মহাকাশের কথা উঠলে আমাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে নক্ষত্র, গ্রহ, ধূমকেতু, গ্রহাণু আর অসীম অন্ধকার। সেখানে চিনি আছে—এই কথাটি শুনতে প্রথমে অবিশ্বাস্যই মনে হতে পারে। কারণ আমরা চিনি বলতে সাধারণত খাবারের মিষ্টি স্বাদের পদার্থকেই বুঝি। কিন্তু বিজ্ঞানের ভাষায় ‘চিনি’ শুধু খাবারের টেবিলে থাকা সাদা দানাদার পদার্থ নয়; এটি এমন এক শ্রেণির জৈব অণু, যার কিছু সদস্য পৃথিবীর জীবনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
আর সাম্প্রতিক গবেষণাগুলো মহাকাশে এসব গুরুত্বপূর্ণ চিনিজাতীয় অণুর উপস্থিতি নিয়ে বিজ্ঞানীদের আগ্রহ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। বিশেষ করে গ্রহাণু বেন্নু থেকে আনা নমুনায় রাইবোজ ও গ্লুকোজের সন্ধান পাওয়ার ঘটনা বিজ্ঞানীদের সামনে নতুন প্রশ্ন তুলেছে—পৃথিবীতে প্রাণের আবির্ভাবের জন্য প্রয়োজনীয় কিছু রাসায়নিক উপাদান কি মহাকাশ থেকেই এসেছিল?
২০২৫ সালের শেষ দিকে নাসা জানায়, তাদের ওসিরিস-রেক্স (OSIRIS-REx) মহাকাশযানে করে পৃথিবীতে আনা গ্রহাণু বেন্নুর নমুনায় জীবনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ দুই ধরনের চিনি—রাইবোজ এবং গ্লুকোজ—শনাক্ত করা হয়েছে। গবেষণাটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ বেন্নু থেকে পাওয়া নমুনাগুলো মহাকাশযানের মাধ্যমে সরাসরি পৃথিবীতে আনা হয়েছিল এবং পৃথিবীর পরিবেশে দীর্ঘদিন পড়ে থাকা কোনো উল্কাপিণ্ডের মতো সেগুলো দূষণের ঝুঁকিতে ছিল না।
এখানে ‘চিনি’ শব্দটি শুনে অবশ্য মিষ্টির কথা ভাবলে ভুল হবে। রাইবোজ এমন একটি পাঁচ-কার্বনবিশিষ্ট চিনি, যা আরএনএ বা RNA-এর কাঠামোর গুরুত্বপূর্ণ অংশ। অন্যদিকে গ্লুকোজ পৃথিবীর জীবজগতের শক্তি উৎপাদনের অন্যতম প্রধান উপাদান। অর্থাৎ বিজ্ঞানীরা বেন্নুর নমুনায় এমন রাসায়নিক উপাদান পেয়েছেন, যেগুলো পৃথিবীর জীবনের মৌলিক জৈব প্রক্রিয়ার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।
আরও বিস্ময়কর বিষয় হলো, বেন্নুতে শুধু চিনি পাওয়া যায়নি। এর আগেই বিজ্ঞানীরা এই গ্রহাণুর নমুনায় ডিএনএ ও আরএনএর সঙ্গে সম্পর্কিত পাঁচটি নিউক্লিওবেস, ফসফেট এবং অ্যামিনো অ্যাসিডের মতো গুরুত্বপূর্ণ জৈব অণুর উপাদান শনাক্ত করেছিলেন। নতুন করে রাইবোজ পাওয়ার ফলে আরএনএ তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় উপাদানগুলোর পুরো একটি গুরুত্বপূর্ণ সেট একই মহাজাগতিক বস্তুতে পাওয়া গেল। তবে এর অর্থ এই নয় যে বেন্নুতে প্রাণ ছিল বা আছে। বরং এর অর্থ হলো, প্রাণ তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় রাসায়নিক উপাদানগুলো সৌরজগতের আদিম পরিবেশে উপস্থিত ছিল।
