একটি নিরীহ মেছোবিড়াল লোকালয়ে ঢুকে পড়েছে। আতঙ্কিত প্রাণীটি হয়তো খাবারের সন্ধানে এসেছে, কিংবা হারিয়ে ফেলেছে নিজের স্বাভাবিক আবাসস্থল। তাকে দেখেই একদল মানুষ লাঠিসোঁটা নিয়ে তেড়ে গেল। শুরু হলো ধাওয়া, তারপর পিটিয়ে হত্যা। কোথাও পথকুকুরকে বিষ খাইয়ে মেরে ফেলা হচ্ছে, কোথাও গরম পানি ঢেলে দেওয়া হচ্ছে বিড়ালের শরীরে। আবার শীতের সকালে অতিথি পাখি শিকারের জন্য পেতে রাখা হচ্ছে ফাঁদ। এসব দৃশ্য বাংলাদেশের বিভিন্ন এলাকায় নতুন নয়। অনেক ক্ষেত্রে প্রাণী হত্যার ঘটনাগুলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লেও কিছুদিন পর তা হারিয়ে যায় মানুষের স্মৃতি থেকে। কিন্তু যে প্রাণীটিকে হত্যা করা হলো, প্রকৃতির ওপর তার প্রভাব কতটা পড়ল, কিংবা মানুষের জীবনেই এর পরিণতি কী হতে পারে, তা নিয়ে খুব কম মানুষই ভাবেন।
পশুপাখির প্রতি নিষ্ঠুরতাকে আমরা প্রায়ই কেবল মানবিকতার প্রশ্ন হিসেবে বিবেচনা করি। একটি প্রাণীকে কষ্ট দেওয়া ঠিক কি না, তাকে হত্যা করা উচিত কি না—আলোচনাটি সাধারণত সেখানেই সীমাবদ্ধ থাকে। কিন্তু বিষয়টির পরিধি অনেক বড়। প্রকৃতির প্রতিটি প্রাণী কোনো না কোনোভাবে বাস্তুতন্ত্রের সঙ্গে যুক্ত। কোনো প্রাণী খাদ্যশৃঙ্খলের অংশ, কোনোটি পরাগায়নে ভূমিকা রাখে, কোনোটি ক্ষতিকর পোকামাকড় নিয়ন্ত্রণ করে, আবার কোনোটি মৃত প্রাণী ও জৈব বর্জ্য অপসারণের মাধ্যমে পরিবেশ পরিষ্কার রাখতে সাহায্য করে। ফলে একটি প্রাণীর সংখ্যা কমে যাওয়া মানে শুধু একটি প্রজাতির ক্ষতি নয়; এর প্রভাব ছড়িয়ে পড়তে পারে পুরো পরিবেশব্যবস্থায়। শেষ পর্যন্ত সেই ক্ষতির বোঝা বহন করতে হয় মানুষকেই।
মানুষের সঙ্গে পশুপাখির সম্পর্ক কোনো সাম্প্রতিক বিষয় নয়। হাজার হাজার বছর ধরে মানুষ ও অন্যান্য প্রাণী একই পরিবেশে বসবাস করেছে। কখনো শিকারি ও শিকার হিসেবে, কখনো খাদ্য ও আশ্রয়ের অংশীদার হিসেবে, আবার কখনো পারস্পরিক নির্ভরতার ভিত্তিতে গড়ে উঠেছে তাদের সম্পর্ক। প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনেও মানুষের সঙ্গে প্রাণীদের দীর্ঘ সম্পর্কের প্রমাণ পাওয়া যায়। জার্মানিতে ১৯১৪ সালে আবিষ্কৃত প্রায় ১৪ হাজার বছর আগের একটি সমাধিতে একজন পুরুষ ও একজন নারীর সঙ্গে একটি কুকুরকেও সমাহিত অবস্থায় পাওয়া যায়। এই আবিষ্কার মানুষের সঙ্গে কুকুরের প্রাচীন সম্পর্কের একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। অর্থাৎ প্রাণীদের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক কেবল প্রয়োজনের ভিত্তিতে তৈরি হয়নি; এর সঙ্গে আবেগ, সহাবস্থান ও সামাজিক জীবনের ইতিহাসও জড়িয়ে রয়েছে।
