বাংলাদেশ আবারও যুক্তরাষ্ট্রের উড়োজাহাজ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান বোয়িং থেকে বিমান কেনার সিদ্ধান্তের দিকে এগোচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক বিশেষ দূত ও ভারতে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত সার্জিও গর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এমন তথ্য জানানোর পর বিষয়টি নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মধ্যে আরেকটি ‘দারুণ চুক্তি’ হয়েছে। তবে ঠিক কতটি উড়োজাহাজ, কী মডেলের এবং কী আর্থিক কাঠামোয় কেনা হবে—এসব বিষয়ে এখনো বিস্তারিত তথ্য স্পষ্ট নয়।
এই ঘোষণার গুরুত্ব বুঝতে হলে কয়েক মাস পেছনে তাকাতে হয়। চলতি বছরের ৩০ এপ্রিল যুক্তরাষ্ট্রের আর্লিংটনে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স ও বোয়িংয়ের মধ্যে একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল। সেই চুক্তির আওতায় ১৪টি উড়োজাহাজ কেনার কথা জানানো হয়। এর মধ্যে ১০টি বোয়িং ৭৮৭ ড্রিমলাইনার এবং চারটি বোয়িং ৭৩৭ ম্যাক্স। বিমান বাংলাদেশ জানিয়েছিল, এসব উড়োজাহাজের বাজারমূল্য প্রায় ৩ দশমিক ৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, বাংলাদেশি মুদ্রায় যার পরিমাণ প্রায় ৪৫ হাজার কোটি টাকা।
এরপর নতুন করে আরও বিমান কেনার সম্ভাবনার খবর সামনে আসায় স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে—বাংলাদেশের কি সত্যিই এত বেশি উড়োজাহাজ প্রয়োজন? নাকি এর পেছনে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ক আরও জোরদার করার হিসাব? বিশেষ করে যখন দেশের অর্থনীতি এখনো নানা চাপের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, তখন বিলিয়ন ডলারের বিমান কেনার সিদ্ধান্তকে শুধু ব্যবসায়িক সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখা কতটা বাস্তবসম্মত, সেটিই বড় প্রশ্ন।
সরকারের পক্ষ থেকে অবশ্য চাপের অভিযোগ অস্বীকার করা হয়েছে। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির বলেছেন, কোনো চাপের কারণে নয়, বাংলাদেশের নিজস্ব চাহিদার ভিত্তিতেই যুক্তরাষ্ট্র থেকে বোয়িং উড়োজাহাজ কেনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, আগামী ১০ থেকে ১৫ বছরে বাংলাদেশের এভিয়েশন খাতে ৭০ থেকে ৮০টি বা তারও বেশি বড় উড়োজাহাজের প্রয়োজন হতে পারে। সরকার বাংলাদেশকে একটি এভিয়েশন হাব হিসেবে গড়ে তুলতে চায়। সেই লক্ষ্য পূরণ করতে হলে উড়োজাহাজের বহর বাড়ানো জরুরি।
