Trial Run

দুর্নীতি আর অনিয়মের অভিযোগে ভূমি অফিসার আটক

কক্সবাজার উন্নয়ন প্রকল্পে

কক্সবাজার জেলায় চলমান উন্নয়ন প্রকল্পে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা অনিয়মের পাহাড় সমতু্ল্য ভূমি অধিগ্রহণ শাখার অপরাধ আর অনিয়ম অনুসন্ধানে কাজ করছে করছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। গত বছর মোহাম্মদ ওয়াসিম নামের ভূমি অধিগ্রহণ শাখার এক সার্ভেয়ারকে নগদ টাকাসহ আটক করে। তার থেকে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে এবার ভূমি অধিগ্রহণে দুর্নীতি-অনিয়মে জড়িত থাকার অভিযোগে কক্সবাজারের মহেশখালীর কালারমারছড়া ইউনিয়ন ভূমি অফিসের উপ-সহকারী কর্মকর্তা (তহসিলদার) মোহাম্মদ জয়নাল আবেদীনকে গ্রেফতার করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। আজ বৃহস্পতিবার (২১ জানুয়ারি) বেলা ১২ টায় চট্টগ্রাম জিইসি মোড় এলাকা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয় বলে জানিয়েছেন দুদক চট্টগ্রাম সমন্বিত জেলা কার্যালয়-২-এর উপ-সহকারী পরিচালক মো. শরীফ উদ্দিন।

দুদক সূত্র জানায়, তহসিলদার জয়নাল ইউনিয়ন ভূমি অফিসের একজন উপ-সহকারী কর্মকর্তা হলেও কালারমারছড়া ইউনিয়নে সরকারের চলমান উন্নয়ন প্রকল্পকে ঘিরে ভূমি অধিগ্রহণ কাজে একটি সিন্ডিকেট গঠন করে দুর্নীতি ও নানা অনিয়মের মাধ্যমে অবৈধভাবে শত কোটি টাকা আয় করেছে বলে অভিযোগ উঠে। কক্সবাজার ভূমি অধিগ্রহণ শাখায় দুর্নীতি ও নানা অনিয়মে জড়িত থাকার অভিযোগে গ্রেপ্তারকৃত দালালদের ১৬৪ ধারায় দেওয়া জবানবন্দিতেও জয়নালের নাম উঠে আসে। তার এসব দুর্নীতির তদন্ত করতে গিয়ে সত্যতাও পেয়েছে দুদক। এসব অভিযোগের ভিত্তিতে দুদকের একটি দল অভিযান চালিয়ে তাকে গ্রেপ্তার করে।

দুদক সূত্রে জানা গেছে, কক্সবাজার জেলায় চলমান উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রথম কাজ ভূমি অধিগ্রহণ করতে গিয়ে দালালদের সিন্ডিকেটটি তৈরি হয়েছে। এসব দালাল জমির মালিকদের নাম দিয়ে বিভিন্ন কৌশলে সরকারের কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। বিষয়টি নজরে আসার পর দুদক আনুষ্ঠানিকভাবে অনুসন্ধানে নামে।

দুদক জানায়, অনুসন্ধানের শুরুতেই দুদক ও র‌্যাব যৌথ অভিযান চালিয়ে গত ১৮ ফেব্রুয়ারি মোহাম্মদ ওয়াসিম নামের ভূমি অধিগ্রহণ শাখার এক সার্ভেয়ারকে কক্সবাজার শহরের বাহারছড়া ও তারাবনিয়ারছড়া এলাকা থেকে ৯৩ লাখ টাকাসহ আটক করে। সেখান থেকে ১৫ লাখ টাকার চেক ও ঘুষ গ্রহণের বিভিন্ন নথি জব্দ করা হয়। এর পরই জমি অধিগ্রহণে ক্ষতিগ্রস্ত মালিকদের প্রতি অমানবিক আচরণ ও আর্থিক হয়রানি প্রকাশ্যে আসে। তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে পরে ২২ জুলাই মো. সেলিম উল্লাহ, ৩ আগস্ট মোহাম্মদ কামরুদ্দিন ও সালাহ উদ্দিন নামের তিন দালালকে আটক করে দুদক। আটকের সময় এসব দালালের কাছ থেকে কয়েক কোটি টাকার নগদ চেক ও ভূমি অধিগ্রহণের গুরুত্বপূর্ণ মূল নথি উদ্ধার করা হয়। পরে আটককৃতদের ১৬৪ ধারায় দেওয়া জবানবন্দিতে প্রায় দেড়’শ দালালের নাম উঠে আসে। এসব দুর্নীতির তদন্ত করতে গিয়ে জয়নালের সম্পৃক্ততা পায় দুদক।

