Trial Run

সৈন্য প্রত্যাহারের পর আফগানিস্তানের ক্ষমতা কি দখল করতে পারবে তালিবান?  

ছবি: সংগৃহীত

আগামী ১১ সেপ্টেম্বরের মধ্যে আফগানিস্তান থেকে সকল বিদেশি সৈন্য প্রত্যাহারের কথা রয়েছে। বিদেশি সেনারা চলে যাবার পর তালিবান যোদ্ধারা আফগানিস্তানের ক্ষমতা দখল করবেন বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন পর্যবেক্ষকরা। প্রায় প্রতিটি প্রদেশের রাজধানীতে তালিবান আক্রমণ চালাচ্ছে। তারা চেক পয়েন্ট, পুলিশ ফাঁড়িতেও  আক্রমণ করছে। 

আফগানিস্তানের ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের মুখপাত্র রহমতুল্লাহ আন্দার জানিয়েছেন, বিদেশি সেনা প্রত্যাহার শুরু হওয়ার পর থেকে তালিবান এক হাজার ৪৫৫টি আক্রমণ করেছে। 

গত এপ্রিলে জাতিসংঘ জানিয়েছিল, এই বছর জানুয়ারি থেকে মার্চের মধ্যে সেনা ও তালিবানের মধ্যে সংঘর্ষে এক হাজার ৮০০ সাধারণ মানুষ মারা গেছেন বা গুরুতর আহত হয়েছেন। গত কয়েক সপ্তাহে কয়েক লাখ মানুষ ঘর ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন। আইএস সশস্ত্র বাহিনীও আফগানিস্তানে সক্রিয় হয়ে উঠছে।

গত এক সপ্তাহে প্রায় ২২৫ জন নিহত

গত ২৪ ঘন্টায় আফগানিস্তানে তালিবান যোদ্ধা এবং সরকারি বাহিনীর মধ্যে ব্যাপক সংঘর্ষে অন্তত ১০০ জন তালিবান যোদ্ধা এবং ৮০ জন আফগান সেনা সদস্য নিহত হয়েছেন। এই সংঘর্ষের পর উত্তর আফগানিস্তানের বাদাখশান রাজ্যের অরঘানচখাও জেলা থেকে সরকারি বাহিনী পিছু হটেছে। নিরাপত্তা বাহিনীর বরাতে আফগানিস্তানের স্থানীয় গণমাধ্যম ‘তোলো নিউজ’ এই তথ্য জানিয়েছে।

আফগানিস্তানের দক্ষিণের উরুজগানের প্রাদেশিক কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, তালিবান যোদ্ধারা চরচেনো জেলার উপকণ্ঠে পৌঁছে গেছে। নিরাপত্তা বাহিনীকে তারা জেলা কেন্দ্র ছেড়ে চলে যেতে আহ্বান জানিয়েছে।  

সূত্র মতে, বাগলান প্রদেশে আফগানিস্তানের সেনাবাহিনীর ফাঁড়ির কাছে একটি গাড়ি বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। এই ঘটনায় নিরাপত্তা বাহিনীর ১০জন সদস্য নিহত হয়েছে এবং আহত হয়েছে আরও ১০জন। গত ২৪ ঘন্টায় আফগানিস্তানের অন্তত ৭০ জেলায় তালিবান এবং সরকারি বাহিনীর মধ্যে তীব্র সংঘর্ষ হয়েছে।

বাদাখশানের স্থানীয় কর্মকর্তারা বলেছেন, প্রদেশের ১২টি জেলায় বিবাদমান দুই পক্ষের মধ্যে ব্যাপক সংঘর্ষ শুরু হয়েছে। সংসদ সদস্য জাবিনুল্লাহ আতিক বলেছেন, বাদাখশানের ১৩টি জেলা মারাত্মক হুমকির মধ্যে আছে। এছাড়া, বাদগিস প্রদেশের আবকামারি জেলায় আফগান বাহিনীর প্রায় ১০০ সদস্য তালিবানের কাছে আত্মসমর্পন করেছে বলে জানা যায়।

গত ৮ জুন আফগানিস্তানের উত্তরাঞ্চলে যুক্তরাজ্যভিত্তিক হ্যালো ট্রাস্ট মাইন–ক্লিয়ারিং অর্গানাইজেশনের ১০ কর্মীকে হত্যা করে মুখোশপরা বন্দুকধারীরা। প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, গত মঙ্গলবার রাতে রাজধানী কাবুল থেকে প্রায় ২৬০ কিলোমিটার উত্তরে বাঘলান প্রদেশে অজ্ঞাতপরিচয় বন্দুকধারীরা হামলা চালায়। এই হামলায় তাদের ১০ কর্মী নিহত ও ১৬ জন আহত হয়েছেন।