তাঁর বক্তব্যের মধ্যে যুক্তি আছে। বাংলাদেশের বিমান পরিবহন বাজার দ্রুত বড় হচ্ছে। বর্তমানে দেশ থেকে আন্তর্জাতিক রুটে যে যাত্রীবাজার রয়েছে, তার বড় অংশই বিদেশি এয়ারলাইনগুলোর নিয়ন্ত্রণে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক তথ্য ও খাতসংশ্লিষ্ট বিশ্লেষণ অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক যাত্রী পরিবহনে বাংলাদেশি এয়ারলাইনগুলোর অংশ প্রায় এক-চতুর্থাংশের মতো। বাকি বড় অংশ বিদেশি কোম্পানিগুলো পরিচালনা করছে। ফলে বাংলাদেশের নিজস্ব এয়ারলাইনগুলো যদি নতুন রুট চালু করতে পারে, যাত্রী পরিবহনের সক্ষমতা বাড়াতে পারে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতামূলক হয়ে উঠতে পারে, তাহলে দেশের অর্থনীতিতে এর ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
কিন্তু শুধু উড়োজাহাজ কিনলেই এই লক্ষ্য অর্জিত হবে না। বরং এখানেই রয়েছে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
বাংলাদেশের জাতীয় পতাকাবাহী বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের বহরে বর্তমানে ১৯টি উড়োজাহাজ রয়েছে। এর পাশাপাশি আরও ১০টি উড়োজাহাজ লিজ নেওয়ার পরিকল্পনার কথাও জানিয়েছে সরকার। অন্যদিকে দেশের বেসরকারি এয়ারলাইন ইউএস-বাংলা ২০২৭ সালের মধ্যে ২১টি নতুন বোয়িং উড়োজাহাজ বহরে যুক্ত করার পরিকল্পনা জানিয়েছে। অর্থাৎ আগামী কয়েক বছরে বাংলাদেশের আকাশ পরিবহন খাতে উড়োজাহাজের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে পারে।
প্রশ্ন হচ্ছে, এই বিপুলসংখ্যক উড়োজাহাজ পরিচালনার জন্য বাংলাদেশের প্রয়োজনীয় অবকাঠামো, দক্ষ জনবল, রক্ষণাবেক্ষণ ব্যবস্থা এবং বাণিজ্যিক ব্যবস্থাপনা প্রস্তুত আছে কি না।
একটি আধুনিক উড়োজাহাজ কেনার পর সেটিকে আকাশে ওড়ানোই শেষ কথা নয়। এর জন্য প্রয়োজন প্রশিক্ষিত পাইলট, প্রকৌশলী, টেকনিশিয়ান, কেবিন ক্রু, গ্রাউন্ড স্টাফ, রক্ষণাবেক্ষণ অবকাঠামো, স্পেয়ার পার্টস, সফটওয়্যার, নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং দক্ষ ব্যবস্থাপনা। একই সঙ্গে প্রয়োজন এমন একটি মার্কেটিং ও রুট পরিকল্পনা, যার মাধ্যমে প্রতিটি উড়োজাহাজ পর্যাপ্ত যাত্রী ও কার্গো পরিবহন করে আয় করতে পারে।
এখানেই বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের অতীত অভিজ্ঞতা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে প্রতিষ্ঠানটি দেশের জাতীয় পতাকাবাহী বিমান সংস্থা হিসেবে কাজ করলেও দীর্ঘমেয়াদে একটি শক্তিশালী ও ধারাবাহিকভাবে লাভজনক বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হতে পারেনি। ফলে নতুন উড়োজাহাজ কেনার সিদ্ধান্তের পাশাপাশি পুরোনো প্রশ্নটিও সামনে আসে—বিমান কি তার বর্তমান সক্ষমতা ও ব্যবস্থাপনা কাঠামো দিয়ে আরও বড় বহরকে সফলভাবে পরিচালনা করতে পারবে?
