অসীম বা ইনফিনিটি—শব্দটি শুনলেই আমাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে এমন কিছু, যার কোনো শেষ নেই। এক, দুই, তিন, চার—এভাবে গুনতে গুনতে যত দূরেই যাওয়া হোক না কেন, সংখ্যার তালিকা শেষ হবে না। তাই ছোটদের কাছে অসীম অনেকটা ধাঁধার মতো। কিন্তু গণিতবিদদের কাছে অসীম কোনো কল্পকাহিনি নয়; বরং এটি গণিতের সবচেয়ে গভীর, জটিল এবং বিস্ময়কর বিষয়গুলোর একটি। অসীমের ভেতরে কি আরও বড় অসীম থাকতে পারে? সব অসীম কি সমান? নাকি কোনো কোনো অসীম অন্য অসীমের তুলনায় এতটাই বড় যে তাদের মধ্যে পার্থক্য কল্পনা করাও কঠিন? শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে গণিতবিদেরা এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজছেন।
গণিতের প্রচলিত ধারণা অনুযায়ী, অসীমকে একটি সিঁড়ি বা মইয়ের সঙ্গে তুলনা করা যায়। এই মইয়ের নিচের দিকে রয়েছে স্বাভাবিক সংখ্যার অসীম সেট—১, ২, ৩, ৪…। এই অসীমকে বলা হয় আলেফ-নাল বা ℵ₀। স্বাভাবিক সংখ্যার তালিকা কখনো শেষ হয় না, কিন্তু এই সেটের প্রতিটি সংখ্যাকে ধারাবাহিকভাবে সাজানো যায়। অন্যদিকে বাস্তব সংখ্যার সেট আরও বড়। শূন্য থেকে এক-এর মাঝেই রয়েছে অসীমসংখ্যক দশমিক সংখ্যা। যেমন ০.১, ০.১১, ০.১১১, ০.১২, ০.১২৩—এভাবে অসংখ্য সংখ্যা তৈরি করা সম্ভব। শুধু তা-ই নয়, বাস্তব সংখ্যার মধ্যে রয়েছে ঋণাত্মক সংখ্যা, ভগ্নাংশ, অমূলদ সংখ্যা এবং আরও অসংখ্য মান। ফলে বাস্তব সংখ্যার অসীম স্বাভাবিক সংখ্যার অসীমের চেয়ে বড়।
এই ধারণা থেকেই গণিতবিদেরা অসীমকে বিভিন্ন স্তরে সাজানোর চেষ্টা করেছেন। একটি অসীমের চেয়ে বড় আরেকটি অসীম, তার চেয়ে বড় আরও একটি অসীম—এভাবে তৈরি হয়েছে বিশাল এক গাণিতিক কাঠামো। এই কাঠামোর বিভিন্ন স্তরকে বোঝাতে ব্যবহৃত হয় ‘কার্ডিনাল’ ধারণা। কার্ডিনাল মূলত কোনো সেটে কতগুলো উপাদান রয়েছে, সেই পরিমাণ বোঝায়। সসীম সেটের ক্ষেত্রে বিষয়টি সহজ। একটি বাক্সে পাঁচটি বল থাকলে তার কার্ডিনাল পাঁচ। কিন্তু অসীম সেটের ক্ষেত্রে বিষয়টি অনেক বেশি জটিল। কারণ দুটি সেটই অসীম হলেও তাদের আকার বা শক্তি সমান নাও হতে পারে।
উদাহরণ হিসেবে স্বাভাবিক সংখ্যার সেট এবং জোড় সংখ্যার সেটের কথা বলা যায়। স্বাভাবিক সংখ্যার সেটে রয়েছে ১, ২, ৩, ৪, ৫… আর জোড় সংখ্যার সেটে রয়েছে ২, ৪, ৬, ৮…। প্রথম দেখায় মনে হতে পারে, স্বাভাবিক সংখ্যার সেট বড়, কারণ এতে জোড়-বিজোড় সব ধরনের সংখ্যা রয়েছে। কিন্তু গণিতের নির্দিষ্ট নিয়মে দেখা যায়, দুটি সেটের উপাদানকে একে অপরের সঙ্গে এক-একভাবে মেলানো সম্ভব। ১-এর সঙ্গে ২, ২-এর সঙ্গে ৪, ৩-এর সঙ্গে ৬—এভাবে প্রতিটি স্বাভাবিক সংখ্যার সঙ্গে একটি জোড় সংখ্যা মেলানো যায়। তাই দুটি সেটের কার্ডিনাল সমান। এখানেই অসীমের অদ্ভুত বৈশিষ্ট্য প্রকাশ পায়।
