বাংলাদেশের বিদ্যুৎ ব্যবস্থায় আদানি পাওয়ারের বিদ্যুৎ যেন এক গলার কাঁটা। একদিকে দেশের বিদ্যুৎ চাহিদা পূরণে আমদানি করা এই বিদ্যুতের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ, অন্যদিকে এর উচ্চমূল্য, চুক্তির কাঠামো, বৈদেশিক মুদ্রার ব্যয় এবং সরবরাহের অনিশ্চয়তা নিয়ে বাড়ছে প্রশ্ন। বিদ্যুৎ কিনতে গিয়ে বাংলাদেশ কতটা বেশি অর্থ দিচ্ছে, সেই অর্থে বিকল্প কোনো জ্বালানি অবকাঠামো গড়ে তোলা যেত কি না, আর একটি মাত্র আন্তঃসীমান্ত বিদ্যুৎকেন্দ্রের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা দেশের জ্বালানি নিরাপত্তাকে কতটা ঝুঁকির মুখে ফেলছে—এসব প্রশ্ন এখন আর কেবল অর্থনীতিবিদ বা জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের আলোচনায় সীমাবদ্ধ নেই। তা হয়ে উঠেছে জাতীয় স্বার্থের বিষয়।
ভারতের ঝাড়খণ্ডের গড্ডায় অবস্থিত আদানি পাওয়ারের ১ হাজার ৬০০ মেগাওয়াট কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ আমদানি শুরু হওয়ার পর থেকেই চুক্তির মূল্য ও শর্ত নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। সর্বশেষ জাতীয় পর্যালোচনা কমিটির মূল্যায়ন এবং প্রকাশিত বিদ্যুৎ ক্রয়সংক্রান্ত হিসাব সেই বিতর্ককে আরও তীব্র করেছে। কমিটির হিসাবে, আদানির বিদ্যুতের মূল্য নিকটতম বেসরকারি প্রতিযোগীর তুলনায় ৩৯ দশমিক ৭ শতাংশ বেশি। সামগ্রিকভাবে যৌক্তিক বাজারদরের তুলনায় এই বিদ্যুতের মূল্য প্রায় ৫০ শতাংশ বেশি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এর ফলে বাংলাদেশকে বছরে প্রায় ৪০০ থেকে ৫০০ মিলিয়ন ডলার অতিরিক্ত ব্যয়ের মুখে পড়তে হতে পারে।
এই হিসাব কেবল একটি বিদ্যুৎকেন্দ্রের বিলের অঙ্ক নয়। এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে দেশের বিদ্যুৎ খাতের আর্থিক সক্ষমতা, সরকারি ভর্তুকির চাপ, ডলারের সংকট, আমদানি ব্যয় এবং দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি পরিকল্পনা। একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ কেনার সিদ্ধান্ত যখন জাতীয় বাজেট ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর প্রভাব ফেলে, তখন সেই সিদ্ধান্তের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা স্বাভাবিক। বিশেষ করে যখন একই সময়ে দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা বাড়ছে, কিন্তু অনেক বিদ্যুৎকেন্দ্রকে বসিয়ে রেখেও কেন্দ্রভাড়া দিতে হচ্ছে, তখন উচ্চমূল্যের বিদ্যুৎ আমদানির বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
