মহাবিশ্বের বিস্ময়গুলোর মধ্যে কৃষ্ণগহ্বর বা ব্ল্যাক হোল নিঃসন্দেহে সবচেয়ে রহস্যময় ও ভয়ংকর এক জ্যোতিষ্ক। মানুষের চোখে কৃষ্ণগহ্বরকে ধরা যায় না, তবে এর মহাকর্ষীয় শক্তি এত প্রবল যে আলো পর্যন্ত সেখান থেকে বের হতে পারে না। আমাদের মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সির কেন্দ্রে যে সুপারম্যাসিভ কৃষ্ণগহ্বর আছে, সেটির নাম স্যাজিটারিজ এ স্টার। এর ভর সূর্যের চেয়ে প্রায় ৪৩ লাখ গুণ বেশি এবং ব্যাস প্রায় ২ কোটি ৪০ লাখ কিলোমিটার। বর্তমানে এটি সুপ্ত অবস্থায় রয়েছে, মানে আশেপাশের পদার্থ খুব বেশি গ্রাস করছে না। তবে বিজ্ঞানীরা বলছেন, এটি চিরকাল শান্ত থেকে যাবে না; একসময় এর ঘুম ভাঙবে, এবং তখন আমাদের গ্যালাক্সিতে এক মহাজাগতিক অগ্নিকুণ্ডের জন্ম হবে।
একটি কৃষ্ণগহ্বর সক্রিয় হয়ে ওঠার প্রক্রিয়াটি মূলত নির্ভর করে এর চারপাশ থেকে কতটা গ্যাস, ধুলো ও নক্ষত্রের অবশিষ্ট পদার্থ এটি নিজের দিকে টানতে পারে তার ওপর। যখন প্রচুর পরিমাণে পদার্থ এর দিকে ধাবিত হয়, তখন কৃষ্ণগহ্বর জেগে ওঠে। সেই সময় এটি শুধু পদার্থ গিলে খায় না, বরং আলোক, বিকিরণ এবং শক্তির প্রবল বিস্ফোরণ ঘটায়। বিজ্ঞানীরা ধারণা করছেন, আমাদের গ্যালাক্সির কেন্দ্রে থাকা স্যাজিটারিজ এ স্টার প্রায় ২৪০ কোটি বছর পর জেগে উঠবে। এর কারণ হবে লার্জ ম্যাগেলানিক ক্লাউড নামক একটি বামন ছায়াপথের সঙ্গে মিল্কিওয়ের সংঘর্ষ। এই সংঘর্ষের ফলে প্রচুর পরিমাণ গ্যাস ও ধুলো গ্যালাক্টিক কেন্দ্রে পৌঁছাবে, আর তখনই কৃষ্ণগহ্বর তার পরবর্তী “খাদ্য” পাবে।
স্যাজিটারিজ এ স্টার সক্রিয় হলে প্রথমেই ঘটবে পদার্থের প্রবল আকর্ষণ। আশেপাশের গ্যাস, নক্ষত্র, ধুলো একসময় কৃষ্ণগহ্বরের দিকে টেনে নিয়ে যাবে এর প্রবল মহাকর্ষ। পদার্থ যখন ভেতরে ঢোকার আগে ঘুরতে থাকে, তখন ঘর্ষণের কারণে প্রচণ্ড তাপ তৈরি হয়। এর ফলে সেখানে অতিবেগুনি, এক্স-রে এবং ইনফ্রারেড তরঙ্গদৈর্ঘ্যে বিকিরণ শুরু হবে। বিজ্ঞানীরা বলছেন, তখন কৃষ্ণগহ্বরকে ঘিরে থাকবে এক বিশাল আলোকবৃত্ত বা এক্রিশন ডিস্ক, যা দূর মহাকাশ থেকেও রেডিও টেলিস্কোপে ধরা পড়বে।
একই সঙ্গে কৃষ্ণগহ্বর থেকে বের হতে শুরু করবে প্লাজমার জেট। এগুলো আলোর গতির বিশাল একটি অংশে মহাশূন্যে ছুটে যাবে। এ দৃশ্যকে মহাজাগতিক অগ্নিকুণ্ডের সঙ্গে তুলনা করা হয়। এমন দৃশ্য পৃথিবী থেকে দেখা যাবে, তবে তা ঘটতে কোটি কোটি বছর পরে। এই জেটগুলো শুধু আলো ছড়াবে না, আশপাশের মহাজাগতিক পরিবেশকেও বদলে দেবে। অনেক নক্ষত্র সেগুলোর তাপে ও বিকিরণে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এমনকি নতুন নক্ষত্রের জন্মও থেমে যেতে পারে।
বিজ্ঞানীরা আরও বলছেন, যখন এই কৃষ্ণগহ্বর জাগবে তখন এটি বর্তমান ভরের তুলনায় ৮ গুণ বড় হয়ে যেতে পারে। কারণ, এর দিকে ধাবিত গ্যাস ও ধুলো একসময় ভেতরে প্রবেশ করবে এবং এর ভর বাড়িয়ে তুলবে। এই বাড়তি ভর মানে আরও শক্তিশালী মহাকর্ষ, যা আশেপাশের নক্ষত্র ও পদার্থকে দ্রুত গ্রাস করবে।
