ইসরায়েলের রাজনীতিতে নির্বাচন মানেই শুধু ভোটের হিসাব নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে জোটের সমীকরণ, আদর্শিক বিভাজন, নিরাপত্তার প্রশ্ন এবং ক্ষমতা ধরে রাখার কঠিন লড়াই। প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে ঘিরে সাম্প্রতিক নির্বাচনী পরিস্থিতি আবারও সেই বাস্তবতাকে সামনে নিয়ে এসেছে। নির্বাচনে তাঁর নেতৃত্বাধীন জোট প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে পারেনি। অন্যদিকে, নেতানিয়াহুবিরোধী শিবিরও সরকার গঠনের মতো নিশ্চিত অবস্থানে পৌঁছাতে পারেনি। ফলে এমন এক রাজনৈতিক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, যেখানে নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠ সমর্থন না পেয়েও আপাতত প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্বে থেকে যাচ্ছেন নেতানিয়াহু।
প্রথম আলোর ২৮ অক্টোবর ২০২৬-এর প্রতিবেদনে এবিসি নিউজের বরাতে উঠে এসেছে, ইসরায়েলের এই নির্বাচনে দুটি বিষয় বিশেষভাবে আলোচনায় এসেছে। একদিকে রয়েছে কোনো পক্ষেরই নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে না পারা, অন্যদিকে রয়েছে আরব ইসরায়েলিদের রাজনৈতিক গুরুত্ব বৃদ্ধি। দীর্ঘদিন ধরে ইসরায়েলের মূলধারার রাজনীতিতে যাঁদের অংশগ্রহণ নানা সীমাবদ্ধতার মুখে পড়েছে, সেই আরব রাজনৈতিক শক্তিগুলোই এখন সরকার গঠনের সমীকরণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। এই পরিস্থিতি শুধু নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নয়, ইসরায়েলের গণতন্ত্র, সংখ্যালঘুদের প্রতিনিধিত্ব এবং মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়েও নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে।
ইসরায়েলের পার্লামেন্ট নেসেটের মোট আসনসংখ্যা ১২০। সরকার গঠন করতে প্রয়োজন অন্তত ৬১টি আসনের সমর্থন। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা বুথফেরত জরিপ অনুযায়ী, নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন জোট ৫২টি আসন পেতে পারে। অর্থাৎ সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা থেকে তারা নয়টি আসন পিছিয়ে রয়েছে। অন্যদিকে, বিরোধী শিবিরের পক্ষেও সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় সমর্থন নিশ্চিত করা সহজ হচ্ছে না। নির্বাচনের এই ফলাফল এমন একটি পরিস্থিতি তৈরি করেছে, যেখানে কে সবচেয়ে বেশি আসন পেয়েছে, তার চেয়ে কে অন্য দলগুলোকে নিজের পক্ষে আনতে পারবে, সেটিই হয়ে উঠেছে বড় প্রশ্ন।
সংসদীয় গণতন্ত্রে সবচেয়ে বেশি আসন পাওয়া এবং সরকার গঠন করা দুটি আলাদা বিষয়। কোনো দল নির্বাচনে এগিয়ে থাকলেও প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা না থাকলে তাকে অন্য দলের সঙ্গে সমঝোতা করতে হয়। কখনো ছোট দলগুলোর সমর্থন নিয়ে সরকার গঠিত হয়, কখনো নির্বাচনের পর দীর্ঘ দর-কষাকষি চলে। আবার কোনো পক্ষই প্রয়োজনীয় সমর্থন নিশ্চিত করতে না পারলে নতুন নির্বাচন পর্যন্ত পরিস্থিতি গড়াতে পারে। ইসরায়েলের বর্তমান রাজনৈতিক সংকটেও এই বাস্তবতা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
