
আবারও কানাডার একটি বোর্ডিং স্কুলে ১৮২টি কবরের সন্ধান পাওয়া গেছে। দেশটির ব্রিটিশ কলম্বিয়ার ক্র্যানব্রুক এলাকার কাছাকাছি সেন্ট ইউজিনস মিশন স্কুলে কবরগুলোর সন্ধান মিলেছে। বহু বছর আগে বন্ধ হয়ে যাওয়া স্কুলটির প্রাঙ্গণে ওই কবরগুলো খুঁজে পেয়েছেন অনুসন্ধানকারীরা। খবর বিবিসি, আল জাজিরা
কানাডার একটি আদিবাসী গোষ্ঠী দাবি করছে, ব্রিটিশ কলাম্বিয়া প্রদেশের একটি সাবেক আবাসিক বিদ্যালয়ের কাছে ১৮২টি অচিহ্নিত কবর পাওয়া গেছে। এবারের কবরগুলো পাওয়া গেছে ক্যানব্রুকের সেন্ট ইউজিনস মিশন স্কুলের কাছে। এসব কবরে সাত থেকে ১৫ বছর বয়সী আদিবাসী শিশুদের দেহাবশেষ রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
অঞ্চলটির স্থানীয় আদিবাসীদের সংগঠন লোয়ার কুটিনি ব্যান্ড জানিয়েছে, ‘গ্রাউন্ড-পেনিট্রেটিং রাডার’ ব্যবহার করে কবরগুলোর অবস্থান খুঁজে পাওয়া গেছে। একেকটি কবরের গভীরতা তিন থেকে চার ফুট পর্যন্ত।
ইন্ডিয়ান রেসিডেন্সিয়াল স্কুল হিস্ট্রি অ্যান্ড ডায়ালগ সেন্টারের তথ্যমতে, স্কুলটি ১৮৯০ থেকে ১৯৭০ সাল পর্যন্ত চালু ছিল। এটি ক্যাথলিক চার্চের অধীনে পরিচালিত হতো। সেখানে আদিবাসী শিশুদের রেখে আধুনিক কানাডীয় সমাজের সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর মতো শিক্ষা দেয়ার কথা বলা হয়েছিল।
১৮ থেকে ১৯ শতকে এ ধরনের অন্তত ১৩৯টি বোর্ডিং স্কুল চালু করেছিল কানাডা সরকার। ধারণা করা হয়, ওইসব আবাসিক স্কুলে ছয় হাজারের বেশি শিক্ষার্থীর মৃত্যু হয়েছিল। এর জন্য সেখানকার অস্বাস্থ্যকর পরিবেশকে দায়ী করা হয়। এছাড়া, শারীরিক ও যৌন নির্যাতনের কারণে অনেক শিক্ষার্থীই পালিয়ে গিয়েছিল।
পরে ব্যাপক সমালোচনার মুখে স্কুলগুলো বন্ধ করে দেয়া হয়। গত বছর এ ধরনের স্কুলগুলোতে কবর অনুসন্ধানের কাজ শুরু হয়।
আঠারো-উনিশ শতকে কানাডা সরকার ও রোমান ক্যাথলিক চার্চের যোগসাজশে আদিবাসীদের সঙ্গে হওয়া বর্বর আচরণের অধ্যায় ক্রমেই উন্মোচিত হচ্ছে। আদিবাসী সন্তানদের আধুনিক সমাজে খাপ খাওয়ানোর নামে জোরপূর্বক আবাসিক স্কুলে রাখার যে উদ্যোগ নিয়েছিল তৎকালীন সরকার, তার ফলাফল হয়েছিল ভয়াবহ। স্কুলগুলোতে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ আর নির্মম নির্যাতনের শিকার হয়ে মারা যায় কয়েক হাজার শিশু। পরে স্কুলগুলো বন্ধ করে দেয়া হলেও কৌশলে চাপা পড়ে যায় আদিবাসী শিশুমৃত্যুর বিষয়টি। তবে সম্প্রতি ওই ধরনের বেশ কয়েকটি স্কুলে কয়েকশ’ কবরের সন্ধান পাওয়ার পর এ নিয়ে তীব্র সমালোচনা শুরু হয়েছে।
গত মাসে ব্রিটিশ কলম্বিয়ার কামলুপস ইন্ডিয়ান রেসিডেন্সিয়াল স্কুলে ২১৫টি কবরের সন্ধান পাওয়া যায়। গত সপ্তাহে সাসকাচেওয়ানে ম্যারিভাল স্কুলে পাওয়া যায় ৭৫১টি কবর। এগুলোর কোনোটিতেই কবরের নাম-নিশানা ছিল না, অর্থাৎ কোনো একসময় সেগুলো নিশ্চিহ্ন করে দেয়ার চেষ্টা হয়েছিল বলে ধারণা করা হয়।