স্যাজিটারিজ এ স্টারের বর্তমান অবস্থা যদিও শান্ত, কিন্তু এটি যে পদার্থ গ্রাস করতে সক্ষম তার সীমা রয়েছে। একে বলা হয় এডিংটন সীমা। যত বড় কৃষ্ণগহ্বর, তত বেশি পদার্থ একবারে এটি শোষণ করতে পারে। বর্তমানে আমাদের গ্যালাক্সির কৃষ্ণগহ্বর এই সীমার অনেক নিচে পদার্থ গ্রহণ করছে। তাই এটিকে এখন সুপ্ত বলা হয়। তবে যখন লার্জ ম্যাগেলানিক ক্লাউডের সংঘর্ষ ঘটবে, তখন পদার্থের প্রবাহ এ সীমা ছাড়িয়ে যাবে এবং কৃষ্ণগহ্বর হঠাৎ সক্রিয় হয়ে উঠবে।
এখন প্রশ্ন আসে, এর প্রভাব পৃথিবীর ওপর কী হতে পারে? যেহেতু আমাদের সৌরজগত গ্যালাক্সির প্রান্তে অবস্থিত, তাই সরাসরি এই বিস্ফোরণের শিকার হবে না। তবে এর বিকিরণ দূর মহাকাশ পেরিয়ে পৃথিবীতেও প্রভাব ফেলতে পারে। শক্তিশালী রশ্মি পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে ঢুকতে পারলে তা আমাদের প্রযুক্তি, স্যাটেলাইট যোগাযোগ এমনকি জীবজগতের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে। তবে বিজ্ঞানীরা বলছেন, পৃথিবী সরাসরি ধ্বংসের মুখে পড়বে না। সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়বে গ্যালাক্সির কেন্দ্রীয় অঞ্চলে, যেখানে অনেক নক্ষত্র হয়ত ধ্বংস হবে কিংবা নতুনভাবে জন্ম নিতে ব্যর্থ হবে।
মহাবিশ্বের ইতিহাসে কৃষ্ণগহ্বরের জাগরণ কোনো বিরল ঘটনা নয়। বহু গ্যালাক্সিতেই এমন সুপারম্যাসিভ কৃষ্ণগহ্বর রয়েছে, যেগুলো সময়ে সময়ে সক্রিয় হয়। আমাদের কাছাকাছি অ্যান্ড্রোমেডা গ্যালাক্সিতেও একটি বিশাল কৃষ্ণগহ্বর রয়েছে, যা ভবিষ্যতে মিল্কিওয়ের সঙ্গে সংঘর্ষ ঘটাবে। বিজ্ঞানীরা মনে করেন, এই মহাজাগতিক সংঘর্ষগুলোই মহাবিশ্বকে নতুন আকার দেয়, পুরনো নক্ষত্র ধ্বংস করে এবং নতুন নক্ষত্রের জন্ম দেয়। তাই কৃষ্ণগহ্বরের জাগরণ মানেই কেবল ধ্বংস নয়, এর ভেতরে লুকিয়ে থাকে নতুন সৃষ্টির সম্ভাবনাও।
স্যাজিটারিজ এ স্টার জাগলে মানুষের পক্ষে তা সরাসরি প্রত্যক্ষ করার সুযোগ থাকবে না। কারণ, সেটি ঘটবে এখন থেকে প্রায় ২৪০ কোটি বছর পরে। তখন পৃথিবী আদৌ টিকে থাকবে কি না তা নিশ্চিত নয়। সূর্য তখন অনেকটাই মধ্যবয়স পেরিয়ে লাল দৈত্যে রূপান্তরের পথে থাকবে। হয়ত পৃথিবী তখন বসবাসের অযোগ্য হয়ে যাবে। তাই এই মহাজাগতিক ঘটনার দর্শক হিসেবে মানুষের অস্তিত্ব থাকবে কি না তা নিয়েই বড় প্রশ্ন রয়েছে।
তবুও বিজ্ঞানীরা এসব নিয়ে গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছেন, কারণ কৃষ্ণগহ্বর মহাবিশ্বের গঠন ও ভবিষ্যৎ বুঝতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কৃষ্ণগহ্বরের আচরণ অধ্যয়ন করে আমরা জানতে পারি গ্যালাক্সির জন্ম, নক্ষত্রের মৃত্যু এবং মহাবিশ্বে শক্তির বিস্তার সম্পর্কে। প্রতিটি কৃষ্ণগহ্বরই যেন সময়ের গভীরে লেখা এক মহাকাব্য, যা ধীরে ধীরে প্রকাশিত হয় কোটি কোটি বছরে।
মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সির কেন্দ্রীয় কৃষ্ণগহ্বর এখন শান্ত। কিন্তু তার ভেতরে লুকিয়ে আছে এক অপ্রতিরোধ্য শক্তি, যা একদিন বিস্ফোরিত হবে। সেই দিনটা আসতে এখনও বহু কোটি বছর বাকি, তবে এর ভবিষ্যদ্বাণী আমাদের শেখায়—মহাবিশ্ব কখনো স্থির নয়। এটি চিরকাল পরিবর্তনের পথে থাকে। আজ যে শান্ত, কাল সে ঝড় তুলবে। আর এই পরিবর্তনের ঢেউ একসময় আমাদের অস্তিত্বকেও ছুঁয়ে যেতে পারে।
আপনার মতামত জানানঃ