তবে সব অসীম সমান নয়। বাস্তব সংখ্যার সেটকে স্বাভাবিক সংখ্যার সঙ্গে এভাবে এক-একভাবে মেলানো যায় না। গণিতবিদ জর্জ ক্যান্টর দেখিয়েছিলেন, বাস্তব সংখ্যার অসীম স্বাভাবিক সংখ্যার অসীমের চেয়ে বড়। এই আবিষ্কার গণিতের জগতে বিপ্লব ঘটায়। এরপর থেকেই অসীমকে বিভিন্ন স্তরে ভাগ করে দেখার চেষ্টা শুরু হয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আবিষ্কৃত হয়েছে মেজারেবল কার্ডিনাল, সুপারকমপ্যাক্ট কার্ডিনাল, হিউজ কার্ডিনালসহ আরও অনেক ধরনের বিশাল অসীম।
এই অসীমগুলোকে সাধারণত ‘লার্জ কার্ডিনাল’ বলা হয়। এগুলো এত বড় যে আধুনিক গণিতের প্রচলিত স্বতঃসিদ্ধ বা অ্যাক্সিওম ব্যবহার করে অনেক সময় তাদের অস্তিত্ব প্রমাণ করা যায় না। তাদের অস্তিত্ব মেনে নিতে হলে গণিতের ভিত্তিতে নতুন কিছু স্বতঃসিদ্ধ যুক্ত করতে হয়। আধুনিক গণিতের অন্যতম ভিত্তি হলো জার্মেলো-ফ্রেনকেল সেট থিওরি উইথ দ্য অ্যাক্সিওম অব চয়েস, সংক্ষেপে জেডএফসি। কিন্তু লার্জ কার্ডিনালের অনেক ধারণা জেডএফসির সাধারণ কাঠামোর বাইরে অবস্থান করে। অর্থাৎ, এগুলোর অস্তিত্ব গণিতের পরিচিত নিয়মের ভেতরে সরাসরি প্রমাণ করা সম্ভব নয়।
এতদিন পর্যন্ত গণিতবিদেরা ধারণা করতেন, যত বড় অসীমই হোক না কেন, তাদের মধ্যে কোনো না কোনো ধরনের শৃঙ্খলা থাকবে। ছোট অসীম থেকে বড় অসীমের দিকে একটি ধারাবাহিক অগ্রগতি থাকবে। অসীমের বিশাল জগৎকে একটি সুসংগঠিত মইয়ের মতো ভাবা হতো, যেখানে প্রতিটি ধাপের নিজস্ব অবস্থান রয়েছে। কিন্তু সম্প্রতি ভিয়েনা ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজি এবং ইউনিভার্সিটি অব বার্সেলোনার গবেষকেরা এমন দুটি নতুন ধরনের অসীমের কথা জানিয়েছেন, যেগুলো এই প্রচলিত ধারণাকে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে।
নতুন এই দুই ধরনের অসীমকে বলা হচ্ছে ‘এক্সাক্টিং কার্ডিনাল’ এবং ‘আল্ট্রা-এক্সাক্টিং কার্ডিনাল’। এগুলো লার্জ কার্ডিনালের পরিবারের নতুন সদস্য। গবেষকদের মতে, এক্সাক্টিং কার্ডিনাল আগের পরিচিত অনেক বড় কার্ডিনালের তুলনায় আরও শক্তিশালী। আর আল্ট্রা-এক্সাক্টিং কার্ডিনাল হলো তার চেয়েও শক্তিশালী এক ধরনের অসীম। সহজভাবে বোঝাতে গেলে, যদি সাধারণ লার্জ কার্ডিনালকে অসীমের বিশাল পাহাড়ের সঙ্গে তুলনা করা হয়, তবে এক্সাক্টিং কার্ডিনাল সেই পাহাড়েরও ওপরে উঠে থাকা কোনো অজানা শিখর। আর আল্ট্রা-এক্সাক্টিং কার্ডিনাল হলো সেই শিখরেরও ওপরে থাকা আরও বিস্ময়কর কোনো উচ্চতা।
গবেষণার সঙ্গে যুক্ত গণিতবিদেরা জানিয়েছেন, এসব নতুন কার্ডিনাল অসীমের প্রচলিত স্তরবিন্যাসের সঙ্গে খুব অদ্ভুত আচরণ করছে। সাধারণত বড় বড় অসীমের ধারণাগুলো একটি নির্দিষ্ট ক্রমে সাজানো যায়। কোনটি অপেক্ষাকৃত ছোট, কোনটি বড়, কোনটির শক্তি বেশি—এসব নিয়ে একটি কাঠামো তৈরি করা সম্ভব হয়। কিন্তু আল্ট্রা-এক্সাক্টিং কার্ডিনালের ক্ষেত্রে সেই পরিচিত কাঠামো আর আগের মতো কাজ করছে না। তারা অসীমের পুরোনো ধারণাগুলোর সঙ্গে এমনভাবে সম্পর্ক তৈরি করছে, যা আগে গণিতবিদেরা কল্পনাও করেননি।
