বিশ্ব রাজনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটছে। চীন, রাশিয়া, বেলারুশ, ইরান ও উত্তর কোরিয়ার মধ্যে সামরিক, অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ক সাম্প্রতিক বছরগুলোতে উল্লেখযোগ্যভাবে গভীর হয়েছে। তবে এই দেশগুলো একটি আনুষ্ঠানিক জোট গঠন করছে—এমন প্রমাণ খুব বেশি নেই। বরং তারা এমন কিছু পারস্পরিক সহযোগিতার ব্যবস্থা গড়ে তুলছে, যার মাধ্যমে একে অন্যের ওপর চাপ কমাতে এবং পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা ও রাজনৈতিক চাপ মোকাবিলা করতে সক্ষম হচ্ছে।
এই সহযোগিতার ধরনটি প্রচলিত সামরিক জোটের চেয়ে অনেক বেশি বিস্তৃত। এর মধ্যে রয়েছে নিষেধাজ্ঞার প্রভাব কমানোর বাণিজ্যিক নেটওয়ার্ক, ডলারের ওপর নির্ভরতা কমানোর বিকল্প অর্থপ্রদানের ব্যবস্থা, সামরিক সরঞ্জাম ও প্রযুক্তির সরবরাহব্যবস্থা, জাতিসংঘে কূটনৈতিক সমর্থন, নজরদারি ও আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থায় সহযোগিতা এবং এমন একটি সার্বভৌমত্বের ধারণা, যেখানে বাইরের শক্তির হস্তক্ষেপ থেকে রাষ্ট্রকে যতটা সম্ভব সুরক্ষিত রাখাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়।
চীন ও রাশিয়ার সম্পর্ক এই নতুন বাস্তবতার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। দুই দেশের নেতারা তাদের সম্পর্ককে ‘সমন্বিত কৌশলগত অংশীদারত্ব’ হিসেবে বর্ণনা করেন। বৈশ্বিক শাসনব্যবস্থা নিয়ে তারা বিভিন্ন ক্ষেত্রে সমন্বয় করে এবং যৌথ সামরিক মহড়াও পরিচালনা করে। ইউক্রেনে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার আগ্রাসনের পর চীন মস্কোর জন্য গুরুত্বপূর্ণ অংশীদারে পরিণত হয়েছে। চীনের শুল্কসংক্রান্ত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পরিমাণ প্রায় ২৩৪ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছিল। আগের বছরের রেকর্ডের তুলনায় সামান্য কম হলেও যুদ্ধ শুরুর আগের সময়ের তুলনায় এটি অনেক বেশি।
রাশিয়া চীনের কাছে তেল, গ্যাসসহ বিভিন্ন পণ্য বিক্রি করে, অনেক ক্ষেত্রে তুলনামূলক কম দামে। বিপরীতে চীন রাশিয়াকে যন্ত্রপাতি, শিল্পের কাঁচামাল ও বিভিন্ন প্রয়োজনীয় উপকরণ সরবরাহ করে। তবে এর অর্থ এই নয় যে বেইজিং রাশিয়ার প্রতিটি পদক্ষেপকে সমর্থন করে। চীন ইউক্রেন যুদ্ধে সরাসরি অংশ নেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করে এবং রাশিয়াকে প্রাণঘাতী অস্ত্র সরবরাহের কথাও অস্বীকার করেছে। তবু যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন চীন ও হংকংভিত্তিক কিছু প্রতিষ্ঠানের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। এসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে রাশিয়ার সামরিক-শিল্প খাতে ব্যবহারযোগ্য দ্বৈত-ব্যবহারযোগ্য পণ্য সরবরাহের অভিযোগ রয়েছে।
রাশিয়ার সঙ্গে ইরান ও উত্তর কোরিয়ার সহযোগিতা অবশ্য আরও সরাসরি সামরিক মাত্রা পেয়েছে। ইরানের তৈরি শাহেদ ড্রোন ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়ার ব্যবহারের বিষয়টি এই সম্পর্কের গভীরতার একটি উদাহরণ। তেহরান দাবি করে, ২০২২ সালের আগে কিছু ড্রোন রাশিয়াকে সরবরাহ করা হয়েছিল এবং পরবর্তী সময়ে সরবরাহের অভিযোগ অস্বীকার করে।
