মানুষের কাছে সন্তান মানেই ভালোবাসা, মমতা, সুরক্ষা আর বেঁচে থাকার স্বপ্ন। একটি সন্তানকে বড় করে তুলতে মা-বাবা নিজেদের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য বিসর্জন দিতেও দ্বিধা করেন না। কিন্তু প্রাণিজগতে মাতৃত্ব ও পিতৃত্বের চিত্র সব সময় এমন কোমল নয়। প্রকৃতির কিছু প্রাণী নিজেদের সন্তানকেই হত্যা করে, এমনকি খেয়েও ফেলে। শুনতে অবিশ্বাস্য মনে হলেও জীববিজ্ঞানে এটি একটি পরিচিত আচরণ। এর নাম ‘ফিলিয়াল ক্যানিবালিজম’ (Filial Cannibalism)। মূলত কোনো প্রাণী নিজের প্রজাতির সন্তানকে খেয়ে ফেললে তাকে এই আচরণের অন্তর্ভুক্ত করা হয়। প্রাণিজগতে এমন ঘটনা কেবল খাদ্যাভাবের কারণে ঘটে না; এর পেছনে রয়েছে শক্তি সংরক্ষণ, প্রজনন কৌশল, পরিবেশগত চাপ, রোগের ঝুঁকি এবং বেঁচে থাকার কঠিন হিসাব।
প্রকৃতির নিয়মে প্রতিটি প্রাণীর প্রধান লক্ষ্য নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখা এবং বংশবিস্তার করা। কিন্তু সব সন্তানকে বাঁচিয়ে রাখার মতো পর্যাপ্ত খাবার, শক্তি কিংবা নিরাপদ পরিবেশ সব সময় পাওয়া যায় না। বিশেষ করে যেসব প্রাণী একসঙ্গে অনেক সন্তান জন্ম দেয়, তাদের জন্য প্রতিটি সন্তানকে সমানভাবে বাঁচিয়ে রাখা কঠিন হয়ে উঠতে পারে। খাবারের অভাব দেখা দিলে মা-বাবা কখনো দুর্বল, অসুস্থ কিংবা মৃত সন্তানকে খেয়ে নিজেদের শরীরের শক্তি ও পুষ্টির ঘাটতি পূরণ করে। এতে তারা নিজেদের বেঁচে থাকার সম্ভাবনা বাড়ানোর পাশাপাশি অবশিষ্ট সন্তানদের প্রতিপালনেও শক্তি ব্যয় করতে পারে।
প্রথমবার শুনলে মনে হতে পারে, এটি প্রকৃতির এক নিষ্ঠুর আচরণ। কিন্তু প্রাণীদের আচরণকে মানুষের আবেগ দিয়ে বিচার করলে এর প্রকৃত কারণ বোঝা কঠিন। মানুষের কাছে সন্তান হত্যা ভয়াবহ অপরাধ হলেও প্রাণিজগতে প্রতিটি আচরণকে বিবর্তন, পরিবেশ এবং প্রজননগত সুবিধার আলোকে বিশ্লেষণ করতে হয়। কোনো প্রাণী সচেতনভাবে মানুষের মতো ভালো-মন্দের বিচার করে এমন সিদ্ধান্ত নেয় না। বরং পরিবেশগত চাপ, শারীরিক অবস্থা এবং সহজাত প্রবৃত্তি তাদের আচরণকে প্রভাবিত করে।
ইঁদুরের মধ্যে এ ধরনের আচরণের উদাহরণ দেখা যায়। একটি মা ইঁদুর একসঙ্গে অনেক ছানার জন্ম দিতে পারে। গর্ভধারণ, সন্তান জন্মদান এবং স্তন্যদানের কারণে তার শরীরে প্রচুর শক্তি ও পুষ্টির প্রয়োজন হয়। কিন্তু খাবারের অভাব থাকলে কিংবা ছানার সংখ্যা বেশি হলে সবার জন্য পর্যাপ্ত দুধ ও পুষ্টি সরবরাহ করা কঠিন হয়ে পড়ে। এমন পরিস্থিতিতে মা ইঁদুর কখনো কিছু ছানা খেয়ে ফেলতে পারে। এতে তার শরীরে প্রয়োজনীয় পুষ্টির কিছুটা ঘাটতি পূরণ হয় এবং অবশিষ্ট ছানাদের বাঁচিয়ে রাখার সম্ভাবনা বাড়তে পারে। তবে সব ইঁদুরের ক্ষেত্রে এমন আচরণ দেখা যায় না। পরিবেশ, খাদ্যের প্রাপ্যতা, মায়ের শারীরিক অবস্থা এবং অন্যান্য পরিস্থিতির ওপর এটি নির্ভর করে।