এই সম্পর্ক বোঝার জন্য বাস্তুসংস্থানবিদ্যা বা ইকোলজি সম্পর্কে ধারণা থাকা জরুরি। ইকোলজি মূলত জীব ও তাদের পারিপার্শ্বিক পরিবেশের পারস্পরিক সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা করে। একটি বন, নদী, জলাভূমি কিংবা কৃষিজমি শুধু গাছপালা বা প্রাণীর সমষ্টি নয়। সেখানে অসংখ্য জীব একে অপরের ওপর প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে নির্ভরশীল। কোনো একটি প্রজাতির সংখ্যা অস্বাভাবিকভাবে কমে গেলে অন্য প্রজাতির ওপর তার প্রভাব পড়তে পারে। এভাবে খাদ্যশৃঙ্খল ও প্রাকৃতিক ভারসাম্য বিঘ্নিত হয়। অথচ আমাদের সমাজে প্রাণীদের এই পরিবেশগত ভূমিকা নিয়ে সচেতনতার অভাব রয়েছে। অনেকেই জানেন না, যেসব প্রাণীকে ভয় পেয়ে কিংবা বিরক্ত হয়ে হত্যা করা হয়, তাদের অনেকেই মানুষের জীবন ও জীবিকার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশের মেছোবিড়াল এর একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। জলাভূমি ও মাছসমৃদ্ধ এলাকায় বসবাসকারী এই বন্য বিড়ালকে অনেকেই মাছের ক্ষতিকর প্রাণী মনে করেন। কিন্তু বাস্তবে মেছোবিড়াল জলাভূমির খাদ্যশৃঙ্খলের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। মাছের পাশাপাশি এটি কাঁকড়া, ইঁদুর ও অন্যান্য ছোট প্রাণী শিকার করে। ফলে জলাভূমির প্রাকৃতিক ভারসাম্য বজায় রাখতে এর ভূমিকা রয়েছে। মেছোবিড়ালকে জলাভূমির পরিবেশগত স্বাস্থ্যের একটি নির্দেশক প্রজাতি হিসেবেও বিবেচনা করা হয়। অথচ লোকালয়ে দেখা গেলেই অনেক ক্ষেত্রে প্রাণীটিকে শত্রু মনে করে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। মানুষের বসতি, কৃষিকাজ, মাছের ঘের এবং সড়ক নির্মাণের কারণে তার স্বাভাবিক আবাসস্থল সংকুচিত হচ্ছে। খাবার ও আশ্রয়ের সন্ধানে লোকালয়ে প্রবেশ করলে তাকে হত্যার ঝুঁকির মুখে পড়তে হচ্ছে।
একই ধরনের পরিস্থিতি দেখা যায় পথকুকুরের ক্ষেত্রেও। শহর ও গ্রামীণ জনপদে পথকুকুরের উপস্থিতি নিয়ে মানুষের মধ্যে নানা ধরনের বিরক্তি ও ভয় রয়েছে। জলাতঙ্কের ঝুঁকি, দলবদ্ধভাবে ঘোরাফেরা কিংবা মানুষের ওপর আক্রমণের আশঙ্কা অমূলক নয়। তবে এসব সমস্যা সমাধানের অর্থ নির্বিচারে প্রাণী হত্যা হতে পারে না। কুকুর শহরের পরিবেশে খাদ্যশৃঙ্খলের একটি অংশ হিসেবে কাজ করে। ইঁদুরসহ বিভিন্ন ছোট প্রাণীর সংখ্যা নিয়ন্ত্রণে তাদের ভূমিকা থাকতে পারে। একই সঙ্গে জৈব বর্জ্যের কিছু অংশ খাওয়ার মাধ্যমে শহরের পরিবেশের সঙ্গেও তারা যুক্ত। ফলে পথকুকুরের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে বৈজ্ঞানিক, মানবিক ও জনস্বাস্থ্যসম্মত ব্যবস্থা প্রয়োজন। জলাতঙ্ক প্রতিরোধে টিকাদান, বন্ধ্যাকরণ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং দায়িত্বশীল প্রাণী ব্যবস্থাপনা অনেক বেশি কার্যকর ও টেকসই পথ।
