যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে আবারও বড় ধরনের পরিবর্তনের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের প্রথম দুই বছরের রাজনৈতিক মূল্যায়ন যেন এক নির্বাচনী রায়ের মধ্য দিয়ে স্পষ্ট হয়ে উঠল। মধ্যবর্তী নির্বাচনে কংগ্রেসের দুই কক্ষ—সিনেট ও প্রতিনিধি পরিষদ—দুটিই রিপাবলিকানদের হাতছাড়া হয়েছে। বিপরীতে, ডেমোক্রেটিক পার্টি পেয়েছে প্রত্যাশার চেয়েও বড় জয়। এই ফলাফল কেবল কয়েকটি আসনের রাজনৈতিক পালাবদল নয়; বরং এটি যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং আগামী দিনের ক্ষমতার ভারসাম্যে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
নির্বাচনের আগে বিভিন্ন জনমত জরিপে রিপাবলিকানদের জন্য যে অস্বস্তিকর পরিস্থিতির পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছিল, ভোটের ফলাফল তার চেয়েও বেশি বিস্ময় তৈরি করেছে। প্রতিনিধি পরিষদে ডেমোক্র্যাটরা ২২৫টি আসন পেয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য প্রয়োজনীয় ২১৮ আসনের সীমা অতিক্রম করেছেন। অন্যদিকে, রিপাবলিকানরা পেয়েছেন ১৩৮টি আসন। তখনো ৭৩টি আসনের ফল ঘোষণা বাকি ছিল। সিনেটেও ডেমোক্র্যাটদের অবস্থান শক্তিশালী হয়েছে। সর্বশেষ প্রকাশিত ফল অনুযায়ী, ১০০ আসনের এই কক্ষে ডেমোক্র্যাটদের দখলে রয়েছে ৫৪টি আসন, আর রিপাবলিকানদের রয়েছে ৪৪টি। নির্বাচনের আগে যেখানে সিনেটে রিপাবলিকানদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা ছিল, সেখানে এবার পরিস্থিতি সম্পূর্ণ বদলে গেছে।
মার্কিন রাজনৈতিক ব্যবস্থায় মধ্যবর্তী নির্বাচনকে সাধারণত ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্টের প্রথম দুই বছরের কাজের ওপর জনগণের মূল্যায়ন হিসেবে বিবেচনা করা হয়। প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ঠিক মাঝামাঝি সময়ে অনুষ্ঠিত হওয়ায় এই নির্বাচন প্রশাসনের জনপ্রিয়তা, নীতিগত সিদ্ধান্ত এবং রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রতি জনগণের আস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা। ইতিহাসে বহুবার দেখা গেছে, প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে বিজয়ী দল মধ্যবর্তী নির্বাচনে এসে বড় ধরনের ধাক্কা খেয়েছে। তবে ট্রাম্পের এবারের পরাজয়ের তাৎপর্য কিছুটা ভিন্ন। কারণ, তিনি শুধু প্রতিনিধি পরিষদ নয়, সিনেটেও নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছেন। ফলে তাঁর প্রশাসনের সামনে এখন রাজনৈতিক বাধার একটি নতুন অধ্যায় শুরু হতে যাচ্ছে।
ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা কমে যাওয়ার পেছনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি হলো জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি। যুক্তরাষ্ট্রের সাধারণ মানুষের কাছে অর্থনীতি শুধু জিডিপি প্রবৃদ্ধি কিংবা শেয়ারবাজারের সূচকের হিসাব নয়; বরং প্রতিদিনের বাজার খরচ, বাড়িভাড়া, বিদ্যুৎ বিল, চিকিৎসা ব্যয় এবং পরিবারের মাসিক বাজেটের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। কোনো প্রশাসন অর্থনৈতিক সাফল্যের দাবি করলেও সাধারণ মানুষ যদি প্রতিদিনের জীবনযাত্রায় স্বস্তি না পান, তাহলে সেই সাফল্য রাজনৈতিক সমর্থনে রূপ নেয় না। এবারের নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটরা এই বাস্তবতাকেই নিজেদের প্রচারের অন্যতম প্রধান হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছেন।