এছাড়া কক্সবাজার পৌরসভার সাবেক কাউন্সিলর জাবেদ মো. কায়সার নোবেলের কাছ থেকে ২০ কোটি ৮০ লাখ টাকা জব্দ করা হয়। তার মধ্যে ১৩ সেপ্টেম্বর কক্সবাজার জেলা ডাকঘরে অভিযান চালিয়ে নোবেলের নামে জমা থাকা ৮০ লাখ টাকা এবং ১ সেপ্টেম্বর বেসিক ব্যাংক, প্রাইম ব্যাংক, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক ও ট্রাস্ট ব্যাংক কক্সবাজার শাখায় ২০ কোটি টাকা জব্দ করা হয়।

সংশ্লিষ্টরা জানান, দেশের প্রায় প্রতিটা প্রকল্পই প্রকল্পের লোকজন কর্তৃক বিভিন্ন অনিয়ম আর দুর্নীতির কারণে ভেতর থেকে অসাড় হয়ে উঠেছে। সরকারি এসব প্রকল্প এভাবে প্রকল্পের লোকজন কর্তৃক দুর্নীতিতে যথাযথভাবে পূর্ণতা পাচ্ছে না। প্রতিটা প্রকল্পেই সময় বাড়ে, ব্যয় বাড়ে কিন্তু কাজের কাজ তেমন একটা এগোয় না। প্রকল্পের ভেতরে ওঁত পেতে থাকে এসব দুর্নীতিবাজ অফিসারদের কারণে দেশের প্রায় অধিকাংশ প্রকল্পই স্থবির হয়ে পড়েছে। একের পর এক সময় ও ব্যয় বাড়ানো হলেও পরিকল্পনা মত কাজ হচ্ছে না। ক’দিন আগেও চট্টগ্রামের কর্ণফুলীতে প্রশাসনের কমপ্লেক্স নির্মাণ প্রকল্পে ব্যাপক দুর্নীতি আর অনিয়মের অভিযোগে প্রকল্পের এসিল্যান্ডসহ সার্ভেয়ারকে দুদক তলব করে। দুদকের তদন্তে উঠে আসে, জানতে পারে, কর্ণফুলী উপজেলা কমপ্লেক্স করার জন্য প্রাথমিক পর্যায়ে অপেক্ষাকৃত কমমূল্যের জমি থাকায় শাহমীরপুর মৌজায় কমপ্লেক্স করার প্রস্তাব হয়। কিন্তু ওই প্রস্তাবের পর এসিল্যান্ড সুকান্ত সাহা’র প্রত্যক্ষ সহযোগীতায় সার্ভেয়ার সুনীলসহ কয়েকজনের যোগসাজশে স্থান পরিবর্তন করা হয়। স্থানীয় আবদুস ছালাম, তার ছেলে ওয়াসিম ও তার মেয়ের জামাই আইয়ুবের নামে আমমোক্তার ও খরিদকৃত স্থানে অধিগ্রহণের স্থান নির্ধারণ করা হয়।

এছাড়া অভিযোগ আছে, ওই এলাকার মিউটিশনের প্রতিটি মামলায় ২০ হাজার টাকা করে নিচ্ছে এসিল্যান্ড সুকান্ত সাহা। সাইফুল নামের চরলক্ষ্যা গ্রামের এক ব্যক্তি জানান, তার একটি খতিয়ান অনুমোদন পেতে দালাল চক্রটিকে দিতে হয়েছে ৬০ হাজার টাকা। এর মধ্যে ২০ হাজার টাকা এসিল্যান্ড সুকান্ত সাহাকে দিয়ে খতিয়ান অনুমোদন নেয়া হয়। তার দাবি অনুযায়ী টাকা না দিলে প্রতিপক্ষ সৃষ্টি করে আপত্তি দাখিল করান ওই এসিল্যন্ড।

সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, দেশে আইনের বেসামাল দশা আর আমলাতান্ত্রিক শাসনে দেশের প্রতিটা দপ্তর এভাবেই দুর্নীতিবাজদের কর্তৃক জর্জরিত। প্রকল্প রক্ষার্থে সরকারের উচিত এসব দুর্নীতিবাজদের চিহ্নিত করে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া। একইসাথে প্রকল্পে যথাযথ নজরদারিতে রেখে নির্ধারিত সময়ে সম্পন্ন করার জন্য আহ্বান জানান তারা।

এসডব্লিউ/এমএন/কেএইচ/১৮৩৭ 

ছড়িয়ে দিনঃ
  • 3
  •  
  •  
  • 0
  •  
  •  
  •  
    3
    Shares

আপনার মতামত জানানঃ