দীর্ঘ আলোচনা, নানা প্রতিশ্রুতি ও অনিশ্চয়তার পর অবশেষে অনুমোদন পেয়েছে বহুল আলোচিত নবম জাতীয় পে-স্কেল। ২০১৫ সালে অষ্টম জাতীয় পে-স্কেল চালুর পর এক দশকে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য, বাসস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসা ও যাতায়াতসহ প্রায় সব খাতেই ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ফলে মূল্যস্ফীতির চাপে সরকারি চাকরিজীবীদের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা কমে গেছে। নতুন বেতন কাঠামো মূলত সেই দীর্ঘদিনের চাপ কিছুটা সামাল দেওয়ার চেষ্টা।
নতুন পে-স্কেলে সরকারি কর্মচারীদের বেতন ১০০ থেকে ১৪২ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে। সর্বনিম্ন মূল বেতন নির্ধারণ করা হয়েছে ২০ হাজার টাকা এবং সর্বোচ্চ ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা। তবে একবারে পুরোপুরি বাস্তবায়নের বদলে চার ধাপে এটি কার্যকর করার পরিকল্পনা রয়েছে। সরকারের হিসাবে, এর ফলে প্রতি বছর রাষ্ট্রের অতিরিক্ত ব্যয় হবে প্রায় ১ লাখ ৫ হাজার ৫৮০ কোটি টাকা। এত বড় আর্থিক দায়ের পাশাপাশি মূল্যস্ফীতির ওপর সম্ভাব্য প্রভাব নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে।
তবে বেতন বাড়ানোর আলোচনা যখন সামনে এসেছে, তখন স্বাভাবিকভাবেই আরেকটি প্রশ্ন জোরালো হয়েছে—সরকারি কর্মচারীদের বেতন বাড়ালে কি দুর্নীতি ও ঘুষ কমবে?
এই প্রশ্নের উত্তর সরল নয়। সরকারি কর্মচারীদের একটি অংশের ক্ষেত্রে বেতন বৃদ্ধি ঘুষের প্রবণতা কমাতে ভূমিকা রাখতে পারে। বিশেষ করে নিম্নপদস্থ কর্মচারীদের ক্ষেত্রে যখন বেতন দিয়ে পরিবারের মৌলিক প্রয়োজন মেটানো কঠিন হয়ে পড়ে, তখন আর্থিক চাপ অনৈতিক আয়ের প্রলোভন বাড়াতে পারে। খাদ্য, বাসা ভাড়া, সন্তানের পড়াশোনা, চিকিৎসা ও যাতায়াতের ব্যয় দ্রুত বাড়তে থাকলে সীমিত আয়ের একজন কর্মচারী নিজেকে ক্রমাগত আর্থিক সংকটের মধ্যে দেখতে পারেন।
এমন পরিস্থিতিতে কেউ বৈধভাবে বাড়তি আয়ের পথ খুঁজতে পারেন, কেউ জীবনযাত্রার ব্যয় কমিয়ে আনতে পারেন। আবার নৈতিকতার জায়গা দুর্বল হলে কেউ কেউ ঘুষ বা অন্য ধরনের অনৈতিক আয়ের দিকে ঝুঁকতে পারেন। এ কারণে সরকারি কর্মচারীদের একটি ন্যায্য ও জীবনযাপনযোগ্য বেতন দেওয়া দুর্নীতি প্রতিরোধের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হতে পারে।
কিন্তু এখানেই মূল বিষয়টি হলো—বেতন কম হলেই দুর্নীতি হয়, আর বেতন বাড়ালেই দুর্নীতি বন্ধ হয়ে যাবে—এমন ধারণা বাস্তবতার সঙ্গে পুরোপুরি মেলে না।
দুর্নীতির সঙ্গে বেতনের সম্পর্ক নিয়ে বিভিন্ন গবেষণার ফলও একরকম নয়। কিছু গবেষণা বলছে, সরকারি কর্মচারীদের বেতন বাড়লে দুর্নীতির প্রবণতা কমতে পারে। কারণ একজন কর্মচারী যদি বৈধভাবে ভালো আয় করেন এবং তার চাকরি হারানোর সম্ভাব্য ক্ষতি বড় হয়, তাহলে ঘুষ নেওয়ার ঝুঁকি তার কাছে তুলনামূলকভাবে বেশি হয়ে ওঠে।