শুধু ইঁদুর নয়, মাছের জগতেও সন্তান ভক্ষণের ঘটনা বেশ পরিচিত। বিশেষ করে কিছু প্রজাতির মাছ নিজেদের ডিম বা সদ্য জন্ম নেওয়া পোনা খেয়ে ফেলে। মাছের ক্ষেত্রে এই আচরণ অনেক সময় প্রজনন কৌশলের সঙ্গে সম্পর্কিত। একটি মাছ যখন বিপুলসংখ্যক ডিম দেয়, তখন সব ডিম থেকে বাচ্চা তৈরি হয় না। কিছু ডিম অনিষিক্ত থাকে, কিছু নষ্ট হয়ে যায়, আবার কিছু ডিম রোগাক্রান্ত হতে পারে। এমন অবস্থায় কোনো কোনো মাছ সেগুলো খেয়ে ফেলে। এতে অবশিষ্ট ডিমের যত্ন নেওয়া এবং নিজের শক্তি ধরে রাখার সুযোগ তৈরি হয়। কিছু মাছের ক্ষেত্রে সন্তান ভক্ষণ প্রজননচক্রের সঙ্গে সম্পর্কিত একটি স্বাভাবিক আচরণ হিসেবেও দেখা যায়।
মাছের মধ্যে সিচলিড (Cichlid) পরিবারের বিভিন্ন প্রজাতি এ বিষয়ে বিশেষভাবে আলোচিত। কিছু সিচলিড মাছ মুখের ভেতরে ডিম বা পোনা রেখে সেগুলোকে শত্রুর হাত থেকে রক্ষা করে। এই সময় তারা নিজেদের খাবার গ্রহণও সীমিত করে দিতে পারে। দীর্ঘ সময় ধরে সন্তান রক্ষার কারণে তাদের শরীরে শক্তির ঘাটতি তৈরি হয়। পরিস্থিতি অনুযায়ী কিছু মাছ নিজেদের ডিম বা পোনার একটি অংশ খেয়ে ফেলতে পারে। তবে মাছের প্রজাতিভেদে সন্তান লালন-পালনের ধরন এবং এই আচরণের কারণ ভিন্ন।
প্রাণিজগতে কুকুরের মধ্যেও কখনো কখনো নবজাতক সন্তানকে খেয়ে ফেলার ঘটনা দেখা যায়। বিশেষ করে সন্তান জন্মদানের পর মা কুকুরের আচরণে অস্বাভাবিকতা দেখা দিলে এমন ঘটনা ঘটতে পারে। শারীরিক অসুস্থতা, তীব্র মানসিক চাপ, অপুষ্টি, সন্তান জন্মদানের জটিলতা কিংবা মৃত ও দুর্বল ছানার উপস্থিতি এ ধরনের আচরণের সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। তবে কুকুরের ক্ষেত্রে সব সন্তান ভক্ষণকে একই কারণে ব্যাখ্যা করা যায় না। অনেক সময় মৃত ছানাকে সরিয়ে ফেলার স্বাভাবিক পরিচ্ছন্নতামূলক আচরণ এবং জীবিত ছানাকে খেয়ে ফেলার মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। তাই এমন ঘটনা ঘটলে প্রাণীটির শারীরিক ও আচরণগত অবস্থা বিবেচনা করা জরুরি।
প্রাণিজগতের আরও একটি বিস্ময়কর উদাহরণ হলো শিম্পাঞ্জি। মানুষের নিকটাত্মীয় হিসেবে পরিচিত এই প্রাণীদের সামাজিক জীবন বেশ জটিল। তারা দলবদ্ধভাবে বসবাস করে এবং তাদের মধ্যে সহযোগিতা, প্রতিযোগিতা, ক্ষমতার দ্বন্দ্ব ও সামাজিক সম্পর্কের নানা রূপ দেখা যায়। কিন্তু এই সামাজিক কাঠামোর মধ্যেও নবজাতক হত্যার ঘটনা ঘটতে পারে। বিশেষ করে কিছু পুরুষ শিম্পাঞ্জি অন্য পুরুষের সন্তান হত্যা করে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে নিহত শাবককে খাওয়ার ঘটনাও পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে। গবেষকদের মতে, এর পেছনে সামাজিক প্রতিযোগিতা, প্রজননগত স্বার্থ এবং দলীয় ক্ষমতার সম্পর্ক ভূমিকা রাখতে পারে। তবে শিম্পাঞ্জিদের সব দল কিংবা সব পুরুষের মধ্যে এমন আচরণ দেখা যায় না।
