Trial Run

স্বর্ণ ডাকাতিতে সাবেক সেনা ও পুলিশ সদস্য জড়িত!

ছবি : সংগৃহীত

ঢাকার সাভারের আমিনবাজার এলাকায় পুলিশ পরিচয় স্বর্ণ ডাকাতির একটি মামলায় আন্তঃজেলা ডাকাত চক্রের আট সদস্যকে গ্রেফতার করে পুলিশের বিশেষায়িত ইউনিট পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। গ্রেফতার ডাকাতচক্রের আট সদস্যের মধ্যে পুরান ঢাকার তাঁতী বাজারের একজন স্বর্ণ ব্যবসায়ী, একজন কারিগর, একজন বহিষ্কৃত সাবেক সেনাও রয়েছে বলে জানিয়েছেন ঢাকা জেলা পিবিআইয়ের পুলিশ সুপার (এসপি) মোহাম্মদ খোরশেদ আলম। এছাড়া এ চক্রের সাথে একজন পুলিশ সদস্যও রয়েছে।  গতকাল রবিবার(৩১ জানু) পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) ঢাকা জেলা কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানানো হয়।

পিবিআইয়ের ঢাকা জেলা পুলিশ সুপার মোহাম্মদ খোরশেদ আলম বলেন, এরা পুলিশ ও ডিবি পরিচয় দিয়ে স্বর্ণ ব্যবসায়ীদের টার্গেট করে ডাকাতি করতেন। এ চক্রে জড়িত আরো সদস্যের নাম আমরা পেয়েছি। তাদের মধ্যে আরো একজন সাবেক সেনা সদস্য ও একজন পুলিশ সদস্যের নাম পাওয়া গেছে। তবে তদন্তের স্বার্থে এখনই বাকি সদস্যদের নাম প্রকাশ করছি না।

ডাকাতির ঘটনাটি গত বছরের ৭ সেপ্টেম্বরের। দীর্ঘ অনুসন্ধানের পর পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) শনাক্ত করে ডাকাত দলের সদস্যদের। প্রথম দফায় গ্রেপ্তার হন চারজন। ২৬ জানুয়ারি থেকে ধারাবাহিক অভিযানে বাকি চারজন গ্রেপ্তার হন। তদন্তে পুলিশ জানতে পারে, দলটি ২০১৮ সাল থেকে ডাকাতি করে আসছে। দলটি সুসংগঠিত। তাদের ইন্টেলিজেন্স শাখা (গোয়েন্দা তথ্য), অপারেশন শাখা (ডাকাতি) ও সোনা কেনাবেচার কাজে যুক্ত একটি শাখা রয়েছে। দলের অন্যতম সদস্য সাবেক সেনাসদস্য ফারুক হোসেন (৪০)।

পুলিশ সুপার মোহাম্মদ খোরশেদ আলম বলেন,  গত বছরের ৭ সেপ্টেম্বর সকালে পুরান ঢাকার তাঁতীবাজারের স্বর্ণ ব্যবসায়ী অর্জুন হালদার তার দোকানের কারিগর সুরেশ হালদারকে সঙ্গে নিয়ে রাজবাড়ী জেলার পলাশ জুয়েলার্স ও রাজলক্ষ্মী জুয়েলার্সের মালিকদের অর্ডার দেওয়া স্বর্ণ সরবরাহের জন্য রওনা হন। একটি কালো ট্রলি ব্যাগের মধ্যে ১৬৬ দশমিক ৫৫৩ ভরি স্বর্ণ (চেইন, কানের দুল, বল চেইন, কানপাশা) ছিল, যার বাজার মূল্য এক কোটি ১৫ লাখ টাকা। তাঁতীবাজার থেকেই তারা গাবতলীর বাসে ওঠেন। গাবতলী গিয়ে ওই বাস থেকে নেমে রাজবাড়ী যাওয়ার একটি বাসে ওঠেন তারা। সকাল সাড়ে ৮টার দিকে বাসটি আমিনবাজারের পাওয়ার প্লান্টের কাছে পৌঁছাতেই চারটি মোটরসাইকেলে ১০-১২ জন মাস্ক পরা লোক বাসটি থামায়। তারা বাসে উঠে পুলিশ পরিচয় দিয়ে অর্জুন হালদার ও সুরেশ হালদারকে জোর করে বাস থেকে নামিয়ে মোটরসাইকেলে তুলে গাবতলীর দিকে রওনা হয়। পরে ফাঁকা জায়গায় স্বর্ণের ব্যাগটি নিয়ে দু’জনকে রাস্তায় ফেলে তারা পালিয়ে যায়।

পুলিশ সুপার বলেন, তদন্তে বেরিয়ে এসেছে অর্জুন হালদারের কর্মচারী সুরেশ হালদারও ওই ডাকাত চক্রের সদস্য। অর্জুন হালদার সঙ্গে স্বর্ণ নিয়ে রাজবাড়ী যাচ্ছে- এই তথ্য ডাকাতদের জানিয়েছিল সুরেশ।

