লেষণে এ প্রক্রিয়াকে ‘রাষ্ট্র-তত্ত্বাবধানে নৃত্য’ (state-supervised choreography) আখ্যা দেওয়া হয়েছে। ১১ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গার মধ্যে মাত্র ০.০০৩ শতাংশ মানুষ এই কাউন্সিলের নেতৃত্ব নির্বাচনে অংশ নিয়েছিলেন। তরুণরা মনে করেন, ইউসিআরের মতো সংস্থাগুলো প্রকৃত স্ব-শাসন নয়, বরং দাতাদের কাছে ‘রোহিঙ্গা-নেতৃত্বাধীন’ অংশীদার হিসেবে উপস্থাপনের একটি হাতিয়ার।
আরসিপিআরের ভূমিকা
আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে রোহিঙ্গা কমিটি ফর পিস অ্যান্ড রিপ্যাট্রিয়েশন (আরসিপিআর)-এর ভূমিকা। তরুণদের অভিযোগ, আরসিপিআর ক্যাম্পে ব্যাপক সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারকারী একটি কাঠামো, যার নেতৃত্বে রয়েছেন দিল মোহাম্মদ—এমন একজন ব্যক্তি যার অতীত নিয়ে ক্যাম্পবাসীদের মধ্যে নানা প্রশ্ন রয়েছে।
তরুণদের অভিযোগ, আরসিপিআরের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা ক্যাম্পে ভীতিপ্রদর্শন ও চাপ প্রয়োগ করে থাকেন। মোহাম্মদ উল্লাহর ভাই জানিয়েছেন, হুমকি দেওয়ার সময় একজন নিজেকে ‘মৌলভী এদ্রিস’ হিসেবে পরিচয় দিয়েছিলেন। আরসিপিআর অবশ্য এই অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে দাবি করে যে তারা ক্যাম্পে সহিংসতা কমাতে এবং সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে স্থিতিশীলতা আনতে ভূমিকা রেখেছে।
নীরবতার মূল্য
এই প্রতিবাদ আন্দোলনের মূল্য অনেক বেশি। রোহিঙ্গা জেন জেড-এর সদস্য সাহাদ জিয়াকে প্রতিবাদ আয়োজনের সময় একটি হত্যা মামলায় মিথ্যা অভিযুক্ত করা হয়। আরও অনেক সংগঠক গ্রেপ্তার ও প্রতিশোধের ভয়ে আত্মগোপনে চলে গেছেন। মোহাম্মদ উল্লাহর পরিবারের সদস্যদের কাছেও জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থার (এনএসআই) সদস্যরা বারবার এসে প্রশ্ন করেছেন।
তবুও তরুণরা থামছে না। তাদের ভাষ্য, “হাজারো রোহিঙ্গা তরুণ এখন মুখ খুলছে। এটা শুধু ছোট একটি দল নয়—অনেকেই ভয়ে নিজেদের পরিচয় গোপন রাখছেন মাত্র”।
আঞ্চলিক প্রেক্ষাপটে রোহিঙ্গা জেন জেড
এই আন্দোলনকে বিচ্ছিন্নভাবে দেখা যাবে না। বাংলাদেশ, নেপাল থেকে ফিলিপাইন—সর্বত্র তরুণরা প্রতিষ্ঠিত কর্তৃত্বকে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট আন্দোলনে বাংলাদেশের জেনারেশন জেড যে ভূমিকা রেখেছিল, তা আন্তর্জাতিকভাবে আলোচিত।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেন সম্প্রতি সতর্ক করে বলেছেন, প্রায় দশ লাখ তরুণ রোহিঙ্গা অনির্দিষ্টকাল ক্যাম্পে আবদ্ধ থাকবে—এটি ভাবা ‘একান্তই ভুল’। এই সংকট সমাধান না হলে তা আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক নিরাপত্তা ঝুঁকিতে পরিণত হবে।
কী চায় রোহিঙ্গা জেন জেড?
রোহিঙ্গা জেন জেড-এর দাবিগুলো স্পষ্ট:
-
মোহাম্মদ উল্লাহর ওপর হুমকি এবং আরসিপিআর নেতৃত্বের ভূমিকার স্বাধীন তদন্ত
-
ক্যাম্পের নেতৃত্ব কাঠামোয় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা
-
যারা সত্য কথা বলেন তাদের জন্য সুরক্ষা
-
ক্যাম্পের সহিংসতা ও ভীতিপ্রদর্শনের অবসান
তারা প্রতিশোধ চায় না; তারা চায় ন্যায়বিচার, নিরাপত্তা ও মর্যাদা। তাদের ভাষায়, এটি নিশ্চিত করা যে কোনো তরুণ রোহিঙ্গাকে নীরবতা, ভয় কিংবা প্রাণপণ যাত্রায় বাধ্য করা না হয়।
চ্যালেঞ্জ ও ভবিষ্যৎ
রোহিঙ্গা জেন জেড আন্দোলন এখনও বিবর্তনশীল এবং এর সম্মুখে অনেক চ্যালেঞ্জ। ক্যাম্পের ক্ষমতাশীল গোষ্ঠীগুলো পাল্টা প্রচারণা শুরু করেছে। দিল মোহাম্মদ একটি অডিও বার্তায় সমালোচকদের ‘১৫-১৬ জন ব্যক্তি’ হিসেবে উল্লেখ করে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন যে ‘কেউই পরিণতি এড়াতে পারবে না’।
তবুও, এই আন্দোলন একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। ক্যাম্পের ভেতর থেকে উঠে আসা এই প্রতিবাদ—যারা প্রতিদিন এর পরিণতি ভোগ করে তাদের কণ্ঠ—শরণার্থীদের রাজনৈতিক সত্ত্বা ও আকাঙ্ক্ষাকে উপেক্ষা করা যায় না বলে বিশ্ববাসীকে স্মরণ করিয়ে দেয়।
প্রত্যাবাসনের শর্ত এখনও অনুকূল নয় এবং আন্তর্জাতিক অর্থায়ন ক্রমশ কমছে। এই বাস্তবতায়, রোহিঙ্গা তরুণদের প্রতিবাদ শুধু ক্যাম্পের ভেতরের ক্ষমতা কাঠামোকেই নয়, বরং শরণার্থী সংকট নিয়ে বৈশ্বিক ধারণাকেও পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানায়।
আপনার মতামত জানানঃ