মেরু অঞ্চলের মেরু ভালুকের জীবনও প্রকৃতির কঠিন বাস্তবতার একটি উদাহরণ। আর্কটিক অঞ্চলে বসবাসকারী এই বিশাল প্রাণীকে প্রতিকূল আবহাওয়া, খাদ্যসংকট এবং দীর্ঘ সময় ধরে শিকার না পাওয়ার মতো পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়। বিশেষ করে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বরফের বিস্তৃতি ও স্থায়িত্ব কমে যাওয়ায় তাদের খাদ্য সংগ্রহের পরিবেশে পরিবর্তন আসছে। এমন কঠিন পরিস্থিতিতে কিছু পুরুষ মেরু ভালুক অন্য ভালুকের শাবক হত্যা করে এবং কখনো সেগুলো খেয়ে ফেলে। এটি মূলত বেঁচে থাকার জন্য খাদ্য সংগ্রহের একটি চরম আচরণ। তবে মেরু ভালুকের ক্ষেত্রে সন্তান হত্যার পেছনে খাদ্যাভাব ছাড়াও প্রজননগত প্রতিযোগিতার মতো কারণ থাকতে পারে।
প্রাণীদের মধ্যে সন্তান ভক্ষণের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো রোগ প্রতিরোধ। কোনো সন্তান জন্মের পর থেকেই অসুস্থ, বিকলাঙ্গ কিংবা মৃত হলে মা-বাবা কখনো সেটিকে খেয়ে ফেলতে পারে। এর মাধ্যমে মৃত দেহ দ্রুত সরিয়ে ফেলা সম্ভব হয় এবং বাসা বা আশ্রয়স্থলে পচন ও রোগজীবাণু ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি কমতে পারে। বিশেষ করে যেসব প্রাণী একই জায়গায় সন্তান জন্ম দেয় বা ডিম ও ছানার যত্ন নেয়, তাদের ক্ষেত্রে মৃত সন্তান সরিয়ে ফেলা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। তবে অসুস্থ সন্তানকে খেয়ে ফেললেই সব সময় রোগের বিস্তার বন্ধ হয়, এমন নিশ্চয়তা নেই। এটি পরিস্থিতিভেদে দেখা যায়।
সন্তান ভক্ষণের সঙ্গে পরিবেশগত নিরাপত্তারও সম্পর্ক রয়েছে। কোনো প্রাণী যদি মনে করে তার বাসা বা আশ্রয়স্থল নিরাপদ নয়, তাহলে তার আচরণে পরিবর্তন আসতে পারে। মানুষের অতিরিক্ত উপস্থিতি, বারবার বিরক্ত করা, শিকারির আক্রমণের আশঙ্কা কিংবা পরিবেশের অস্বাভাবিক পরিবর্তন প্রাণীর মধ্যে চাপ সৃষ্টি করতে পারে। কিছু প্রাণীর ক্ষেত্রে এই চাপ সন্তান পরিচর্যার স্বাভাবিক আচরণ ব্যাহত করে। ফলে তারা সন্তানকে পরিত্যাগ করতে পারে কিংবা বিরল ক্ষেত্রে আক্রমণাত্মক আচরণ করতে পারে। কুকুরসহ বিভিন্ন স্তন্যপায়ী প্রাণীর ক্ষেত্রে পরিবেশগত চাপ ও মাতৃত্বকালীন আচরণের সম্পর্ক নিয়ে গবেষণা রয়েছে।
প্রজনন চক্রের সঙ্গেও এই আচরণের সম্পর্ক রয়েছে। যেসব প্রাণী অল্প সময়ে অনেক সন্তান জন্ম দেয়, তাদের ক্ষেত্রে সন্তানদের মধ্যে প্রতিযোগিতা বেশি হতে পারে। খাবার, আশ্রয় এবং মায়ের যত্ন পাওয়ার ক্ষেত্রে প্রতিটি সন্তানকে লড়াই করতে হয়। কোনো কোনো পরিস্থিতিতে দুর্বল সন্তান বেঁচে থাকার সুযোগ হারায়। তখন মা-বাবার আচরণে সন্তান ভক্ষণের মতো ঘটনা দেখা দিতে পারে। অন্যদিকে যেসব প্রাণী অল্পসংখ্যক সন্তানের জন্ম দেয় এবং দীর্ঘ সময় ধরে তাদের যত্ন নেয়, তাদের মধ্যে সন্তান লালন-পালনের কৌশল ভিন্ন হতে পারে। তবে কোনো প্রাণীর প্রজনন পদ্ধতি দেখেই তার মধ্যে সন্তান ভক্ষণের প্রবণতা আছে বলে সিদ্ধান্ত নেওয়া যায় না।
