বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার ইতিমধ্যে প্রায় আট মাস অতিবাহিত করছে। এই সরকারের সফলতা নিয়ে যত সমালোচনাই থাকুক না কেন, গণ–অভ্যুত্থান ও বিপ্লব–পরবর্তী রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার মধ্যেই এই সরকারের মূল সাফল্য ছিল।
এদিক থেকে মূল্যায়ন করলে দেখা যাচ্ছে, সরকার ক্রমে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছে। আইনশৃঙ্খলার যে অবনতি হয়েছিল, আশানুরূপ না হলেও তার একটি ইতিবাচক পরিবর্তন কয়েক সপ্তাহ ধরে দেখা যাচ্ছে।
রমজানে দ্রব্যমূল্য এবং বিদ্যুতের সরবরাহের ক্ষেত্রে একধরনের শৃঙ্খলা সরকারের বিরুদ্ধে বিতর্ক দুর্বল করছে। এর ফলে সরকার কিছুটা সুবিধাজনক অবস্থায় চলে এসেছে এবং আগে যে বিতর্কটা ছিল যে ‘অগ্রাধিকার সংস্কারের পর দ্রুত নির্বাচন’ নাকি ‘পূর্ণাঙ্গ সংস্কার ও বিচারের পর নির্বাচন’, সেই বিতর্ক আরও তীব্র হচ্ছে। তা ছাড়া স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মোহাম্মদ ইউনূসের বক্তব্যের পর নির্বাচন প্রসঙ্গ আবার আলোচনায় এসেছে।
সংস্কারের ক্ষেত্রে বিএনপিসহ পুরোনো কিছু রাজনৈতিক দলের যে অবস্থান, তার সঙ্গে বৈষম্যবিরোধী শক্তি, এনসিপি, জামায়াতসহ ইসলামপন্থী দলগুলো, ঐকমত্য কমিশন এবং সরকারের মধ্যে মতপার্থক্য ধীরে ধীরে স্পষ্ট হচ্ছে।
এদিকে কেউ কেউ অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদ শেষে নির্বাচনের আগে একটি ট্রানজিশনাল সরকারের প্রস্তাব করছেন। এটা বিএনপির যে জাতীয় সরকারের ধারণা, তার সঙ্গে অনেকটা মিলে যায়। তবে বিএনপি জাতীয় সরকার প্রস্তাব করেছিল নির্বাচনের পর। দু–একজন আবার প্রধান উপদেষ্টাকে আগামী ৫ বছরের জন্য প্রধানমন্ত্রী হিসেবে চাচ্ছেন।
বৈষম্যবিরোধীদের নেতৃত্বে তারুণ্যনির্ভর একটি নতুন দল তৈরি হয়েছে। এখন তরুণ ভোটারদের নিয়ে বিএনপিকে আরও ভাবতে হবে। তা ছাড়া সেকেন্ড রিপাবলিকের ধারণা এবং ’৭১ ও ’২৪–কেন্দ্রিক বিতর্ক বিএনপির সঙ্গে অন্য রাজনৈতিক ও সামাজিক শক্তির একটি প্রতিদ্বন্দ্বিতা তৈরি করছে। ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের বিষয়টিও সামনে এসেছে। জামায়াত ও শিবিরের সঙ্গে বিএনপি ও ছাত্রদলের একধরণের রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা যেন ৫ আগস্টের পর থেকেই শুরু হয়েছে।
