Trial Run

সেবার নামে প্রতিনিয়ত গ্রাহকদের অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছে বিকাশ 

ছবি: সংগৃহীত

জনপ্রিয়তার তুঙ্গে বিকাশ। বিতর্কিত হলেও প্রতিনিয়ত বাড়ছে গ্রাহক, বাড়ছে লেনদেন। প্রবাসীরাও এই সেবা গ্রহণ করছে নিয়মিত। 

মহামারী শুরু হওয়ার পর মোবাইল ব্যাংকিংয়ের ওপর মানুষের নির্ভরতা বেড়েছে আরও। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে বাংলাদেশে মোবাইলে ফোনে আর্থিক সেবার (এমএফএস) মাধ্যমে প্রতিদিন ১ হাজার থেকে ১ হাজার ২০০ কোটি টাকা লেনদেন হয়। যার ৮০ শতাংশই হয় দেশের সবচেয়ে বড় এমএফএস কোম্পানি বিকাশের মাধ্যমে।

২০১২ সালে বিকাশ এ সেবা চালু করার পর দেশে এখন নগদ, রকেট, ইউক্যাশ, এমক্যাশ, শিওরক্যাশসহ ১৫টির মত কোম্পানি এমএফএস সেবা দিচ্ছে। এর মধ্যে ডাক বিভাগের সেবা ‘নগদ’ এক বছরের কিছু বেশি সময়ে দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম এমএফএস-এ পরিণত হয়েছে।

ক্যাশ আউটে অতিরিক্ত চার্জ

সাধারণ ব্যাংকিং-এ ৫ হাজার টাকা পাঠাতে যেখানে ২০ টাকা চার্জ। সেখানে বিকাশে ব্যয় হয় ৫ গুণ, প্রায় একশ টাকা।

এজেন্ট এবং সেবা দেবার ক্ষেত্রে এগিয়ে ব্র্যাক ব্যাংকের মোবাইল ব্যাংকিং সেবা বিকাশ। তবে, এই প্রতিষ্ঠান অর্থ প্রেরণ এবং উত্তোলনে নিচ্ছে সবচেয়ে বেশি অর্থ।

শুরুর দিকে টাকা পাঠাতে হাজারে ১২ টাকা কমিশন পেতেন বিকাশ এজেন্ট। পরে এই হার বেড়ে হয় হাজারে ১৫ টাকা। আর এখনকার কমিশন হার হাজারে ১৭ টাকা ৫০ পয়সা।

একজন গ্রাহক তার নিজ অ্যাকাউন্ট থেকে মাসে (মাসে ২৫ বারের বেশি ক্যাশ-আউটের সুযোগ নেই) সর্বোচ্চ ২ লাখ টাকা ক্যাশ-আউট করতে পারলেও এ জন্য তাকে খরচ গুণতে হয় ৩ হাজার ৫ শ’ টাকা। 

দৈনিক সর্বোচ্চ ক্যাশ-আউটের পরিমাণ ৩০ হাজার টাকা (দিনে ৫ বার ক্যাশ-আউটের বেশি নয়)। এতে চার্জ ৫২৫ টাকা। যা নিতান্তই ব্যয়বহুল। সব মিলিয়ে বিকাশ ব্যবহারকারীদের এখন রীতিমতো নাভিশ্বাস উঠছে।

মোবাইল ব্যাংকিং সেবায় সবচেয়ে বেশি টাকা নে’য়া প্রতিষ্ঠানটির কমিউনিকেশন বিভাগের প্রধান শামসুদ্দিন হায়দার বলেন, ‘এটা প্রযুক্তিনির্ভর সেবা। সেবার পরিসর বড় হওয়ায় লোকবল বেশি। ফলে খরচটাও বেশি। ব্যবসা টিকিয়ে রাখার জন্য, মান ধরে রাখতে সেবার বিনিময়ে গ্রাহকের কাছ থেকে অর্থ নেয়া হয়। এখান থেকে খুব বেশি লাভ থাকে না। কারণ, অর্থের বড় অংশই ডিলার, এজেন্ট, নেটওয়ার্ক সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে ভাগ করে দিতে হয়। প্রত্যন্ত অঞ্চলে সেবা দিতে খরচ বেশি পড়ে যায়।’

