নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহের অজুহাতে যে চুক্তিগুলো একসময় ‘উন্নয়নের প্রতীক’ হিসেবে প্রচার করা হয়েছিল, সেগুলোই এখন দেশের অর্থনীতির গলায় পাথর হয়ে ঝুলছে—এমনই এক কঠোর বাস্তবতার ছবি উঠে এসেছে অন্তর্বর্তী সরকারের গঠিত চুক্তি পর্যালোচনা জাতীয় কমিটির প্রতিবেদনে। বিশেষ ক্ষমতা আইনের অধীনে সম্পাদিত বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তিগুলোর মধ্যে সবচেয়ে ক্ষতিকর ও রাষ্ট্রের জন্য সবচেয়ে রক্তক্ষরণ ঘটানো চুক্তি হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে আদানি গ্রুপের সঙ্গে করা বিদ্যুৎ আমদানি চুক্তি। প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই একটি চুক্তির কারণেই বাংলাদেশ প্রতিবছর বাড়তি গুনছে ৪০ থেকে ৫০ কোটি ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় ৫ থেকে ৬ হাজার কোটি টাকার সমান।
গত ২৬ জানুয়ারি বিদ্যুৎ ভবনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এই তথ্য প্রকাশ করে জাতীয় কমিটি জানায়, বিশেষ ক্ষমতা আইনে করা বিদ্যুৎ চুক্তিগুলো সংশোধন ছাড়া দেশের বিদ্যুৎ খাতকে টেকসই করা সম্ভব নয়। কমিটির ভাষায়, যেসব চুক্তি সবচেয়ে বেশি ক্ষতি করছে, সেগুলোর ‘অস্ত্রোপচার’ জরুরি, আর এই অস্ত্রোপচারের শুরুটা আদানির চুক্তি দিয়েই হওয়া উচিত। কারণ আদানির চুক্তি ধরতে পারলে অন্য চুক্তিগুলো নিয়েও রাষ্ট্রের দর–কষাকষির সক্ষমতা বাড়বে।
কমিটির চূড়ান্ত প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, ভারতের অভ্যন্তরীণ কোনো কারণে আদানির গোড্ডা বিদ্যুৎকেন্দ্র ক্ষতিগ্রস্ত হলে বা উৎপাদন ব্যাহত হলেও তার দায়ভার বহন করতে হবে বাংলাদেশকে। অথচ বিদ্যুৎকেন্দ্রটি বাংলাদেশের ভূখণ্ডের বাইরে অবস্থিত, ঝুঁকিটা বাংলাদেশের ঘাড়ে, আর বিদ্যুৎ উৎপাদনের নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি বিদেশি একটি করপোরেট গোষ্ঠীর হাতে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ভারত থেকে অন্য উৎসে যখন বিদ্যুৎ আমদানির দাম ছিল প্রতি ইউনিট ৪ দশমিক ৪৬ সেন্ট, তখন আদানির সঙ্গে চুক্তি করা হয় প্রায় দ্বিগুণ দামে—৮ দশমিক ৬১ সেন্টে। শুধু দামই বেশি নয়, চুক্তিতে এমন এক অদ্ভুত মূল্যসূচক সংযুক্ত করা হয়েছে, যার ফলে আদানিকে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের জন্য ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ বেশি মূল্য পরিশোধ করতে হচ্ছে বাংলাদেশকে।
এই হিসাব ধরলে ২৫ বছরের চুক্তির মেয়াদে আদানি গ্রুপ বাংলাদেশ থেকে বাড়তি আদায় করবে প্রায় এক হাজার কোটি ডলার। অর্থাৎ, রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে এই বিপুল অর্থ বেরিয়ে যাবে কোনো উৎপাদন ঝুঁকি ছাড়াই, শুধুমাত্র একটি অসম ও একতরফা চুক্তির কারণে। জাতীয় কমিটির সদস্যদের মতে, এ ধরনের চুক্তি স্বাভাবিক বাজার প্রক্রিয়ায় হওয়া সম্ভব নয়; এর পেছনে দুর্নীতি ও যোগসাজশ ছাড়া অন্য কোনো ব্যাখ্যা নেই।