ট্রাম্প প্রশাসনের শুল্কনীতি নিয়েও অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। বিভিন্ন দেশের পণ্যের ওপর উচ্চ শুল্ক আরোপের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের শিল্প ও অর্থনীতিকে শক্তিশালী করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন তিনি। তাঁর বক্তব্য ছিল, বিদেশি পণ্যের ওপর শুল্ক বাড়লে দেশীয় উৎপাদন উৎসাহিত হবে এবং যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি লাভবান হবে। কিন্তু বাস্তবে শুল্কের প্রভাব নিয়ে তৈরি হয়েছে নানা বিতর্ক। আমদানি ব্যয় বেড়ে গেলে তার একটি অংশ শেষ পর্যন্ত ভোক্তাদের ওপর গিয়ে পড়ে। ফলে ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান, আমদানিকারক এবং সাধারণ ক্রেতাদের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। নির্বাচনের প্রচারে ডেমোক্র্যাটরা এই নীতির অর্থনৈতিক প্রভাব নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।
আরেকটি বড় কারণ ইরান যুদ্ধ। ট্রাম্প প্রশাসনের পররাষ্ট্রনীতি এবং সামরিক সিদ্ধান্তের প্রভাব এবার সরাসরি অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে পড়েছে। যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে শুধু সামরিক ব্যয় বাড়ে না, আন্তর্জাতিক বাজারেও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। বিশেষ করে জ্বালানি সরবরাহ, তেলের দাম, পরিবহন ব্যয় এবং বৈশ্বিক বাণিজ্যের ওপর এর প্রভাব পড়তে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের সাধারণ মানুষ যখন জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে উদ্বিগ্ন, তখন বিদেশে দীর্ঘস্থায়ী সামরিক সংঘাতে জড়িয়ে থাকার বিষয়টি রাজনৈতিকভাবে আরও সংবেদনশীল হয়ে ওঠে। ট্রাম্প দ্রুত যুদ্ধ শেষ করার যে প্রত্যাশা তৈরি করেছিলেন, তা পূরণ না হওয়ায় তাঁর প্রশাসনের ওপর চাপ বেড়েছে।
এর পাশাপাশি ট্রাম্প পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে সরকারি নীতিকে কাজে লাগিয়ে সম্পদ বাড়ানোর অভিযোগও নির্বাচনী বিতর্কে জায়গা করে নিয়েছে। যদিও অভিযোগ এবং প্রমাণিত অপরাধ এক বিষয় নয়, তবু রাজনৈতিক নেতৃত্বের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিয়ে প্রশ্ন উঠলে তার প্রভাব ভোটারদের মনোভাবের ওপর পড়তে পারে। ডেমোক্র্যাটরা প্রচারে প্রশাসনের নৈতিকতা, দুর্নীতির অভিযোগ এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের বিষয়গুলো সামনে এনেছেন। ফলে নির্বাচনটি অনেক ভোটারের কাছে শুধু অর্থনৈতিক নীতির মূল্যায়ন ছিল না; বরং রাষ্ট্র পরিচালনায় জবাবদিহি প্রতিষ্ঠার প্রশ্নেও পরিণত হয়েছিল।