এই পার্থক্যটি খুব গুরুত্বপূর্ণ। মহাকাশে জীবনের উপাদান পাওয়া আর মহাকাশে জীবন পাওয়া এক বিষয় নয়। কোনো গ্রহাণুতে রাইবোজ, অ্যামিনো অ্যাসিড বা নিউক্লিওবেস পাওয়া মানে সেখানে জীবন্ত কোনো প্রাণী ছিল—এমন প্রমাণ পাওয়া যায়নি। বরং বিজ্ঞানীরা যে প্রশ্নের উত্তর খুঁজছেন, তা হলো—জীবন সৃষ্টির আগে প্রয়োজনীয় রাসায়নিক উপাদানগুলো কীভাবে তৈরি হয়েছিল এবং পৃথিবীতে সেগুলো কতটা বাইরে থেকে এসেছিল।
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে বিজ্ঞানীরা বহু বছর ধরে উল্কাপিণ্ড পরীক্ষা করে আসছেন। ২০১৯ সালে নাসা জানায়, দুটি কার্বনসমৃদ্ধ উল্কাপিণ্ড—এনডব্লিউএ ৮০১ এবং মুরচিসন—থেকে রাইবোজসহ অন্যান্য চিনি শনাক্ত করা হয়েছিল। সেই গবেষণায় রাইবোজ, অ্যারাবিনোজ ও জাইলোজের মতো চিনি পাওয়া যায়। গবেষকদের মতে, এসব অণুর কিছু পৃথিবীর জীবনের আগে মহাজাগতিক পরিবেশে তৈরি হয়ে থাকতে পারে এবং পরে উল্কাপিণ্ডের মাধ্যমে পৃথিবীতে পৌঁছাতে পারে।
তবে উল্কাপিণ্ডের ক্ষেত্রে একটি বড় সমস্যা ছিল—পৃথিবীতে পড়ে থাকা কোনো নমুনায় পরে পার্থিব দূষণ ঘটেছে কি না, সেই প্রশ্ন। বেন্নুর নমুনার ক্ষেত্রে সেই উদ্বেগ অনেকটাই কম, কারণ ওসিরিস-রেক্স মহাকাশযান গ্রহাণু থেকে নমুনা সংগ্রহ করে সেগুলোকে সুরক্ষিত অবস্থায় পৃথিবীতে ফিরিয়ে এনেছে। ফলে বেন্নুর রাসায়নিক ইতিহাস বিশ্লেষণের সুযোগ বিজ্ঞানীরা অনেক বেশি নির্ভরযোগ্যভাবে পাচ্ছেন।
মহাকাশে চিনির উপস্থিতির গল্প অবশ্য শুধু গ্রহাণুতে থেমে নেই। এর আগেও জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা আন্তঃনাক্ষত্রিক মহাকাশে চিনিজাতীয় একটি সরল অণু গ্লাইকোলঅ্যালডিহাইড শনাক্ত করেছিলেন। ২০১২ সালে আলমা বা ALMA টেলিস্কোপ ব্যবহার করে তরুণ সূর্যের মতো একটি দ্বৈত নক্ষত্রকে ঘিরে থাকা গ্যাসে এই অণুর সন্ধান পাওয়া যায়। গ্লাইকোলঅ্যালডিহাইডকে সাধারণ চিনির একটি সরল রূপ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
এই আবিষ্কারের গুরুত্ব ছিল অন্য জায়গায়। তখন প্রশ্ন উঠেছিল, গ্রহ তৈরি হওয়ার আগেই যদি একটি তরুণ নক্ষত্রের চারপাশে জীবনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ জৈব অণু উপস্থিত থাকে, তাহলে নতুন তৈরি হওয়া গ্রহগুলোর উপাদানের মধ্যেও সেগুলো ঢুকে যেতে পারে কি না। অর্থাৎ জীবনের রাসায়নিক ভিত্তি হয়তো কোনো একটি গ্রহে হঠাৎ করে শূন্য থেকে তৈরি হয়নি; বরং নক্ষত্র ও গ্রহ তৈরির প্রক্রিয়ার মধ্যেই কিছু গুরুত্বপূর্ণ জৈব অণু তৈরি ও ছড়িয়ে পড়তে পারে।