এভিয়েশন বিশেষজ্ঞ কাজী ওয়াহিদুল আলমের বক্তব্যেও এই উদ্বেগের প্রতিফলন রয়েছে। তাঁর মতে, আগাম অর্ডার করলে তুলনামূলক কম দামে উড়োজাহাজ পাওয়ার সুযোগ থাকে এবং আগামী দশকে বাংলাদেশের যাত্রীসংখ্যা বর্তমানের তুলনায় দুই থেকে আড়াই গুণ হতে পারে। সে হিসাবে এখন থেকেই বহর সম্প্রসারণের পরিকল্পনা করা যুক্তিযুক্ত। কিন্তু একই সঙ্গে তিনি মনে করেন, বড় বহর পরিচালনার সক্ষমতা তৈরি না হলে নতুন উড়োজাহাজই শেষ পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানের জন্য বোঝা হয়ে উঠতে পারে।
এই দ্বৈত বাস্তবতাই বোয়িং কেনার পুরো বিষয়টিকে জটিল করে তুলেছে। একদিকে বাংলাদেশকে ভবিষ্যতের যাত্রীবাজারের জন্য প্রস্তুতি নিতে হবে। অন্যদিকে ভবিষ্যতের সম্ভাবনা ধরে আজ বিপুল অর্থ ব্যয় করার ঝুঁকিও কম নয়।
বিশ্বের বিমান পরিবহন শিল্পে উড়োজাহাজ কেনা সাধারণত দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ। একটি এয়ারলাইন আজ অর্ডার দিলে অনেক ক্ষেত্রে কয়েক বছর পর সেই উড়োজাহাজ হাতে পায়। তাই ১০ বা ১৫ বছরের সম্ভাব্য যাত্রীচাহিদা বিবেচনা করে বহর পরিকল্পনা করা অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু সেই পরিকল্পনা অবশ্যই তথ্যভিত্তিক হতে হবে। কোন রুটে কত যাত্রী আছে, কোন রুটে ভবিষ্যতে যাত্রী বাড়বে, কোন গন্তব্যে প্রতিযোগিতা কম, কোথায় কার্গো সম্ভাবনা বেশি—এসব প্রশ্নের সুনির্দিষ্ট উত্তর থাকতে হবে।
শুধু ‘আগামী দিনে যাত্রী বাড়বে’—এই ধারণার ওপর ভিত্তি করে উড়োজাহাজ কেনা হলে তা ঝুঁকিপূর্ণ। কারণ যাত্রী বাড়লেও সেই যাত্রী বাংলাদেশের নিজস্ব এয়ারলাইন ব্যবহার করবে—এমন নিশ্চয়তা নেই। বিদেশি এয়ারলাইনগুলোও তাদের সক্ষমতা বাড়াবে, নতুন রুট চালু করবে এবং বাংলাদেশের বাজারে প্রতিযোগিতা করবে। ফলে বাংলাদেশের এয়ারলাইনকে শুধু আসনসংখ্যা বাড়ালেই হবে না; সেবা, সময়ানুবর্তিতা, ভাড়া, রুট নেটওয়ার্ক, ট্রানজিট সুবিধা এবং যাত্রীর অভিজ্ঞতার দিক থেকেও প্রতিযোগিতামূলক হতে হবে।
এখানে বাংলাদেশের জন্য আরেকটি বড় সুযোগ রয়েছে। বর্তমানে বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি যাত্রী মধ্যপ্রাচ্য, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, ইউরোপ এবং অন্যান্য অঞ্চলে যাতায়াত করেন। শ্রমিক, ব্যবসায়ী, শিক্ষার্থী, পর্যটক ও প্রবাসীদের কারণে এই বাজারের একটি বড় অংশ তুলনামূলক স্থায়ী। বাংলাদেশের নিজস্ব এয়ারলাইন যদি এই যাত্রীদের বড় একটি অংশকে নিজেদের নেটওয়ার্কে আনতে পারে, তাহলে নতুন উড়োজাহাজের বাণিজ্যিক ব্যবহার নিশ্চিত করার সুযোগ তৈরি হবে।
তবে সেই লক্ষ্য অর্জনে রুট নির্বাচন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সব আন্তর্জাতিক রুট সমান লাভজনক নয়। কোনো রুটে যাত্রীসংখ্যা বেশি হলেও প্রতিযোগিতা এত বেশি হতে পারে যে সেখানে মুনাফা করা কঠিন। আবার তুলনামূলক ছোট কোনো বাজারে কম প্রতিযোগিতার কারণে বেশি লাভ হতে পারে। তাই বিমান কেনার আগে শুধু কতটি উড়োজাহাজ প্রয়োজন তা নয়, প্রতিটি উড়োজাহাজ কোথায় এবং কীভাবে ব্যবহার করা হবে—তার বিস্তারিত ব্যবসায়িক পরিকল্পনা থাকা জরুরি।
এদিকে বোয়িং কেনার সিদ্ধান্তের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্যিক সম্পর্কের বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে বাণিজ্য ভারসাম্য নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনা রয়েছে। ফলে যুক্তরাষ্ট্র থেকে বড় অঙ্কের পণ্য কেনা হলে তা দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের হিসাবেও প্রভাব ফেলতে পারে। এ কারণেই অনেকে প্রশ্ন তুলছেন, বিমান কেনার সিদ্ধান্তে বাণিজ্যিক প্রয়োজনের পাশাপাশি কূটনৈতিক বা বাণিজ্যিক সম্পর্কের হিসাবও কি কাজ করছে?