সেন্ড মানিতে চার্জ

সমাজের নিম্ন শ্রেণির মানুষ সাধারণত তাদের আয়ের সিংহভাগই টাকা লেনদেন করে বিকাশের মাধ্যমে। কারণ তারা কেউ রিক্সা চালায়, দিনমজুরি করে অথবা গার্মেন্টস এ কাজ করে। তাদের উর্পাজন করা টাকায় গ্রামে সংসার চলে বেশিরভাগের। 

বাংলাদেশ ব্যাংক সেন্ড মানিতে টাকা কাটা যাবে না বলে জানানোর পর নগদ তা মানলেও, মানেনি বিকাশ। বিকাশের সেন্ড মানির টাকা ক্যাশ-আউট করলে চার্জ কেটে রাখা হয় প্রেরকের কাছ থেকে। প্রাপক যদি সে টাকা ক্যাশ-আউট করতে চান সেক্ষেত্রে তাকেও বাড়তি অর্থ দিয়ে টাকা তুলতে হয়। 

অর্থাৎ উভয় দিক থেকেই বাড়তি টাকা তোলার খেলায় মেতেছে বিকাশ নামক প্রতিষ্ঠানটি। যিনি টাকা পাঠান; আর যিনি গ্রহণ করেন দুদিকেই চার্জ কাটা হচ্ছে।

প্রতি হাজারে ক্যাশ আউট চার্জ ১৭ টাকা ৫০ পয়সা। আর সেন্ড মানি বা এক ব্যক্তি অপর ব্যক্তিকে টাকা পাঠাতে গেলে প্রতি লেনদেনে নেয়া হয় ৫ টাকা। সব মিলিয়ে টাকা উত্তোলন এবং জমার ক্ষেত্রে বিকাশের একজন গ্রাহককে খরচ করতে হয় ২২ টাকা ৫০ পয়সা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা মানেনি বিকাশ

সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংকের এক নির্দেশনায় বলা হয়েছে, এখন থেকে ব্যক্তি হতে ব্যক্তি প্রতি মাসে ২ লাখ টাকা লেনদেন করতে পারবে, আগে যা ছিল ৭৫ হাজার টাকা। এর মধ্যে পি-টু-পিতে প্রতি মাসে ৪০ হাজার টাকা পর্যন্ত লেনদেন করা যাবে কোনো প্রকার চার্জ ছাড়াই। 

অর্থাৎ ৪০ হাজার টাকা পর্যন্ত পাঠাতে কোনো বাড়তি খরচ লাগবে না। তবে প্রতিবার লেনদেনে সর্বোচ্চ সীমা হবে ১০ হাজার টাকা।

গ্রাহকদের অভিযোগ, ২০০ থেকে ৩০০ টাকা টাকা পাঠাতে গেলেও বিকাশ ৫ টাকা করে চার্জ কাটা হচ্ছে। শুধু যে বহাল রেখেছে তাই নয়। ২৫ হাজার টাকার ওপর লেনদেনে সেন্ড মানিতে তারা চার্জ ৫ টাকা থেকে ১০ টাকায় উন্নীত করেছে।

জমানো টাকার উপর ইন্টারেস্টের প্রতারণা

জমানো টাকার ওপর ইন্টারেস্ট দিয়ে থাকে বিকাশ, এমন প্রচারণাও তাদের কম নয়। একে প্রচারণা নয় ‘প্রতারণা’ বলছেন গ্রাহকরা। হাজারটা শর্তের বেড়াজালে এখানেও গ্রাহক প্রতারণায় বিকাশ এগিয়ে। 

