Trial Run

বাংলাদেশে বিজ্ঞানমনস্কতার বেহাল চিত্র কেন?

মুজিব রহমান

বিজ্ঞানমনস্কতা হওয়ার সাথে বিজ্ঞানের ছাত্র-শিক্ষকের সম্পর্ক নেই। বাংলাদেশের প্রধান বিজ্ঞানমনস্ক মানুষ ড. হুমায়ুন আজাদ ও আহমদ শরীফ ছিলেন বাংলার অধ্যাপক। তবে বিজ্ঞানমনস্কতা চর্চায় বিজ্ঞানের শিক্ষক-ছাত্রদেরই এগিয়ে থাকার কথা ছিল। কিন্তু মানহীন বিজ্ঞানশিক্ষার কারণে এর উল্টো চিত্রই দেখা যায়। শুধু শমশের আলি, অরুন বসাক, গাজী আজমল, রানা চৌধুরীদের মতো অধ্যাপকরাই নন, অসংখ্য বিজ্ঞানের ছাত্রই মৌলবাদ অনুশীলন করে বিজ্ঞানমনস্কতার পিঠে ছুড়ি বসান। আমরা বিস্ময়ের সাথেই দেখি বাংলাদেশে বিজ্ঞান চর্চার জন্য বই লিখছেন বা অনুবাদ করছেন অন্য বিভাগের শিক্ষক/ছাত্ররা। সম্প্রতি স্টিফেন হকিং এর দ্য গ্রান্ড ডিজাইনের বাংলা রুপান্তর করেছেন বাংলার অধ্যাপক সেলিম মজহার! ড. জামাল নজরুল ইসলাম বিজ্ঞান চর্চার অন্তরায় হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতির নেতিবাচক হস্তক্ষেপকে দায়ি করেছিলেন। দ্য গ্রান্ড ডিজাইনের পাঠোন্মচন অনুষ্ঠানে অনেকে বাংলায় বিজ্ঞান পরিভাষার অভাবের কথা বলেছিলেন। যেখানে আমার মনে হয়েছে, এসব ক্ষেত্রে ইংরেজি শব্দটিই ব্যবহার করা যায় অনায়াসেই। তবে একজন বাংলার অধ্যাপকের পক্ষে বিজ্ঞানের বই লেখা বা অনুবাদ করা কঠিন এ কারণে যে, তাঁর পক্ষে বিজ্ঞান ভালভাবে রপ্ত করা কঠিনই। হুমায়ুন আজাদও ‘মহাবিশ্ব’ নামে একটি বই লিখেছেন যেটি ভাল মানেরও। তাঁর মতো মেধা সবসময় আসে না।

মুজিব রহমান

স্কুল পর্যায়ে বিজ্ঞান শিক্ষার মারাত্মক ধ্বস নেমেছে। বিপরীতে নারীরা বিজ্ঞান শিক্ষায় আরো অনাগ্রহী। আমাদের স্কুলে আড়াই হাজার শিক্ষার্থী। সেখানে এক বছর বিজ্ঞানের ছাত্র ছিল মাত্র ৫ জন। বুয়েটে শিক্ষার্থীদের মাত্র এক পঞ্চমাংশ নারী। ড. ফেরদৌসী কাদরী মনে করেন, ‘বাংলাদেশে বিজ্ঞানচর্চায় নারীদের অংশগ্রহণে প্রতিকূলতা সৃষ্টি হয় শিক্ষার প্রাথমিক ধাপ থেকেই এবং পরের ধাপগুলোতে তা ক্রমশ বাড়ে। বিজ্ঞানচর্চায় অংশগ্রহণকারী নারীদের জীবন ও কাজ সম্পর্কে বাস্তব ধারণার অভাব, কুসংস্কার, স্থায়ী চাকরির অদৃশ্য প্রলোভন ইত্যাদি অভিভাবক, আত্মীয়স্বজন, শিক্ষক-শিক্ষিকা বা সহকর্মীদের জন্য মেয়েদের বিজ্ঞানচর্চার উৎসাহ প্রদানে বাধা হয়ে দাঁড়ায়।’ মায়েরা যদি বিজ্ঞান শিক্ষা ও চর্চায় বা বিজ্ঞানমনস্কতায় পিছিয়ে থাকেন তবে সন্তানদের উপরও তার প্রভাব পড়বে।