সংবাদ সম্মেলনে এসপি আরো জানান, অর্জুন হালদার আদালতে ডাকাতির মামলা করেন। আদালত মামলাটির তদন্তভার দেন পিবিআই ঢাকা জেলাকে। গত ১৪ জানুয়ারি ডাকাত চক্রের চার সদস্য সুরেশ, মিঠুন মজুমদার ওরফে মিঠু, উজ্জ্বল চন্দ্র দাস ও মিহির দাসকে গ্রেপ্তার করে পিবিআই। তারা আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। তাদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে অভিযান চালিয়ে শনিবার চক্রের আরও চার সদস্য শংকর চন্দ্র ঘোষ, সোহেল আহমেদ পল্লব, মিঠুন চৌকিদার ও সাবেক সেনা সদস্য ফারুক হোসেনকে গ্রেপ্তার করা হয়। চক্রে আরও অন্তত ১৫ সদস্য রয়েছে। চক্রটি তাঁতীবাজারের স্বর্ণ ব্যবসায়ীদের টার্গেট করে বিভিন্নভাবে ডাকাতি করে আসছিল।

সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, ‘গ্রেফতার আটজনের মধ্যে ফারুক হোসেন নামে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর এক সাবেক সদস্য রয়েছে। তিনি করপোরাল হিসেবে বাহিনীতে কর্মরত ছিলেন। তিনি জাতিসংঘের একটি মিশনে অংশ নিয়েছিলেন। এ চক্রের গ্রেফতার আরেক সদস্য অপারেশনাল কাজে অংশ নেওয়া সোহেল আহমেদ পল্লব, ২০১৮ সাল থেকে ডাকাতির কাজে যুক্ত ছিলেন বলে জানিয়েছেন। তার নেতৃত্বে চক্রটি এখন পর্যন্ত ৫-৭টি ডাকাতির ঘটনা ঘটিয়েছে।

তিনি বলেন, চক্রটি ধরতে অনেককেই নজরদারিতে রাখা হয়েছে। আরও এক সাবেক সেনা সদস্যের এ ধরনের অপকর্মে জড়িত থাকার প্রমাণ পেয়েছে পিবিআই, তিনিও নজরদারিতে রয়েছেন। এছাড়া, সাবেক পুলিশ সদস্য জড়িত রয়েছেন বলেও জানা গেছে। ’

সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, সাম্প্রতিক সময়ে পুলিশ বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েছে বেশি।  একের পর এক পুলিশের অপরাধের ফিরিস্তি আসাতে আতঙ্কিত হয়ে পড়েছে লোকজন। এখন সেনা বাহিনীর সদস্যের সঙ্গে ডাকাতিতে জড়িয়ে পড়েছে পুলিশ। সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, পুলিশের ভাবমূর্তি রক্ষায় পুলিশকে ডাণ্ডা ব্যবহার করতে দেখা যায় বাইরে। অথচ নিজেদের ঘরেই যে এসব ঘটে বেশি, সেবিষয়ে নজরদারি নেই। যদিও ডিএমপি কমিশনার নিজেদের ঘর থেকেই শুদ্ধি অভিযান শুরু করতে চান বলে ঘোষণা দিয়েছিলেন। সেটা রাজনীতিবিদদের মতো কেবলই ঘোষণা নাকি বাস্তবিকও পুলিশ এবিষয়ে কাজ করছে, সন্দেহ প্রকাশ করেন তারা।

এর আগে গত ৭ জানুয়ারি মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের মুন্সীগঞ্জ জেলা শাখার সহকারী পরিচালক এসএম সাকিব হোসেন, সিপাহি আমিনুল ইসলাম ও সোর্স হারুন রাজধানীর জিন্দাবাহার লেনের একটি সোনার দোকানে যান। ডিবি পরিচয়ে তারা ওই দোকানের মালিককে তুলে নিয়ে যান এবং ৯০ ভরি সোনা লুট করেন। এ ঘটনায় গত ১২ জানুয়ারি কতোয়ালি থানায় ভুক্তভোগী স্বর্ণ ব্যবসায়ী মামলা করেন। পুলিশ প্রথমে দোকানের একজন কর্মচারীসহ দুজনকে গ্রেফতার করে। পরে তারা স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। ওই জবানবন্দিতে তারা ডাকাতির ঘটনায় সাকিব হোসেনের সম্পৃক্ততার কথা জানান। তাদের জবানবন্দির ভিত্তিতে গত ১৯ জানুয়ারি পুরান ঢাকা থেকে গ্রেফতার করা হয় সাকিব হোসেনকে। তিনি ৩৪তম বিসিএসে নন-ক্যাডার কর্মকর্তা হিসেবে মাদক দ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরে নিয়োগ পান।

সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা আক্ষেপ প্রকাশ করেন, প্রশাসনের কাজ হলো রাষ্ট্রের আইন সমুন্নত রাখতে বেআইনি কর্মকাণ্ড রুখতে কাজ করা। কিন্তু প্রশাসনেই যেন ঢুকে পড়ছে রাষ্ট্রের যত ক্রিমিনাল। এবিষয়ে সরকার তথা রাষ্ট্রের নীতি নির্ধারকদের এগিয়ে আসতে হবে বলে জানান তারা।

এসডব্লিউ/এমএন/কেএইচ/১৬১৮ 

ছড়িয়ে দিনঃ
  • 22
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    22
    Shares

আপনার মতামত জানানঃ