প্রকৃতিতে শিয়াল, পেঁচা ও গুঁইসাপের মতো প্রাণীর ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ। ইঁদুর ও বিভিন্ন ক্ষতিকর প্রাণী নিয়ন্ত্রণে এসব প্রাণী প্রাকৃতিক শিকারি হিসেবে কাজ করে। বিশেষ করে কৃষিজমিতে ইঁদুরের উপদ্রব ফসলের বড় ক্ষতির কারণ হতে পারে। পেঁচা ও শিয়ালের মতো প্রাণী প্রাকৃতিকভাবে ইঁদুরের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখে। কিন্তু ভয়, কুসংস্কার কিংবা অজ্ঞতার কারণে এসব প্রাণীকে হত্যা করা হলে কৃষিব্যবস্থায় তার পরোক্ষ প্রভাব পড়তে পারে। প্রাকৃতিক শিকারি কমে গেলে ক্ষতিকর প্রাণীর সংখ্যা বেড়ে যাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়। তখন কৃষকেরা বাধ্য হয়ে রাসায়নিক কীটনাশকের ব্যবহার বাড়াতে পারেন। অতিরিক্ত কীটনাশক মাটি, পানি, খাদ্য এবং মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকি তৈরি করে। অর্থাৎ যে প্রাণীটিকে অপ্রয়োজনীয় মনে করে হত্যা করা হচ্ছে, তার অনুপস্থিতিই একসময় মানুষের জন্য নতুন সমস্যার কারণ হয়ে উঠতে পারে।
শকুনের উদাহরণটি আরও তাৎপর্যপূর্ণ। একসময় বাংলাদেশের আকাশে শকুনের উপস্থিতি ছিল পরিচিত দৃশ্য। মৃত গবাদিপশুর দেহাবশেষ খেয়ে পরিবেশ পরিষ্কার রাখতে শকুন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করত। কিন্তু বিভিন্ন কারণে উপমহাদেশে শকুনের সংখ্যা ভয়াবহভাবে কমে গেছে। গবাদিপশুর চিকিৎসায় ব্যবহৃত ডাইক্লোফেনাক নামের ওষুধ শকুনের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর বলে প্রমাণিত হয়েছে। এই ওষুধের অবশিষ্টাংশ থাকা মৃত গবাদিপশু খেয়ে বহু শকুনের কিডনি বিকল হয়ে মারা যাওয়ার ঘটনা ঘটেছে। ফলে শকুনের সংখ্যা কমে যাওয়ার পেছনে মানুষের চিকিৎসা ও কৃষিব্যবস্থারও ভূমিকা রয়েছে। একটি প্রাণী বিলুপ্তির দিকে এগিয়ে গেলে তার পরিবেশগত দায়িত্ব অন্য কোনো প্রাণী সহজে পূরণ করতে পারে না। মৃত প্রাণীর দেহাবশেষ দীর্ঘ সময় পড়ে থাকলে অন্যান্য প্রাণী ও জীবাণুর মাধ্যমে রোগ ছড়ানোর ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে।
পাখি ও পতঙ্গের ক্ষেত্রেও একই বাস্তবতা প্রযোজ্য। মৌমাছি, প্রজাপতি, বিভিন্ন পাখি ও বাদুড় উদ্ভিদের পরাগায়নে ভূমিকা রাখে। অনেক উদ্ভিদ ও ফসলের বংশবিস্তার এই পরাগায়ন প্রক্রিয়ার ওপর নির্ভরশীল। অথচ কীটনাশকের অতিরিক্ত ব্যবহার, বন উজাড়, জলাভূমি ধ্বংস এবং নির্বিচারে শিকারের কারণে এসব প্রাণীর আবাসস্থল সংকুচিত হচ্ছে। অতিথি পাখি শিকার, খাঁচায় পাখি বন্দি করে বিক্রি এবং বন্যপ্রাণীর অবৈধ বাণিজ্যও জীববৈচিত্র্যের জন্য হুমকি তৈরি করছে। প্রকৃতির এই ক্ষতি শুধু বন্যপ্রাণীপ্রেমীদের উদ্বেগের বিষয় নয়; কৃষি, খাদ্যনিরাপত্তা এবং মানুষের দীর্ঘমেয়াদি জীবনযাত্রার সঙ্গেও এর সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে।