এখানেই বেন্নুর আবিষ্কার নতুন মাত্রা যোগ করেছে। কারণ গ্লাইকোলঅ্যালডিহাইডের মতো সরল অণু মহাকাশে থাকার প্রমাণ এবং গ্রহাণুর নমুনায় রাইবোজ ও গ্লুকোজের উপস্থিতি—দুটিকে একসঙ্গে দেখলে বোঝা যায়, মহাকাশের রাসায়নিক পরিবেশ জীবনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ অণু তৈরির ক্ষেত্রে একেবারেই নিষ্ক্রিয় নয়। নাসার বিজ্ঞানীরা মনে করেন, সৌরজগতের আদিম পরিবেশে জৈব অণু তৈরির রাসায়নিক প্রক্রিয়া সক্রিয় ছিল এবং সেগুলোর কিছু অংশ পরবর্তীতে গ্রহাণু ও উল্কাপিণ্ডের মাধ্যমে গ্রহের পৃষ্ঠে পৌঁছাতে পারে।
তবে সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি এখনো অমীমাংসিত—পৃথিবীর জীবনের শুরুতে মহাকাশ থেকে আসা এসব উপাদানের ভূমিকা ঠিক কতটা ছিল?
বিজ্ঞানীদের একটি সম্ভাবনা হলো, প্রায় সাড়ে চারশ কোটি বছর আগে পৃথিবী যখন তরুণ ছিল, তখন গ্রহাণু ও ধূমকেতুর আঘাতে পানি এবং বিভিন্ন জৈব অণু পৃথিবীর পৃষ্ঠে এসে জমা হতে পারে। এসব উপাদান পৃথিবীর পরিবেশে উপস্থিত অন্যান্য রাসায়নিকের সঙ্গে বিক্রিয়া করে আরও জটিল অণু তৈরি করতে পারে। দীর্ঘ সময় ধরে এই রাসায়নিক বিবর্তনের মধ্য দিয়েই হয়তো জীবনের প্রথম ধাপ তৈরি হয়েছিল। নাসা নিজেও উল্লেখ করেছে, মহাকাশ থেকে আসা জৈব অণু পৃথিবীতে জীবনের উপাদান সরবরাহে ভূমিকা রাখতে পারে—যদিও এই প্রক্রিয়ার পূর্ণ চিত্র এখনো নিশ্চিত নয়।
এখানে ‘আরএনএ বিশ্ব’ বা RNA World ধারণাটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। আধুনিক জীবনে ডিএনএ জিনগত তথ্য সংরক্ষণ করে, আরএনএ নানা গুরুত্বপূর্ণ কাজ করে। কিন্তু জীবনের একেবারে শুরুর দিকে ডিএনএর আগে আরএনএ-জাতীয় অণু গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে—এমন একটি বৈজ্ঞানিক ধারণা রয়েছে। রাইবোজ আরএনএর কাঠামোর অন্যতম অপরিহার্য অংশ। ফলে প্রাচীন সৌরজগতের পরিবেশে রাইবোজের উপস্থিতি এই ধারণাকে নিয়ে গবেষণার জন্য গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সরবরাহ করে।
বেন্নুর আরও একটি বিষয় বিজ্ঞানীদের বিশেষভাবে আগ্রহী করেছে। নমুনায় রাইবোজ পাওয়া গেলেও ডিঅক্সিরাইবোজ—ডিএনএর সঙ্গে সম্পর্কিত চিনি—একইভাবে শনাক্ত হয়নি। এর ভিত্তিতে গবেষকেরা অনুমান করছেন, সৌরজগতের আদিম পরিবেশে রাইবোজ হয়তো ডিঅক্সিরাইবোজের তুলনায় সহজে তৈরি বা সংরক্ষিত হয়েছিল। এটি আরএনএ বিশ্ব ধারণার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে পারে, যদিও এখান থেকেও কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না।
