বিহারের মুখ্যমন্ত্রী নীতীশ কুমারের হাত ধরে একজন নারী চিকিৎসকের হিজাব টেনে নামিয়ে দেওয়ার দৃশ্যটি কয়েক সেকেন্ডের একটি ভিডিও হলেও এর অভিঘাত ছড়িয়ে পড়েছে বহুস্তরে—নারীর সম্মান, ধর্মীয় স্বাধীনতা, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার আচরণ এবং ভারতের সংখ্যালঘু রাজনীতির জটিল বাস্তবতায়। একটি নিয়োগপত্র বিতরণ অনুষ্ঠান, যা হওয়ার কথা ছিল একজন তরুণ চিকিৎসকের জীবনের গর্বের মুহূর্ত, সেটিই মুহূর্তের মধ্যে পরিণত হয় জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বিতর্কে।
ভিডিওতে দেখা যায়, মুখ্যমন্ত্রী নীতীশ কুমার নিয়োগপত্র তুলে দেওয়ার সময় হঠাৎ প্রশ্ন করেন, “এটা কী?”—এরপর সামনের দিকে ঝুঁকে ওই নারী চিকিৎসকের হিজাব টেনে নিচে নামিয়ে দেন। ঘটনাটি ঘটে প্রকাশ্য মঞ্চে, অসংখ্য ক্যামেরার সামনে, যেখানে উপস্থিত ছিলেন মন্ত্রী, ঊর্ধ্বতন আমলা এবং নবনিযুক্ত চিকিৎসকরা। ওই নারী কোনো প্রতিক্রিয়া দেখানোর সুযোগই পাননি; রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ নির্বাহী ক্ষমতার একজন ব্যক্তি তার ব্যক্তিগত পরিসরে অনধিকার প্রবেশ করেন।
এই ঘটনা শুধু একটি ব্যক্তিগত আচরণগত ভুল নয়, বরং এটি রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার চরিত্রকে উন্মোচন করে। একজন মুখ্যমন্ত্রী যখন একজন প্রাপ্তবয়স্ক নারীর ধর্মীয় পোশাক নিজ হাতে সরিয়ে দেন, তখন সেটি আর ‘স্নেহ’ বা ‘অনিচ্ছাকৃত’ আচরণ থাকে না; এটি হয়ে ওঠে ক্ষমতার প্রকাশ—যেখানে রাষ্ট্র নিজেকে নাগরিকের শরীর ও পরিচয়ের ওপর কর্তৃত্বশীল মনে করে।
ঘটনাটির প্রতিক্রিয়া তাই তীব্র হয়েছে। বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো এটিকে নারীর মর্যাদা ও ধর্মীয় স্বাধীনতার লঙ্ঘন হিসেবে চিহ্নিত করেছে। আসাদুদ্দিন ওয়াইসির দল এআইএমআইএম একে সরাসরি অপমান বলে অভিহিত করে ক্ষমা দাবি করেছে। কংগ্রেস একে ‘নির্লজ্জতা’ বলে আখ্যা দিয়ে পদত্যাগ দাবি করেছে। আরজেডি আরও এক ধাপ এগিয়ে মুখ্যমন্ত্রীর মানসিক স্থিতি নিয়েই প্রশ্ন তুলেছে। এই প্রতিক্রিয়াগুলো কেবল রাজনৈতিক আক্রমণ নয়; এগুলো ভারতের সংবিধান, সামাজিক মূল্যবোধ এবং রাষ্ট্রীয় আচরণ নিয়ে গভীর উদ্বেগের বহিঃপ্রকাশ।
সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো—এই ঘটনা ঘটেছে এমন এক সময়ে, যখন ভারতে হিজাব, পোশাক ও মুসলিম নারীর পরিচয় নিয়ে বিতর্ক দীর্ঘদিন ধরেই উত্তপ্ত। কর্ণাটকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে হিজাব নিষেধাজ্ঞা, বিভিন্ন রাজ্যে ‘ইউনিফর্ম’ বিতর্ক, এবং মুসলিম নারীদের ধর্মীয় চর্চাকে ‘পিছিয়ে পড়া’ বা ‘পুরুষতান্ত্রিক নিপীড়নের প্রতীক’ হিসেবে উপস্থাপনের প্রবণতা—এই সবকিছুর মধ্যেই নীতীশ কুমারের এই আচরণ একটি বড় রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপটে যুক্ত হয়ে যায়।
নীতীশ কুমারের দল অবশ্য এই ঘটনাকে ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেছে। জেডি(ইউ) নেতাদের ভাষ্য অনুযায়ী, এটি ছিল ‘স্নেহের প্রকাশ’, মুখ্যমন্ত্রী চেয়েছিলেন ওই নারী চিকিৎসকের মুখ দেখা যাক, তার সাফল্য দৃশ্যমান হোক। এই যুক্তি শুনতে যতটা সহজ, বাস্তবে ততটাই বিপজ্জনক। কারণ এই যুক্তির ভেতরেই লুকিয়ে আছে এক ধরনের পিতৃতান্ত্রিক মানসিকতা—যেখানে পুরুষ রাষ্ট্রনেতা ঠিক করে দেন, একজন নারী কীভাবে নিজেকে প্রকাশ করবে, কী পরবে, কীভাবে ‘দেখা যাবে’।