প্রাণীদের প্রতি মানুষের নিষ্ঠুরতার পেছনে ভয় ও অজ্ঞতার পাশাপাশি কুসংস্কারও বড় ভূমিকা রাখে। কালো বিড়ালকে অশুভ মনে করা, পেঁচাকে দুর্ভাগ্যের প্রতীক ভাবা, সাপ দেখলেই মেরে ফেলা কিংবা নির্দিষ্ট কিছু প্রাণীকে অপবিত্র মনে করে ঘৃণা করার প্রবণতা সমাজে এখনো রয়েছে। কোনো প্রাণী মানুষের জন্য বিপজ্জনক হতে পারে—এটি বাস্তবতা। কিন্তু বিপজ্জনক হওয়ার অর্থ এই নয় যে প্রতিটি প্রাণীকে দেখামাত্র হত্যা করতে হবে। বরং কোন প্রাণী মানুষের জন্য কতটা ঝুঁকিপূর্ণ, তার আচরণ কেমন এবং কীভাবে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখতে হবে, সে বিষয়ে বৈজ্ঞানিক জ্ঞান থাকা জরুরি।
ধর্মীয় বিশ্বাসের ক্ষেত্রেও সংবেদনশীলতা ও সঠিক ব্যাখ্যা প্রয়োজন। কোনো প্রাণীকে পবিত্র বা অপবিত্র মনে করার সামাজিক ধারণা থেকে তার প্রতি ঘৃণা কিংবা নিষ্ঠুরতা তৈরি হওয়া উচিত নয়। স্বাস্থ্যবিধি ও পরিচ্ছন্নতার প্রয়োজনীয়তা এক বিষয়, আর অকারণে কোনো জীবকে কষ্ট দেওয়া সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। আধুনিক বিজ্ঞান প্রাণীদের পরিচর্যা, টিকাদান, রোগ প্রতিরোধ এবং নিরাপদ সহাবস্থানের নানা পদ্ধতি দেখিয়েছে। তাই পুরোনো ভয় বা প্রচলিত ধারণার ভিত্তিতে প্রাণীদের প্রতি সহিংস আচরণকে স্বাভাবিক বলে মেনে নেওয়ার সুযোগ নেই।
এই সমস্যার আরেকটি বড় কারণ আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় প্রকৃতি ও প্রাণিকুল সম্পর্কে প্রায়োগিক শিক্ষার ঘাটতি। শিশুরা বইয়ে বাঘ, হাতি, সিংহ কিংবা ডলফিনের ছবি দেখে; কিন্তু নিজেদের আশপাশের মেছোবিড়াল, শিয়াল, পেঁচা, গুঁইসাপ কিংবা দেশি পাখিদের পরিবেশগত ভূমিকা সম্পর্কে খুব কমই জানতে পারে। অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পরিবেশ নিয়ে পাঠ থাকলেও বাস্তব জীবনে প্রাণীদের সঙ্গে সহাবস্থান, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্য সম্পর্কে পর্যাপ্ত হাতে-কলমে শিক্ষা দেওয়া হয় না। ফলে শিশুরা একটি প্রাণীকে ভালোবাসতে শেখে, কিন্তু অন্য প্রাণীর প্রয়োজনীয়তা বুঝতে শেখে না।
