২০২৫ সালের জানুয়ারিতে জাতীয় ক্যান্সার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের (এনআইসিআরএইচ) সাবেক পরিচালক শেখ গোলাম মোস্তফার বিরুদ্ধে যে অভিযোগ উঠেছে, তা কেবল একটি ব্যক্তিগত দুর্নীতির ঘটনা নয়; বরং এটি বাংলাদেশের প্রশাসনিক ও স্বাস্থ্য খাতের ভেতরের ভাঙন, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং নৈতিকতার সংকটের প্রতিফলন। অভিযোগ অনুযায়ী, তিনি স্বাস্থ্য উপদেষ্টা পদে বসার জন্য এক সমন্বয়ক গ্রুপকে নগদ ১০ লাখ টাকা এবং চারটি চেকের মাধ্যমে মোট ২০০ কোটি টাকার প্রতিশ্রুতি দেন। দুদক তদন্ত করে বলেছে, অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়া গেছে। অভিযানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, ড. মোস্তফার ব্যাংক হিসাবে এত পরিমাণ অর্থ ছিল না; তবে পদটি পাওয়ার পর এই অর্থ সংগ্রহ করার পরিকল্পনা ছিল বলে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে জানা গেছে।
ঘটনার সূত্রপাত হয় যখন একটি সমন্বয়ক গ্রুপ নিজেদের যমুনা থেকে আগত পরিচয় দিয়ে ড. মোস্তফাকে আশ্বাস দেয় যে তাঁকে স্বাস্থ্য উপদেষ্টা করা হবে। মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করেন আরিফুল ইসলাম, যিনি নিজেকে সমন্বয়ক আরেফিনের ভাই হিসেবে পরিচয় দেন। তিনি সরাসরি ড. মোস্তফার চেম্বার থেকে চেকগুলো সংগ্রহ করেন। যদিও আরেফিন উপস্থিত ছিলেন না, তিনি ফোনে যোগাযোগ করেন। এই চিত্রে দেখা যায়—বাংলাদেশের স্বাস্থ্য প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ একটি পদ অর্জনের জন্য ব্যক্তিগত অর্থ, রাজনৈতিক প্রভাব এবং প্রলোভন একসাথে কাজ করছে। অথচ এই পদটি কেবল মর্যাদা বা আর্থিক সুবিধার নয়, বরং মানুষের জীবন ও মৃত্যুর সাথে সম্পর্কিত।
ড. মোস্তফা অবশ্য অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছেন, তাঁকে মিথ্যা প্রলোভন দেখানো হয়েছে এবং জোর করে চেকগুলোতে সই করানো হয়েছে। তাঁর দাবি অনুযায়ী, চেকগুলো ছিল “সিকিউরিটি চেক” এবং সেই সময় তাঁদের হাতে অস্ত্রও ছিল। এই দাবি এক ধরনের নাটকীয় পরিস্থিতি তৈরি করে, যা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং দুদকের জন্য আরও গভীর অনুসন্ধানের ক্ষেত্র তৈরি করেছে। যদি সত্যিই অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে সই করানো হয়ে থাকে, তাহলে এটি একটি ভিন্ন ধরনের অপরাধ, আর যদি স্বেচ্ছায় হয়ে থাকে তবে এটি দুর্নীতি ও ঘুষের চরম উদাহরণ।
এই ঘটনার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতের ভেতরের দুর্বলতা ও অসঙ্গতি প্রকাশ পেয়েছে। ক্যান্সার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের মতো একটি জাতীয় প্রতিষ্ঠানের সাবেক পরিচালক পদলোভে এমন ঝুঁকিপূর্ণ লেনদেনে জড়িয়ে পড়েন, এটি নিঃসন্দেহে ভয়ঙ্কর বার্তা বহন করে। স্বাস্থ্য খাত যেখানে মানুষের আস্থা ও মানবিক দায়িত্বশীলতার সর্বোচ্চ প্রতীক হওয়ার কথা, সেখানে পদোন্নতি বা উপদেষ্টা হওয়ার জন্য কোটি কোটি টাকার ঘুষের চিত্র জনগণের বিশ্বাসকে মারাত্মকভাবে নাড়িয়ে দিয়েছে। এর ফলে সাধারণ মানুষ প্রশ্ন করতে শুরু করেছে—যদি শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তারা এরকম দুর্নীতির সাথে জড়িত থাকেন, তাহলে সাধারণ মানুষের জন্য চিকিৎসা সেবা কতটা সৎ, নিরাপদ ও নৈতিক হতে পারে?