এ হামলার ঘটনায় তালিবান যোদ্ধাদের দায়ী করেছে আফগান সরকার। গত বুধবার দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র তারেক আরিয়ান সাংবাদিকদের বলেন, তালিবান যোদ্ধারা প্রতিষ্ঠানটির কম্পাউন্ডে প্রবেশ করে এলোপাতাড়ি গুলি ছোড়েন। এতে নিহত হন মাইন অপসারণের কাজে নিয়োজিত প্রতিষ্ঠানটির অন্তত ১০ কর্মী।

তালিবানের মুখপাত্র জাবিহউল্লাহ মুজাহিদ ব্রিটিশ মাইন অপসারণ প্রতিষ্ঠানে হামলা চালিয়ে ১০ জনকে হত্যার অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, এ হামলার ঘটনায় তালিবান জড়িত নয়।

এর আগে আফগানিস্তানের উত্তরাঞ্চলীয় প্রদেশ বাদগিসে গত শনিবার (৫ জুন) বোমা হামলায় কমপক্ষে ১১ জন নিহত হয়েছেন। নিহতদের সবাই বেসামরিক নাগরিক। রাস্তার পাশে পুঁতে রাখা একটি ল্যান্ড মাইন বিস্ফোরিত হলে মাইক্রোবাসে থাকা যাত্রীরা নিহত হয়। এই হামলা ও নিহতের ঘটনার পেছনে সশস্ত্র তালিবান গোষ্ঠীর হাত থাকতে পারে বলে ধারণা করছেন দেশটির কর্মকর্তারা।

প্রদেশটির গভর্নর হুসাম উদ্দিন শামস জানান, শনিবারের এই হামলায় ১১ জন নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে তিনজন শিশু রয়েছে। চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে আফগানিস্তানে দেশটির সরকারি বাহিনী এবং তালিবানের মধ্যে সংঘর্ষে প্রায় এক হাজার ৮০০ বেসামরিক নাগরিক হতাহত হয়েছেন। যদিও উভয়পক্ষের মধ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।

গত বৃহস্পতিবারও (৩ জুন) রাজধানী কাবুলে বোমা হামলায় চার জন নিহত হন। হামলায় আহত হন আরও চার জন। কাবুলের একটি মিনিবাসে হামলায় হতাহতের এই ঘটনা ঘটে বলে আফগান পুলিশের বরাত দিয়ে সেসময় জানায় বার্তাসংস্থা এএফপি।

আফগানিস্তানের এক পঞ্চমাংশ তালিবানদের দখলে 

এই ধর্মীয় মৌলবাদী দলটা ১৯৯৬ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত আফগানিস্তান শাসন করেছে। ২০০১ সালে নর্দার্ন অ্যালায়েন্স এবং ন্যাটো দেশগুলো কর্তৃক পরিচালিত এক যৌথ অভিযানের মাধ্যমে সেদেশে তালিবান শাসনের অবসান ঘটানো হয়, তালিবান নেতারা অনেকেই বন্দী হন, বাকিরা পালিয়ে যান। তখন থেকে তারা মার্কিনীদের সাহায্য নিয়ে ক্ষমতায় থাকা কাবুল সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে আসছে। 

বিশেষজ্ঞদের মতে, ২০০১ সালের তুলনায় তালিবানরা এখন অনেক বেশি শক্তিশালী। তাদের এখন আছে ৮৫ হাজার সেনা। তারা দেশেটির এক পঞ্চমাংশ নিয়ন্ত্রণ করছে এবং আরও অঞ্চল দখলে প্রতিনিয়ত আক্রমণ চালিয়ে যাচ্ছে (সূত্র: কাউন্সিল অন ফরেইন রিলেশন)।

সাঁড়াশি আক্রমণ চালিয়ে গত সপ্তাহের শেষের দিকে আফগানিস্তানের আরও তিনটি জেলা দখলে নিয়েছে দেশটির সশস্ত্র গোষ্ঠী তালিবান। তালিবানের এই আক্রমণে আফগানিস্তানের বহু সংখ্যক সেনা ও সাধারণ মানুষ নিহত হয়েছে।

জার্মান সংবাদমাধ্যম ডয়চে ভেলে জানিয়েছে, নর্দার্ন প্রভিন্সের কেসর জেলা কার্যত তালিবানের অধিকারে চলে গেছে। এখানে শহরের কেন্দ্রে পুলিশ সদরদফতরে প্রথমে একটি গাড়ি বোমা বিস্ফোরণ হয়। তাতে ২০ জন নিরাপত্তা কর্মী মারা গেছেন। তারপর তালিবান আক্রমণ চালিয়ে পুলিশের সদরদফতর দখল করে নিয়েছে। স্থানীয় পৌরসভা ভবনও তাদের দখলে।