এই প্রশ্নের উত্তর এখনো পুরোপুরি পরিষ্কার নয়। তবে একটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ—একটি রাষ্ট্রীয় এয়ারলাইনকে যদি কোনো কূটনৈতিক বা বাণিজ্যিক সমীকরণের অংশ হিসেবে বড় অঙ্কের উড়োজাহাজ কিনতে হয়, তাহলে সেই বিনিয়োগের আর্থিক ঝুঁকি শেষ পর্যন্ত বহন করতে হবে রাষ্ট্রকেই। তাই সিদ্ধান্তের স্বচ্ছতা এবং অর্থনৈতিক যৌক্তিকতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বিশেষ করে এমন সময়ে যখন বাংলাদেশ অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করছে। সরকার নিজেই দেশের অর্থনীতির ওপর চাপের কথা বলছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের কাছ থেকে নতুন ঋণের জন্যও বাংলাদেশ যোগাযোগ করেছে। বড় সরকারি প্রকল্প গ্রহণে সতর্কতা, বৈদেশিক মুদ্রার চাপ এবং বিভিন্ন খাতে ব্যয় নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আলোচনা চলছে। এর মধ্যে কয়েক বিলিয়ন ডলারের উড়োজাহাজ কেনার সিদ্ধান্ত স্বাভাবিকভাবেই জনমনে প্রশ্ন তৈরি করবে।
তবে বিমান কেনা মানেই যে অপচয়—এমন সিদ্ধান্তেও পৌঁছানো ঠিক হবে না। একটি রাষ্ট্রের বিমান পরিবহন সক্ষমতা কেবল ব্যবসায়িক মুনাফার বিষয় নয়; এর সঙ্গে পর্যটন, প্রবাসী শ্রমবাজার, বাণিজ্য, বিনিয়োগ, কূটনীতি এবং দেশের আন্তর্জাতিক যোগাযোগও যুক্ত। একটি শক্তিশালী জাতীয় এয়ারলাইন বিদেশি এয়ারলাইনগুলোর ওপর নির্ভরতা কমাতে পারে এবং দেশের যাত্রী পরিবহনের বড় অংশ নিজের নিয়ন্ত্রণে আনতে পারে।
সুতরাং মূল প্রশ্ন হওয়া উচিত—বাংলাদেশ কতটি বিমান কিনছে, তা নয়; বরং কেন কিনছে, কীভাবে ব্যবহার করবে এবং কত বছরে সেই বিনিয়োগের অর্থনৈতিক সুফল পাওয়া যাবে।
যদি আগামী ১০ থেকে ১৫ বছরে যাত্রীসংখ্যা সত্যিই উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ে, নতুন আন্তর্জাতিক রুট তৈরি হয়, বাংলাদেশকে আঞ্চলিক এভিয়েশন হাব হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হয় এবং বিমান বাংলাদেশ দক্ষ বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হতে পারে, তাহলে নতুন উড়োজাহাজ কেনা দীর্ঘমেয়াদে লাভজনক বিনিয়োগ হতে পারে। কিন্তু সেই প্রস্তুতি ছাড়া শুধু বহর বড় করলে পরিস্থিতি উল্টো হতে পারে।
সবচেয়ে জরুরি হলো একটি পূর্ণাঙ্গ জাতীয় এভিয়েশন কৌশল। সেখানে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের ভবিষ্যৎ বহর, বেসরকারি এয়ারলাইনগুলোর সম্প্রসারণ, বিমানবন্দর অবকাঠামো, পাইলট ও প্রকৌশলী তৈরির পরিকল্পনা, রক্ষণাবেক্ষণ সক্ষমতা, কার্গো পরিবহন, ট্রানজিট যাত্রী এবং আন্তর্জাতিক রুট—সবকিছুকে একসঙ্গে বিবেচনা করতে হবে।
ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরকে কেন্দ্র করে যদি বাংলাদেশ সত্যিই একটি আঞ্চলিক বিমান চলাচল কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠতে চায়, তাহলে শুধু উড়োজাহাজের সংখ্যা বাড়ালেই হবে না। দ্রুত ও দক্ষ ইমিগ্রেশন, আধুনিক টার্মিনাল, পর্যাপ্ত পার্কিং বে, কার্গো সুবিধা, ট্রানজিট ব্যবস্থা এবং আন্তর্জাতিক মানের গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং প্রয়োজন হবে। একই সঙ্গে বিমান বাংলাদেশকে রাজনৈতিক প্রভাবের বাইরে রেখে পেশাদার বাণিজ্যিক ব্যবস্থাপনার অধীনে পরিচালনার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ।
অর্থাৎ বোয়িং থেকে নতুন উড়োজাহাজ কেনা বাংলাদেশের জন্য একই সঙ্গে সুযোগ এবং ঝুঁকি। সুযোগ—কারণ দেশের বিশাল আন্তর্জাতিক যাত্রীবাজারের বড় অংশ এখনো বিদেশি এয়ারলাইনগুলোর হাতে। ঝুঁকি—কারণ সেই বাজার দখল করার মতো দক্ষতা ও ব্যবস্থাপনা কাঠামো তৈরি না হলে নতুন উড়োজাহাজের ঋণ, রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিচালন ব্যয় রাষ্ট্রের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করতে পারে।
বাংলাদেশের সামনে এখন তাই একটি মৌলিক সিদ্ধান্তের প্রশ্ন। দেশ কি শুধু উড়োজাহাজ কিনে বহর বড় করবে, নাকি উড়োজাহাজ কেনার সঙ্গে সঙ্গে একটি দক্ষ, লাভজনক ও আন্তর্জাতিকভাবে প্রতিযোগিতামূলক বিমান পরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তুলবে?
প্রথমটি করলে এটি বড় ব্যয়ের সিদ্ধান্ত হতে পারে। দ্বিতীয়টি করতে পারলে একই ব্যয় ভবিষ্যতের একটি কৌশলগত বিনিয়োগে পরিণত হতে পারে। শেষ পর্যন্ত বোয়িং কেনার সাফল্য নির্ভর করবে উড়োজাহাজের সংখ্যা নয়, সেগুলো কতটা দক্ষতার সঙ্গে আকাশে উড়ানো যায় এবং প্রতিটি উড়োজাহাজ দেশের অর্থনীতিতে কতটা মূল্য তৈরি করতে পারে—তার ওপর।
তাই এখন সবচেয়ে প্রয়োজন উড়োজাহাজ কেনার সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে আবেগ বা রাজনৈতিক বিতর্ক নয়, বরং স্বচ্ছ হিসাব, বাস্তব যাত্রীচাহিদা, রুটভিত্তিক ব্যবসায়িক বিশ্লেষণ এবং দীর্ঘমেয়াদি কৌশল। বাংলাদেশ যদি সেই পরিকল্পনা নিশ্চিত করতে পারে, তাহলে নতুন বোয়িং বহর দেশের আকাশপথের সক্ষমতা বাড়ানোর শক্তিশালী হাতিয়ার হতে পারে। আর যদি পরিকল্পনা ও সক্ষমতার ঘাটতি থেকেই যায়, তাহলে আকাশে ওড়ার কথা যে উড়োজাহাজগুলোর, সেগুলোই একসময় দেশের অর্থনীতির জন্য মাটিতে দাঁড়িয়ে থাকা ব্যয়ের বোঝায় পরিণত হতে পারে।
আপনার মতামত জানানঃ