জনমত জরিপেও ট্রাম্পের অবস্থান ছিল উদ্বেগজনক। রয়টার্স/ইপসসের একটি জরিপে তাঁর জনপ্রিয়তা ৩১ শতাংশে নেমে আসার তথ্য উঠে আসে। এটি তাঁর দুই মেয়াদের মধ্যে সবচেয়ে নিম্ন পর্যায়ের জনপ্রিয়তা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। নির্বাচনের পর প্রকাশিত বুথফেরত জরিপেও ভোটারদের অসন্তোষের চিত্র স্পষ্ট হয়েছে। জরিপে অংশ নেওয়া প্রায় তিন-চতুর্থাংশ ভোটার জানিয়েছেন, দেশের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে তাঁরা সন্তুষ্ট নন। অন্যদিকে, প্রায় ৭০ শতাংশ ভোটার মনে করেন, প্রেসিডেন্টের ক্ষমতার ওপর নিয়ন্ত্রণ ও ভারসাম্য প্রতিষ্ঠায় কংগ্রেসের আরও সক্রিয় ভূমিকা থাকা প্রয়োজন।
এই পরিসংখ্যানের রাজনৈতিক তাৎপর্য গভীর। যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান এমন একটি শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করেছে, যেখানে প্রেসিডেন্ট, কংগ্রেস এবং সুপ্রিম কোর্টের মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য বজায় রাখার ব্যবস্থা রয়েছে। প্রেসিডেন্ট শক্তিশালী হলেও তিনি এককভাবে সব সিদ্ধান্ত কার্যকর করতে পারেন না। কংগ্রেস আইন প্রণয়ন, বাজেট অনুমোদন এবং প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডের ওপর নজরদারির মাধ্যমে নির্বাহী বিভাগের ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। ফলে কংগ্রেসের দুই কক্ষ ডেমোক্র্যাটদের নিয়ন্ত্রণে চলে যাওয়ায় ট্রাম্পের প্রশাসনের সামনে নতুন বাস্তবতা তৈরি হয়েছে।
আগামী জানুয়ারিতে নির্বাচিত প্রতিনিধিরা শপথ নেওয়ার পর এই পরিবর্তনের প্রকৃত প্রভাব দৃশ্যমান হবে। প্রতিনিধি পরিষদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ায় ডেমোক্র্যাটরা বিভিন্ন সংসদীয় কমিটির নিয়ন্ত্রণ নিতে পারবেন। তাঁরা ট্রাম্প প্রশাসনের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত, সরকারি ব্যয়, নীতিনির্ধারণ এবং সম্ভাব্য অনিয়ম নিয়ে তদন্ত শুরু করতে পারবেন। এসব তদন্তের আওতায় প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তা, ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক সহযোগী এমনকি তাঁর পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধেও উত্থাপিত অভিযোগ আসতে পারে।
এখানে একটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কংগ্রেসের তদন্ত মানেই কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে অপরাধ প্রমাণিত হওয়া নয়। তবে তদন্তের মাধ্যমে প্রশাসনের কর্মকাণ্ড সম্পর্কে তথ্য প্রকাশ, নথি সংগ্রহ এবং সরকারি কর্মকর্তাদের জবাবদিহির আওতায় আনা সম্ভব। রাজনৈতিকভাবে এসব তদন্ত ট্রাম্প প্রশাসনের ওপর ধারাবাহিক চাপ তৈরি করতে পারে। একই সঙ্গে আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে ডেমোক্র্যাটদের সমর্থন ছাড়া অনেক গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ এগিয়ে নেওয়া কঠিন হয়ে পড়বে।
সিনেটের নিয়ন্ত্রণ হারানো ট্রাম্পের জন্য আরও একটি বড় চ্যালেঞ্জ। যুক্তরাষ্ট্রে প্রেসিডেন্টের গুরুত্বপূর্ণ নিয়োগের ক্ষেত্রে সিনেটের অনুমোদন প্রয়োজন হয়। মন্ত্রিসভার সদস্য, বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক পদ এবং বিচার বিভাগীয় নিয়োগের ক্ষেত্রে সিনেটের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ফলে ডেমোক্র্যাটরা সংখ্যাগরিষ্ঠ হওয়ায় ট্রাম্পের পছন্দের প্রার্থীদের অনুমোদন প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হতে পারে। কোনো নিয়োগ আটকে গেলে প্রশাসনের কার্যক্রমেও প্রভাব পড়বে।
