
১৯৭৭ সালের ৫ সেপ্টেম্বর। ফ্লোরিডার কেপ ক্যানাভেরাল থেকে টাইটান IIIE–সেন্টর রকেটে চেপে যাত্রা শুরু করেছিল ৭২১.৯ কিলোগ্রামের এক যন্ত্র। নাম ভয়েজার–১। পরিকল্পনা ছিল বৃহস্পতি ও শনি গ্রহকে কাছ থেকে দেখা। কিন্তু সেই সীমিত লক্ষ্য পেরিয়ে যানটি আজ মানুষের নির্মিত সবচেয়ে দূরবর্তী বস্তু—সূর্যের তৈরি কণিকা ও চৌম্বকক্ষেত্রের বুদ্বুদ হেলিওস্ফিয়ারের বাইরে, আন্তঃনাক্ষত্রিক মহাশূন্যে কর্মরত প্রথম মানবদূত। NASA-র মিশন পরিচিতি
আজ ৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ভয়েজার–১-এর যাত্রার ৪৯ বছর পূর্ণ হলো। এই বয়সে তাকে ‘সক্রিয়’ বলা নিজেই এক প্রকৌশল বিস্ময়। সে এখন পৃথিবী থেকে ২৫ বিলিয়ন কিলোমিটারেরও বেশি দূরে। ২০২৬ সালের ১৮ নভেম্বর যানটি পৃথিবী থেকে ঠিক এক ‘আলোক-দিন’ দূরত্বে পৌঁছাবে—অর্থাৎ আলো ২৪ ঘণ্টায় যতটা পথ যায়, ততটা দূরে থাকা প্রথম মানবনির্মিত বস্তু হবে এটি। NASA-র বর্তমান অবস্থান পাতা
একটি গ্রহযাত্রা কীভাবে অনন্ত যাত্রা হয়ে উঠল
ভয়েজার–১ নামের ‘১’ দেখে মনে হতে পারে, সেটিই আগে উড়েছিল। আসলে ভয়েজার–২ উৎক্ষেপিত হয় ১৬ দিন আগে। কিন্তু ভয়েজার–১-এর পথ ছিল দ্রুততর। সে ১৯৭৭ সালের ডিসেম্বরেই যমজ যানটিকে পেছনে ফেলে দেয়। ১৯৭৯ সালের মার্চে বৃহস্পতির পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় এটি গ্রহটির ক্ষীণ বলয় এবং থিবি ও মেটিস নামে দুটি নতুন উপগ্রহ আবিষ্কার করে। ১৯৮০ সালের নভেম্বরে শনির কাছে গিয়ে পাঁচটি নতুন উপগ্রহ, জি-রিং এবং বলয়ের জটিল গঠন সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাঠায়।
শনির বৃহৎ উপগ্রহ টাইটানকে কাছ থেকে দেখার সিদ্ধান্তই ভয়েজার–১-এর ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে। টাইটানের ঘন বায়ুমণ্ডল পর্যবেক্ষণের জন্য যানটিকে এমন পথে নেওয়া হয়েছিল, যা তাকে গ্রহগুলোর সমতল কক্ষপথের ওপর দিয়ে বাইরে ছুড়ে দেয়। ফলে ইউরেনাস ও নেপচুনের দিকে যাওয়ার সুযোগ আর থাকেনি; সেই দায়িত্ব নেয় ভয়েজার–২। কিন্তু ভয়েজার–১ পেয়ে যায় অন্য এক গন্তব্য—সৌরজগতের সীমান্ত এবং তারও পরের অজানা অঞ্চল।