যেমন মাসে কমপক্ষে ২টি আর্থিক লেনদেন (ক্যাশইন, ক্যাশআউট, এটিএম ক্যাশআউট, পেমেন্ট, সেন্ডমানি অথবা বাইএয়ারটাইম) করতে হবে। মাসজুড়ে প্রতিদিন শেষে গ্রাহকের অ্যাকাউন্টে ১ হাজার বা তার বেশি টাকা ব্যালেন্স থাকতে হবে। 

তারপর আবার ইন্টারেস্ট গণনা মাসশেষে প্রতিদিনের গড় ব্যাল্যান্সের ওপর। সঙ্গে সরকারি নিয়ম অনুযায়ী ভ্যাট এবং ট্যাক্স কেটে বছরে দুই দফায় দে’য়া হয়।

ইউটিলিটি বিল পরিশোধের ক্ষেত্রেও বিকাশের চার্জ সবচেয়ে বেশি। এসব বিল দে’য়ার ক্ষেত্রে বিকাশ সর্বনিম্ন ৫ টাকা থেকে সর্বোচ্চ নিচ্ছে ৩০ টাকা পর্যন্ত। আর বেতন দেয়ার ক্ষেত্রে এই প্রতিষ্ঠানের চার্জ ১ দশমিক ১ ভাগ থেকে ১ দশমিক ৫০ ভাগ পর্যন্ত।

এছাড়া বিকাশের হটলাইন ‘১৬২৪৭’ ব্যবহার করেও সাধারণ মানুষের মোবাইলের ব্যালেন্সে ভাগ বসাচ্ছে তারা। বিকাশ গ্রাহকদের তার জরুরি প্রয়োজনের জন্য এই সেবা (হটলাইন-১৬২৪৭) ফ্রি দেওয়া উচিত বলেও মত দেন অনেকে।

বিকাশ এজেন্টদের প্রতারণা 

বাংলাদেশ ব্যাংকের আইন অনুযায়ী ক্যাশআউট চার্জ ১৭ টাকা ৫০ পয়সা হলেও এজেন্টরা গ্রাহকদের কাছ থেকে আদায় করছে ২০ টাকা। প্রতিদিনই কয়েক লাখ গ্রাহকদের কাছ থেকে এভাবে প্রতি হাজারে ২ টাকা ৫০ পয়সা করে বেশি আদায় করায় কোটি কোটি টাকা কার হাতে যাচ্ছে সেই প্রশ্ন তুলেছেন এই খাতের নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠানগুলো। 

গত শনিবার টেলিকম রিপোর্টার্স নেটওয়ার্ক বাংলাদেশ টিআরএনবি আয়োজিত‘ প্রতিযোগিতা ও অংশীদারিত্বে প্রেক্ষাপট : প্রসঙ্গ এমএফএস সেবা’ এক ভার্চুয়াল আলোচনা সভায় এমনটা জানানো হয়।

এমএফএস সেবায় গ্রাহকের সাথে প্রতারণার বিষয়টি তুলে ধরে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর আবুল কাশেম বলেন, বলা হচ্ছে বিকাশ লস করছে। আসলে সেটি হয়তো সত্য নয়, হয়তো হিসাবে গড়মিল আছে। নাহলে আলিবাবা, ব্র্যাক ব্যাংকে বিনিয়োগ করতো না। 

চার্জের বিষয়ে তিনি বলেন, বিকাশের ১৭ টাকা ৫০ পয়সার জায়গায় ২০ টাকা নেয়া হচ্ছে। এটা বন্ধ করতে বিকাশ ও বাংলাদেশ ব্যাংক কি কোন উদ্যোগ নিতে পারে না। এটা গ্রাহকের সাথে সুস্পষ্ট প্রতারণা ও চুরি। প্রত্যেক দিন কত পরিমাণ গ্রাহক এই প্রক্রিয়ায় ঠকছে? বিকাশের মতো একটা লাইসেন্সধারী প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে এজেন্টরা এই ক্রাইম করছে। 

