বাংলাদেশে একটি তথাকথিত ‘দয়ালু একনায়কতন্ত্র’ সফল হতে পারে—এমন ধারণা সময় সময় সামনে আসে, বিশেষ করে যখন রাজনৈতিক অস্থিরতা, অর্থনৈতিক চাপ বা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার সীমাবদ্ধতা নিয়ে মানুষের মধ্যে হতাশা তৈরি হয়। সাম্প্রতিক সময়েও এমন চিন্তা অনেকের মধ্যে দেখা যাচ্ছে যে, যদি একজন শক্তিশালী কিন্তু সদিচ্ছাসম্পন্ন নেতা সব ক্ষমতা নিজের হাতে নিয়ে দেশ পরিচালনা করেন, তাহলে হয়তো উন্নয়ন দ্রুত হবে এবং রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলা কমবে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, বাংলাদেশের ইতিহাস, সমাজ ও রাজনৈতিক সংস্কৃতি এই ধারণাকে সমর্থন করে না। বরং এই ধরনের চিন্তা দেশকে আরও বিপজ্জনক পথে ঠেলে দিতে পারে।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস মূলত গণতন্ত্রের জন্য দীর্ঘ সংগ্রামের ইতিহাস। ব্রিটিশ শাসনের অবসান থেকে শুরু করে পাকিস্তান আমলে পূর্ব বাংলার মানুষের আন্দোলন, ভাষা আন্দোলন, ছয় দফা, গণঅভ্যুত্থান—সবকিছুই ছিল অধিকার ও প্রতিনিধিত্বের দাবিতে সংগ্রাম। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধও ছিল একটি স্বাধীন, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে। স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র ও সংবিধানের মূলনীতিতেও গণতন্ত্রকে কেন্দ্রীয় মূল্যবোধ হিসেবে রাখা হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে একটি একনায়কতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা, তা যতই ‘দয়ালু’ বলে দাবি করা হোক না কেন, দেশের প্রতিষ্ঠালগ্নের আদর্শের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
একটি দয়ালু একনায়কতন্ত্রের পক্ষে যারা যুক্তি দেন, তারা সাধারণত দুটি বিষয় তুলে ধরেন। প্রথমত, তারা মনে করেন অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা বা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে কিছুটা দমন করা প্রয়োজন। দ্বিতীয়ত, তারা মনে করেন রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ছাড়া উন্নয়ন সম্ভব নয়, আর সেই স্থিতিশীলতা আনতে শক্ত হাতে শাসন দরকার। কিন্তু এই যুক্তিগুলো গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এগুলো মূলত গণতন্ত্রকে দুর্বল করার পথ তৈরি করে। যখন একটি রাষ্ট্রে মানুষের ভোটাধিকার বা মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে গৌণ করা হয়, তখন সেই রাষ্ট্র ধীরে ধীরে কর্তৃত্ববাদী হয়ে ওঠে এবং জনগণের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা সহজ হয়ে যায়।
বাংলাদেশের সমাজ অত্যন্ত বৈচিত্র্যময় ও মতপ্রকাশে উন্মুক্ত। এখানে মানুষ পরিবারে, চায়ের দোকানে, সামাজিক মাধ্যমে—সব জায়গায় রাজনীতি নিয়ে আলোচনা করে এবং ভিন্নমত প্রকাশ করে। এই ধরনের সমাজকে একক মতাদর্শ বা একক নেতার অধীনে সীমাবদ্ধ রাখা প্রায় অসম্ভব। বরং এমন চেষ্টা করলে জনগণের মধ্যে অসন্তোষ আরও বাড়ে এবং তা একসময় বিস্ফোরিত হয়ে ওঠে। বাংলাদেশের ইতিহাসে বহুবার মানুষ রাস্তায় নেমে কর্তৃত্ববাদী শাসনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেছে—১৯৯০ সালের গণঅভ্যুত্থান থেকে শুরু করে সাম্প্রতিক আন্দোলনগুলো তার প্রমাণ।
এছাড়া, বাংলাদেশ একটি বৃহৎ জনসংখ্যার দেশ যেখানে বিভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শ সহাবস্থান করে। এখানে বামপন্থী, ডানপন্থী, মধ্যপন্থী—সব ধরনের রাজনৈতিক ধারা রয়েছে। এই বহুমাত্রিক সমাজে একটি একনায়কতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা কার্যকর হতে পারে না, কারণ তা স্বাভাবিকভাবেই একটি নির্দিষ্ট মতাদর্শকে প্রাধান্য দেয় এবং অন্য মতগুলোকে দমন করে। গণতন্ত্রই একমাত্র ব্যবস্থা যা এই ভিন্নমতগুলোর মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করতে পারে।
