Trial Run

অবৈধ ইটভাটার অভয়ারণ্য বগুড়া!

দইয়ের জন্য বিখ্যাত বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের জেলা বগুড়া এখন অবৈধ ইটভাটার অভয়ারণ্য হয়ে উঠেছে। সংবাদকর্মীদের তদন্তে বেরিয়ে এসেছে, ওই জেলার প্রায় শতভাগ ইটভাটাই অবৈধ। নিয়ম নীতির তোয়াক্কা না করে ভাটা স্থাপনের পর কাঠ পুড়িয়ে ভাটা মালিকরা কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। শীতের এই সময়ে ইটভাটার কারণেই দেশে বায়ু দূষণ চরম আকারে বেড়ে যায়। সদ্যই বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা বিশ্বের সবচেয়ে অস্বাস্থ্যকর শহরের তকমা পেয়েছে বায়ুদূষণের কারণে। কিন্তু ইট প্রস্তুত ও ভাটা স্থাপন (নিয়ন্ত্রণ) আইন ভঙ্গ করে এসব ভাটা চললেও এগুলোর বিরুদ্ধে উল্লেখযোগ্য কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না পরিবেশ অধিদপ্তর এবং জেলা প্রশাসন।

পরিবেশ অধিদপ্তরের রাজশাহী বিভাগীয় বগুড়া কার্যালয়ের হিসাব অনুযায়ী, ওই জেলায় মোট ইটভাটা রয়েছে ২১৮টি। তবে পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র এবং জেলা প্রশাসকের কার্যালয় থেকে লাইসেন্সপ্রাপ্ত ইটভাটার সংখ্যা মাত্র ১৭টি। বাকি ২০১টি ইটভাটাই অবৈধ হিসেবে চিহ্নিত। অবৈধ কারণ, ইটভাটা স্থাপন করা যাবে না, এমন এলাকায় স্থাপিত এই ভাটাগুলো। পরিবেশ অধিদপ্তর বলছে হাইকোর্টে রিট থাকায় এগুলোর বিরুদ্ধে এতদিন ব্যবস্থা নেওয়া যায়নি। রায় পরিবেশ অধিদপ্তরের পক্ষে পাওয়ায় পর্যায়ক্রমে এগুলোর বিরুদ্ধে আইনী ব্যবস্থা নেয়া হবে।

সংশ্লিষ্টদের দাবিমতে, ২০১৯-২০ অর্থবছরে ২৫টি অবৈধ ইটভাটা উচ্ছেদ করা হয়েছে। এই ভাটাগুলো লাইসেন্স নিয়েই তাদের কার্যক্রম শুরু করেছিল। কিন্তু ২০১৩ সালের আইনের কারণে এগুলো অবৈধ হয়ে যায়। সে সময় তাদেরকে ২ বছর সময় দেওয়া হয়েছিল ভাটা উপযুক্ত স্থানে এবং পরিবেশ সম্মত আধুনিক পদ্ধতিতে স্থাপন করার জন্য। কিন্তু তারা আইন না মেনে নিজেদের মতো ভাটা পরিচালনা করে আসছেন।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বর্তমানে অবৈধ হিসেবে চিহ্নিত ভাটাগুলোর আর বৈধ হওয়ার সুযোগ নেই। কারণ, ইটভাটা থেকে দূষণ কমানোর লক্ষ্যে পুরাতন পদ্ধতির ইটভাটার পরিবর্তে জ্বালানী সাশ্রয়ী ও আধুনিক প্রযুক্তির পরিবেশ বান্ধব ইটভাটা স্থাপনের লক্ষ্যে ‘ইট প্রস্তুত ও ভাটা স্থাপন (নিয়ন্ত্রণ) আইন, ২০১৩ (সংশোধিত) ২০১৯’ প্রণয়ন করা হয়েছে। এ আইনে সনাতন প্রযুক্তির ১২০ ফুট চিমনি বিশিষ্ট ইটভাটায় ইট উৎপাদন নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

পরিবেশ অধিদপ্তর থেকে আরো জানানো হয়েছে, অবৈধ এসব ইটভাটার মধ্যে ২৫-৩০টি ভাটা সনাতন পদ্ধতিতে পরিচালিত। এই ইটভাটার কালো ধোয়া ১২০ ফুট উচ্চতা সম্পন্ন চিমনির মাধ্যমে নির্গত হচ্ছে। এছাড়া বাকিগুলো জিগজ্যাগ পদ্ধতিতে পরিচালিত। জিগজ্যাগ পদ্ধতিতে ইট প্রস্তুত করলে চিমনির উচ্চতা ৬০ ফুট হলেও কোন সমস্যা নেই। সেটি পরিবেশের ক্ষতি করে না। কারণ ধোয়া পরিশোধন হয়ে ক্ষতিকারক পদার্থ কার্বন ধোয়া থেকে আলাদা হয়ে যায়।