ধরা যাক, একজন সরকারি কর্মকর্তা মাসে ৫০ হাজার টাকা বেতন পান। একই ধরনের দায়িত্বের একটি বেসরকারি চাকরিতে যদি তিনি ১ লাখ টাকা আয় করতে পারেন, তাহলে সরকারি চাকরির আর্থিক মূল্য তার কাছে তুলনামূলকভাবে কম মনে হতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে সামান্য ঘুষের বিনিময়ে নিয়ম ভাঙার প্রলোভন দেখা দিতে পারে। কিন্তু যদি তার বৈধ আয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়, তাহলে সরকারি চাকরি হারানোর সম্ভাব্য ক্ষতিও বাড়বে। ফলে ঘুষ নেওয়ার ক্ষেত্রে ঝুঁকি-লাভের হিসাব বদলে যেতে পারে।
বিশেষ করে নিম্নবেতনভুক্ত কর্মীদের ক্ষেত্রে এই যুক্তি কিছুটা বেশি প্রযোজ্য। যখন একজন কর্মচারীর বেতন পরিবারের মৌলিক ব্যয় মেটানোর জন্যই যথেষ্ট নয়, তখন সামান্য ঘুষও তার কাছে গুরুত্বপূর্ণ অতিরিক্ত আয়ের উৎস হয়ে উঠতে পারে। তাই নবম পে-স্কেলের মাধ্যমে নিম্নপদস্থ কর্মীদের আর্থিক নিরাপত্তা বাড়ানো হলে ছোটখাটো ঘুষ বা দৈনন্দিন সেবার সঙ্গে যুক্ত অনিয়মের কিছুটা হ্রাস ঘটতে পারে।
কিন্তু মধ্যম ও উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রে চিত্রটি একেবারেই ভিন্ন হতে পারে। কারণ তাদের হাতে থাকা প্রশাসনিক, নিয়ন্ত্রক, আইন প্রয়োগ বা সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত ক্ষমতার কারণে ঘুষের পরিমাণ অনেক সময় তাদের বৈধ বেতনের তুলনায় বহুগুণ বেশি হতে পারে।
একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা যদি একটি সিদ্ধান্তের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকার সরকারি প্রকল্প, ক্রয় বা অনুমোদনের ওপর প্রভাব ফেলতে পারেন, তাহলে তার বৈধ বেতন কয়েক গুণ বাড়ালেও সম্ভাব্য অবৈধ লাভের তুলনায় সেটি খুব সামান্য হতে পারে। সে ক্ষেত্রে শুধু বেতন বাড়িয়ে দুর্নীতির প্রলোভন দূর করা কঠিন।
বরং কেউ কেউ এমন পরিস্থিতিতে ঘুষের পরিমাণ আরও বাড়িয়ে দিতে পারেন। অর্থাৎ বেতন বাড়ানোর পাশাপাশি যদি দুর্নীতির সুযোগ ও অবৈধ আয়ের সম্ভাবনা আগের মতোই থাকে, তাহলে শুধু বেতন বৃদ্ধির মাধ্যমে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন নাও আসতে পারে।
এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো দুর্নীতি ধরা পড়ার সম্ভাবনা। একজন সরকারি কর্মকর্তা যদি মনে করেন যে ঘুষ নিলেও তাকে ধরা পড়ার সম্ভাবনা খুব কম, তাহলে উচ্চ বেতনও তাকে দুর্নীতি থেকে বিরত রাখার জন্য যথেষ্ট নাও হতে পারে। বিশেষ করে যখন অবৈধভাবে পাওয়া অর্থের পরিমাণ বৈধ বেতনের তুলনায় অনেক বেশি।