১৯৯০ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি, ক্যামেরা বন্ধ করার আগে ভয়েজার–১ ঘুরে তাকিয়েছিল নিজের ঘরের দিকে। প্রায় ৪০ জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক একক দূর থেকে তোলা সৌরজগতের ‘ফ্যামিলি পোর্ট্রেট’-এর এক ফ্রেমে পৃথিবী দেখা যায় সূর্যালোকের মধ্যে ক্ষুদ্র নীল বিন্দু হিসেবে। সেই ছবিই ‘পেল ব্লু ডট’। মহাশূন্যের বিপুলতায় মানুষের সমস্ত ইতিহাস, যুদ্ধ, প্রেম, অহংকার ও স্বপ্ন যে এক অতি ক্ষুদ্র বিন্দুতে ঘটে—ছবিটি সেই কঠিন সত্যের দৃশ্যমান দলিল।
‘সৌরজগত ছেড়েছে’—কথাটির অর্থ কী
২০১২ সালের ২৫ আগস্ট ভয়েজার–১ হেলিওপজ অতিক্রম করে। হেলিওপজ হলো সেই সীমানা, যেখানে সৌরবায়ুর প্রভাবের চেয়ে আন্তঃনাক্ষত্রিক মাধ্যমের প্রভাব শক্তিশালী হয়ে ওঠে। এ কারণেই তাকে আন্তঃনাক্ষত্রিক মহাশূন্যে প্রবেশ করা প্রথম মানবনির্মিত বস্তু বলা হয়।
তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য আছে। ‘আন্তঃনাক্ষত্রিক মহাশূন্যে প্রবেশ’ আর ‘সূর্যের মহাকর্ষীয় প্রভাব সম্পূর্ণ ছেড়ে যাওয়া’ এক কথা নয়। বহু দূরে ওর্ট মেঘ পর্যন্ত সৌরজগতের বিস্তৃত মহাকর্ষীয় পরিসর ধরা হয়। ভয়েজারের সেই অঞ্চল অতিক্রম করতে হাজার হাজার বছর লাগতে পারে। অতএব সে সৌরবায়ুর বুদ্বুদ পেরিয়েছে, কিন্তু বৃহত্তর অর্থে সূর্যের রাজ্য এখনো পুরোপুরি ছাড়েনি।
এত দূর থেকে কথোপকথন
ভয়েজার–১-এর সঙ্গে যোগাযোগ কোনো তাৎক্ষণিক কথোপকথন নয়। পৃথিবী থেকে পাঠানো একটি রেডিও নির্দেশ পৌঁছাতে এখন প্রায় ২৩ ঘণ্টা লাগে; উত্তর ফিরতেও প্রায় সমান সময়। একটি পরীক্ষার ফল জানতে তাই প্রায় ৪৬ ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়। ১৯৭০-এর দশকের প্রযুক্তিতে নির্মিত যানের ক্ষীণ সংকেত ধরে NASA-র ডিপ স্পেস নেটওয়ার্ক—ক্যালিফোর্নিয়া, স্পেন ও অস্ট্রেলিয়ায় ছড়িয়ে থাকা বিশাল অ্যান্টেনা ব্যবস্থা।
এই দূরত্বেই ২০২৩ সালের নভেম্বরে ভয়েজার–১ পাঠাতে শুরু করে দুর্বোধ্য তথ্য। যানটি নির্দেশ গ্রহণ করছিল, কিন্তু বিজ্ঞান ও প্রকৌশল-ডেটা আর পড়া যাচ্ছিল না। কয়েক মাসের অনুসন্ধানে প্রকৌশলীরা বুঝতে পারেন, ফ্লাইট ডেটা সিস্টেমের একটি মেমোরি চিপ নষ্ট হয়েছে এবং প্রয়োজনীয় সফটওয়্যার কোডের অংশ হারিয়েছে। এক জায়গায় সেই কোড বসানোর মতো ফাঁকা স্মৃতি ছিল না। তাই তারা কোডটিকে কয়েক ভাগে ভেঙে ভিন্ন ভিন্ন স্থানে রেখে, সব রেফারেন্স নতুন ঠিকানায় মিলিয়ে দেন। ২০২৪ সালের এপ্রিলে প্রকৌশল-ডেটা এবং জুনে বৈজ্ঞানিক ডেটা আবার পাঠাতে শুরু করে যানটি। প্রায় অর্ধশতাব্দী পুরোনো কম্পিউটারকে ২৪ বিলিয়ন কিলোমিটারের ওপার থেকে মেরামত—মানব প্রকৌশলের ইতিহাসে এটি বিরল এক দূরবর্তী উদ্ধার। JPL-এর প্রকৌশল আপডেট
