মুসলমানদের জীবনে হজ একটি অনন্য ধর্মীয় ইবাদত। সামর্থ্যবান প্রত্যেক মুসলমানের জন্য জীবনে একবার হজ পালন করা ফরজ। অন্যদিকে ওমরাহ মুসলমানদের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি ইবাদত, যা বছরের বিভিন্ন সময়ে পালন করা যায়। পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে লাখ লাখ মানুষ প্রতিবছর মক্কা ও মদিনায় ছুটে যান আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের আশায়। কেউ সারা জীবনের সঞ্চয় ব্যয় করেন, কেউ জমি বিক্রি করেন, আবার কেউ বছরের পর বছর টাকা জমিয়ে রাখেন পবিত্র কাবা ঘর একবার নিজের চোখে দেখার স্বপ্ন পূরণ করতে। কিন্তু ধর্মীয় বিশ্বাস ও আধ্যাত্মিকতার এই বিশাল আয়োজনের সঙ্গে জড়িয়ে গেছে আরেকটি বাস্তবতা—অর্থনীতি, পর্যটন, আবাসন, পরিবহন এবং আন্তর্জাতিক ব্যবসা। হজ ও ওমরাহকে কেন্দ্র করে সৌদি আরবে গড়ে উঠেছে কয়েক স্তরের বিশাল বাণিজ্যিক ব্যবস্থা। ফলে একটি প্রশ্ন ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে, পবিত্র এই ইবাদতগুলোকে ঘিরে তৈরি হওয়া অর্থনৈতিক সাম্রাজ্যে ধর্মীয় সেবার জায়গা কতটুকু, আর ব্যবসার বিস্তার কতদূর?
সৌদি আরবের অর্থনৈতিক পরিকল্পনায় হজ ও ওমরাহ এখন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি খাত। দেশটির ভিশন ২০৩০ কর্মসূচির অন্যতম লক্ষ্য হলো তেলনির্ভর অর্থনীতি থেকে বেরিয়ে পর্যটন, বিনোদন, সেবা ও বেসরকারি বিনিয়োগের ক্ষেত্র সম্প্রসারণ করা। এই পরিকল্পনায় ধর্মীয় পর্যটনকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সৌদি সরকারের পিলগ্রিম এক্সপেরিয়েন্স প্রোগ্রামের লক্ষ্য ছিল ২০২৫ সালের মধ্যে বছরে ১ কোটি ৫০ লাখ আন্তর্জাতিক ওমরাহযাত্রীকে স্বাগত জানানো এবং ২০৩০ সালের মধ্যে সেই সক্ষমতা বাড়িয়ে ৩ কোটিতে উন্নীত করা। অর্থাৎ হজ ও ওমরাহ শুধু ধর্মীয় আয়োজন হিসেবে নয়, দেশটির দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক পরিকল্পনারও একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
এই পরিকল্পনার পেছনে রয়েছে বিশাল একটি বাজার। ২০২৫ সালে সৌদি আরবের সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, মোট ১৬ লাখ ৭৩ হাজার ২৩০ জন মুসলমান হজ পালন করেছেন। তাঁদের মধ্যে ১৫ লাখ ৬ হাজার ৫৭৬ জন এসেছেন সৌদি আরবের বাইরে থেকে। অন্যদিকে সৌদি আরবের সরকারি ডেটাসৌদি প্ল্যাটফর্মের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে দেশটির ভেতরে ও বাইরে মিলিয়ে ৪ কোটি ৩০ লাখের বেশি ওমরাহ পালনের রেকর্ড হয়েছে। এখানে একটি বিষয় মনে রাখা প্রয়োজন, এই সংখ্যার মধ্যে সৌদি আরবের অভ্যন্তরীণ ওমরাহযাত্রীও রয়েছেন এবং একই ব্যক্তি একাধিকবার ওমরাহ পালন করলে তাঁর যাত্রাও আলাদা করে গণনায় আসতে পারে। তাই এই সংখ্যা অনন্য ব্যক্তির সংখ্যা নয়। তবু পরিসংখ্যানটি বুঝিয়ে দেয়, হজ ও ওমরাহকে কেন্দ্র করে কী বিশাল পরিসরের সেবা ও বাণিজ্যিক কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।