আমাদের উপজেলা সদরের সরকারি শ্রীনগর ডিগ্রি কলেজের পদার্থবিদ্যার একজন শিক্ষক ক্লাসে বলতেন, ‘বিজ্ঞানের যাবতীয় সূত্রই এসেছে তাদের ধর্মগ্রন্থ থেকে’। বিষয়টি চ্যালেঞ্জ করে ফেসবুকে বিষয়টি নিয়ে একটা ছোট লেখা প্রকাশ করার উনি কেঁপে উঠলেন। শেষে ছাত্রদের উদ্বুদ্ধ করলেন, কেউ যেন না বলে, তিনি ক্লাসে এসব কথা বলেছেন। তিনি শ্রীনগর কলেজে থাকতে আর এসব কথা বলেন নি। আমার কলেজে বিবর্তনবাদ পড়াতে এসে জীববিজ্ঞানের শিক্ষক মিজানুর রহমান বলেছিলেন, ‘বিবর্তনবাদ বিশ্বাস করার কিছু নেই। পড়াতে হবে তাই পড়াচ্ছি। এটি সত্য হলে পৃথিবীতে কোন বানর থাকতো না’। আমাদের আরেক শিক্ষক গাজী আজমল স্যারও সমানতালে বিজ্ঞানবিরোধী হয়ে উঠেছেন। আল্লামা শমশের আলী অনবরত প্রতারণামূলক কোয়ান্টাম মেথডের পক্ষে বক্তৃতা দিয়ে বেড়ান। ড. অরুণ বসাক হাত ভরা আংটি দেখিয়ে দাবি করেন, এতে তার আত্মা শান্তি পায়! এদের কারণেও দেশে বিজ্ঞানমনস্কতার ক্ষতি হয়েছে।

দেশে অনেকগুলো বিজ্ঞানবিষয়ক অনলাইন ফেসবুক গ্রুপ/পেজ রয়েছে। প্রথম আলোর রয়েছে বিজ্ঞানচিন্তা! খুবই ভাল এবং সেখানে মূলত তাদের পত্রিকার লেখাই প্রকাশিত হয়। কিন্তু আরো একটি বিজ্ঞানচিন্তাকে খুঁজে পাবেন যেখানে বিজ্ঞানবিষয়ক আমার অনেকগুলো লেখা প্রকাশের পরে মুছে দেওয়া হয়েছে। ‘ব্যাঙের ছাতার বিজ্ঞান’ এর একই দশা এখন সেখানে প্রচার হচ্ছে ‘বিবর্তনবাদ ভুয়া তাঁর প্রমাণ’ শীর্ষক ধারাবাহিক। আরো ৫/৭টি পেজ/গ্রুপের একই অবস্থা। খুব বেশি অনুসারী না থাকলেও ‘ভারতীয় বিজ্ঞান ও যুক্তিবাদি সমিতি’, ‘বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও যুক্তিবাদী সমিতি’, ‘যুক্তিচিন্তা’, ‘ইস্টিশন’ ইত্যাদি ভূমিকা রাখছে যা যথেষ্ট নয়। ব্লগগুলোও তাদের জনপ্রিয়তা হারিয়েছে প্রথমত তা ব্যবহারে ফ্রেন্ডলি নয় বলেই দ্বিতীয়ত অধিকাংশ ব্লগেই মুক্তচিন্তা প্রকাশ করা যায় না। বাংলাদেশে ব্লগিং এ মাইলফলক স্থাপন করেছিল ‘সামহোয়ারইনব্লগ’ কিন্তু ধর্ম ও বিজ্ঞান চর্চা নিয়ে বিরোধে ওখান থেকে গুরুত্বপূর্ণ ব্লগারগণ বেরিয়ে গেলে তারা জনপ্রিয়তা হারায়। এই ব্লগটি এখন ধুকছে এবং একই সাথে বিজ্ঞানবিরোধী চর্চাতেই মনোনিবেশ করেছে। এখানকার ৮০% লেখাই বিজ্ঞানবিরোধী। ১/২টি বিজ্ঞানের পোস্ট পড়লেও তা নিয়ে পোস্টদাতাতের ব্লকের মুখে পড়তে হয়। বিবর্তনবাদ নিয়ে লেখা দিয়ে আমি নিজেও ব্লকের শিকার হয়েছি। অভিজিৎ রায় আলোর ঝলকানির মতো নিয়ে এসেছিলেন ‘মুক্তমনা’ ব্লগটি। তাঁর মৃত্যুর পরে মুক্তমনা খুব বেশি সচল নেই। অনন্ত বিজয় ও রাজিব হায়দার (থাবা বাবা) খুন হওয়াও ক্ষতির কারণ হয়। এটাকে এগিয়ে নেয়ার মতো দক্ষ লোকের অভাব রয়েছে। অভিজিৎ রায়ের স্ত্রী বন্যা আহমেদ ‘থিংক বাংলা’ নামে একটি ইউটিউব চ্যানেলে বিজ্ঞান চর্চার কাজ করছেন। চ্যানেলটি খুবই মানসম্মত হলেও এখনো তেমন প্রচার পায়নি। সচলায়তন সাইটও একসময় আলোচিত ছিল। জাতীয় দৈনিকগুলো বিজ্ঞানমনস্কতাকে এগিয়ে নিতে খুব নগণ্যই ভূমিকা রেখেছে বিপরীতে ধর্মান্ধতা ছড়াতে তাদের ভূমিকা ব্যাপক।