নেতানিয়াহুর জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো, বিরোধী শিবির থেকে অন্তত একটি গুরুত্বপূর্ণ দলকে নিজের দিকে টেনে আনা। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সাবেক প্রধানমন্ত্রী নাফতালি বেনেটের নেতৃত্বাধীন ‘টুগেদার’ দল সম্ভাব্য ১২ থেকে ১৩টি আসন পেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। নেতানিয়াহুর ৫২টি আসনের সঙ্গে এই আসনগুলো যুক্ত হলে তাঁর জোটের মোট আসনসংখ্যা ৬৪ বা ৬৫-তে পৌঁছাতে পারে। তবে রাজনৈতিক বাস্তবতা কেবল গাণিতিক হিসাবের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বেনেটের দল যদি নেতানিয়াহুর সঙ্গে জোটে যোগ দিতে অস্বীকৃতি জানায়, তাহলে এই সম্ভাব্য সমীকরণ কার্যকর হবে না।
এখানেই নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ সবচেয়ে বেশি অনিশ্চিত হয়ে উঠেছে। নাফতালি বেনেট এবং ইয়ার লাপিদের নেতৃত্বাধীন বিরোধী শিবিরের অন্যতম লক্ষ্যই ছিল নেতানিয়াহুকে ক্ষমতা থেকে সরানো। ফলে নির্বাচনের পর তাঁর সঙ্গে জোট গঠন করা বেনেটের জন্য শুধু রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নয়, বরং নিজের নির্বাচনী অবস্থান ও সমর্থকদের প্রত্যাশার সঙ্গেও সম্পর্কিত। নির্বাচনী প্রচারে নেতানিয়াহুর বিরোধিতা করে পরে তাঁর সঙ্গেই সরকার গঠন করতে গেলে বেনেটকে কঠিন রাজনৈতিক ব্যাখ্যা দিতে হতে পারে।
বুথফেরত জরিপের ফল প্রকাশের পর বেনেটের বক্তব্যও এই অবস্থানকে স্পষ্ট করেছে। তিনি ঘোষণা দিয়েছেন, নেতানিয়াহু নির্বাচনে হেরে গেছেন এবং তাঁর সরকারের বাড়ি ফেরার সময় হয়েছে। যদিও বুথফেরত জরিপ চূড়ান্ত ফল নয়, তবু এই বক্তব্য থেকে বোঝা যায়, নেতানিয়াহুর সঙ্গে সমঝোতার সম্ভাবনা রাজনৈতিকভাবে কতটা জটিল। সরকার গঠনের আলোচনায় শেষ পর্যন্ত কে কতটা ছাড় দিতে প্রস্তুত থাকবেন, তার ওপর নির্ভর করবে পরবর্তী পরিস্থিতি।
এদিকে, নির্বাচনের ফলাফল নেতানিয়াহুবিরোধী শিবিরের মধ্যেও ঐক্যের অভাব সামনে এনেছে। বিরোধী নেতারা দীর্ঘদিন ধরে নেতানিয়াহুকে ক্ষমতা থেকে সরানোর বিষয়ে একমত হলেও সরকার গঠনের পদ্ধতি নিয়ে তাঁদের মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে। বিশেষ করে আরব রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে জোট গঠন কিংবা তাদের সমর্থন নিয়ে সরকার পরিচালনার প্রশ্নটি বড় বিতর্কে পরিণত হয়েছে। নীতিগতভাবে নেতানিয়াহুবিরোধী হলেও এসব দল একসঙ্গে সরকার গঠনের বিষয়ে একমত হতে না পারলে তাদের সম্মিলিত শক্তি কার্যকর রাজনৈতিক ফল বয়ে আনতে পারবে না।
ইসরায়েলের রাজনীতিতে আরব নাগরিকদের প্রতিনিধিত্বের প্রশ্নটি দীর্ঘদিন ধরেই গুরুত্বপূর্ণ। দেশটির আরব নাগরিকেরা জনসংখ্যার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ হলেও জাতীয় পর্যায়ের রাজনৈতিক ক্ষমতায় তাঁদের অংশগ্রহণ নানা বাধার মুখে পড়েছে। ইসরায়েলের মূলধারার অনেক ইহুদি রাজনৈতিক দল আরব দলগুলোর সঙ্গে আনুষ্ঠানিক জোট গঠনের ব্যাপারে দীর্ঘদিন অনীহা দেখিয়েছে। নিরাপত্তা, জাতীয় পরিচয়, ফিলিস্তিন প্রশ্ন এবং রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নিয়ে মতাদর্শিক বিভাজন এই অনীহার পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