সবচেয়ে বড় শত্রু: সময় নয়, বিদ্যুৎ
ভয়েজার–১ সৌরপ্যানেলে চলে না। এত দূরে সূর্যের আলো অত্যন্ত দুর্বল। এর তিনটি রেডিওআইসোটোপ থার্মোইলেকট্রিক জেনারেটর প্লুটোনিয়ামের ক্ষয় থেকে উৎপন্ন তাপকে বিদ্যুতে রূপান্তর করে। কিন্তু জ্বালানির ক্ষয় ও যন্ত্রাংশের বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দুই ভয়েজারের বিদ্যুৎশক্তি বছরে প্রায় চার ওয়াট করে কমছে।
বেঁচে থাকার কৌশল তাই নির্মম: একে একে হিটার ও বৈজ্ঞানিক যন্ত্র বন্ধ করা। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে ভয়েজার–১-এর কসমিক রে সাবসিস্টেম বন্ধ হয়। ২০২৬ সালের ১৭ এপ্রিল বন্ধ করা হয় লো-এনার্জি চার্জড পার্টিকলস যন্ত্র। এখন সচল আছে মাত্র দুটি বিজ্ঞানযন্ত্র—ম্যাগনেটোমিটার এবং প্লাজমা ওয়েভ সাবসিস্টেম। একটি চৌম্বকক্ষেত্র মাপে, অন্যটি আন্তঃনাক্ষত্রিক প্লাজমার তরঙ্গ ‘শোনে’। NASA-র ভাষায়, পৃথিবীর তৈরি আর কোনো যান এই অঞ্চল থেকে এমন তথ্য দিতে পারে না। NASA-র ২০২৬ সালের শক্তি-সংরক্ষণ আপডেট
এখানেই ভয়েজারের সাহসিকতা রোমান্টিকতার বদলে বাস্তব হয়ে ওঠে। এটি অমর নয়। প্রতিটি ওয়াট বাঁচানো মানে কিছু দেখার ক্ষমতা হারানো, যাতে অন্য একটি অনুভূতি আরও কিছুদিন টিকে থাকে। মিশনের শেষ অধ্যায় তাই আবিষ্কারের পাশাপাশি বেছে বেছে বিসর্জনের ইতিহাস।
সঙ্গে আছে পৃথিবীর পরিচয়পত্র
ভয়েজার–১ একা নয়। তার গায়ে বসানো আছে ১২ ইঞ্চির স্বর্ণমণ্ডিত তামার ডিস্ক—‘গোল্ডেন রেকর্ড’। কোনো বুদ্ধিমান প্রাণী কখনো এটি পেলে কীভাবে বাজাবে, পৃথিবী কোথায় এবং কতদিন ধরে রেকর্ডটি ভ্রমণ করছে—তার সংকেত খোদাই করা আছে আবরণে। ডিস্কে রয়েছে পৃথিবীর জীবন ও সংস্কৃতির ছবি, বজ্রপাত ও পাখির ডাকসহ প্রাকৃতিক শব্দ, নানা যুগ ও সংস্কৃতির সংগীত এবং ৫৫ ভাষায় শুভেচ্ছা। NASA-র গোল্ডেন রেকর্ড পরিচিতি
এটি বাস্তবে ভিনগ্রহীর হাতে পৌঁছাবে—এমন সম্ভাবনা অত্যন্ত ক্ষীণ। বরং গোল্ডেন রেকর্ড ছিল নিজেদের কাছে নিজেদের পরিচয় দেওয়ার একটি প্রয়াস। শীতল যুদ্ধের বিভক্ত পৃথিবী মহাবিশ্বকে যে বার্তা পাঠিয়েছিল, সেখানে দেশসীমার মানচিত্র নয়; ছিল মানুষের হাসি, শিশুর কান্না, সমুদ্রের শব্দ, গণিত, সংগীত ও জীবনের বৈচিত্র্য। অর্থাৎ আমরা কী নিয়ে লড়ি তা নয়, আমরা সম্মিলিতভাবে কী—সেই উত্তরটি বেছে নেওয়া হয়েছিল।
