
সিলিন্ডারের গ্যাস ফুরিয়ে গেলে পরের মাসের মূল্যঘোষণা পর্যন্ত অপেক্ষা করার সুযোগ থাকে না। অক্টোবরের ঢাকায় ১২ কেজির এলপিজি সিলিন্ডারের নির্ধারিত দাম ছিল ১,৮৩৭ টাকা। প্রথম আলোর প্রতিবেদনে দেখা যায়, কোনো কোনো দোকানে ক্রেতাকে দিতে হয়েছে ২,২০০ থেকে ২,৫০০ টাকা। নভেম্বরে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) নির্ধারিত দাম আরও ২২৩ টাকা বাড়িয়ে ২,০৬০ টাকা করেছে। অক্টোবরের দোকানদর আর নভেম্বরের ঘোষিত দর ভিন্ন সময়ের হিসাব। তবে অক্টোবরের অভিজ্ঞতা একটি প্রশ্ন সামনে আনে। কমিশন যে দাম বেঁধে দেয়, সেই দামে দোকানে গ্যাস পৌঁছানোর ব্যবস্থা কতটা কার্যকর?
২০২১ সালের এপ্রিলে বেসরকারি ১২ কেজি সিলিন্ডারের প্রথম নির্ধারিত দর ছিল ৯৭৫ টাকা। সাড়ে পাঁচ বছরে তা বেড়েছে ১,০৮৫ টাকা, প্রায় ১১১ শতাংশ। এর মধ্যে সেপ্টেম্বর থেকে নভেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত দুই দফায় বেড়েছে ৪৭৫ টাকা। এ হিসাব নির্ধারিত দরের। কোনো পরিবারের রান্নার খরচ কতটা বেড়েছে, তা নির্ভর করে তারা কত ঘন ঘন সিলিন্ডার বদলায় এবং স্থানীয় দোকানে কত দামে পায় তার ওপর।
এক বছরেই দুই ধরনের সরবরাহসংকট
জানুয়ারির সংকটের শুরু আমদানি পর্যায়ে। কয়েকটি বড় আমদানিকারক ঋণপত্র খুলতে সমস্যায় পড়েছিল। প্রথম আলো জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের তথ্য উদ্ধৃত করে জানিয়েছে, ২০২৫ সালের নভেম্বরে আগের বছরের একই মাসের তুলনায় এলপিজি আমদানি ৪৪ শতাংশ কমে। জানুয়ারির মাঝামাঝি নির্ধারিত দর ১,৩০৬ টাকা থাকলেও ঢাকার মোহাম্মদপুরে ২,৩০০ টাকায় সিলিন্ডার বিক্রির নজির পাওয়া যায়। ব্যাংকিং জটিলতা তাই শেষ পর্যন্ত ক্রেতার রান্নার খরচে এসে পড়ে।
সেপ্টেম্বরে ছবিটা আলাদা। অপারেটরদের সংগঠন লোয়াবের হিসাবে আগস্টে প্রায় ১ লাখ ৫৮ হাজার টন এবং সেপ্টেম্বরে প্রায় ১ লাখ ৫৬ হাজার টন এলপিজি আমদানি হয়েছিল। অথচ সেপ্টেম্বরের শেষ ভাগে ডিলারদের সরবরাহ কমে যায়। মাসিক আমদানির অঙ্ক দিয়ে বোঝা যায় কত গ্যাস দেশে এসেছে। কোন কোম্পানির গ্যাস কখন খালাস হয়েছে, কতটা বোতলজাত হয়েছে এবং কোন এলাকায় কতটা পাঠানো হয়েছে, তার উত্তর পেতে দৈনিক হিসাব দরকার।
আমদানির ব্যয় কতটা বেড়েছে, সরবরাহ কমল কেন