বগুড়া জেলার অবৈধ ইটভাটাগুলোর মধ্যে রয়েছে- বগুড়া সদরে ১২টি, শাজাহানপুরে ৩২টি, সোনাতলায় ৪টি, আদমদীঘিতে ৮টি, কাহালুতে ১০টি, দুপচাঁচিয়ায় ৮টি, ধুনটে ১৯টি, গাবতলীতে ৩৭টি, শিবগঞ্জে ৩১টি এবং শেরপুরে ২৬টি। তবে পরিবেশ অধিদপ্তরের তালিকাভুক্ত ২০১টি ইটভাটার বাইরেও জেলায় আরো অসংখ্য ইটভাটা রয়েছে বলে দাবি করেছেন স্থানীয় পরিবেশবাদীরা।

সংবাদকর্মীরা সরেজমিনে শাজাহানপুর, গাবতলী এবং সারিয়াকান্দি উপজেলার ইটভাটাগুলোয় গিয়ে দেখা গেছে, প্রতিটি ইটভাটাই ফসলি জমির মাঝখানে স্থাপন করা। প্রতিটি ইটভাটার ১ কিলোমিটার এলাকার মাঝে জনবসতি রয়েছে। এছাড়া অধিকাংশ ইটভাটার ১ কিলোমিটারের মাঝে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান রয়েছে।

শাজাহানপুর উপজেলার খোট্টাপাড়ায় স্থাপিত এআরএন ব্রিকস ফিল্ড এর প্রোপ্রাইটর নজরুল ইসলাম জানান, ৫ বছর আগে তারা ভাটা চালু করেছেন। কিন্তু ২০১৭ সালের পর আর নবায়ন করে দেয়নি। মেসার্স এআরএস ব্রিকস এর স্বত্ত্বাধিকারী জিয়াউর রহমান জানান, জিগজ্যাগ পদ্ধতিতে তার ইটভাটা পরিচালিত। পরিবেশ থেকে ছাড়পত্র না দেওয়ায় ইটভাটা মালিক সমিতির মাধ্যমে তারা পরিবেশ অধিদপ্তর এবং জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সাথে যোগাযোগ করছেন পুনরায় ভাটার বৈধতার জন্য।

বগুড়া জেলা ইটভাটা মালিক সমিতির সভাপতি আবুল কালাম আজাদ বলেন, নীতিমালা অনুযায়ী বাংলাদেশের যে প্রেক্ষাপট, এই প্রেক্ষাপটে কোনো ইটভাটার লাইসেন্স পাওয়া যাবে না। কারণ, ভাটার আশপাশে কোনো আবাদী জমি ঘরবাড়ি স্কুল-কলেজ থাকা যাবে না, পঞ্চাশটির বেশি গাছ থাকা যাবে না। এরকম জায়গা তো বাংলাদেশে খুঁজে পাওয়া যাবে না। যদি না পাওয়া যায় তাহলে যে ১৭টির লাইসেন্স দেওয়া হয়েছে আমি বলব সেগুলো ঘুষ খেয়ে লাইসেন্স দিয়েছে। আর বাকি যে ২০১টি অবৈধ ভাটার কথা বলছেন সেগুলো পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিচালককে বলে ভেঙে দিতে বলুন। সরকার যদি এগুলো ভেঙে দিতে চায়, দিক।

বগুড়া জেলা প্রশাসক (ভারপ্রাপ্ত) আব্দুল মালেক বলেন, পরিবেশ অধিদপ্তর থেকে ছাড়পত্র দেওয়ার পর জেলা প্রশাসকের কার্যালয় থেকে অনাপত্তিপত্র দেওয়া হয়। যে সকল ইটভাটা অবৈধ, যাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে আইনি জটিলতা নেই তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে এ জন্য পরিবেশ অধিদপ্তরকেই আগে এগিয়ে আসতে হবে। আমরা তাদেরকে সহযোগিতা করব।

এসডাব্লিউ/আরবি/আরা/০৮৫৫

ছড়িয়ে দিনঃ
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

আপনার মতামত জানানঃ