প্রকাশিত সর্বশেষ পূর্ণাঙ্গ ইউনিটভিত্তিক হিসাব অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে বাংলাদেশ আদানির কাছ থেকে প্রায় ৮ দশমিক ১৬ বিলিয়ন ইউনিট বিদ্যুৎ গ্রহণ করে। ওই অর্থবছরে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের গড় মূল্য ছিল ১৪ টাকা ৮৭ পয়সা। ফলে মোট ব্যয় দাঁড়ায় প্রায় ১২ হাজার ১০০ কোটি টাকা। একই সময়ে ভারতের অন্যান্য বিদ্যুৎ সরবরাহকারীর কাছ থেকে বিদ্যুৎ কেনার গড় মূল্য ছিল প্রতি ইউনিট ৯ টাকা ৫৭ পয়সা। অর্থাৎ, আদানির বিদ্যুতের জন্য বাংলাদেশকে ইউনিটপ্রতি প্রায় ৫ টাকা ৩০ পয়সা বেশি দিতে হয়েছে। শতাংশের হিসাবে এই ব্যবধান প্রায় ৫৫ শতাংশ।
এক বছরে ৮ দশমিক ১৬ বিলিয়ন ইউনিট বিদ্যুতের ওপর ইউনিটপ্রতি ৫ টাকা ৩০ পয়সা অতিরিক্ত ব্যয় হলে মোট পার্থক্য দাঁড়ায় প্রায় ৪ হাজার ৩০০ কোটি টাকা। ভারতের অন্যান্য সরবরাহকারীদের গড় দরে একই পরিমাণ বিদ্যুৎ কেনা হলে ব্যয় হতো আনুমানিক ৭ হাজার ৮০৫ কোটি টাকা। কিন্তু আদানির বিদ্যুতের জন্য ব্যয় হয়েছে প্রায় ১২ হাজার ১০০ কোটি টাকা। ফলে শুধু ২০২৩-২৪ অর্থবছরেই বাড়তি ব্যয়ের পরিমাণ ৪ হাজার কোটি টাকার বেশি।
তবে এই অঙ্ককে পুরো চুক্তির মেয়াদের চূড়ান্ত ক্ষতি হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। কারণ পরবর্তী বছরগুলোর বিদ্যুৎ সরবরাহ, কয়লার আন্তর্জাতিক মূল্য, ডলারের বিনিময় হার, ক্যাপাসিটি চার্জ এবং অন্যান্য ব্যয়ের পূর্ণাঙ্গ হিসাব প্রকাশ্যে নেই। বিদ্যুৎ আমদানির মূল্য নির্ধারণে জ্বালানি ব্যয় ও অন্যান্য চার্জের ভূমিকা রয়েছে। ফলে একটি নির্দিষ্ট অর্থবছরের হিসাব দিয়ে পুরো ২৫ বছরের চুক্তির আর্থিক প্রভাব নির্ধারণ করা যাবে না। কিন্তু একটি বিষয় স্পষ্ট—প্রকাশিত সর্বশেষ পূর্ণাঙ্গ হিসাবেই আদানির বিদ্যুতের উচ্চমূল্যের কারণে বাংলাদেশের ওপর বড় ধরনের আর্থিক চাপের চিত্র পাওয়া যাচ্ছে।
এই চাপের বিপরীতে উঠে আসছে বিকল্প বিনিয়োগের প্রশ্ন। আদানিকে দেয়া অর্থ দিয়ে বাংলাদেশ কতটা সৌরবিদ্যুৎ সক্ষমতা গড়ে তুলতে পারত? ২০২৩-২৪ অর্থবছরে আদানিকে পরিশোধ করা প্রায় ১২ হাজার ১০০ কোটি টাকা যদি ইউটিলিটি-স্কেল সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পে বিনিয়োগ করা হতো, তাহলে আনুমানিক ১ হাজার ২৪০ থেকে ১ হাজার ৬৫০ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করা সম্ভব হতে পারত। এ হিসাব করা হয়েছে প্রতি মেগাওয়াটে ৬ থেকে ৮ লাখ মার্কিন ডলার মূলধনী ব্যয় ধরে।
২০২৫ সালের জুনে পরিশোধিত প্রায় ৪৩৭ মিলিয়ন ডলার বা প্রায় ৫ হাজার ৩০০ কোটি টাকা যুক্ত করে মোট ১৭ হাজার ৪০০ কোটি টাকা বিবেচনায় নিলে সম্ভাব্য সৌরবিদ্যুৎ সক্ষমতা দাঁড়াতে পারে আনুমানিক ১ হাজার ৮০০ থেকে ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট। গড় হিসাবে প্রায় ২ হাজার ১০০ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ সক্ষমতা নির্মাণের সম্ভাবনার কথা বলা হচ্ছে।