সংবাদ সম্মেলনে কমিটির সদস্য অধ্যাপক মোশতাক হোসেন খান বলেন, বিদ্যমান প্রমাণের ভিত্তিতে আদানির চুক্তি বাতিল করে ক্ষতিপূরণ আদায়ের আইনি সুযোগ রয়েছে। তবে এটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের বিষয়। অন্তর্বর্তী সরকার হয়তো সময়সীমার কারণে এই সিদ্ধান্ত নিতে পারবে না, কিন্তু একটি নির্বাচিত রাজনৈতিক সরকার চাইলে তা করতে পারে। এজন্য নির্বাচন–পূর্ব সময়েই রাজনৈতিক দলগুলোর কাছ থেকে আদানি চুক্তি নিয়ে অবস্থান স্পষ্ট করার প্রতিশ্রুতি নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি। একই সঙ্গে তিনি বলেন, প্রতারণার অভিযোগে আদানির বিরুদ্ধে মামলা করাও সম্ভব।
তবে চুক্তি বাতিলের সম্ভাব্য ঝুঁকির কথাও গোপন করেননি কমিটির সদস্যরা। তাঁদের মতে, চুক্তি বাতিলের পথে গেলে স্বল্প মেয়াদে আদানি বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ করতে পারে, যার ফলে লোডশেডিং বাড়তে পারে। কিন্তু এই সাময়িক কষ্টকে ২৫ বছরের ‘অভিশাপ’ থেকে মুক্তির মূল্য হিসেবে দেখার আহ্বান জানান মোশতাক হোসেন খান। তাঁর ভাষায়, যে সরকারই ক্ষমতায় আসুক, এই প্রশ্নে জনগণকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে।
প্রতিবেদনে আরও জানানো হয়, দুর্নীতি–সংক্রান্ত বিষয়গুলো যাচাইয়ের জন্য যুক্তরাজ্যভিত্তিক একটি বিশেষজ্ঞ আইনি পরামর্শক প্রতিষ্ঠান নিয়োগ দিয়েছে বিদ্যুৎ বিভাগ। আদানি বিদ্যুৎকেন্দ্র সংক্রান্ত সব তথ্য ইতিমধ্যে দুদক ও উচ্চ আদালতে জমা দেওয়া হয়েছে। নিরপেক্ষ বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণেও একই কথা উঠে এসেছে—দুর্নীতি ছাড়া এমন চুক্তি করা সম্ভব নয়। তবে একই সঙ্গে প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়েছে, পর্যাপ্ত দুর্নীতির প্রমাণ ছাড়া কোনো সার্বভৌম চুক্তি বাতিল করলে আন্তর্জাতিক সালিসে রাষ্ট্র দুর্বল অবস্থানে পড়তে পারে।
জাতীয় কমিটি আদানির বিদ্যুৎকেন্দ্রকে আখ্যা দিয়েছে—‘দেশের বাইরে বসে বিদ্যুৎ, কিন্তু ঝুঁকি বাংলাদেশে’। স্থান নির্বাচন, দাম নির্ধারণ এবং চুক্তির শর্ত—এই তিনটি ক্ষেত্রেই গুরুতর অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেছে। শুরুতে কক্সবাজারের মহেশখালী ও ভারতের ঝাড়খণ্ডের গোড্ডা—এই দুটি স্থান আলোচনায় থাকলেও শেষ পর্যন্ত কেন গোড্ডা বেছে নেওয়া হলো, তার কোনো সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা সরকারি নথিতে নেই। অথচ ঝাড়খণ্ডের কয়লা রপ্তানি নিষিদ্ধ, ফলে সেখানে বিদ্যুৎকেন্দ্র চালাতে আমদানিকৃত কয়লার ওপর নির্ভর করতে হয়েছে, যা ব্যয় আরও বাড়িয়েছে।