বিইআরসি সৌদি আরামকোর মাসিক চুক্তিমূল্যকে ভিত্তি ধরে। এর সঙ্গে জাহাজভাড়া, ট্রেডারের প্রিমিয়াম এবং দেশীয় ব্যয় যোগ হয়। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের মধ্যে আমদানির ব্যয় দ্রুত বদলেছে। সেপ্টেম্বরে কমিশন জাহাজভাড়া ও প্রিমিয়াম বাবদ টনপ্রতি ১৬০ ডলার ধরেছিল। প্রথম আলোর বাজার অনুসন্ধানে সে সময়ের জন্য ২৬০ থেকে ৪০০ ডলারের হিসাব উঠে আসে। অক্টোবরে কারিগরি কমিটি ১৬০ ডলার বহাল রাখার সুপারিশ করলেও কমিশন ২৫০ ডলার ধরে। পরে কোম্পানিগুলো সরবরাহ বাড়াতে শুরু করে বলে প্রথম আলো জানিয়েছে।
কোম্পানিগুলোর দাবি, আগের দরে বিক্রি করলে লোকসান হচ্ছিল। কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) অভিযোগ করেছে, কয়েকটি কোম্পানি মজুত আটকে কৃত্রিম সংকট তৈরি করেছে। দাম বাড়ার পর সরবরাহ বেড়েছে বলে এ দুই ব্যাখ্যার মধ্যে কোনটি কতটা খাটে, তা নির্ধারণ করা যায় না। চালানভিত্তিক ক্রয়মূল্য ও জাহাজভাড়া দিয়ে ব্যয়ের দাবি যাচাই করা যায়। আর আমদানি, মজুত, বোতলজাতকরণ ও ডিলারকে ছাড় করা গ্যাসের দৈনিক হিসাব মিলিয়ে বোঝা যায় কোথায় সরবরাহ আটকে ছিল। বিইআরসি ১২টি কোম্পানির কাছে তথ্য চেয়েছে বলে প্রথম আলো জানিয়েছে। প্রতিবেদন প্রকাশের সময় যাচাইয়ের ফল প্রকাশিত হয়নি।
আন্তর্জাতিক দাম কমলেও দেশীয় ব্যয়ের অংশ বহাল থাকতে পারে। প্রথম আলোর হিসাবে নভেম্বরের দরে কোম্পানি, ডিলার ও দোকানদারের জন্য নির্ধারিত অংশ যথাক্রমে ২৮২, ৮৫ ও ৭০ টাকা। মোট ৪৩৭ টাকা। এই অঙ্ক নির্ধারিত মূল্যকাঠামোয় বরাদ্দ, সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর নিট মুনাফার হিসাব আলাদা। বিশ্ববাজারে দর কমার সুফল বিচার করতে হলে পরের মূল্যাদেশে আমদানি ব্যয়ের পাশাপাশি এই বরাদ্দগুলোর পরিবর্তনও দেখতে হবে।
কোম্পানি বদলের খরচও ক্রেতার ঘাড়ে
প্রথম আলোর হিসাবে দেশের এলপিজি সরবরাহের প্রায় ৯৯ শতাংশ বেসরকারি খাতের হাতে। নিয়মিত আমদানি করে আট থেকে দশটি কোম্পানি। কোনো একটি ব্র্যান্ডের সরবরাহ বন্ধ হলে কাগজে বাজারে অন্য ব্র্যান্ড থাকার পরও ক্রেতার বিকল্প সীমিত হতে পারে। প্রতিবেদনে দেখা গেছে, বন্ধ কোম্পানির খালি সিলিন্ডার অনেক বিক্রেতা ফেরত নিতে চান না। ফলে কিছু পরিবারকে গ্যাসের দামের সঙ্গে অন্য ব্র্যান্ডের সিলিন্ডার কেনার খরচও গুনতে হয়।
সরবরাহসংকটের সময়ে বিইআরসির সিদ্ধান্ত বিচার করার জন্য তাই দোকান পর্যন্ত নজর রাখতে হবে। এলাকায় এলাকায় কত দামে বিক্রি হচ্ছে, কোন ব্র্যান্ড পাওয়া যাচ্ছে এবং সরবরাহের ব্যবধান কোথায় তৈরি হচ্ছে, এই তিন তথ্য একসঙ্গে প্রকাশ করলে নতুন দর কতটা কাজ করেছে বোঝা যাবে। নভেম্বরের মূল্যবৃদ্ধির পর ২,০৬০ টাকায় সিলিন্ডার কতটা সহজে মিলছে, নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার সবচেয়ে সরাসরি পরীক্ষা সেটিই।
আপনার মতামত জানানঃ