সব মিলিয়ে বিএনপির সামনে অনেক চ্যালেঞ্জ। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বিএনপি কতটা প্রস্তুত? ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে সংশ্লিষ্ট সব রাজনৈতিক দলের মধ্যে বিএনপি সবচেয়ে অভিজ্ঞ ও পুরোনো রাজনৈতিক দল; যার বিস্তৃতি বাংলাদেশের সামাজিক ও রাজনৈতিক জীবনের সব স্তরে রয়েছে। বিএনপির আন্দোলন সরকার পতনে সক্ষম না হলেও কর্তৃত্ববাদকে যতটা মাঠপর্যায়ে (প্রেসক্লাব, পেশাজীবীদের কনফারেন্স হল বা ভার্চ্যুয়াল জগৎ নয়) চ্যালেঞ্জ করা হয়েছে, বিশেষ করে ২০১৪ সালের নির্বাচনের পর সেটা অল্পবিস্তর পরিসরে, প্রকাশ্যে ও ধারাবাহিকভাবে বিএনপি করেছে।
বিএনপির পেশাজীবীরাই অধিকাংশ ক্ষেত্রে ২০১৪ সালের পর প্রকাশ্যে সরকারবিরোধী তর্ক ও বয়ান চালু রেখেছে। গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের প্রধানতম শক্তি হিসেবে গত ১৭ বছর বিএনপিই বিশেষভাবে কাজ করেছে, যা তার ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতারই অংশ ছিল। বিএনপির এই ঐতিহাসিক পরিপ্রেক্ষিতে তৈরি হয়েছে ’৭৫–পরবর্তী সময়ে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে গণতন্ত্র পুনঃপ্রবর্তন, খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে স্বৈরাচারী এরশাদবিরোধী আন্দোলন এবং শেখ হাসিনার ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে খালেদা জিয়ার অবর্ণনীয় কষ্টের মধ্যেও আপসহীন নেতৃত্ব এবং তারেক রহমানের নেতৃত্ব ও সাংগঠনিক দক্ষতার মধ্য দিয়ে।
বিএনপির বড় অর্জন হলো বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে নেতৃত্বের আসনে থাকার লোভ ত্যাগ করে সর্বশক্তি দিয়ে অংশগ্রহণ এবং ’২৪–এর সাফল্যের পর তরুণদের প্রতিপক্ষ মনে না করে বিএনপির হাইকমান্ড বিশেষ করে খালেদা জিয়া ও তারেক রহমান কর্তৃক তরুণদের প্রশংসা করা, তাঁদের পাশে থাকার অঙ্গীকার করা, অন্তর্বর্তী সরকারের ক্ষমতাকাঠামোতে কম ভাগ পেয়েও নিঃশর্ত সমর্থন অব্যাহত রাখা।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন পর্যন্ত বিএনপির এই অতীত অর্জন এবং অন্তর্বর্তী সরকারকে সমর্থন দিয়ে যাওয়ার মধ্যেই কি ক্ষমতায় যাওয়ার দীর্ঘ প্রতীক্ষায় একক সত্তা হিসেবে থাকা বিএনপির জন্য যথেষ্ট? ৫ আগস্ট–পরবর্তী আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি, অন্তর্বর্তী সরকারের বিভিন্ন পদক্ষেপ, বিচার, সংস্কার ও নির্বাচনকেন্দ্রিক যে বিতর্ক, তরুণদের নেতৃত্বে নতুন রাজনৈতিক দলের আবির্ভাব, ’২৪ ও ’৭১–কেন্দ্রিক বিতর্ক এবং নতুন বাংলাদেশ গড়ার যে প্রস্তাব সামনে এসেছে, সেই পরিপ্রেক্ষিতে বিএনপির জন্য কি নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে? এই অবস্থায় বিএনপি কী করতে পারে?