এই বিপুলসংখ্যক মানুষের জন্য প্রয়োজন হোটেল, খাবার, বিমান টিকিট, বাস, ট্রেন, গাইড, স্বাস্থ্যসেবা, ভিসা প্রক্রিয়া, কেনাকাটা এবং নানা ধরনের আনুষঙ্গিক সেবা। ফলে মক্কা ও মদিনায় গড়ে উঠেছে বিশাল হোটেল ও আবাসনশিল্প। পবিত্র মসজিদুল হারামের আশপাশে রয়েছে আন্তর্জাতিক মানের পাঁচ তারকা হোটেল, বিলাসবহুল আবাসন, বিপণিবিতান ও রেস্তোরাঁ। কাবা ঘরের কাছাকাছি অবস্থানকে কেন্দ্র করে আবাসনের মূল্য ও সেবার ধরনেও তৈরি হয়েছে বিভিন্ন স্তর। যাঁদের আর্থিক সামর্থ্য বেশি, তাঁরা হারামের কাছাকাছি বিলাসবহুল হোটেলে অবস্থান করতে পারেন। অন্যদিকে সীমিত বাজেটের হাজিদের অনেক দূরের আবাসনে থাকতে হয় এবং যাতায়াতের জন্য অতিরিক্ত সময় ব্যয় করতে হয়।
এখানেই ধর্মীয় ইবাদত ও বাণিজ্যিক বাস্তবতার মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তৈরি হয়। একজন মুসলমান হজ বা ওমরাহ করতে যান মূলত আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের উদ্দেশ্যে। কিন্তু সেই যাত্রায় তাঁর অবস্থান, যাতায়াত ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা অনেকাংশে নির্ভর করে অর্থনৈতিক সামর্থ্যের ওপর। একই পবিত্র স্থানে একজন ধনী ব্যক্তি বিলাসবহুল হোটেলে থেকে ইবাদত করতে পারেন, আর একজন সাধারণ শ্রমজীবী মানুষকে সীমিত অর্থে প্রতিটি খরচ হিসাব করে চলতে হয়। যদিও উন্নত আবাসন ও অতিরিক্ত সুবিধার জন্য বেশি মূল্য নেওয়া স্বাভাবিক ব্যবসায়িক বিষয়, তবু প্রশ্ন থেকে যায়—পবিত্র স্থানকেন্দ্রিক এই বাণিজ্যে সাধারণ মুসলমানের স্বার্থ কতটা গুরুত্ব পাচ্ছে?
সৌদি আরবের সরকারি ওমরাহ প্ল্যাটফর্ম নুসুকের দিকে তাকালেও এই বাণিজ্যিক কাঠামোর চিত্র স্পষ্ট হয়। সেখানে বিভিন্ন ধরনের ওমরাহ প্যাকেজ রয়েছে। কোনো প্যাকেজে ভিসা, বিমান টিকিট, হোটেল, খাবার, পরিবহন ও গাইড অন্তর্ভুক্ত থাকে। আবার কিছু প্যাকেজে বিলাসবহুল হোটেল ও বিশেষ সুবিধা দেওয়া হয়। সরকারি তত্ত্বাবধানে অনুমোদিত সেবা প্রদানকারীরা এসব প্যাকেজ বিক্রি করেন। অর্থাৎ একজন মুসলমানের ধর্মীয় সফর এখন অনেকাংশে একটি সংগঠিত পর্যটন ও সেবা পণ্যের কাঠামোর মধ্য দিয়ে পরিচালিত হচ্ছে। এটি নিজে অবৈধ বা অনৈতিক নয়। কারণ লাখ লাখ মানুষের নিরাপদ যাতায়াত, আবাসন ও ব্যবস্থাপনার জন্য অর্থনৈতিক কাঠামো প্রয়োজন। কিন্তু সেই কাঠামো কতটা স্বচ্ছ, সেবার মূল্য কতটা যৌক্তিক এবং মুনাফা অর্জনের প্রতিযোগিতায় হাজিদের অধিকার কতটা সুরক্ষিত—এসব প্রশ্নের উত্তর গুরুত্বপূর্ণ।