পরিবার ও সামাজিক পরিবেশও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। কোনো শিশু যদি দেখে বড়রা একটি পথকুকুরকে ঢিল ছুড়ে মারছে, সাপ দেখামাত্র হত্যা করছে কিংবা পাখিকে খাঁচায় আটকে রাখছে, তাহলে সে এসব আচরণকেই স্বাভাবিক বলে শিখতে পারে। বিপরীতে ছোটবেলা থেকে প্রাণীদের প্রতি সহমর্মিতা, নিরাপদ আচরণ এবং পরিবেশগত ভারসাম্যের গুরুত্ব শেখানো হলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের দৃষ্টিভঙ্গিতে পরিবর্তন আনা সম্ভব। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে স্থানীয় জীববৈচিত্র্য নিয়ে আলোচনা, প্রকৃতি পর্যবেক্ষণ, বৃক্ষরোপণ এবং বন্যপ্রাণী সংরক্ষণমূলক কার্যক্রম চালু করা যেতে পারে।
বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল ধ্বংসের বিষয়টিও আলাদা করে গুরুত্ব পাওয়ার দাবি রাখে। বন উজাড়, জলাভূমি ভরাট, অপরিকল্পিত নগরায়ণ এবং সড়ক ও রেলপথ নির্মাণের কারণে প্রাণীদের স্বাভাবিক চলাচলের পথ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। অনেক প্রাণী খাবার বা প্রজননের জন্য এক এলাকা থেকে অন্য এলাকায় যাতায়াত করে। মাঝখানে সড়ক তৈরি হলে যানবাহনের ধাক্কায় প্রাণহানির ঝুঁকি বাড়ে। বিদ্যুতের তার, ফাঁদ ও অন্যান্য মানবসৃষ্ট বাধাও অনেক প্রাণীর মৃত্যুর কারণ হয়। তাই অবকাঠামো নির্মাণের সময় বন্যপ্রাণীর চলাচলের পথ, নিরাপদ পারাপার এবং আবাসস্থল সংরক্ষণের বিষয়গুলো পরিকল্পনায় রাখা জরুরি।
প্রাণীদের প্রতি নিষ্ঠুরতা বন্ধ করতে হলে শুধু ব্যক্তিগত সহানুভূতি যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন কার্যকর আইন প্রয়োগ ও প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ। বাংলাদেশে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা আইন রয়েছে। কিন্তু আইন সম্পর্কে সাধারণ মানুষের সচেতনতা এবং অপরাধের ক্ষেত্রে তার প্রয়োগ আরও জোরদার করা প্রয়োজন। বন্যপ্রাণী হত্যা, অবৈধভাবে ধরে রাখা, পাচার কিংবা বাণিজ্যের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে আহত প্রাণী উদ্ধার, চিকিৎসা, পুনর্বাসন এবং নিরাপদ আবাসস্থল নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি। স্থানীয় প্রশাসন, বন বিভাগ, পরিবেশবাদী সংগঠন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং গণমাধ্যমকে এ ক্ষেত্রে সমন্বিত ভূমিকা পালন করতে হবে।
গণমাধ্যমেরও দায়িত্ব রয়েছে। প্রাণী নির্যাতনের কোনো ঘটনা ঘটলে শুধু ঘটনার ভয়াবহ ছবি প্রকাশ করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না। সেই প্রাণীটি পরিবেশে কী ভূমিকা রাখে, কেন তাকে হত্যা করা উচিত নয় এবং এ ধরনের ঘটনা প্রতিরোধে কী করা প্রয়োজন—সেসব বিষয়ও তুলে ধরতে হবে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সচেতনতামূলক প্রচারণা চালানো যেতে পারে। একই সঙ্গে প্রাণী নিয়ে কুসংস্কার, ভুল তথ্য ও অযৌক্তিক ভীতি দূর করতে বিজ্ঞানভিত্তিক আলোচনা প্রয়োজন।