বিএনপির প্রথম কাজ হলো তার পেশাজীবী সংগঠনসহ সব পর্যায়ের সংগঠনকে পুনর্গঠন করা। এ ক্ষেত্রে প্রাধান্য দিতে হবে সেই নেতা-কর্মীদের; যাঁরা গত ১৭ বছর জেল, জরিমানা, গুম, খুন, মামলা-মোকদ্দমা সত্ত্বেও বিএনপি ত্যাগ করেননি বা বিএনপিকে বিভক্ত করেননি। তাঁরা যেন কোনো অভিমান করে নির্লিপ্ত না হয়ে যান, সেটা খেয়াল রাখা এবং ঐক্যবদ্ধ রাখা। আর যেসব বিএনপির সমর্থক আন্দোলনের ঝুঁকি নেননি; কিন্তু ৫ আগস্টের পর বিএনপির কর্মী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করছেন, তাঁদের অপেক্ষায় রাখা। কিন্তু যাঁরা হাইব্রিড বিএনপি, আওয়ামী লীগের সঙ্গে সখ্য ছিল এবং নিরপেক্ষতার ভান করে ফ্যসিবাদ থেকে সব সুবিধা নিয়েছেন, কিন্তু তাঁরা এখন বিএনপির নেতা–কর্মীদের সঙ্গে আত্মীয়তার সুযোগে অথবা উৎকোচ দিয়ে দলে অনুপ্রবেশের চেষ্টা করছেন, তাঁদের সযত্ন পরিহার করা।
সংগঠন ঠিক করার পাশাপাশি নির্বাচনের প্রস্তুতি নেওয়া শুরু করতে হবে। এ ক্ষেত্রে প্রথম কাজ হলো সমমনা রাজনৈতিক দলগুলোকে নিয়ে নির্বাচনের নির্ধারিত দিনক্ষণ বিষয়ে সরকারের সঙ্গে বোঝাপড়ায় যাওয়া। ৩০০ আসনে কমপক্ষে ১০ জনের একটা তালিকা তৈরি করা।
ভবিষ্যৎ নির্বাচনে যেন দেশি-বিদেশি কোনো চক্র, পতিত শক্তি অথবা রাজনৈতিক সুবিধাবাদী গোষ্ঠী বিএনপিকে কোনো প্রকার বেকায়দায় না ফেলতে পারে, সেদিকে লক্ষ্য রাখা। জনগণকে স্বপ্ন দেখাতে পারবে, এমন নির্বাচনী ইশতেহার তৈরি করা ও ইশতেহারে পরিমার্জিত ৩১ দফাকে সামনে নিয়ে আসা এবং ব্যাপক প্রচারণা শুরু করা। পাশাপাশি বেকারত্ব দূরীকরণে, পাচার করা টাকা উদ্ধার, শেয়ার মার্কেটের শৃঙ্খলা, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, জবাবদিহিমূলক সংসদ ইত্যাদি বিষয়ে সুনির্দিষ্ট নীতি নির্বাচনী ইশতেহারে অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন।
’২৪ ও ’৭১–কেন্দ্রিক যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, সে ক্ষেত্রে ভারসাম্যমূলক বয়ান তৈরি করতে হবে। তারেক রহমানের আহ্বানে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে বিএনপির নেতা–কর্মীদের অংশগ্রহণ ও নেতা-কর্মীর শাহাদাত বরণের ফলে এককভাবে ’২৪-ও বিএনপিরই বড় অর্জন। বিএনপি দুই অর্জনকেই প্রাধান্য দিয়ে বয়ান তৈরি করবে।
সংস্কারের ক্ষেত্রে ‘অগ্রাধিকার সংস্কার’কে প্রাধান্য দিয়ে কথা বলতে হবে। সংস্কারের অনেক কাজ বিএনপি ক্ষমতায় এলে করবে, সেইটা সামনে নিয়ে আসতে হবে।
যেহেতু বিএনপি বহুদলীয় রাজনীতির প্রবর্তক, সেহেতু ঐতিহাসিকভাবে বিএনপি প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে কোনো রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধের পক্ষে নীতিগতভাবে অবস্থান নিতে না চাইলেও আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধের ক্ষেত্রে তরুণদের বিরোধিতা না করে, বিশ্বাসযোগ্য বিচারিক প্রক্রিয়া বা রাজনৈতিক দলের ঐক্যমত বা গণভোটের মাধ্যমে নিষিদ্ধের বিষয়ে ফয়সালার বয়ান তৈরি করে তরুণদের পাশে রাখতে পারে। বিএনপিকে মনে রাখতে হবে, গত ১৫ বছর তার নেতা–কর্মীরাই আওয়ামী লীগ দ্বারা সবচেয়ে বেশি এবং নির্মম অত্যাচারের শিকার হয়েছে এবং জনগণের সহানুভূতি লাভের জন্য এটি প্রচারও করতে হবে।
