ভারতের উত্তর প্রদেশে স্থাননামের পরিবর্তন এখন আর বিচ্ছিন্ন কোনো প্রশাসনিক উদ্যোগ নয়; এটি রাজ্যের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক আলোচনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে। মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথের নেতৃত্বাধীন সরকার একের পর এক শহর, জনপদ ও গ্রামের নাম পরিবর্তন করে এমন একটি বার্তা দিতে চাইছে, যা তাদের ভাষায় “সাংস্কৃতিক গৌরব পুনরুদ্ধার”-এর অংশ। সরকারের দাবি, শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে ভারতের বহু ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় স্থানের মূল পরিচয় পরিবর্তন করা হয়েছিল এবং এখন সেই পরিচয় ফিরিয়ে আনার কাজ চলছে। কিন্তু সমালোচকদের মতে, এই উদ্যোগ কেবল নাম পরিবর্তনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি ভারতের বহুমাত্রিক ইতিহাসের একটি অংশকে আড়াল করার এবং বিশেষ করে মুসলিম শাসনামলের সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারকে জনস্মৃতি থেকে ধীরে ধীরে মুছে দেওয়ার রাজনৈতিক প্রচেষ্টা।
এই বিতর্ক নতুন মাত্রা পায় ২০২৫ সালের অক্টোবরে। উত্তর প্রদেশের লখিমপুর খেরি জেলায় একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে যোগী আদিত্যনাথ স্থানীয়দের কাছে জানতে চান, মুস্তাফাবাদ গ্রামে কতজন মুসলিম বাস করেন। উপস্থিত ব্যক্তিরা জানান, সেখানে একজন মুসলিমও নেই। এই তথ্য শোনার পর যোগী বিস্ময় প্রকাশ করে বলেন, যখন গ্রামে কোনো মুসলিম বাসিন্দাই নেই, তখন গ্রামের নাম মুস্তাফাবাদ কেন থাকবে? তাঁর মতে, গ্রামের নাম হওয়া উচিত ‘কবীর ধাম’। এলাকায় অবস্থিত সন্ত কবীরকে উৎসর্গ করা একটি আশ্রমের প্রসঙ্গ তুলে ধরে তিনি বলেন, স্থানটির প্রকৃত সাংস্কৃতিক পরিচয় কবীরের সঙ্গে যুক্ত, তাই সেই পরিচয়ই সরকারি নামেও প্রতিফলিত হওয়া উচিত।
এই বক্তব্যে তিনি আরও বলেন, অতীতে ধর্মনিরপেক্ষতার নামে বহু স্থানের আসল পরিচয় মুছে ফেলা হয়েছিল। তাঁর ভাষায়, অযোধ্যাকে ফৈজাবাদ, প্রয়াগরাজকে এলাহাবাদ এবং কবীর ধামকে মুস্তাফাবাদ বলা হয়েছিল। যদি কোনো সমাজের পরিচয় এভাবে মুছে ফেলা হয়, তাহলে একসময় সেই সমাজ অস্তিত্বের সংকটে পড়বে। এই বক্তব্য শুধু একটি গ্রামের নাম পরিবর্তনের প্রস্তাব ছিল না; বরং এটি যোগী সরকারের দীর্ঘদিনের সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক অবস্থানের প্রতিফলন।
২০১৭ সালে ক্ষমতায় আসার পর থেকেই উত্তর প্রদেশে নাম পরিবর্তনের ধারাবাহিকতা শুরু হয়। সবচেয়ে আলোচিত সিদ্ধান্তগুলোর একটি ছিল এলাহাবাদের নাম পরিবর্তন করে ‘প্রয়াগরাজ’ করা। সরকারের যুক্তি ছিল, প্রয়াগ নামটি হাজার বছরেরও বেশি পুরোনো এবং হিন্দু ধর্মীয় ঐতিহ্যের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। পরে ফৈজাবাদ জেলার নাম পরিবর্তন করে ‘অযোধ্যা’ রাখা হয়। এরপর মুঘলসরাই রেলওয়ে স্টেশনের নাম পরিবর্তন করে জনসংঘ নেতা দীনদয়াল উপাধ্যায়ের নামে রাখা হয়। এ ছাড়া উত্তর প্রদেশের বিভিন্ন জেলা, সড়ক, রেলস্টেশন ও জনপদের নামও পরিবর্তন করা হয়েছে বা প্রস্তাব করা হয়েছে।