এখানে অবশ্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়েছে। সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্রের স্থাপিত সক্ষমতা এবং কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রকৃত বার্ষিক উৎপাদন সরাসরি তুলনীয় নয়। সৌরবিদ্যুৎ সূর্যালোকের ওপর নির্ভরশীল। ফলে সৌরকেন্দ্রের ক্যাপাসিটি ফ্যাক্টর কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রের তুলনায় সাধারণত কম। অন্যদিকে আদানির গড্ডা কেন্দ্রের মোট সক্ষমতা ১ হাজার ৬০০ মেগাওয়াট এবং এটি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র। একই সংখ্যক মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ ও কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে সমপরিমাণ বিদ্যুৎ পাওয়া যায় না।
তবু এই তুলনা অপ্রাসঙ্গিক নয়। কারণ এখানে প্রশ্নটি শুধু উৎপাদিত বিদ্যুতের পরিমাণ নিয়ে নয়, বরং বিনিয়োগের সুযোগ-ব্যয় নিয়ে। একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ দিয়ে বাংলাদেশ দীর্ঘমেয়াদি বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তির আওতায় বিদেশি একটি কেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ কিনছে, নাকি সেই অর্থ দিয়ে নিজস্ব নবায়নযোগ্য জ্বালানি সক্ষমতা গড়ে তুলছে—এই সিদ্ধান্তের প্রভাব বহু বছর ধরে থাকে। সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের পর জ্বালানি হিসেবে কয়লা বা গ্যাস আমদানির প্রয়োজন হয় না। ফলে আন্তর্জাতিক জ্বালানির বাজারদরের ওঠানামা, পরিবহন ব্যয় এবং বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ তুলনামূলকভাবে কম হতে পারে।
বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর জ্বালানি অর্থনীতির জন্য এই বিষয়টি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। কয়লা, গ্যাস ও তেল আমদানির ব্যয় যখন বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে চাপ তৈরি করে, তখন বিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যয়ও বেড়ে যায়। আমদানি করা কয়লার দাম বাড়লে বিদ্যুৎকেন্দ্রের জ্বালানি ব্যয় বাড়ে। ডলারের বিনিময় হার বাড়লে একই পরিমাণ বিদ্যুৎ কিনতে দেশীয় মুদ্রায় বেশি অর্থ লাগে। এর সঙ্গে যদি উচ্চ ক্যাপাসিটি চার্জ এবং অন্যান্য অতিরিক্ত ব্যয় যুক্ত হয়, তাহলে বিদ্যুৎ খাতের আর্থিক ভারসাম্য আরও দুর্বল হতে পারে।
জাতীয় পর্যালোচনা কমিটির প্রতিবেদনে আদানি চুক্তির কাঠামোগত দিক নিয়েও গুরুতর প্রশ্ন তোলা হয়েছে। কমিটির মূল্যায়নে, আন্তঃসীমান্ত বিদ্যুৎ ক্রয় ব্যবস্থায় আদানির দাম একটি বড় ব্যতিক্রম। চুক্তির মাধ্যমে এমন কিছু ব্যয় বাংলাদেশের ওপর চাপানো হয়েছে, যা আন্তর্জাতিক প্রচলিত পদ্ধতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় বলে কমিটি মনে করেছে। এর মধ্যে ভারতে আদানির করসংক্রান্ত ব্যয় বাংলাদেশের বিদ্যুৎমূল্যের সঙ্গে যুক্ত করার বিষয়টি অন্যতম। কয়লার মূল্য নির্ধারণের পদ্ধতি নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