শহরের কেন্দ্রস্থলে তাদের সঙ্গে আফগানিস্তানের সরকারি সেনার প্রবল যুদ্ধ চলছে। শহরের অধিকাংশ এলাকাই মূলত চলে গেছে তালিবানের দখলে। প্রাদেশিক গভর্নর আব্দুল বাকি হাশিমি জানিয়েছেন, তালিবানের হামলায় ১০ জন সেনা নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন ১৮ জন। এছাড়া আরও ২০ জনকে আটক করেছে যোদ্ধারা।

আফগানিস্তানের পূর্ব নূরস্তানের দো আব জেলা রাতারাতি দখল করে নিয়েছে গোষ্ঠীটি। আগের দিন গত শুক্রবার দক্ষিণ জাবুলের শিংকাই, সংলগ্ন গজনির দেহ ইয়াক এবং পার্শ্ববর্তী দাইকুন্দি প্রদেশের গিজাব জেলারও নিয়ন্ত্রণ নেয় তারা।

নূরস্তান প্রদেশের আইনপ্রণেতা ইসমাইল আতিকান বলেন, দো আব জেলায় এক মাস ধরে আফগান নিরাপত্তা বাহিনীকে অবরোধ করে রেখেছিল তালিবানরা। সেখানে ৩০০-এর অধিক সেনা তালিবানদের কাছে নিজেদের অস্ত্র জমা দিয়েছে এবং চুক্তির অংশ হিসেবে অঞ্চলটি থেকে সরে গিয়েছে।

কাবুলের পূর্বদিকে দো আব জেলা থেকে সেনাবাহিনী চলে গেছে বলে জানিয়েছেন কাউন্সিলর সাইদুল্লাহ নুরিস্তানি। জেলাটি এখন তালিবানের দখলে। আফগান সেনাবাহিনী চলে যাওয়ার আগে এই জেলার খাবার ও অস্ত্র সরবরাহের সব রাস্তা বন্ধ করে দিয়েছিল তালিবান।

ফলে অতিরিক্ত সেনাও সেখানে যেতে পারেনি। এমনকি অস্ত্র বা খাবারও ঢুকতে দেয়নি তারা। এই অবস্থায় আদিবাসী নেতাদের মধ্যস্থতায় সব সেনাকে জেলা ছেড়ে বেরিয়ে যাওয়ার প্রস্তাবে সম্মতি দেয় তালিবান।

পার্লামেন্ট সদস্য ইসমাইল আতিকান জানিয়েছেন, তালিবানের অবরোধের পর জেলা ছেড়ে চলে যাওয়া ছাড়া সেনা সদস্যদের আর কোনো বিকল্প ছিল না। গত সপ্তাহের শেষ নাগাদ সব মিলিয়ে নতুন করে মোট তিনটি জেলা তালিবানের দখলে গেছে।

তালিবানরা এখন নওরাগম অঞ্চলের দিকে এগিয়ে চলছে। যেটি নূরস্থানকে পাঞ্জশির প্রদেশের সঙ্গে যুক্ত করার একটি কৌশলগত জেলা। এটিকে দীর্ঘদিন ধরে একটি অদম্য এবং শক্তিশালী অঞ্চল হিসেবে দেখা হচ্ছে। কারণ, পূর্বে সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং তালিবান সৈন্যরাও এটি দখল করতে ব্যর্থ হয়েছিল, যোগ করেন তিনি।

দক্ষিণ আফগানিস্তানের জাবুল প্রদেশের একজন সংসদ সদস্য তালিবানদের কাছে এই অঞ্চলটির ক্ষয়ক্ষতির জন্য দুঃখ প্রকাশ করেছেন। বলেন, তারা জাবুলের অপর জেলা শাহজয়েতে একটি মূল সেনা ঘাঁটি কোনো রকম প্রতিরোধ ছাড়াই দখল করে নিয়েছে। সৈন্যরা অঞ্চলটি ত্যাগ করে এবং তালিবানরা সরকারের ওপর চাপ বাড়ায়।

এসডব্লিউ/এমএন/এসএস/১৩৫৮ 


State watch সকল পাঠকদের জন্য উন্মুক্ত সংবাদ মাধ্যম, যেটি পাঠকদের অর্থায়নে পরিচালিত হয়। যে কোন পরিমাণের সহযোগিতা, সেটি ছোট বা বড় হোক, আপনাদের প্রতিটি সহযোগিতা আমাদের নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে ভবিষ্যতে বড় অবদান রাখতে পারে। তাই State watch-কে সহযোগিতার অনুরোধ জানাচ্ছি। 

ছড়িয়ে দিনঃ
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

আপনার মতামত জানানঃ