সরকারের মতে, এসব সিদ্ধান্ত কোনো সম্প্রদায়কে লক্ষ্য করে নেওয়া হয়নি; বরং ভারতের প্রাচীন ঐতিহ্য, ধর্মীয় ইতিহাস এবং সাংস্কৃতিক পরিচয়কে পুনরুদ্ধার করার জন্যই এই উদ্যোগ। বিজেপি ও হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলোর দাবি, মুঘল ও মুসলিম শাসনামলে বহু প্রাচীন স্থানের নাম পরিবর্তন করা হয়েছিল। তাই বর্তমান উদ্যোগ সেই ঐতিহাসিক বিকৃতিকে সংশোধনের প্রচেষ্টা মাত্র।
কিন্তু ইতিহাসবিদদের একটি বড় অংশ এই ব্যাখ্যার সঙ্গে পুরোপুরি একমত নন। তাঁদের মতে, ভারতের ইতিহাস বহুস্তরীয় এবং বহুসাংস্কৃতিক। কোনো একটি শহর বা গ্রামের নাম শত শত বছরের সামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠে। একটি নাম শুধু কোনো শাসকের স্মৃতি বহন করে না; এটি স্থানীয় মানুষের জীবন, ভাষা, সাহিত্য, লোকসংস্কৃতি এবং ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতারও অংশ হয়ে ওঠে। ফলে শুধুমাত্র রাজনৈতিক বা ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে নাম পরিবর্তন করলে ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তর হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।
মুস্তাফাবাদকে ‘কবীর ধাম’ করার প্রস্তাবও একই বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। সন্ত কবীর ভারতীয় উপমহাদেশের অন্যতম শ্রদ্ধেয় সাধক ও কবি। তিনি হিন্দু ও মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের মধ্যে সমানভাবে সম্মানিত। তাঁর দর্শনের মূল ভিত্তি ছিল সাম্প্রদায়িক বিভাজনের ঊর্ধ্বে উঠে মানবতার কথা বলা। সমালোচকদের প্রশ্ন, যে কবীর সারাজীবন ধর্মীয় বিভাজনের বিরুদ্ধে কথা বলেছেন, তাঁর নাম ব্যবহার করে যদি কোনো স্থানকে একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রে নিয়ে আসা হয়, তবে তা তাঁর দর্শনের সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ?
নাম পরিবর্তনের বিষয়টি শুধু উত্তর প্রদেশেই সীমাবদ্ধ নয়। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে একই ধরনের উদ্যোগ দেখা গেছে। কোথাও মুঘল আমলের নাম পরিবর্তনের দাবি উঠেছে, কোথাও আবার মুসলিম শাসকদের নামে থাকা সড়ক বা স্থাপনার নাম বদলের প্রস্তাব এসেছে। এসব পদক্ষেপকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে ইতিহাস, পরিচয় এবং রাষ্ট্রের ভূমিকা নিয়ে নতুন বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই ধরনের সিদ্ধান্তের রাজনৈতিক গুরুত্বও কম নয়। ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক পরিচয়কে সামনে এনে রাজনৈতিক সমর্থন সুসংহত করার কৌশল হিসেবে নাম পরিবর্তন কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। বিশেষ করে নির্বাচনের আগে বা গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক মুহূর্তে এ ধরনের সিদ্ধান্ত জনমনে আবেগ সৃষ্টি করে। ফলে বিরোধীরা অভিযোগ করেন, উন্নয়ন, কর্মসংস্থান, শিক্ষা বা স্বাস্থ্যসেবার মতো বাস্তব সমস্যাগুলো থেকে জনগণের দৃষ্টি সরাতেও পরিচয়ভিত্তিক রাজনীতি ব্যবহার করা হয়।