একটি বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তিতে মূল্য নির্ধারণের সূত্র অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ চুক্তির মেয়াদ যদি ২৫ বছর হয়, তাহলে সেই সূত্রের প্রভাব এক বছরের বিল ছাড়িয়ে কয়েক দশক পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। কয়লার দাম কীভাবে নির্ধারিত হবে, কর ও অন্যান্য ব্যয় কোন পক্ষ বহন করবে, ক্যাপাসিটি চার্জের কাঠামো কী হবে এবং বিদ্যুৎ না কিনলেও কোনো অর্থ পরিশোধ করতে হবে কি না—এসব শর্তের প্রতিটি দেশের বিদ্যুৎ খাতের ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলে।
এই কারণেই আদানির চুক্তিকে কেবল বিদ্যুৎ কেনাবেচার বিষয় হিসেবে দেখলে সমস্যার গভীরতা বোঝা যাবে না। এটি বাংলাদেশের জ্বালানি নীতি, বিদ্যুৎ খাতের আর্থিক ব্যবস্থাপনা এবং বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবহারের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। জাতীয় পর্যালোচনা কমিটির হিসাবে, অতিরিক্ত মূল্যের কারণে আগামী ১০ বছরে শুধু বাড়তি ব্যয়ের পরিমাণ ৪ থেকে ৫ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে। এই অর্থ দেশের অবকাঠামো, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, বিদ্যুৎ সঞ্চালন ব্যবস্থা কিংবা অন্যান্য উন্নয়ন খাতে বিনিয়োগ করা যেত কি না, সেই প্রশ্নও সামনে আসে।
আদানির বিদ্যুৎ নিয়ে সংকট শুধু দামের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বকেয়া বিল পরিশোধ নিয়েও বাংলাদেশ ও আদানি পাওয়ারের মধ্যে টানাপড়েন হয়েছে। ২০২৪ সালে ডলার সংকটের সময় বকেয়া বিল নিয়ে সমস্যা তীব্র হলে বিদ্যুৎ সরবরাহ কমিয়ে দেয়ার ঘটনা ঘটে। পরবর্তীতে নিয়মিত অর্থ পরিশোধের মাধ্যমে ২০২৫ সালের জুনে বকেয়া প্রায় ৪৩৭ মিলিয়ন ডলারে এবং ২০২৬ সালের জুলাইয়ে প্রায় ৪০০ মিলিয়ন ডলারে নামিয়ে আনার কথা জানানো হয়েছে।
এই ঘটনাগুলো দেখিয়েছে, বিদ্যুৎ আমদানির ক্ষেত্রে অর্থ পরিশোধের সক্ষমতা কতটা গুরুত্বপূর্ণ। একটি দেশ যদি প্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ কিনতে চায়, কিন্তু বৈদেশিক মুদ্রার সংকটে সময়মতো বিল পরিশোধ করতে না পারে, তাহলে সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান সরবরাহ কমিয়ে দিতে পারে। এর প্রভাব পড়ে জাতীয় গ্রিডে। বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সরবরাহের ক্ষেত্রে এমন ঝুঁকি যত বেশি, দেশের বিদ্যুৎ ব্যবস্থা তত বেশি অস্থির হয়ে ওঠে।
২০২৬ সালের ১২ সেপ্টেম্বর গড্ডা কেন্দ্রের দুটি ৮০০ মেগাওয়াট ইউনিটের একটিতে কারিগরি সমস্যা দেখা দেয়। এর ফলে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ সরবরাহের ওপর নতুন করে চাপ তৈরি হয় এবং লোডশেডিং পরিস্থিতি কঠিন হয়ে পড়ে। ঘটনাটি আবারও সামনে আনে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—দেশের মোট বিদ্যুৎ সরবরাহের ১০ শতাংশের বেশি জোগান দিতে সক্ষম একটি একক আন্তঃসীমান্ত উৎসের ওপর বাংলাদেশের নির্ভরতা কি অতিরিক্ত হয়ে যাচ্ছে?