হজের ক্ষেত্রেও একই বাস্তবতা দেখা যায়। হজের জন্য বিমানভাড়া, আবাসন, মিনা ও আরাফাতের ব্যবস্থাপনা, পরিবহন, খাবার এবং অন্যান্য সেবার খরচ রয়েছে। সৌদি কর্তৃপক্ষও বিভিন্ন স্তরের প্যাকেজ চালু করেছে, যাতে ভিন্ন আর্থিক সামর্থ্যের মানুষ নিজেদের উপযোগী ব্যবস্থা বেছে নিতে পারেন। ২০২৫ সালের হজের জন্য সৌদি আরবের অভ্যন্তরীণ হাজিদের কয়েকটি প্যাকেজের প্রাথমিক মূল্য ছিল প্রায় ৮ হাজার ৯২ থেকে ১৩ হাজার ১৫০ সৌদি রিয়াল, যেখানে কিছু ক্ষেত্রে পরিবহন খরচ অন্তর্ভুক্ত ছিল না। অর্থাৎ হজ ব্যবস্থাপনায়ও সেবার মান ও অবস্থানের ভিত্তিতে মূল্যের পার্থক্য রয়েছে। বিদেশি হাজিদের ক্ষেত্রে নিজ দেশের বিমানভাড়া, এজেন্সি, আবাসন ও অন্যান্য ব্যবস্থাপনা যুক্ত হওয়ায় মোট খরচ আরও ভিন্ন হতে পারে।
ধর্মীয় পর্যটনের অর্থনৈতিক গুরুত্ব কতটা, তার একটি ধারণা পাওয়া যায় সৌদি আরবের পর্যটন ব্যয়ের পরিসংখ্যান থেকে। দেশটির ডেটাসৌদি প্ল্যাটফর্মে সৌদি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্যের ভিত্তিতে বলা হয়েছে, ২০২২ সালে বিদেশি পর্যটকদের ধর্মীয় উদ্দেশ্যে ভ্রমণসংক্রান্ত ব্যয় ছিল প্রায় ৩৭ দশমিক ৩ বিলিয়ন সৌদি রিয়াল। এটি মোট বিদেশি পর্যটন ব্যয়ের প্রায় ৪১ শতাংশ। তবে এই হিসাবকে শুধু হজ ও ওমরাহর আয় বলা যাবে না; এর মধ্যে ধর্মীয় উদ্দেশ্যে ভ্রমণের বৃহত্তর ব্যয় অন্তর্ভুক্ত। তবু এই পরিসংখ্যান প্রমাণ করে, ধর্মীয় পর্যটন সৌদি অর্থনীতিতে কত বড় ভূমিকা রাখে।
এই অর্থনীতির সুবিধাভোগী কারা? প্রথমত, হোটেল ও আবাসন ব্যবসা। দ্বিতীয়ত, বিমান পরিবহন ও পর্যটন কোম্পানি। তৃতীয়ত, খাবার, কেনাকাটা, পরিবহন, গাইড ও অন্যান্য সেবার সঙ্গে যুক্ত প্রতিষ্ঠান। এর পাশাপাশি সৌদি সরকারও ভিসা, পর্যটন, সেবা ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে সামগ্রিক অর্থনীতিতে সুবিধা পায়। স্থানীয় ব্যবসা ও কর্মসংস্থানও বাড়ে। ফলে হজ ও ওমরাহকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া অর্থনৈতিক কার্যক্রমকে পুরোপুরি নেতিবাচকভাবে দেখার সুযোগ নেই। বরং প্রশ্ন হওয়া উচিত, এই ব্যবসা কতটা ন্যায়সংগত ও জনকল্যাণমূলকভাবে পরিচালিত হচ্ছে।
সমস্যা তৈরি হয় যখন ধর্মীয় আবেগকে ব্যবহার করে অতিরিক্ত মুনাফা অর্জনের চেষ্টা করা হয়। বাংলাদেশের মতো দেশে অনেক মানুষ সারা জীবনের সঞ্চয় দিয়ে হজ বা ওমরাহ পালনের প্রস্তুতি নেন। তাঁদের অনেকেই বিদেশ ভ্রমণ সম্পর্কে অভিজ্ঞ নন। সৌদি আরবের নিয়ম, ভিসা, হোটেল, পরিবহন কিংবা প্যাকেজের প্রকৃত মূল্য সম্পর্কে তাঁদের ধারণাও সীমিত থাকতে পারে। এই দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে কিছু অসাধু এজেন্সি কম খরচে হজ করানোর প্রতিশ্রুতি দিয়ে টাকা হাতিয়ে নেয়। কেউ ভুয়া ভিসার ব্যবস্থা করে, কেউ প্রতিশ্রুত হোটেল দেয় না, আবার কেউ অতিরিক্ত অর্থ দাবি করে। শেষ পর্যন্ত ধর্মীয় সফরের স্বপ্ন নিয়ে যাওয়া মানুষকে পড়তে হয় বিপাকে।