তাই দুর্নীতি প্রতিরোধের আসল সমীকরণ শুধু বেতন নয়; বরং দুর্নীতি থেকে সম্ভাব্য লাভ, ধরা পড়ার সম্ভাবনা এবং ধরা পড়লে শাস্তির মাত্রা—সবকিছুর ওপর নির্ভর করে।
কোনো সরকারি কর্মচারী যদি জানেন যে ঘুষ নেওয়ার পরও তদন্ত হওয়ার সম্ভাবনা কম, শাস্তি এড়ানোর সুযোগ বেশি এবং প্রভাবশালী মহলের সহায়তায় বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়া সম্ভব, তাহলে তার বেতন যতই বাড়ানো হোক, দুর্নীতির প্রলোভন পুরোপুরি দূর হবে না।
এ কারণে নবম পে-স্কেলকে দুর্নীতিবিরোধী ব্যবস্থার একটি অংশ হিসেবে দেখা উচিত, পুরো সমাধান হিসেবে নয়।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সরকারি চাকরিতে বিভিন্ন ধরনের সুযোগ-সুবিধার বৈষম্য। একই ধরনের দায়িত্ব পালন করলেও বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, বিভাগ বা সরকারি সংস্থার কর্মীদের সুযোগ-সুবিধায় পার্থক্য থাকতে পারে। কারও বাড়তি ভাতা বেশি, কারও আবাসন সুবিধা ভালো, কেউ আবার বিভিন্ন ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক সুবিধা পান। চাকরির ঝুঁকি, দায়িত্ব, কাজের চাপ, পেনশন ও অন্যান্য সুবিধার কারণে এসব পার্থক্যের কিছু যৌক্তিক কারণ থাকতে পারে। কিন্তু কর্মীরা যখন নিজেদের মধ্যে তুলনা করেন, তখন বৈষম্যের অনুভূতি তৈরি হতে পারে।
নতুন পে-স্কেল সেই অনুভূতি পুরোপুরি দূর করতে পারবে কি না, সেটিও একটি প্রশ্ন। একই গ্রেডে থাকা দুই কর্মচারীর একজন যদি উল্লেখযোগ্য অতিরিক্ত সুবিধা পান আর অন্যজন না পান, তাহলে শুধু মূল বেতন বাড়িয়ে আপেক্ষিক বঞ্চনার অনুভূতি দূর করা কঠিন।
তবে বেতন বৃদ্ধির আরেকটি ইতিবাচক দিক রয়েছে। এটি সরকারি কর্মচারীদের মনোবল ও আর্থিক নিরাপত্তা বাড়াতে পারে। একজন কর্মচারী যখন নিজের আয়কে ন্যায্য মনে করেন এবং পরিবারকে সম্মানজনকভাবে পরিচালনা করতে পারেন, তখন তার প্রতিষ্ঠানের প্রতি আনুগত্য ও দায়িত্ববোধও শক্তিশালী হতে পারে।
কিন্তু সেই ইতিবাচক প্রভাব টেকসই করতে হলে প্রশাসনিক ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনতে হবে। সরকারি সেবার প্রক্রিয়া যত বেশি স্বচ্ছ হবে, ব্যক্তিনির্ভর সিদ্ধান্তের সুযোগ যত কমবে এবং নাগরিক সেবা যত বেশি ডিজিটাল ও স্বয়ংক্রিয় হবে, ঘুষের সুযোগও তত কমবে।
উদাহরণ হিসেবে সরকারি অনুমোদন, লাইসেন্স, জমি, কর, সরকারি ক্রয় কিংবা বিভিন্ন প্রশাসনিক সেবার ক্ষেত্রে যদি একজন নাগরিককে বহু কর্মকর্তার ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করতে হয়, তাহলে অনিয়মের সুযোগ তৈরি হয়। বিপরীতে প্রক্রিয়াগুলো যদি স্পষ্ট, অনলাইনভিত্তিক এবং নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে সম্পন্ন হয়, তাহলে ঘুষের সুযোগ কমানো সম্ভব।