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, মানুষ প্রকৃতির বাইরে কোনো স্বাধীন সত্তা নয়। আমরা যে বাতাসে শ্বাস নিই, যে পানি পান করি, যে খাদ্য গ্রহণ করি—সবকিছুর সঙ্গেই প্রকৃতির প্রত্যক্ষ সম্পর্ক রয়েছে। একটি বন ধ্বংস হলে শুধু গাছ হারায় না, হারিয়ে যায় অসংখ্য প্রাণীর আবাসস্থল। একটি জলাভূমি ভরাট হলে শুধু পানি ধারণের জায়গা কমে না, বিপন্ন হয় মাছ, পাখি, সরীসৃপ ও অন্যান্য জীবের জীবন। একটি প্রজাতি বিলুপ্ত হলে তার সঙ্গে যুক্ত অসংখ্য পরিবেশগত সম্পর্কও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এই বাস্তবতা অস্বীকার করে মানুষের দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।
প্রাণীদের প্রতি সহমর্মিতা দেখানো মানে মানুষের নিরাপত্তা উপেক্ষা করা নয়। বরং মানুষ ও প্রাণী উভয়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার মধ্যেই প্রকৃত সমাধান রয়েছে। পথকুকুরের ক্ষেত্রে টিকাদান ও বন্ধ্যাকরণ, সাপের ক্ষেত্রে নিরাপদ উদ্ধার, আহত বন্যপ্রাণীর চিকিৎসা, অবৈধ শিকার বন্ধ এবং আবাসস্থল সংরক্ষণের মতো উদ্যোগ নিতে হবে। একই সঙ্গে মানুষের জন্য বিপজ্জনক পরিস্থিতি তৈরি হলে প্রশিক্ষিত উদ্ধারকর্মী ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সহায়তা নেওয়া প্রয়োজন।
প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক প্রতিযোগিতার নয়, সহাবস্থানের। কোনো প্রাণীকে অপ্রয়োজনীয় মনে করে হত্যা করা কিংবা নিজের ভয় ও বিরক্তির কারণে তার জীবন কেড়ে নেওয়া আমাদের সভ্যতার পরিচয় হতে পারে না। বরং একটি সমাজ কতটা মানবিক, তা বোঝা যায় তার দুর্বল ও নির্বাক প্রাণীদের প্রতি আচরণ থেকেও। পশুপাখির প্রতি নিষ্ঠুরতা বন্ধ করা তাই কেবল প্রাণীপ্রেমীদের দাবি নয়; এটি পরিবেশ রক্ষা, জনস্বাস্থ্য, কৃষি, জীববৈচিত্র্য এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নিরাপত্তার প্রশ্ন।
আজ যে মেছোবিড়ালকে পিটিয়ে হত্যা করা হচ্ছে, যে পাখিকে খাঁচায় বন্দি করা হচ্ছে কিংবা যে শকুনের অস্তিত্ব হারিয়ে যাচ্ছে, তাদের অনুপস্থিতির প্রভাব একদিন মানুষের জীবনেও পড়তে পারে। প্রকৃতির প্রতিটি প্রাণীর নিজস্ব ভূমিকা রয়েছে। সেই ভূমিকা বোঝার আগেই তাদের ধ্বংস করা আসলে নিজেদের অস্তিত্বের ভিত্তিকে দুর্বল করা। প্রকৃতির সঙ্গে শত্রুতা করে মানুষ কখনো দীর্ঘদিন ভালো থাকতে পারে না। তাই এখনই প্রয়োজন দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন—ভয় ও কুসংস্কারের পরিবর্তে বিজ্ঞান, নিষ্ঠুরতার পরিবর্তে সহমর্মিতা এবং ধ্বংসের পরিবর্তে সহাবস্থানকে বেছে নেওয়া। কারণ পশুপাখির জীবন রক্ষা করা মানে শেষ পর্যন্ত মানুষের নিজের জীবন ও ভবিষ্যৎ রক্ষা করা।
আপনার মতামত জানানঃ