রাষ্ট্রের প্রতিটি হাতই যেন বিজ্ঞানমনস্কতা বিরোধী হয়ে উঠেছে। সরকার হয়তো সিংহভাগ মানুষের চেতনার চিন্তাই করে ফলে তারাও বিজ্ঞানমনস্কতা সৃষ্টিতে ভূমিকা রাখতে চায় না। পাঠ্যবই থেকে গুরুত্বপূর্ণ অনেকগুলো লেখাই সরিয়ে দেয়া হয়েছে। অনেকে দাবি করেন হেফাজত ইসলামের চাপে পড়েই ওগুলো বাদ দেয়া হয়েছে। আমাদের শিক্ষক, প্রশাসনের লোক, আইন শৃঙ্খলাবাহিনীর লোকদের মধ্যেও বিজ্ঞানমনস্ক লোক খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। দেশে একজন বিজ্ঞানমনস্ক মানুষকে বহুবিধ হয়রাণীর শিকার হতে হয়। পরিবার, সমাজ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, চাকরি ক্ষেত্র সর্বত্রই তাঁকে নিন্দা করা হয়। ফলে মানুষও বিজ্ঞানচর্চায় আগ্রহ হারিয়ে ফেলে। তারা যু্ক্তি-প্রমাণ ছেড়ে সুবিধাজনক অন্ধবিশ্বাসে আকৃষ্ট হয়। মুক্তচিন্তার মানুষদের জন্য পৃথিবীর সবচেয়ে ভয়ঙ্কর ৩০টি দেশের তালিকায় বাংলাদেশের নাম রয়েছে।

তবুও আশার আলোও রয়েছে। ব্যক্তিগতভাবেই দেশ থেকে বিতাড়িত বেশ কয়েকজন অগ্রসর চিন্তার মানুষ বিজ্ঞানমনস্কতা চর্চা করছেন এবং এসব নিয়ে অনলাইনে সক্রিয় থাকছেন। দেশজুড়ে তারা বহুভাবেই নিন্দিত হলেও সাম্প্রতিক সময়ে তাদের ভাবদর্শ দ্বারা অনুপ্রাণিত অনেক মানুষও তৈরি হয়েছে তাও বোঝা যায়। এক্ষেত্রে তসলিমা নাসরিন, আসিফ মহিউদ্দিন, অনন্য আজাদ সহ অনেকে দেশজুড়ে অতিমাত্রায় নিন্দিত হলেও মুক্তচিন্তা প্রসারে ভূমিকা রাখছেন। এরা সবাই-ই দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন। দেশে থেকে মুক্তচিন্তা প্রসারে সম্ভাবনাময় মুখ হয়ে উঠেছিলেন জাফর ইকবাল, সুলতানা কামাল, ভারতের প্রবীর ঘোষ, মুনতাসির মামুন, শফিক রেহমান, শাহরিয়ার কবির ও আনিসুল হকসহ অনেকে। বহুবিধ চাপ ও হুমকিতে তারাও এখন হিসেব করে কথা বলছেন। তবে সাধারণ পর্যায়ে অসংখ্য বিজ্ঞানমনস্ক মানুষ তৈরি হয়েছেন- তারাই প্রকৃত আশার আলো হয়ে উঠছেন।


State watch সকল পাঠকদের জন্য উন্মুক্ত সংবাদ মাধ্যম, যেটি পাঠকদের অর্থায়নে পরিচালিত হয়। যে কোন পরিমাণের সহযোগিতা, সেটি ছোট বা বড় হোক, আপনাদের প্রতিটি সহযোগিতা আমাদের নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে ভবিষ্যতে বড় অবদান রাখতে পারে। তাই State watch-কে সহযোগিতার অনুরোধ জানাচ্ছি। 

ছড়িয়ে দিনঃ
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

আপনার মতামত জানানঃ