বিজ্ঞানীরা প্রাণীদের এ ধরনের আচরণকে বিবর্তনীয় দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করেন। প্রকৃতিতে কোনো প্রাণীর বেঁচে থাকা কেবল তার নিজের জীবনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ নয়, বরং ভবিষ্যতে তার বংশবিস্তারের সম্ভাবনার সঙ্গেও সম্পর্কিত। একটি মা প্রাণী যদি অতিরিক্ত দুর্বল বা অসুস্থ সন্তানকে বাঁচাতে গিয়ে নিজের জীবন বিপন্ন করে, তাহলে তার অবশিষ্ট সন্তানদেরও বেঁচে থাকার সম্ভাবনা কমে যেতে পারে। সে ক্ষেত্রে কিছু সন্তান হারানোর বিনিময়ে অন্য সন্তানদের বাঁচিয়ে রাখার সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে। এ ধরনের আচরণকে কখনো কখনো প্রজননগত বিনিয়োগের পুনর্বণ্টন হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়।
তবে সন্তান ভক্ষণের ঘটনা সব সময় মা-বাবার পক্ষ থেকেই ঘটে না। কোনো কোনো প্রজাতিতে বড় সন্তান ছোট সন্তানকে খেয়ে ফেলতে পারে। আবার একই প্রজাতির অন্য সদস্যরাও সুযোগ পেলে ডিম বা শাবক খেয়ে ফেলতে পারে। ফলে ফিলিয়াল ক্যানিবালিজম, অর্থাৎ নিজের সন্তান ভক্ষণ, এবং ক্যানিবালিজমের অন্যান্য ধরনকে আলাদা করে বোঝা জরুরি। প্রাণিজগতে সন্তান হত্যার ঘটনা, মৃত সন্তান খাওয়া এবং জীবিত সন্তানকে খাদ্য হিসেবে গ্রহণ—এসব আচরণ এক নয়। গবেষণায় প্রতিটি ঘটনার কারণ ও প্রেক্ষাপট আলাদাভাবে বিবেচনা করা হয়।
বিভিন্ন গবেষণায় প্রায় দেড় হাজার প্রজাতির প্রাণীর মধ্যে নিজ প্রজাতির সদস্য ভক্ষণ বা ক্যানিবালিজমের বিভিন্ন ধরন নথিভুক্ত হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়। তবে এই সংখ্যা শুধু মা-বাবার নিজের সন্তান খাওয়ার ঘটনা বোঝায় না; এর মধ্যে প্রজাতির অন্য সদস্যকে খাওয়ার ঘটনাও অন্তর্ভুক্ত হতে পারে। প্রাণিজগতে এমন আচরণের বিস্তৃতি বোঝার জন্য এই পার্থক্যটি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ একই ধরনের আচরণ একেক প্রজাতির ক্ষেত্রে একেক কারণে দেখা দিতে পারে।
মানুষের চোখে সন্তান ভক্ষণ প্রকৃতির সবচেয়ে নিষ্ঠুর দৃশ্যগুলোর একটি। কিন্তু প্রকৃতির জগৎ আবেগের চেয়ে বেঁচে থাকার বাস্তবতায় অনেক বেশি পরিচালিত। সেখানে প্রতিটি প্রাণীকে খাদ্য, নিরাপত্তা, প্রজনন এবং প্রতিকূল পরিবেশের সঙ্গে প্রতিনিয়ত লড়াই করতে হয়। কখনো সেই লড়াই এতটাই কঠিন হয়ে ওঠে যে নিজের সন্তানকে হারিয়েও টিকে থাকার পথ বেছে নিতে হয়।
প্রকৃতির এই আচরণ আমাদের মনে করিয়ে দেয়, প্রাণিজগতে মাতৃত্ব ও পিতৃত্বের প্রকাশ সব প্রজাতিতে এক রকম নয়। কোথাও মা তার সন্তানকে বুকের উষ্ণতায় আগলে রাখে, আবার কোথাও চরম পরিবেশগত চাপে সেই সন্তানই হয়ে ওঠে বেঁচে থাকার কঠিন সমীকরণের অংশ। প্রকৃতির এই নির্মম বাস্তবতা হয়তো মানুষের কাছে অস্বাভাবিক, কিন্তু বিবর্তনের দীর্ঘ ইতিহাসে এটি টিকে থাকার নানা কৌশলেরই একটি।
আপনার মতামত জানানঃ