সৌদি কর্তৃপক্ষও অননুমোদিত হজ ও ওমরাহ প্যাকেজ নিয়ে একাধিকবার সতর্ক করেছে। কারণ বৈধ অনুমতি ছাড়া হজে যাওয়ার চেষ্টা করলে হাজিরা প্রয়োজনীয় পরিবহন, আবাসন ও নিরাপত্তাসেবা থেকে বঞ্চিত হতে পারেন। ২০২৪ সালের হজে ভয়াবহ তাপপ্রবাহের মধ্যে ১ হাজার ৩০১ জনের মৃত্যুর ঘটনাও হজ ব্যবস্থাপনা, নিরাপত্তা এবং অননুমোদিত যাত্রার ঝুঁকি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি করেছিল। সৌদি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছিল, মৃতদের বড় অংশের প্রয়োজনীয় অনুমতি ছিল না এবং তাঁরা পর্যাপ্ত সুরক্ষা ও সুযোগ-সুবিধা পাননি। এই ঘটনা দেখিয়েছে, হজের মতো বিশাল আয়োজন পরিচালনায় শুধু অবকাঠামো ও ব্যবসা সম্প্রসারণ নয়, মানুষের জীবন রক্ষাও সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার হওয়া প্রয়োজন।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, মক্কা ও মদিনার ঐতিহাসিক পরিবেশের পরিবর্তন। আধুনিক নগরায়ণ, নতুন সড়ক, হোটেল, বহুতল ভবন ও বিপণিবিতান নির্মাণের ফলে পবিত্র শহরগুলোর চেহারা বদলে যাচ্ছে। বিশেষ করে মক্কায় মসজিদুল হারামের আশপাশে বিশাল বাণিজ্যিক স্থাপনা ও বিলাসবহুল হোটেলের উপস্থিতি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা রয়েছে। আধুনিক অবকাঠামো নির্মাণের প্রয়োজন অস্বীকার করা যায় না। প্রতিবছর লাখ লাখ মানুষের নিরাপদ চলাচল ও অবস্থানের জন্য বড় বিনিয়োগ প্রয়োজন। কিন্তু একই সঙ্গে ইসলামের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের সঙ্গে সম্পর্কিত স্থানগুলো সংরক্ষণের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। উন্নয়ন যদি ঐতিহাসিক স্মৃতি ও সাংস্কৃতিক পরিচয়কে আড়াল করে ফেলে, তাহলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম ইসলামের ইতিহাসের অনেক গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন থেকে দূরে সরে যেতে পারে।
সৌদি আরবের পক্ষে যুক্তি হলো, হজ ও ওমরাহযাত্রীদের সংখ্যা বাড়ছে, তাই তাঁদের সেবা দেওয়ার জন্য নতুন অবকাঠামো, প্রযুক্তি ও বেসরকারি বিনিয়োগ প্রয়োজন। নুসুকের মতো ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে ভিসা, প্যাকেজ ও অন্যান্য সেবা সহজ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশটি ১ কোটি ৮৫ লাখের বেশি আন্তর্জাতিক হজ ও ওমরাহযাত্রীকে স্বাগত জানিয়েছিল। ২০২৫ সালে আন্তর্জাতিক হাজি ও ওমরাহযাত্রী মিলিয়ে এই সংখ্যা ১ কোটি ৯৫ লাখে পৌঁছায় বলে সৌদি পিলগ্রিম এক্সপেরিয়েন্স প্রোগ্রাম জানিয়েছে। বিপুলসংখ্যক মানুষের ব্যবস্থাপনা সহজ করতে প্রযুক্তি ও বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ যে প্রয়োজন, তা অস্বীকার করার উপায় নেই।