এই আবিষ্কারের সঙ্গে জড়িয়ে আছে ‘এইচওডি কনজেকচার’ বা HOD Conjecture নামের একটি গুরুত্বপূর্ণ গাণিতিক অনুমান। এইচওডি বলতে বোঝায় ‘হারডি’—গাণিতিক মহাবিশ্বের একটি বিশেষভাবে সংজ্ঞায়িত অভ্যন্তরীণ অংশ। সহজ ভাষায়, গাণিতিক মহাবিশ্বকে যদি একটি বিশাল লাইব্রেরি ধরা হয়, তবে এইচওডি হলো সেই লাইব্রেরির এমন একটি অংশ, যেখানে বইগুলো নির্দিষ্ট নিয়মে সাজানো এবং তালিকাভুক্ত। এইচওডি কনজেকচার ধারণা করে, মহাবিশ্ব যত বড় এবং জটিলই হোক না কেন, তার ভেতরে একটি গভীর শৃঙ্খলা কাজ করে। অসীমের বড় বড় ধারণাগুলোকেও কোনো না কোনোভাবে এই শৃঙ্খলার মধ্যে ব্যাখ্যা করা সম্ভব।
কিন্তু এক্সাক্টিং এবং আল্ট্রা-এক্সাক্টিং কার্ডিনালের আবিষ্কার সেই ধারণাকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। গবেষকেরা দেখিয়েছেন, এসব কার্ডিনালের অস্তিত্ব এমন একটি পরিস্থিতির দিকে নিয়ে যেতে পারে, যাকে গণিতবিদেরা বলেন ‘V is far from HOD’। এখানে V হলো সম্পূর্ণ গাণিতিক মহাবিশ্ব। কথাটির অর্থ দাঁড়ায়, সম্পূর্ণ গাণিতিক মহাবিশ্ব এইচওডি কাঠামো থেকে অনেক দূরে অবস্থান করতে পারে। অর্থাৎ, মহাবিশ্বকে হয়তো এমন একটি সাজানো লাইব্রেরি হিসেবে দেখা যাবে না, যেখানে প্রতিটি বইয়ের অবস্থান আগে থেকেই নির্ধারিত। বরং এটি হতে পারে এক বিশাল, অজানা এবং জটিল বন, যার সব পথ এখনো মানুষের জানা হয়নি।
এই আবিষ্কার শুধু বিমূর্ত গণিতের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। অসীম এবং সেট থিওরির মতো বিষয়গুলোকে অনেক সময় বাস্তব জীবন থেকে দূরের বলে মনে হয়। কিন্তু আধুনিক কম্পিউটার বিজ্ঞান, ক্রিপ্টোগ্রাফি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং মহাকাশবিজ্ঞানের গভীরে রয়েছে গণিতের এসব মৌলিক ধারণা। কম্পিউটার কীভাবে তথ্য সাজাবে, অ্যালগরিদম কীভাবে কাজ করবে, কোনো সমস্যার সমাধান সম্ভব কি না, একটি গাণিতিক কাঠামোর সীমা কোথায়—এসব প্রশ্নের পেছনে রয়েছে অসীম, সেট, যুক্তি এবং প্রমাণের ধারণা।
ক্রিপ্টোগ্রাফির ক্ষেত্রে নিরাপদ তথ্য আদান-প্রদান এবং এনক্রিপশনের পেছনে যে জটিল গাণিতিক কাঠামো কাজ করে, তা বোঝার জন্য গণিতের মৌলিক সীমা জানা জরুরি। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ক্ষেত্রেও অ্যালগরিদম, সম্ভাবনা, যুক্তি এবং তথ্যের বিশাল সেট নিয়ে কাজ করতে হয়। আবার মহাকাশবিজ্ঞান ও কসমোলজিতে মহাবিশ্বের গঠন, সময়, স্থান, ব্ল্যাকহোল এবং পদার্থের মৌলিক আচরণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে গণিতের আরও গভীর স্তরের প্রয়োজন হয়। আজকের কোনো আবিষ্কার হয়তো আগামীকাল সরাসরি প্রযুক্তিতে ব্যবহার হবে না, কিন্তু তা ভবিষ্যতের নতুন চিন্তার ভিত্তি তৈরি করতে পারে।
তবে এই নতুন অসীম আবিষ্কারের সবচেয়ে বড় গুরুত্ব প্রযুক্তিগত নয়, বরং দার্শনিক। এটি আমাদের আবার ভাবতে বাধ্য করছে—গণিত কি মানুষের তৈরি একটি নিয়মতান্ত্রিক ভাষা, নাকি মানুষের আবিষ্কারের বাইরেও গণিতের একটি বিশাল বাস্তবতা রয়েছে? অসীম কি সত্যিই একটি সুসংগঠিত সিঁড়ি, নাকি তার ভেতরে এমন বিশৃঙ্খলা লুকিয়ে আছে, যা কোনো নির্দিষ্ট নিয়মে ধরা যায় না? আমরা কি গণিতের সব সত্য একদিন জানতে পারব, নাকি কিছু সত্য চিরকাল মানুষের বোধের বাইরে থেকে যাবে?