অন্যদিকে যোগী সরকারের সমর্থকেরা মনে করেন, ভারতের সভ্যতা ও ঐতিহ্য দীর্ঘদিন ধরে অবহেলিত ছিল। তাঁদের মতে, প্রাচীন হিন্দু ঐতিহ্যের সঙ্গে সম্পর্কিত স্থানগুলোর নাম পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা জাতীয় আত্মপরিচয়কে শক্তিশালী করে। তাঁদের যুক্তি, ইউরোপ, আফ্রিকা কিংবা এশিয়ার বহু দেশ উপনিবেশিক শাসনের পর নিজেদের পুরোনো নাম ফিরিয়ে এনেছে। সেক্ষেত্রে ভারতেও ঐতিহাসিক নাম পুনঃপ্রতিষ্ঠা অস্বাভাবিক কিছু নয়।
তবে সমালোচকেরা একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্যের কথা তুলে ধরেন। তাঁদের মতে, উপনিবেশিক শাসনের নাম পরিবর্তন এবং ভারতের মধ্যযুগীয় মুসলিম শাসনের নাম পরিবর্তনকে একইভাবে দেখা যায় না। কারণ মুঘল বা অন্যান্য মুসলিম শাসকেরা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে ভারতের সমাজ, সংস্কৃতি, ভাষা, স্থাপত্য, সঙ্গীত ও প্রশাসনের অংশ হয়ে উঠেছিলেন। ফলে সেই সময়ের স্মৃতিচিহ্নকে সম্পূর্ণভাবে বিদেশি বা বহিরাগত হিসেবে চিহ্নিত করা ইতিহাসকে সরলীকৃত করে ফেলে।
স্থাননামের সঙ্গে মানুষের আবেগও গভীরভাবে জড়িত। একটি শহরের নাম বদলে গেলেও বহু মানুষ পুরোনো নামই ব্যবহার করতে থাকেন। এলাহাবাদ আজ সরকারি নথিতে প্রয়াগরাজ হলেও অনেক প্রবীণ বাসিন্দা এখনও এলাহাবাদ নামেই শহরটিকে চেনেন। একইভাবে ফৈজাবাদ নামটিও মানুষের স্মৃতিতে রয়ে গেছে। অর্থাৎ প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের মাধ্যমে নাম বদলানো সম্ভব হলেও মানুষের স্মৃতি ও সাংস্কৃতিক অভ্যাস বদলাতে অনেক বেশি সময় লাগে।
ভারতের সংবিধান ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রব্যবস্থার কথা বললেও বাস্তব রাজনীতিতে ধর্মীয় পরিচয় ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। উত্তর প্রদেশের নাম পরিবর্তনের উদ্যোগ সেই বৃহত্তর রাজনৈতিক বাস্তবতারই অংশ। এটি শুধু একটি গ্রামের সাইনবোর্ড বদলানোর বিষয় নয়; বরং রাষ্ট্র কীভাবে ইতিহাসকে ব্যাখ্যা করবে, কোন পরিচয়কে সামনে আনবে এবং কোন স্মৃতিকে গুরুত্ব দেবে—সেই প্রশ্নও এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে।
মুস্তাফাবাদ থেকে কবীর ধাম—এই প্রস্তাব তাই একটি গ্রামের নাম পরিবর্তনের চেয়েও বড় প্রতীক হয়ে উঠেছে। একদিকে এটি যোগী সরকারের সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদের ধারাবাহিকতা প্রকাশ করে, অন্যদিকে ভারতের বহুত্ববাদী ইতিহাস ও পরিচয় নিয়ে নতুন বিতর্কেরও জন্ম দেয়। ভবিষ্যতে আরও কত স্থাননাম পরিবর্তন হবে, তা সময়ই বলে দেবে। তবে এতটুকু নিশ্চিত, এই বিতর্ক আগামী দিনেও ভারতের রাজনীতি, ইতিহাসচর্চা এবং সামাজিক আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে থাকবে। কারণ একটি নাম কেবল মানচিত্রের একটি শব্দ নয়; এটি মানুষের স্মৃতি, পরিচয়, ইতিহাস এবং ভবিষ্যৎ—সবকিছুর সঙ্গেই গভীরভাবে জড়িয়ে থাকে।
আপনার মতামত জানানঃ