কেন ‘সবচেয়ে সাহসী দূত’
ভয়েজার–১-এর সাহস মানুষের মতো অনুভূত সাহস নয়; যন্ত্র ভয় পায় না। সাহসটি আসলে তাদের, যারা এমন এক যান বানিয়েছিলেন যার সাফল্যের বড় অংশ তারা জীবদ্দশায় দেখতে পারবেন কি না জানতেন না; যারা অনিশ্চিত সংকেতের ভেতর মাসের পর মাস ত্রুটি খুঁজে পুরোনো কোড নতুন ঠিকানায় বসিয়েছেন; এবং যারা জানতেন, একদিন কোনো উত্তর না দিয়েই যানটি নীরব হয়ে যাবে—তবু তাকে পাঠিয়েছেন।
এর বৈজ্ঞানিক মূল্য অনন্য। গ্রহের বলয়, উপগ্রহ ও বায়ুমণ্ডল সম্পর্কে জ্ঞান বদলে দেওয়ার পরও এটি এমন অঞ্চলের প্লাজমা ও চৌম্বকক্ষেত্র মাপছে, যেখানে আর কোনো কার্যকর মানবযান নেই। এর প্রকৌশলগত মূল্যও বিরাট: সীমিত শক্তি, দীর্ঘ যোগাযোগ-বিলম্ব ও অকল্পনীয় দূরত্বে একটি ব্যবস্থা কীভাবে পরিচালনা করতে হয়, ভয়েজার তার জীবন্ত পাঠ্যপুস্তক।
কিন্তু এর সাংস্কৃতিক মূল্য সম্ভবত আরও গভীর। ভয়েজার আমাদের অর্জনের চেয়ে আমাদের বিনয় শেখায়। পৃথিবীর সবচেয়ে দূরবর্তী প্রতিনিধি কোনো পতাকা উড়িয়ে নতুন ভূমি দাবি করছে না। সে নিঃশব্দে তথ্য সংগ্রহ করছে এবং সঙ্গে বহন করছে মানুষের কণ্ঠ ও পৃথিবীর শব্দ। আধিপত্য নয়—কৌতূহল; নিশ্চিত উত্তর নয়—প্রশ্ন; ফিরে আসার প্রতিশ্রুতি নয়—অজানার দিকে অবিরাম যাত্রা।
শেষ সংকেতের পরও যাত্রা থাকবে
একদিন বিদ্যুৎ এত কমে যাবে যে পৃথিবীর সঙ্গে ভয়েজার–১-এর যোগাযোগ থেমে যাবে। তখন তার বৈজ্ঞানিক মিশন শেষ হবে, কিন্তু গতি থামবে না। গ্রহ, নক্ষত্র ও সভ্যতার সময়মাত্রা পেরিয়ে সে মিল্কিওয়ের পথে ঘুরে বেড়াবে। গোল্ডেন রেকর্ড তখনও থাকবে—সম্ভবত মানবসভ্যতার বহু নির্মাণের চেয়ে দীর্ঘকাল।
ভয়েজার–১ তাই কেবল ‘সবচেয়ে দূরের যন্ত্র’ নয়। এটি মানুষের এমন একটি সিদ্ধান্তের স্মারক—আমরা নিজেদের ছোটত্ব জেনেও মহাবিশ্বকে প্রশ্ন করব; উত্তর আসতে প্রায় দুই দিন লাগলেও অপেক্ষা করব; শক্তি ফুরিয়ে এলেও শেষ সচল যন্ত্র দিয়ে অন্ধকারের শব্দ শুনব। পৃথিবী থেকে যত দূরে যাচ্ছে, ততই সে আমাদের সবচেয়ে মানবিক বৈশিষ্ট্যটির কাছে ফিরিয়ে আনছে: সীমা জেনেও সীমার ওপারে তাকানোর সাহস।
আপনার মতামত জানানঃ