এই ব্যাখ্যা আরও বিপজ্জনক হয়ে ওঠে যখন রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার সঙ্গে যুক্ত হয়। একজন সাধারণ ব্যক্তি যদি এমন আচরণ করেন, সেটি সামাজিক অপরাধ; কিন্তু একজন মুখ্যমন্ত্রী করলে সেটি একটি বার্তা দেয়—রাষ্ট্র মনে করে, সে চাইলে নাগরিকের শরীর ও বিশ্বাসে হস্তক্ষেপ করতে পারে।
এই ঘটনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো মঞ্চে উপস্থিত অন্যদের ভূমিকা। ভিডিওতে দেখা যায়, উপ-মুখ্যমন্ত্রী সম্রাট চৌধুরী তাকে থামানোর চেষ্টা করছেন। কিন্তু মুখ্যমন্ত্রীর মুখ্যসচিব ও স্বাস্থ্যমন্ত্রীকে হাসতে দেখা যায়। এই হাসি কেবল ব্যক্তিগত প্রতিক্রিয়া নয়; এটি একটি প্রাতিষ্ঠানিক উদাসীনতার প্রতীক। যখন রাষ্ট্রীয় যন্ত্রের শীর্ষ ব্যক্তিরা এমন ঘটনায় নীরব বা হাস্যরসাত্মক থাকেন, তখন সেটি নিপীড়িত পক্ষের জন্য আরও গভীর বার্তা দেয়—তারা একা।
এই বিতর্ক ভারতের সীমানা পেরিয়ে পাকিস্তানেও আলোচিত হয়েছে। পাকিস্তানি সাংবাদিক ও বিশ্লেষকরা ঘটনাটিকে ভারতের মুসলিমবিরোধী আচরণের উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরছেন। এটি ভারতীয় কূটনীতির জন্যও অস্বস্তিকর, কারণ ভারত নিজেকে একটি ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে উপস্থাপন করে থাকে। কিন্তু এই ধরনের দৃশ্য আন্তর্জাতিক পরিসরে সেই দাবিকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।
নীতীশ কুমারের ব্যক্তিগত রাজনৈতিক ইতিহাস এই বিতর্ককে আরও জটিল করে তোলে। একসময় তিনি নিজেকে ধর্মনিরপেক্ষ রাজনীতির প্রতীক হিসেবে তুলে ধরেছিলেন—“আমি টুপিও পরি, তিলকও পরি”—এই বক্তব্য তাকে বিজেপির রাজনীতির বিপরীতে একটি অবস্থান দিয়েছিল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তার রাজনৈতিক অবস্থান বদলেছে, জোট বদলেছে, আর সেই সঙ্গে বদলেছে তার রাজনৈতিক ভাষা ও আচরণও।
সাম্প্রতিক সময়ে তার আচরণ ঘিরে যে প্রশ্নগুলো উঠছে, সেগুলো এই ঘটনার পর আরও জোরালো হয়েছে। জনসভায় অপ্রাসঙ্গিক আচরণ, জাতীয় সংগীতের সময় অন্যমনস্কতা, সরকারি কর্মকর্তাদের সঙ্গে অদ্ভুত আচরণ—এসব মিলিয়ে একটি বড় প্রশ্ন সামনে এসেছে: এটি কি ব্যক্তিগত বার্ধক্যজনিত আচরণ, নাকি ক্ষমতার দীর্ঘস্থায়ী অবস্থান থেকে জন্ম নেওয়া এক ধরনের দায়িত্বহীনতা?
তবে বয়স বা মানসিক স্থিতি দিয়ে এই ঘটনার দায় এড়ানো যায় না। কারণ যাই হোক না কেন, একজন মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে নীতীশ কুমার সাংবিধানিক শপথে আবদ্ধ—তিনি নাগরিকের মর্যাদা, স্বাধীনতা ও অধিকার রক্ষা করবেন। সেই শপথ ভঙ্গ হলে তার দায় রাজনৈতিক ও নৈতিক—ব্যক্তিগত নয়।
সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি রয়ে যায়—ওই নারী চিকিৎসকের জন্য এর অর্থ কী? তিনি কোনো বক্তব্য দেননি, সম্ভবত দিতে পারেননি। কিন্তু তার নীরবতার মধ্যেই লুকিয়ে আছে হাজারো নারীর অভিজ্ঞতা—যারা রাষ্ট্র, সমাজ ও ক্ষমতার সামনে নিজেদের অসহায় বোধ করেন। তার নিয়োগপত্র নেওয়ার মুহূর্তটি চিরতরে বদলে গেছে; সেটি আর শুধু সাফল্যের স্মৃতি নয়, বরং এক ধরনের প্রকাশ্য অপমানের দলিল।
এই ঘটনা ভারতের গণতন্ত্রের জন্যও একটি আয়না। গণতন্ত্র কেবল ভোট বা নির্বাচন নয়; এটি প্রতিদিনের আচরণ, ভাষা ও সম্মানের চর্চা। যখন সেই চর্চায় ফাটল ধরে, তখন কয়েক সেকেন্ডের একটি ভিডিওই যথেষ্ট—রাষ্ট্রের চরিত্র উন্মোচনের জন্য।
নীতীশ কুমারের হিজাব টেনে নামানো তাই কেবল একটি বিতর্ক নয়; এটি ভারতের রাজনীতি, সমাজ ও রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার একটি গভীর সংকেত। এই সংকেত উপেক্ষা করলে ভবিষ্যতে এমন আচরণ আরও স্বাভাবিক হয়ে উঠবে—আর তখন আর কোনো ভিডিও ভাইরাল হওয়ারও প্রয়োজন হবে না।
আপনার মতামত জানানঃ