এর পাশাপাশি প্রয়োজন নিয়মিত নজরদারি, কার্যকর অডিট, সম্পদের হিসাব যাচাই এবং অভিযোগ তদন্তের স্বাধীন ব্যবস্থা। দুর্নীতির অভিযোগ উঠলে তদন্ত যেন রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক প্রভাবের বাইরে থেকে পরিচালিত হয়, সেটিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
শাস্তির নিশ্চয়তাও এখানে বড় ভূমিকা রাখে। দুর্নীতির বিরুদ্ধে আইন থাকলেই হবে না; সেই আইন বাস্তবে প্রয়োগ করতে হবে। কেউ দুর্নীতি করলে তার পদ, পরিচয় বা রাজনৈতিক যোগাযোগ নির্বিশেষে তদন্ত ও শাস্তির মুখোমুখি হতে হবে—এমন বিশ্বাস তৈরি না হলে দুর্নীতি প্রতিরোধ কঠিন।
রাজনৈতিক সদিচ্ছাও তাই অপরিহার্য। প্রশাসন, আইন প্রয়োগকারী সংস্থা, সরকারি ক্রয় ও নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠানগুলোর গুরুত্বপূর্ণ পদগুলো যদি রাজনৈতিক প্রভাবের অধীনে থাকে, তাহলে বেতন কাঠামোর পরিবর্তন একা খুব বেশি ফল দেবে না। একইভাবে দুর্নীতিবিরোধী প্রতিষ্ঠানগুলো যদি কখনো কঠোরভাবে এবং কখনো নির্বাচিতভাবে আইন প্রয়োগ করে, তাহলে দুর্নীতির বিরুদ্ধে মানুষের আস্থা দুর্বল হবে।
নবম পে-স্কেল তাই একদিকে যেমন সরকারি কর্মচারীদের দীর্ঘদিনের জীবনযাত্রার ব্যয় ও মূল্যস্ফীতির চাপ মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ, অন্যদিকে এটি রাষ্ট্রের জন্য বড় আর্থিক দায়ও তৈরি করছে। এই বিপুল ব্যয়ের বিনিময়ে সরকার যদি সত্যিই দুর্নীতি কমাতে চায়, তাহলে বেতন বৃদ্ধির সঙ্গে জবাবদিহি ও প্রশাসনিক সংস্কারও নিশ্চিত করতে হবে।
শেষ পর্যন্ত দুর্নীতি একটি অর্থনৈতিক সমস্যা যেমন, তেমনি এটি একটি প্রাতিষ্ঠানিক ও নৈতিক সমস্যাও। কম বেতন দুর্নীতির একটি কারণ হতে পারে, কিন্তু সেটিই একমাত্র কারণ নয়। ক্ষমতার অপব্যবহার, দুর্বল নজরদারি, শাস্তির অনিশ্চয়তা, রাজনৈতিক প্রভাব, স্বচ্ছতার অভাব এবং বড় অঙ্কের অবৈধ লাভের সুযোগ—সবকিছু মিলেই দুর্নীতির পরিবেশ তৈরি করে।
তাই নবম পে-স্কেলের সাফল্য শুধু সরকারি কর্মচারীরা কত টাকা বেশি পেলেন, তা দিয়ে মাপা উচিত নয়। বরং দেখতে হবে—সরকারি সেবা কতটা সহজ হয়েছে, ঘুষের অভিযোগ কতটা কমেছে, দুর্নীতির তদন্ত কতটা কার্যকর হয়েছে এবং জনগণ সরকারি প্রতিষ্ঠানের ওপর কতটা আস্থা ফিরে পেয়েছে।
বেতন বাড়ানো প্রয়োজন হতে পারে, কিন্তু দুর্নীতি বন্ধ করার জন্য সেটি যথেষ্ট নয়। প্রকৃত পরিবর্তনের জন্য প্রয়োজন ন্যায্য বেতন, স্বচ্ছ প্রশাসন, শক্তিশালী নজরদারি, স্বাধীন তদন্ত, নিশ্চিত শাস্তি এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছার সমন্বয়। এসবের সমন্বয় ঘটাতে পারলেই নবম পে-স্কেল শুধু সরকারি কর্মচারীদের বেতন বাড়ানোর একটি উদ্যোগ না হয়ে আরও দক্ষ, জবাবদিহিমূলক ও দুর্নীতিমুক্ত সরকারি সেবাব্যবস্থা গড়ার একটি সুযোগ হয়ে উঠতে পারে।
আপনার মতামত জানানঃ