অন্যদিকে দুদকের অবস্থানও বেশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের প্রাথমিক অনুসন্ধানে সত্যতা মিললেও, এটি কেবল শুরু মাত্র। চূড়ান্ত প্রমাণ, আইনি প্রক্রিয়া এবং বিচার নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত সমাজে নানা গুজব, ব্যাখ্যা ও পাল্টা যুক্তি চলতেই থাকবে। বাংলাদেশের দুর্নীতি দমন কমিশন দীর্ঘদিন ধরে নানা অভিযোগের মুখে ছিল—তাদের তদন্ত ধীরগতি, রাজনৈতিক প্রভাব এবং কার্যকারিতা নিয়ে বহু প্রশ্ন উঠেছে। এই ঘটনার ক্ষেত্রে তারা কতটা নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছভাবে তদন্ত চালাতে পারে, সেটিই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
এই কেলেঙ্কারি কেবল একজন চিকিৎসকের ব্যক্তিগত পদলোভ নয়; বরং পুরো সমাজে দুর্নীতি কীভাবে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নিয়েছে তার প্রতিফলন। রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ পদ অর্জনের জন্য আর্থিক লেনদেন, চাপে ফেলা এবং প্রলোভন—এসব কেবল বর্তমান সমাজের প্রশাসনিক চিত্র নয়, বরং ভবিষ্যতের জন্যও একটি অশুভ ইঙ্গিত। স্বাস্থ্য খাতের মতো সংবেদনশীল ক্ষেত্রে যখন দুর্নীতি ঢুকে যায়, তখন সেটি কেবল আর্থিক নয়; মানুষের জীবন ও মৃত্যুর প্রশ্নে এসে দাঁড়ায়।
বাংলাদেশের মানুষ বহুদিন ধরে সুশাসন, স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতার অভাবে হতাশ। প্রতিটি নির্বাচন, প্রতিটি প্রশাসনিক পরিবর্তনে মানুষ আশা করে দুর্নীতি কমবে, কিন্তু বাস্তবে দেখা যায় দুর্নীতি আরও নতুন নতুন রূপে বিস্তার লাভ করছে। এই ঘটনার মাধ্যমে আবারও প্রমাণ হলো, ক্ষমতা ও পদলোভ মানুষের নৈতিকতাকে কীভাবে ধ্বংস করে দিতে পারে। যদি একজন চিকিৎসক, যিনি এক সময় হাজার হাজার রোগীর জীবনের জন্য লড়াই করেছেন, তিনিও পদলোভে গিয়ে এমন জালিয়াতির ফাঁদে পড়েন—তাহলে সাধারণ মানুষ আর কাকে বিশ্বাস করবে?
অবশেষে প্রশ্ন থেকে যায়—এই ঘটনার বিচার কি আদৌ হবে? নাকি বাংলাদেশে অন্য অনেক দুর্নীতির মামলার মতো এটি কেবল “অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা” পেয়ে ধীরে ধীরে ভুলে যাওয়া হবে? ন্যায়বিচারের জায়গায় যদি রাজনৈতিক প্রভাব কাজ করে, তাহলে প্রকৃত অপরাধীরা রক্ষা পাবে আর জনগণ আরও একবার আস্থার সংকটে পড়বে। সমাজের দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে আমাদের প্রত্যাশা—দুদক তাদের অনুসন্ধানকে পূর্ণাঙ্গ করবে, বিচার বিভাগ নিরপেক্ষ থাকবে, আর এই ঘটনার মাধ্যমে একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন হবে যাতে ভবিষ্যতে কেউ আর রাষ্ট্রীয় পদ কেনাবেচার মতো অপরাধে লিপ্ত হওয়ার সাহস না পায়।
এই ঘটনার ভেতরে একটি বার্তা লুকিয়ে আছে—সততা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা ছাড়া কোনো প্রতিষ্ঠানই টিকে থাকতে পারে না। রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ পদ অর্জনের লোভে যদি কোটি কোটি টাকা লেনদেন হয়, তাহলে সেই রাষ্ট্রের সাধারণ মানুষ কেবল অবিশ্বাস, হতাশা এবং বঞ্চনার শিকার হবে। এই ঘটনা আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে, দুর্নীতি শুধু ব্যক্তিকে কলুষিত করে না, বরং একটি গোটা সমাজকে নষ্ট করে দেয়।
আপনার মতামত জানানঃ