এই চিত্র শুধু আদানির ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ নয়। কমিটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত দেড় দশকে দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা পাঁচ গুণ বাড়লেও একই সময়ে বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর বিল বেড়েছে ১১ গুণ। এর ফলে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) কার্যত দেউলিয়া হওয়ার পথে। ২০১৫ সালে যেখানে পিডিবির লোকসান ছিল সাড়ে পাঁচ হাজার কোটি টাকা, সেখানে সর্বশেষ বছরে তা ছাড়িয়েছে ৫০ হাজার কোটি টাকা। সংস্কার না হলে এই লোকসান স্থায়ী রূপ নেবে এবং এর বোঝা পড়বে সাধারণ মানুষের ওপর।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, বর্তমানে ৭ হাজার ৭০০ থেকে ৯ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা অলস পড়ে আছে। তবুও এসব কেন্দ্রকে বসে বসে ভাড়া দিতে হচ্ছে প্রতিবছর ৯০ কোটি থেকে ১৫০ কোটি ডলার পর্যন্ত। অর্থাৎ বিদ্যুৎ ব্যবহার করা হোক বা না হোক, সরকারকে ভাড়া গুনতেই হচ্ছে। কমিটির ভাষায়, এসব চুক্তির মূল দর্শনই হলো—লাভটা নিজের, ঝুঁকিটা সমাজের। জ্বালানির দাম বাড়লে সরকার দেবে, ডলারের দাম বাড়লে সরকার দেবে, বিদ্যুৎ না নিলেও সরকার ভাড়া দেবে।
এই বাস্তবতায় পিডিবিকে টিকিয়ে রাখতে হলে বিদ্যুতের দাম ৮৬ শতাংশ পর্যন্ত বাড়াতে হতে পারে বলে সতর্ক করেছে কমিটি। কিন্তু এত বড় মূল্যবৃদ্ধি হলে শিল্প খাত ধসে পড়বে, সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা অসহনীয় হয়ে উঠবে। তাই দুই থেকে চার বছর কষ্ট সহ্য করে হলেও এই চুক্তির ফাঁদ থেকে বেরিয়ে আসার পথ খুঁজতে হবে বলে মত দেন বিশেষজ্ঞরা।
প্রতিবেদন আরও জানায়, বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দ্রুত সরবরাহ বৃদ্ধির নামে প্রণীত বিশেষ আইনটি কার্যত রাষ্ট্র দখলের হাতিয়ারে পরিণত হয়েছিল। সার্বভৌম গ্যারান্টি ও আন্তর্জাতিক সালিসের সুরক্ষা দিয়ে দেশি–বিদেশি কিছু গোষ্ঠীর লাভ নিশ্চিত করা হয়েছে। এসব চুক্তি সম্পাদনে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে সরাসরি নির্দেশনার কথাও উঠে এসেছে প্রতিবেদনে। যদিও প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত ব্যাংক হিসাবে সরাসরি লেনদেনের প্রমাণ পাওয়া যায়নি, তবে চুক্তির সঙ্গে যুক্ত অনেক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার হিসাবে মিলেছে কয়েক মিলিয়ন ডলারের লেনদেনের তথ্য।
সব মিলিয়ে জাতীয় কমিটির প্রতিবেদন বিদ্যুৎ খাতের এক অস্বস্তিকর সত্য উন্মোচন করেছে—যেখানে উন্নয়নের নামে রাষ্ট্রীয় স্বার্থ বিসর্জন দিয়ে একটি সীমিত গোষ্ঠীর লাভ নিশ্চিত করা হয়েছে। আদানির চুক্তি সেই ব্যবস্থার সবচেয়ে স্পষ্ট ও ভয়াবহ উদাহরণ। এখন প্রশ্ন একটাই—এই সত্য জানার পর রাষ্ট্র ও জনগণ কি সেই কঠিন কিন্তু প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নিতে পারবে, নাকি আরও কয়েক দশক ধরে এই রক্তক্ষরণ মেনে নিয়েই চলতে হবে।
আপনার মতামত জানানঃ