নিঃসন্দেহ তারেক রহমানের ৩১ দফা একটি নতুনধারা তৈরি করেছে। তবে ৩১ দফাসহ গণমানুষের আবেগকে প্রভাবিত করবে, এমন আরও উদ্ভাবনী কর্মসূচির মাধ্যমে এবং বিএনপির নাম ব্যবহার করে যাঁরা চাঁদাবাজির সঙ্গে জড়িত, তাঁদের বিরুদ্ধে কঠিন ব্যবস্থা গ্রহণ করে বিএনপিই যে অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ মিলিয়ে সাধারণ মানুষের ভরসা, সেই বার্তা জনগণকে দিতে হবে।
প্রতিবেশী আঞ্চলিক শক্তি (ভারত), বিকাশমান বৈশ্বিক শক্তি (চীন) এবং বর্তমান বৈশ্বিক শক্তির (আমেরিকা) মধ্যে ভারসাম্যমূলক নীতি তৈরি করতে হবে। ব্যবসা–বাণিজ্যের ক্ষেত্রে ভারত–নির্ভরতা ও ’২৪–পরবর্তী তরুণদের ভারতবিরোধিতা উভয়কে আমলে নিয়ে কৌশলগত নীতি প্রণয়ন করতে হবে। চীন ও আমেরিকার প্রতিদ্বন্দ্বিতা গভীরভাবে বুঝে জাতীয় স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে নীতি-পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে।
২০১৪ সালে নির্বাচনের পর প্রথম আলোতে লিখে ছিলাম, ‘বিএনপি হেরে গেলে কী হবে’ (১৩ জানুয়ারি, ২০১৪)। গত এক দশকের রাজনীতিতে ও ৫ আগস্টের মাধ্যমে সেই লেখা অনেকটাই বাস্তব হয়েছে।
১৮ বছরের আঁধারকে আলোতে রূপান্তর করতে হলে বিএনপিকে নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় যেতে হবে। সেই ক্ষমতাকে টেকসইও করতে হবে। এর জন্য বিএনপির প্রয়োজন স্ব–স্ব ফিল্ডে দক্ষ এক দল বুদ্ধিজীবীর প্যানেল তৈরি করা, যাঁরা নীতিনির্ধারণী পরামর্শ দেবেন এবং প্রয়োজনীয় বয়ান তৈরি করবেন। নিঃসন্দেহে বিএনপি বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় দল। তার জনসমর্থনও বেশি।
যেহেতু বিএনপির প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক দলগুলো ব্যাপক গণসংযোগ এবং নতুন নতুন রাজনৈতিক এজেন্ডা ও কর্মসূচি দিয়ে ভোটারদের প্রভাবিত করতে চেষ্টা করছে, সেহেতু পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে বিএনপিকেও রাজনীতির নতুনধারা তৈরি করতে হবে।
নিঃসন্দেহ তারেক রহমানের ৩১ দফা একটি নতুনধারা তৈরি করেছে। তবে ৩১ দফাসহ গণমানুষের আবেগকে প্রভাবিত করবে, এমন আরও উদ্ভাবনী কর্মসূচির মাধ্যমে এবং বিএনপির নাম ব্যবহার করে যাঁরা চাঁদাবাজির সঙ্গে জড়িত, তাঁদের বিরুদ্ধে কঠিন ব্যবস্থা গ্রহণ করে বিএনপিই যে অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ মিলিয়ে সাধারণ মানুষের ভরসা, সেই বার্তা জনগণকে দিতে হবে। লিখেছেন, কাজী মোহাম্মাদ মাহবুবুর রহমান।
আপনার মতামত জানানঃ