তবে নির্বাচনের পর যখন কোনো পক্ষই এককভাবে সরকার গঠনের মতো আসন পায় না, তখন রাজনৈতিক বাস্তবতা অনেক সময় পুরোনো অবস্থানকে নতুন করে বিবেচনা করতে বাধ্য করে। আরব দলগুলোর সমর্থন তখন সরকার গঠনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে তাদের ভূমিকা কেবল সংসদে কয়েকটি আসনের প্রতিনিধিত্বে সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং রাষ্ট্র পরিচালনার সিদ্ধান্তে প্রভাব বিস্তারের সুযোগও তৈরি হয়। রাজনৈতিক ভাষায় এই অবস্থানকে বলা হয় ‘কিংমেকার’—অর্থাৎ সরাসরি সরকার পরিচালনার নেতৃত্বে না থেকেও সরকার কে গঠন করবে, তা নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা।
এই সম্ভাবনা ইসরায়েলের রাজনীতিতে একটি তাৎপর্যপূর্ণ পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। দীর্ঘদিন ধরে যেসব রাজনৈতিক শক্তিকে ক্ষমতার অংশীদার হিসেবে গ্রহণ করতে অনীহা দেখানো হয়েছে, সংখ্যাগরিষ্ঠতার সংকট তাদের গুরুত্ব বাড়িয়ে দিতে পারে। তবে আরব দলগুলোর সমর্থন পাওয়া মানেই যে তাদের সব দাবি পূরণ হবে, এমন নয়। সরকার গঠনের আলোচনায় তারা কোন শর্ত দেবে, বিরোধী দলগুলো সেই শর্ত কতটা গ্রহণ করবে এবং শেষ পর্যন্ত কতটা সহযোগিতা প্রতিষ্ঠিত হবে—এসব প্রশ্নের উত্তরই নির্ধারণ করবে এই রাজনৈতিক পরিবর্তনের গভীরতা।
অন্যদিকে, বিরোধী শিবিরের নেতা অ্যাভিগদর লিবারম্যান যেকোনো ধরনের সংখ্যালঘু সরকারের সম্ভাবনা নাকচ করে দিয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁর অবস্থান কার্যকর হলে আরব দলগুলোর সমর্থন নিয়ে সরকার গঠনের পথ আরও জটিল হতে পারে। কারণ, কোনো সরকার সংসদে আনুষ্ঠানিক সংখ্যাগরিষ্ঠতা ছাড়া দায়িত্ব পালন করতে চাইলে তার প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে সমর্থন নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে নেতানিয়াহুবিরোধী দলগুলোর সামনে দ্বৈত চ্যালেঞ্জ রয়েছে: একদিকে তাঁকে ক্ষমতা থেকে সরানো, অন্যদিকে নিজেদের মধ্যে রাজনৈতিক ঐকমত্য তৈরি করা।
এই অচলাবস্থার মধ্যে নেতানিয়াহুর নিজের দল লিকুদ পার্টির ভেতরেও ভিন্ন মতের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দলের কয়েকজন প্রবীণ রাজনীতিক জাতীয় ঐক্যের স্বার্থে নেতানিয়াহুকে ছেড়ে গাদি আইজেনকটের নেতৃত্বাধীন জোটে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। এমন আহ্বান বাস্তবায়িত হলে তা শুধু সরকার গঠনের হিসাব বদলে দেবে না, নেতানিয়াহুর দীর্ঘ রাজনৈতিক নেতৃত্ব নিয়েও প্রশ্ন তৈরি করবে। তবে দলীয় পর্যায়ে এমন মতপার্থক্য থাকলেই যে বড় ধরনের ভাঙন ঘটবে, তা নিশ্চিত নয়। ক্ষমতার ভাগাভাগি, রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ এবং নির্বাচনী
আপনার মতামত জানানঃ