তবে কংগ্রেসের দুই কক্ষ হারানোর অর্থ এই নয় যে ট্রাম্প তাঁর প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা হারিয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান অনুযায়ী, পররাষ্ট্রনীতি পরিচালনা, সামরিক বাহিনীর সর্বাধিনায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন এবং নির্বাহী আদেশ জারির মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষমতা এখনো তাঁর হাতে রয়েছে। ডেমোক্র্যাটরা আইন প্রণয়ন ও নিয়োগের ক্ষেত্রে বাধা তৈরি করতে পারলেও প্রেসিডেন্টের সব সিদ্ধান্ত সরাসরি বন্ধ করতে পারবেন না। বিশেষ করে সামরিক বাহিনী মোতায়েন কিংবা আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে প্রেসিডেন্টের হাতে উল্লেখযোগ্য ক্ষমতা রয়েছে। ফলে আগামী দুই বছর যুক্তরাষ্ট্রে নির্বাহী ক্ষমতা ও আইনসভা—এই দুই প্রতিষ্ঠানের মধ্যে টানাপোড়েন আরও বাড়তে পারে।
নির্বাচনের আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো ডেমোক্র্যাটদের বিভিন্ন ঐতিহাসিক অর্জন। মিশিগান থেকে আবদুল আল-সাইদের সিনেটর নির্বাচিত হওয়ার ঘটনাকে যুক্তরাষ্ট্রের মুসলিম রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। মিসরীয় বংশোদ্ভূত এই রাজনীতিকের বিজয় যুক্তরাষ্ট্রের বহুজাতিক ও বহুসাংস্কৃতিক সমাজে রাজনৈতিক অংশগ্রহণের প্রশ্নটিকে নতুন করে সামনে এনেছে। নির্বাচনী প্রচারের সময় তাঁকে ঘিরে মুসলিমবিদ্বেষী বক্তব্য ও রাজনৈতিক বিরোধিতা থাকলেও শেষ পর্যন্ত ভোটারদের সমর্থন তাঁর পক্ষে গেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
নিউ মেক্সিকো থেকে ডেব হালান্ডের জয়ও ইতিহাসের অংশ। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম আদিবাসী নারী গভর্নর হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন। মিনেসোটা থেকে পেগি ফ্ল্যানাগানের সিনেটর নির্বাচিত হওয়ার ঘটনাও আদিবাসী জনগোষ্ঠীর রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বে নতুন অধ্যায় তৈরি করেছে। জর্জিয়ায় কেইশা ল্যান্স এবং টেক্সাসে জিনা হিনোজোসার বিজয়ও জাতিগত ও লৈঙ্গিক প্রতিনিধিত্বের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। এসব বিজয় দেখিয়ে দিচ্ছে, মার্কিন রাজনীতিতে পরিচয়, বৈচিত্র্য এবং প্রতিনিধিত্বের প্রশ্ন এখনো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
প্রতিনিধি পরিষদে ডেমোক্র্যাটদের জয়কে গত ৩৫ বছরের মধ্যে অন্যতম বড় সাফল্য হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। এই বিজয়ের পর দলটির নেতা হাকিম জেফ্রিস স্পিকার হওয়ার পথে এগিয়ে রয়েছেন। এর ফলে প্রতিনিধি পরিষদের নেতৃত্বে পরিবর্তন আসবে। ডেমোক্র্যাটদের জন্য এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিকে বাস্তব রাজনৈতিক কর্মসূচিতে রূপান্তর করা। শুধু ট্রাম্পবিরোধী অবস্থানের কারণে ভোট পাওয়া আর জনগণের জীবনযাত্রায় বাস্তব পরিবর্তন আনা এক বিষয় নয়।