আরও মজার বিষয় হলো, মহাকাশে এসব জৈব অণু কীভাবে তৈরি হয়, সেটিও বিজ্ঞানীদের গবেষণার বড় ক্ষেত্র। আন্তঃনাক্ষত্রিক মহাকাশে অত্যন্ত ঠান্ডা গ্যাস ও ধূলিকণার মেঘ রয়েছে। সেখানে পানি, মিথানল, কার্বন মনোক্সাইডসহ বিভিন্ন সরল অণু বরফের স্তরে জমা হতে পারে। অতিবেগুনি রশ্মি ও মহাজাগতিক রশ্মির প্রভাবে এসব অণুর মধ্যে রাসায়নিক পরিবর্তন ঘটতে পারে। পরীক্ষাগারে এমন পরিবেশ অনুকরণ করে বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, জৈবভাবে গুরুত্বপূর্ণ চিনি ও চিনিজাতীয় অণু তৈরি হতে পারে।
অর্থাৎ ‘মহাকাশে চিনি’ আবিষ্কারের গল্পটি আসলে কোনো মহাজাগতিক মিষ্টির গল্প নয়। এটি জীবনের উৎপত্তি নিয়ে মানুষের সবচেয়ে পুরোনো প্রশ্নগুলোর একটি—আমরা কোথা থেকে এলাম—তার উত্তর খোঁজার গল্প।
যদি পৃথিবীর জীবনের প্রয়োজনীয় কিছু রাসায়নিক উপাদান সৌরজগতের বিভিন্ন গ্রহাণু ও মহাজাগতিক বস্তুতে স্বাভাবিকভাবেই তৈরি হয়ে থাকে, তাহলে একটি সম্ভাবনা দাঁড়ায়—জীবনের জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামাল হয়তো মহাবিশ্বে অস্বাভাবিক কোনো জিনিস নয়। নাসার ভাষায়, মহাকাশে জীবনের মৌলিক উপাদানগুলোর উপস্থিতি ক্রমেই আরও স্পষ্ট হচ্ছে। কিন্তু সেই উপাদানগুলো থেকে সত্যিকারের জীবন তৈরি হওয়া কতটা সহজ, সেটিই এখনো বড় রহস্য।
বেন্নু সেই রহস্যের দরজা খুলে দিয়েছে, কিন্তু পুরো দরজা এখনো খোলেনি। একটি ছোট গ্রহাণুর কয়েকটি নমুনার ভেতর পাওয়া রাইবোজ ও গ্লুকোজ আমাদের জানাচ্ছে, পৃথিবীর জীবনের রাসায়নিক গল্প হয়তো শুধু পৃথিবীর গল্প নয়। সেই গল্পের কিছু অধ্যায় লেখা হয়েছিল সূর্য, গ্রহ ও গ্রহাণু তৈরিরও আগে—মহাকাশের অন্ধকারে।
আর যদি সত্যিই পৃথিবীর প্রাণের জন্য প্রয়োজনীয় কিছু উপাদান মহাকাশ থেকে এসে থাকে, তাহলে ভবিষ্যতের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়তো আর শুধু ‘মহাকাশে চিনি আছে কি না’—এটা নয়। প্রশ্ন হবে, এই একই রাসায়নিক উপাদান কি অন্য কোনো গ্রহেও পৌঁছেছে? আর সেখানে কি তারা জীবনের জন্মের জন্য একই ধরনের রাসায়নিক যাত্রা শুরু করেছে?
সেই উত্তর এখনো অজানা। তবে মহাকাশের ধূলিকণা, গ্রহাণু আর বরফের মধ্যে একের পর এক জৈব অণুর সন্ধান পাওয়ায় একটি বিষয় ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছে—জীবনের গল্প সম্ভবত পৃথিবীর মাটিতে শুরু হওয়ার অনেক আগেই মহাবিশ্বের রাসায়নিক পরীক্ষাগারে তার প্রস্তুতি শুরু হয়েছিল।
আপনার মতামত জানানঃ