এক্সাক্টিং এবং আল্ট্রা-এক্সাক্টিং কার্ডিনাল হয়তো সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে সরাসরি কোনো পরিবর্তন আনবে না। এগুলো দিয়ে আগামীকাল ব্যাংক অ্যাকাউন্টের পাসওয়ার্ড বদলে যাবে না, কোনো মোবাইল ফোনের গতি বেড়ে যাবে না কিংবা নতুন কোনো যন্ত্র হঠাৎ আবিষ্কৃত হবে না। কিন্তু এসব ধারণা গণিতের মৌলিক কাঠামোকে নতুনভাবে দেখতে সাহায্য করবে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অনেক বড় পরিবর্তনই শুরু হয়েছে এমন কিছু বিমূর্ত প্রশ্ন থেকে, যেগুলোর তাৎক্ষণিক কোনো ব্যবহারিক মূল্য ছিল না।
মানুষ একসময় ভাবত, পৃথিবীই মহাবিশ্বের কেন্দ্র। পরে জানা গেল, পৃথিবী সূর্যের চারদিকে ঘোরে। একসময় ধারণা ছিল, পদার্থকে অসীমভাবে ভাগ করা যায়। পরে পরমাণু ও উপপরমাণুকণার জগতের সন্ধান মিলল। তেমনি অসীম সম্পর্কেও মানুষের ধারণা বারবার বদলাচ্ছে। এক অসীমের ভেতরে আরও বড় অসীম, তারও ওপরে নতুন স্তর—এভাবে গণিত আমাদের পরিচিত চিন্তার সীমা অতিক্রম করতে বাধ্য করছে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই আবিষ্কার আমাদের নিশ্চিত উত্তর দেওয়ার বদলে আরও প্রশ্নের সামনে দাঁড় করিয়েছে। নতুন দুই ধরনের অসীম কি সত্যিই প্রচলিত গাণিতিক শৃঙ্খল ভেঙে দিচ্ছে? নাকি এগুলোকে ব্যাখ্যা করার জন্য গণিতের আরও উন্নত কোনো কাঠামো তৈরি করা সম্ভব? এইচওডি কনজেকচার কি শেষ পর্যন্ত ভুল প্রমাণিত হবে, নাকি নতুন কোনো উপায়ে তা সংশোধিত হয়ে টিকে থাকবে? এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গণিতবিদদের আরও দীর্ঘ গবেষণা করতে হবে।
অসীমের জগৎ যে মানুষের কল্পনার চেয়েও অনেক বড়, এই আবিষ্কার তারই আরেকটি প্রমাণ। আমরা যতই মনে করি গণিতের নিয়মগুলো সবকিছু ব্যাখ্যা করতে পারে, ততই নতুন কোনো প্রশ্ন এসে সেই আত্মবিশ্বাসকে নাড়া দেয়। এক্সাক্টিং ও আল্ট্রা-এক্সাক্টিং কার্ডিনাল হয়তো অসীমের শেষ নয়; বরং অসীমকে বোঝার পথে আরও একটি দরজা। সেই দরজার ওপারে কী আছে, তা এখনো অজানা। আর অজানার সেই আকর্ষণই গণিতকে শুধু সংখ্যা ও সূত্রের বিষয় না বানিয়ে মানুষের চিন্তা, কৌতূহল এবং জ্ঞান অনুসন্ধানের অন্যতম শক্তিশালী মাধ্যম করে তুলেছে।
আপনার মতামত জানানঃ