এখানেই ডেমোক্র্যাটদের সামনে কঠিন পরীক্ষা অপেক্ষা করছে। জীবনযাত্রার ব্যয় কমানো, স্বাস্থ্যসেবা সহজলভ্য করা, আবাসন ব্যয় নিয়ন্ত্রণ এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ানো—এসব বিষয়ে তাঁদের কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। বিশেষ করে স্বাস্থ্যবিমার ক্ষেত্রে অ্যাফোর্ডেবল কেয়ার অ্যাক্টের আওতায় অতিরিক্ত ভর্তুকির মেয়াদ শেষ হওয়ার পর অনেক মার্কিন নাগরিকের প্রিমিয়াম বেড়েছে। ডেমোক্র্যাটরা এসব ভর্তুকি পুনর্বহালের উদ্যোগ নিতে পারেন। নিম্ন আয়ের মানুষের স্বাস্থ্যসেবা কর্মসূচিতে বরাদ্দ কমানোর সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধেও তাঁরা অবস্থান নিতে পারেন।
তবে এসব উদ্যোগ বাস্তবায়ন সহজ হবে না। কংগ্রেসের দুই কক্ষ নিয়ন্ত্রণ করলেও প্রেসিডেন্টের ভেটো ক্ষমতা রয়েছে। কোনো বিল পাস হওয়ার পর ট্রাম্প তাতে ভেটো দিতে পারেন। সেই ভেটো অতিক্রম করতে হলে কংগ্রেসের উভয় কক্ষে দুই-তৃতীয়াংশ সমর্থন প্রয়োজন। ফলে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলেই ডেমোক্র্যাটরা তাঁদের সব পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে পারবেন, এমন নিশ্চয়তা নেই। বরং প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে রাজনৈতিক সমঝোতা, দর-কষাকষি এবং সাংবিধানিক ক্ষমতার সীমাবদ্ধতা বিবেচনায় রাখতে হবে।
ট্রাম্পের জন্যও এখন কৌশল পরিবর্তনের প্রয়োজন দেখা দিতে পারে। নির্বাচনের আগে ডেমোক্র্যাটদের বিরুদ্ধে কঠোর ভাষায় আক্রমণ, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে নানা তকমা দেওয়া এবং জরিপকে গুরুত্ব না দেওয়ার আহ্বান—এসব বক্তব্য তাঁর প্রচারের অংশ ছিল। এমনকি পরাজিত হলে ডেমোক্র্যাটদের উদ্যোগে একের পর এক ভেটো দেওয়ার কথাও বলেছিলেন তিনি। কিন্তু ফলাফল স্পষ্ট হওয়ার পর তাঁর বক্তব্যে পরিবর্তন দেখা যায়। সিবিএস নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ডেমোক্র্যাটদের অভিনন্দন জানিয়ে দেশের কল্যাণে তাঁদের সঙ্গে কাজ করার প্রত্যাশা প্রকাশ করেন তিনি।
ট্রাম্পের এই সুর পরিবর্তনকে রাজনৈতিক বাস্তবতা মেনে নেওয়ার ইঙ্গিত হিসেবে দেখা যেতে পারে। কারণ, আগামী দুই বছর কংগ্রেসের সঙ্গে সংঘাত বাড়ালে তাঁর প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচিগুলো আরও বাধার মুখে পড়বে। অন্যদিকে, সমঝোতার পথ বেছে নিলে কিছু নীতিগত বিষয়ে অগ্রগতি অর্জন করা সম্ভব হতে পারে। তবে ট্রাম্পের রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব এবং তাঁর অতীতের বক্তব্য বিবেচনায় এই সমঝোতা কতটা স্থায়ী হবে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে থেকেও নির্বাচনের ফল নিয়ে প্রতিক্রিয়া এসেছে। স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ, দক্ষিণ আফ্রিকার প্রেসিডেন্ট সিরিল রামাফোসা এবং মেক্সিকোর প্রেসিডেন্ট ক্লদিয়া শেনবাউম ডেমোক্র্যাটদের বিজয়কে স্বাগত জানিয়েছেন। তাঁদের বক্তব্যে অর্থনৈতিক নীতি, রাজনৈতিক পরিবর্তন এবং প্রতিনিধিত্বের বিষয়গুলো গুরুত্ব পেয়েছে। অন্যদিকে, ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফল ওয়াশিংটন ও তেহরানের শত্রুতায় পরিবর্তন আনবে না। এই প্রতিক্রিয়া মনে করিয়ে দেয়, যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিবর্তন আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ওপর প্রভাব ফেললেও সব দ্বন্দ্বের সমাধান এক নির্বাচনে সম্ভব নয়।