বিদ্যুৎ ব্যবস্থায় কোনো একটি উৎসের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা ঝুঁকিপূর্ণ। কারণ ওই উৎসে কারিগরি ত্রুটি, জ্বালানি সংকট, আর্থিক বিরোধ কিংবা সীমান্তসংক্রান্ত কোনো সমস্যা দেখা দিলে তার প্রভাব জাতীয় পর্যায়ে ছড়িয়ে পড়তে পারে। আদানি কেন্দ্রের ক্ষেত্রে এই ঝুঁকি আরও গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি দেশের বাইরে অবস্থিত। কেন্দ্রের উৎপাদন, কয়লা সরবরাহ, পরিবহন, অর্থ পরিশোধ এবং আন্তঃসীমান্ত সঞ্চালন—সবকিছুর ওপর বাংলাদেশের নির্ভরতা রয়েছে।
তবে এখানেও ভারসাম্যপূর্ণ মূল্যায়ন প্রয়োজন। আদানির বিদ্যুৎ বাংলাদেশের বিদ্যুৎ চাহিদা পূরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। বড় শিল্প, নগরায়ণ এবং অর্থনৈতিক কার্যক্রম সচল রাখতে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ প্রয়োজন। তাই হঠাৎ করে একটি বড় বিদ্যুৎ আমদানি চুক্তি বাতিল করলে সরবরাহ ঘাটতি তৈরি হতে পারে। এর পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সালিসি ও ক্ষতিপূরণসংক্রান্ত ঝুঁকিও দেখা দিতে পারে। ফলে চুক্তি বাতিলের মতো সিদ্ধান্তের আগে বিকল্প বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা জরুরি।
এখানেই আসে পুনঃআলোচনার প্রশ্ন। বিশেষজ্ঞদের মতে, চুক্তি সম্পূর্ণ বাতিল না করে মূল্য নির্ধারণের সূত্র, কয়লার দাম, ক্যাপাসিটি চার্জ এবং করসংক্রান্ত শর্ত পুনর্মূল্যায়ন করা হতে পারে বাস্তবসম্মত পথ। একই সঙ্গে মাসভিত্তিক প্রকৃত পরিশোধ, বিদ্যুৎ সরবরাহের পরিমাণ, জ্বালানি ব্যয় এবং অন্যান্য চার্জের পূর্ণাঙ্গ তথ্য প্রকাশ করা প্রয়োজন। এতে জনসাধারণ ও নীতিনির্ধারকেরা বুঝতে পারবেন, বাংলাদেশ আসলে কত দামে বিদ্যুৎ কিনছে এবং সেই দামের পেছনে কোন কোন ব্যয় কাজ করছে।
২০২৩ থেকে সেপ্টেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত আদানির বিদ্যুতের চূড়ান্ত গড় ইউনিট মূল্য নির্ধারণের ক্ষেত্রেও সতর্কতা প্রয়োজন। ২০২৩-২৪ অর্থবছরের জন্য ইউনিট ও মূল্যসংক্রান্ত তুলনামূলকভাবে স্পষ্ট হিসাব রয়েছে। কিন্তু ২০২৪-২৫, ২০২৫-২৬ এবং চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য মোট সরবরাহকৃত ইউনিট, এনার্জি চার্জ, ক্যাপাসিটি চার্জ, কয়লার মূল্য, কর ও অন্যান্য ব্যয়ের পূর্ণাঙ্গ সমন্বিত হিসাব প্রকাশ্যে নেই। ফলে পুরো সময়ের গড় ইউনিট মূল্য নির্দিষ্ট করে বলা হলে তা অনুমাননির্ভর হতে পারে।
তবে প্রকাশিত সর্বশেষ পূর্ণাঙ্গ হিসাব থেকে নিশ্চিতভাবে বলা যায়, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে আদানির বিদ্যুতের গড় মূল্য ছিল প্রতি ইউনিট ১৪ টাকা ৮৭ পয়সা। জাতীয় পর্যালোচনা কমিটির মূল্যায়নে বর্তমান চুক্তির দাম যৌক্তিক বাজারদরের তুলনায় প্রায় ৫০ শতাংশ বেশি। এই তথ্যগুলোই চুক্তির অর্থনৈতিক প্রভাব নিয়ে গভীরভাবে ভাবার জন্য যথেষ্ট।
বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতে সামনে এখন দুটি সমান্তরাল প্রয়োজন। প্রথমত, দেশের বর্তমান বিদ্যুৎ চাহিদা পূরণে নির্ভরযোগ্য সরবরাহ নিশ্চিত করা। দ্বিতীয়ত, দীর্ঘমেয়াদে উচ্চমূল্যের আমদানি নির্ভরতা কমিয়ে নিজস্ব ও বৈচিত্র্যময় বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা গড়ে তোলা। সৌরবিদ্যুৎ, বায়ু বিদ্যুৎ, গ্যাসভিত্তিক দক্ষ কেন্দ্র, বিদ্যুৎ সঞ্চালন ব্যবস্থা এবং শক্তি সঞ্চয় প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ বাড়ানো গেলে ভবিষ্যতে একটি নির্দিষ্ট বিদেশি উৎসের ওপর চাপ কমানো সম্ভব হতে পারে।
আদানির বিদ্যুৎ নিয়ে বিতর্ক তাই কেবল অতীতে কত টাকা বেশি দেয়া হয়েছে, সেই হিসাবের মধ্যে আটকে থাকার বিষয় নয়। এটি ভবিষ্যতের বাংলাদেশের জ্বালানি কাঠামো কেমন হবে, সেই প্রশ্নও। বিদ্যুৎ কেনার চুক্তি যদি দেশের অর্থনীতিকে দীর্ঘদিন চাপের মধ্যে রাখে, তাহলে তার পুনর্মূল্যায়ন প্রয়োজন। আর যদি কোনো চুক্তি দেশের বিদ্যুৎ নিরাপত্তায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে, তাহলে সেটিকে আরও স্বচ্ছ, ন্যায্য এবং অর্থনৈতিকভাবে টেকসই করার উদ্যোগও জরুরি।
শেষ পর্যন্ত আদানির বিদ্যুৎ বাংলাদেশের জন্য কেবল একটি বিদ্যুৎকেন্দ্রের নাম নয়; এটি একটি বড় নীতিগত শিক্ষা। বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা থাকলেই হয় না, সেই বিদ্যুৎ কত দামে কেনা হচ্ছে, কী শর্তে কেনা হচ্ছে, তার অর্থ পরিশোধের সক্ষমতা কতটা এবং বিকল্প উৎস তৈরিতে কী বিনিয়োগ করা হচ্ছে—এসব বিষয়ও সমান গুরুত্বপূর্ণ। উচ্চমূল্যের বিদ্যুৎ যদি দেশের আর্থিক ব্যবস্থাকে দুর্বল করে, তাহলে দীর্ঘমেয়াদে সেই বিদ্যুৎ নিরাপত্তা কতটা টেকসই, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়।
বাংলাদেশের সামনে এখন সবচেয়ে জরুরি কাজ হলো তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত নেয়া। চুক্তির প্রতিটি ব্যয়, প্রতিটি শর্ত এবং প্রতিটি ঝুঁকি জনসমক্ষে তুলে ধরে পুনঃআলোচনার পথ খুঁজতে হবে। একই সঙ্গে নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও নিজস্ব বিদ্যুৎ সক্ষমতা বাড়াতে হবে। কারণ একটি দেশের বিদ্যুৎ নিরাপত্তা শুধু বিদ্যুৎ পাওয়ার ওপর নির্ভর করে না; নির্ভর করে সেই বিদ্যুৎ কতটা সাশ্রয়ী, নির্ভরযোগ্য এবং দীর্ঘমেয়াদে দেশের অর্থনীতির জন্য টেকসই।
আদানির বিদ্যুৎ নিয়ে আজকের বিতর্ক তাই আগামী দিনের জ্বালানি নীতির জন্য একটি সতর্কবার্তা। উচ্চমূল্য, আর্থিক ক্ষতি ও সরবরাহের ঝুঁকি যদি একসঙ্গে কাজ করে, তাহলে বিদ্যুৎ আমদানির সুবিধার পাশাপাশি তার মূল্যও বিবেচনা করতে হবে। দেশের অর্থনীতি, জনগণের অর্থ এবং ভবিষ্যৎ জ্বালানি নিরাপত্তার স্বার্থে এখন প্রয়োজন স্বচ্ছতা, পুনর্মূল্যায়ন এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা।
আপনার মতামত জানানঃ