তবে ধর্মীয় সেবার বাণিজ্যিকীকরণ নিয়ে সমালোচনার জায়গাটিও গুরুত্বপূর্ণ। ইসলাম ব্যবসাকে নিষিদ্ধ করেনি। বরং হালাল ব্যবসা, ন্যায্য মুনাফা এবং শ্রমের বিনিময়ে পারিশ্রমিককে স্বীকৃতি দিয়েছে। হজযাত্রীদের জন্য হোটেল, পরিবহন, খাবার কিংবা অন্যান্য সেবা দিয়ে অর্থ উপার্জন করাও স্বাভাবিক। কিন্তু প্রতারণা, মজুতদারি, অসাধু মূল্যবৃদ্ধি, মিথ্যা প্রতিশ্রুতি কিংবা অসহায় মানুষের ধর্মীয় আবেগকে কাজে লাগিয়ে অর্থ আদায় ইসলামের নৈতিক শিক্ষার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। একজন হাজি শুধু একজন পর্যটক নন; তিনি একটি বিশেষ ধর্মীয় উদ্দেশ্য নিয়ে সফর করছেন। তাই তাঁর সঙ্গে ব্যবসায়িক সম্পর্কেও সততা, দায়িত্বশীলতা ও মানবিকতা বজায় রাখা জরুরি।
এখানে সৌদি সরকারের পাশাপাশি নিজ নিজ দেশের সরকার, হজ এজেন্সি এবং আন্তর্জাতিক ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোরও দায়িত্ব রয়েছে। হজ ও ওমরাহ প্যাকেজের মূল্য, হোটেলের অবস্থান, খাবারের মান, পরিবহন এবং অন্যান্য সেবার বিবরণ স্পষ্টভাবে জানাতে হবে। কোনো এজেন্সি প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করলে দ্রুত অভিযোগ গ্রহণ ও ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা থাকতে হবে। একই সঙ্গে কম আয়ের মুসলমানদের জন্য সাশ্রয়ী ও মানসম্মত প্যাকেজ নিশ্চিত করা জরুরি। ধর্মীয় সফর যেন শুধু ধনীদের জন্য বিলাসবহুল অভিজ্ঞতা হয়ে না ওঠে, সেটিও বিবেচনায় রাখতে হবে।
শেষ পর্যন্ত হজ ও ওমরাহর মূল উদ্দেশ্য অর্থ উপার্জন নয়, বরং আত্মশুদ্ধি, আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন এবং মুসলমানদের মধ্যে ঐক্য ও ভ্রাতৃত্বের বন্ধন দৃঢ় করা। এই ইবাদতকে কেন্দ্র করে ব্যবসা হওয়া অস্বাভাবিক নয়, কিন্তু ব্যবসার স্বার্থ যেন ইবাদতের মর্যাদাকে ছাপিয়ে না যায়। সৌদি আরবের অর্থনৈতিক উন্নয়ন, পর্যটন সম্প্রসারণ এবং আধুনিক ব্যবস্থাপনা প্রয়োজনীয় হতে পারে। কিন্তু সেই উন্নয়নের সাফল্য শুধু কত মানুষ হজ ও ওমরাহ করতে এলেন কিংবা কত অর্থ ব্যয় করলেন, তা দিয়ে বিচার করা উচিত নয়। বরং দেখতে হবে, সাধারণ মুসলমান কতটা নিরাপদে, সাশ্রয়ীভাবে ও মর্যাদার সঙ্গে ইবাদত করতে পারছেন।
একজন মানুষ হয়তো চল্লিশ বছর ধরে টাকা জমিয়ে হজে যাওয়ার স্বপ্ন দেখেছেন। তাঁর কাছে কাবা ঘর দেখা কোনো পর্যটন অভিজ্ঞতা নয়; এটি জীবনের সবচেয়ে বড় আধ্যাত্মিক আকাঙ্ক্ষাগুলোর একটি। সেই আকাঙ্ক্ষাকে কেন্দ্র করে যদি কেউ প্রতারণা করে, অযৌক্তিক মুনাফা অর্জন করে কিংবা মানুষের অসহায়ত্বকে পুঁজি করে, তাহলে সেটি শুধু অর্থনৈতিক অনিয়ম নয়, ধর্মীয় অনুভূতিরও অপব্যবহার। তাই প্রশ্নটি হজ ও ওমরাহর সঙ্গে ব্যবসা থাকবে কি না, সেটি নয়। বরং প্রশ্ন হলো, এই ব্যবসা কার স্বার্থে পরিচালিত হচ্ছে—হাজিদের সেবা ও নিরাপত্তার জন্য, নাকি কেবল মুনাফা বাড়ানোর জন্য? পবিত্র ইবাদতের মর্যাদা রক্ষা করতে হলে এই প্রশ্নের জবাব খুঁজতেই হবে।
আপনার মতামত জানানঃ