বিশ্ব রাজনীতিতে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা এতটাই গুরুত্বপূর্ণ যে দেশটির অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার ভারসাম্য পরিবর্তন আন্তর্জাতিক অর্থনীতি ও কূটনীতিতেও প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে বাণিজ্যনীতি, শুল্ক, জ্বালানি নিরাপত্তা, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত এবং সামরিক কৌশলের মতো বিষয়গুলোতে প্রশাসনের সিদ্ধান্তের পাশাপাশি কংগ্রেসের অবস্থানও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। ট্রাম্পের শুল্কনীতি নিয়ে ডেমোক্র্যাটদের বিরোধিতা বাড়লে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে নতুন আলোচনা তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে ইরান যুদ্ধের বিষয়ে কংগ্রেসের চাপ প্রশাসনের সিদ্ধান্ত গ্রহণকে প্রভাবিত করতে পারে।
তবে ডেমোক্র্যাটদের বিজয় মানেই যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতিতে রাতারাতি আমূল পরিবর্তন আসবে, এমন ধারণা বাস্তবসম্মত নয়। মার্কিন প্রেসিডেন্টের হাতে পররাষ্ট্রনীতি ও সামরিক সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য সাংবিধানিক ক্ষমতা রয়েছে। কংগ্রেসের বিরোধিতা সত্ত্বেও অনেক সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব। তবে অর্থায়ন, আইনগত অনুমোদন, তদন্ত এবং রাজনৈতিক জবাবদিহির মাধ্যমে কংগ্রেস প্রশাসনের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে। ফলে আগামী দুই বছরে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির পাশাপাশি আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রেও নতুন ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে।
সব মিলিয়ে ২০২৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচন ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের জন্য একটি বড় রাজনৈতিক সতর্কবার্তা। ভোটাররা শুধু একটি দলের বিপক্ষে অবস্থান নেননি; তাঁরা অর্থনৈতিক স্বস্তি, প্রশাসনিক জবাবদিহি এবং ক্ষমতার ভারসাম্য নিয়েও নিজেদের প্রত্যাশা প্রকাশ করেছেন। এখন প্রশ্ন হলো, ডেমোক্র্যাটরা এই জনসমর্থনকে কতটা কার্যকর রাজনৈতিক পরিবর্তনে রূপ দিতে পারবেন এবং ট্রাম্প কতটা দক্ষতার সঙ্গে নতুন কংগ্রেসের সঙ্গে কাজ করতে পারবেন।
মার্কিন রাজনীতিতে ক্ষমতা ধরে রাখা যতটা কঠিন, ক্ষমতা হারানোর পরও রাজনৈতিক প্রভাব বজায় রাখা অনেক সময় তার চেয়েও কঠিন। ট্রাম্প এখনো হোয়াইট হাউসে রয়েছেন, তাঁর হাতে রয়েছে প্রেসিডেন্টের সাংবিধানিক ক্ষমতা এবং রিপাবলিকান পার্টির ওপর তাঁর প্রভাবও গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে তাঁর প্রশাসন এমন এক রাজনৈতিক বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছে, যেখানে প্রতিটি বড় সিদ্ধান্তে বিরোধী দলের ভূমিকা উপেক্ষা করা কঠিন হবে। অন্যদিকে, ডেমোক্র্যাটদের জন্য এই জয় যেমন সম্ভাবনার দরজা খুলেছে, তেমনি তৈরি করেছে জনগণের প্রত্যাশা পূরণের কঠিন দায়িত্ব। আগামী দুই বছরই নির্ধারণ করবে, এই নির্বাচন কেবল ট্রাম্পের জন্য সাময়িক ধাক্কা ছিল, নাকি যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তনের সূচনা।
আপনার মতামত জানানঃ