অনেকে উদাহরণ হিসেবে সিঙ্গাপুরের কথা বলেন, যেখানে লি কুয়ান ইউ-এর নেতৃত্বে দেশটি দ্রুত উন্নয়ন করেছে। কিন্তু এই তুলনাটি বাস্তবসম্মত নয়। সিঙ্গাপুর একটি ছোট শহররাষ্ট্র, যার জনসংখ্যা বাংলাদেশের তুলনায় অনেক কম এবং এর রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপট সম্পূর্ণ ভিন্ন। বাংলাদেশের মতো একটি বড়, জটিল ও ঐতিহাসিকভাবে আন্দোলনপ্রবণ দেশে সেই মডেল প্রয়োগ করা সম্ভব নয়। ইতিহাসে যেসব ‘দয়ালু একনায়কতন্ত্র’ সফল হয়েছে বলে দাবি করা হয়, সেগুলো খুবই সীমিত এবং ব্যতিক্রমধর্মী; এগুলো কোনো দেশের জন্য স্থায়ী সমাধান হতে পারে না।
বাংলাদেশের আরেকটি বড় সমস্যা হলো, এখানে রাজনীতি প্রায়ই ব্যক্তিনির্ভর হয়ে পড়ে। বিভিন্ন সময়ে দেশের রাজনৈতিক ব্যবস্থা নির্দিষ্ট ব্যক্তির চারপাশে আবর্তিত হয়েছে, যার ফলে শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠার সুযোগ কমেছে। একটি দেশের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের জন্য প্রয়োজন শক্তিশালী ও কার্যকর প্রতিষ্ঠান, যা কোনো একক নেতার ওপর নির্ভরশীল নয়। কিন্তু যখন সবকিছু একজন নেতার ওপর নির্ভর করে, তখন সেই নেতা সরে গেলে পুরো ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়ে।
একটি দয়ালু একনায়কতন্ত্র কার্যকর হতে হলে দুটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত পূরণ করতে হয়। প্রথমত, শাসককে অত্যন্ত সৎ ও নিঃস্বার্থ হতে হবে, যাতে তিনি ক্ষমতার অপব্যবহার না করেন। দ্বিতীয়ত, তাকে অত্যন্ত বিচক্ষণ হতে হবে, যাতে তিনি প্রয়োজন ছাড়া বলপ্রয়োগ না করেন। কিন্তু বাস্তবে এই দুটি শর্ত একসঙ্গে পূরণ হওয়া খুবই বিরল। ক্ষমতা মানুষের চরিত্রকে প্রভাবিত করে এবং দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকলে দুর্নীতি বা স্বেচ্ছাচারিতার ঝুঁকি বেড়ে যায়।
বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতায় সবচেয়ে প্রয়োজন একটি শক্তিশালী গণতান্ত্রিক কাঠামো, যেখানে সরকার, বিরোধী দল এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের ভূমিকা সঠিকভাবে পালন করবে। একটি কার্যকর সংসদ, স্বাধীন বিচারব্যবস্থা এবং নিরপেক্ষ প্রশাসন একটি দেশের উন্নয়নের ভিত্তি তৈরি করে। যদি এই প্রতিষ্ঠানগুলো শক্তিশালী হয়, তাহলে কোনো একক নেতার ওপর নির্ভর না করেও দেশ এগিয়ে যেতে পারে।
গণতন্ত্রের অন্যতম সৌন্দর্য হলো, এটি ক্ষমতার ভারসাম্য বজায় রাখে এবং জনগণকে তাদের প্রতিনিধি বেছে নেওয়ার সুযোগ দেয়। এতে ভুল হওয়ার সম্ভাবনা থাকলেও, সেই ভুল সংশোধনের সুযোগও থাকে। অন্যদিকে, একনায়কতান্ত্রিক ব্যবস্থায় ভুল সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করার সুযোগ সীমিত থাকে, যা দীর্ঘমেয়াদে দেশের জন্য ক্ষতিকর।
বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্ভর করে এই দেশের জনগণের ওপর এবং তাদের গণতান্ত্রিক চর্চার ওপর। একটি শক্তিশালী, অংশগ্রহণমূলক এবং জবাবদিহিমূলক রাজনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারলেই দেশ সত্যিকার অর্থে উন্নতির পথে এগোতে পারবে। কোনো একক ব্যক্তির ওপর নির্ভর না করে, একটি সুসংগঠিত ব্যবস্থা তৈরি করাই হবে সবচেয়ে বড় সাফল্য।
সবশেষে বলা যায়, দয়ালু একনায়কতন্ত্রের ধারণা যতই আকর্ষণীয় মনে হোক না কেন, এটি বাংলাদেশের জন্য উপযুক্ত নয়। দেশের ইতিহাস, সংস্কৃতি এবং রাজনৈতিক বাস্তবতা এই ব্যবস্থার বিপরীতে অবস্থান করে। তাই আমাদের উচিত গণতন্ত্রকে আরও শক্তিশালী করা এবং এমন একটি ব্যবস্থা গড়ে তোলা, যেখানে জনগণের ইচ্ছাই হবে রাষ্ট্র পরিচালনার মূল ভিত্তি।
আপনার মতামত জানানঃ