কমছে রেমিট্যান্স প্রবাহ

যেখানে ইউরোপ আমেরিকা থেকে আনুমানিক এক লক্ষ টাকা বাংলাদেশে পাঠাতে প্রয়োজন হয় প্রায় তিনশত টাকা, সেখানে দেশের অভ্যন্তরে টাকা পাঠাতে ‘বিকাশকে প্রদান করতে হয় দুই হাজার টাকা। বিকাশ অন্যান্য রাষ্ট্রের তুলনায় ৬ থেকে ৭ গুণ বেশি পাঠানোর খরচ নেয়। 

এছাড়া, রেমিটেন্সের অর্থ অবৈধভাবে বিকাশের মাধ্যমে হুন্ডি করার অভিযোগও আছে। সঠিক নিয়মে বিদেশ থেকে টাকা না আসায় সরকার বঞ্চিত হচ্ছে রেমিট্যান্স থেকে। কমছে রেমিট্যান্স প্রবাহ।

একটি চক্র দীর্ঘদিন ধরে রেমিট্যান্সের প্রবাহ কমাতে প্রবাসীদের আয়ের অর্থ অবৈধভাবে দেশে পাচার করছে। যা মানি লন্ডারিং আইনে অপরাধ। চক্রটি ব্যাংকিং সেবায় না গিয়ে অবৈধভাবে হুন্ডির মাধ্যমে সে টাকা লেনদেন করছে। এক্ষেত্রে দেশে থাকা কতিপয় বিকাশ এজেন্ট এর সাড়ে জড়িত।

সূত্র মতে, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া কিংবা মধ্যপ্রাচ্যের কোনো দেশ থেকে ইলেক্ট্রনিক বার্তায় বাংলাদেশে জানানো হচ্ছে, চট্টগ্রাম, পাবনা কিংবা মাদারিপুরে টাকা পাঠাতে হবে। হুন্ডি দলে কিছু সদস্য দেশে ও দেশের বাইরে অবস্থান করে বাংলাদেশি ওয়েজ আর্নারদের নিকট থেকে বৈদেশিক মুদ্রা গ্রহণ করে তা বাংলাদেশে না পাঠিয়ে বাংলাদেশের স্থানীয় টাকায় স্থানীয়ভাবে পরিশোধ করছে।

অর্থনীতিবিদদের দাবি, বাজারে বিকাশ সবচেয়ে বেশি সার্ভিস চার্জ বেশি নিচ্ছে। ফলে ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে নিম্ন আয়ের মানুষরা। যেখানে দেশের প্রধানমন্ত্রী এ দুর্যোগের মুহূর্তে ১০ টাকা কেজিতে চাল দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন সেখানে প্রতিষ্ঠানটি এক হাজার টাকায় প্রায় বিশ টাকা সার্ভিস চার্জ নেয়। বাজার ব্যবস্থাপনা ও গ্রাহকদের স্বার্থে বাংলাদেশ ব্যাংকের নজরদারি ও সার্ভিস চার্জ নির্দিষ্ট করে দেয়া জরুরী।

এসডব্লিউ/এমএন/এসএস/১৬০৫ 


State watch সকল পাঠকদের জন্য উন্মুক্ত সংবাদ মাধ্যম, যেটি পাঠকদের অর্থায়নে পরিচালিত হয়। যে কোন পরিমাণের সহযোগিতা, সেটি ছোট বা বড় হোক, আপনাদের প্রতিটি সহযোগিতা আমাদের নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে ভবিষ্যতে বড় অবদান রাখতে পারে। তাই State watch-কে সহযোগিতার অনুরোধ জানাচ্ছি। 

ছড়িয়ে দিনঃ
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

আপনার মতামত জানানঃ