এসব আবিষ্কারের পরিপ্রেক্ষিতে কানাডা সরকার ও ক্যাথলিক চার্চের ওপর দায় স্বীকারের জন্য চাপ বাড়ছে। আদিবাসী নেতারা পোপ ফ্র্যান্সিসকে ক্ষমা চাওয়া এবং স্কুলগুলো সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশের দাবি জানিয়েছেন। এছাড়া স্কুলে শিশুমৃত্যুর ঘটনায় দোষীদের শাস্তি দিতে যথাযথ আইনি ব্যবস্থা নেয়ারও দাবি জানিয়েছেন তারা।
অটোয়ায় বুধবার এক সংবাদ সম্মেলনে কানাডার প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডো বলেন, ‘একের পর এক কবর আবিষ্কারের এই ভয়াবহতা কানাডার নাগরিকদের বারবার অতীতে, এমনকি এখনও আদিবাসীদের ওপর চলমান অন্যায় মনে করিয়ে দিচ্ছে।’
স্থানীয় সময় বুধবার ভোরে অ্যালবার্টা ও নোভা স্কটিয়া প্রদেশের দুটি গির্জায় অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে। এ নিয়ে গত দুই সপ্তাহে মোট ছয়টি গির্জায় আগুন লেগেছে। বাকি চারটি গির্জা ব্রিটিশ কলাম্বিয়ার।
কবর আবিষ্কারের পর থেকে দেশজুড়ে গির্জায় ভাঙচুর আর অগ্নিসংযোগ শুরু হওয়ার নিন্দা জানান ট্রুডো। সবার প্রতি আহ্বান জানান ঐক্য গড়ার প্রচেষ্টায় অংশ নেয়ার।
আদিবাসী-অধ্যুষিত দুটি প্রদেশে হাজারো অচিহ্নিত পুরোনো কবর শনাক্তের সময়ে বিভিন্ন ক্যাথলিক চার্চে আগুন ধরানোর ঘটনায় যোগসূত্র খুঁজছে পুলিশ। কোনো ঘটনাতেই এখন পর্যন্ত কোনো গ্রেপ্তার বা অভিযোগ গঠন করা হয়নি।
এ বিষয়ে ট্রুডো বলেন, ‘ধর্মীয় উপাসনালয়ে ধ্বংসযজ্ঞ চালানো কোনো অবস্থাতেই গ্রহণযোগ্য নয়। এগুলো বন্ধ করতেই হবে। অতীতের অন্যায়গুলোর পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে নতুন করে অন্যায় নয়, বরং সবাইকে একজোট হয়ে কাজ করতে হবে।’
কানাডার ট্রুথ অ্যান্ড রিকন্সিলিয়েশন কমিশন ২০১৫ সালে ‘সাংস্কৃতিক জেনোসাইড’বিষয়ক একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। সেখানে আদিবাসীদের নির্মূল প্রচেষ্টার অংশ এই জেনোসাইডের কেন্দ্র হিসেবে আবাসিক শিক্ষা ব্যবস্থার কথা উল্লেখ করা হয়।
সাসকাচোয়ান প্রদেশের ৭৪টি আদিবাসী গোষ্ঠীর জোট ফেডারেশন অফ সভরেইন ইনডিজেনাস নেশন্স (এফএসআইএন) জানিয়েছে, সাবেক শিক্ষার্থীদের ক্ষতিপূরণ প্রদানে ক্যাথলিক চার্চের আড়াই কোটি কানাডিয়ান ডলার দেয়ার কথা থাকলেও এখনও সে আশ্বাস পূরণ করা হয়নি।
বিবৃতিতে এফএসআইএন বলেছে, ক্যাথেড্রাল নির্মাণে কোটি কোটি ডলারের তহবিল সংগ্রহ করে ক্যাথলিক চার্চ। বিপরীতে আদিবাসীদের ওপর নির্মমতার ক্ষতিপূরণ ৩৫ হাজার কানাডিয়ান ডলার। অর্থাৎ জনপ্রতি ক্ষতিপূরণ মাত্র শূন্য দশমিক ৩০ ডলার।
বিষয়টি লজ্জাজনক বলে ক্যাথলিক চার্চের প্রতি ক্ষোভ জানিয়েছে সংগঠনটি।
এসডব্লিউ/এমএন/কেএইচ/১৯৩২
আপনার মতামত জানানঃ