উত্তর কোরিয়ার ক্ষেত্রেও সহযোগিতা শুধু গোলাবারুদ ও ক্ষেপণাস্ত্র সরবরাহের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। প্রথমে রাশিয়াকে উত্তর কোরিয়ার গোলাবারুদ ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র সরবরাহের খবর সামনে আসে। পরে এই সম্পর্ক আরও বিস্তৃত সামরিক সহযোগিতায় রূপ নেয়। এমনকি উত্তর কোরিয়ার সেনারা রুশ বাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধেও অংশ নিয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
এই সম্পর্কগুলো সংশ্লিষ্ট প্রতিটি দেশের জন্য কিছু না কিছু সুবিধা তৈরি করছে। রাশিয়া তুলনামূলক কম খরচে সামরিক সরঞ্জাম, ড্রোন ও জনবল পাচ্ছে। ইরান পাচ্ছে অর্থনৈতিক আয়, যুদ্ধক্ষেত্রের অভিজ্ঞতা এবং উন্নত সামরিক প্রযুক্তি পাওয়ার সম্ভাবনা। উত্তর কোরিয়া খাদ্য, জ্বালানি ও বৈদেশিক মুদ্রার পাশাপাশি প্রযুক্তিগত জ্ঞান পাওয়ার সুযোগ পাচ্ছে এবং আন্তর্জাতিক বিচ্ছিন্নতাও কিছুটা কমাতে পারছে। অন্যদিকে বেলারুশ রাশিয়াকে ভূখণ্ড, লজিস্টিক সুবিধা ও কূটনৈতিক সমর্থন দিচ্ছে।
সবকিছু মিলিয়ে এই বিনিময়ব্যবস্থা পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার কার্যকারিতা কমিয়ে দিচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে যে চাপ একটি রাষ্ট্রের পক্ষে একা মোকাবিলা করা কঠিন, কয়েকটি রাষ্ট্র পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমে সেটি অনেক সহজে সামলাতে পারছে।
অর্থনৈতিক ও আর্থিক ব্যবস্থাতেও এই পরিবর্তনের প্রভাব দেখা যাচ্ছে। রাশিয়া তার আমদানির ক্ষেত্রে রুবল ও চীনা ইউয়ানে লেনদেন বাড়াচ্ছে। দেশটি নিজস্ব মির পেমেন্ট ব্যবস্থা ব্যবহারে উৎসাহ দিচ্ছে। একই সঙ্গে তৃতীয় দেশের ব্যাংক, মধ্যস্থতাকারী, ক্রিপ্টোকারেন্সি এবং তথাকথিত ‘শ্যাডো ফ্লিট’ ব্যবহার করে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সচল রাখার চেষ্টা করছে।
ইরানও দীর্ঘদিন ধরে নিষেধাজ্ঞা মোকাবিলায় নিজস্ব পদ্ধতি গড়ে তুলেছে। তেল বিক্রির ক্ষেত্রে দেশটি বিভিন্ন জাহাজ চলাচল নেটওয়ার্ক, জাহাজের পতাকা পরিবর্তন, সমুদ্রে এক জাহাজ থেকে অন্য জাহাজে তেল স্থানান্তর এবং মধ্যস্থতাকারীদের ব্যবহার করে থাকে। ইরানের তেলের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ চীনে যায়। উত্তর কোরিয়াও অনানুষ্ঠানিক ক্রয় নেটওয়ার্ক ও সাইবার কার্যক্রমের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় সম্পদ সংগ্রহ এবং নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে চলার চেষ্টা করে।
তবে এসব কর্মকাণ্ডকে একটি কেন্দ্রীয় কমান্ডের অধীনে পরিচালিত কোনো সুসংগঠিত পরিকল্পনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং বিভিন্ন দেশ, ব্যবসায়ী, মধ্যস্থতাকারী ও বিচারব্যবস্থার মধ্য দিয়ে তৈরি হয়েছে পরস্পর-সংযুক্ত একটি নেটওয়ার্ক। এটি একটি নির্দিষ্ট ‘মাস্টার প্ল্যান’-এর চেয়ে বেশি একটি নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে চলার পরিবেশ।
এই সহযোগিতার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো প্রযুক্তি ও রাজনৈতিক ব্যবস্থাপনা। চীনা কোম্পানিগুলো বিশ্বের বিভিন্ন উন্নয়নশীল দেশে ক্যামেরা, টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থা, তথ্যভিত্তিক প্ল্যাটফর্ম এবং ‘সেফ সিটি’ প্রযুক্তি সরবরাহ করছে। কিছু দেশে এসব প্রযুক্তি ব্যাপক নজরদারি এবং ডিজিটাল পরিসর নিয়ন্ত্রণে ব্যবহৃত হওয়ার অভিযোগ রয়েছে। তবে প্রযুক্তি নিজে স্বৈরতান্ত্রিক নয়। একই ধরনের প্রযুক্তি অন্য দেশও তৈরি করে এবং নগর নিরাপত্তা বৃদ্ধিতে তা বৈধভাবেই ব্যবহার করা সম্ভব। এর রাজনৈতিক প্রভাব নির্ভর করে আইন, প্রাতিষ্ঠানিক নজরদারি, ক্রয়প্রক্রিয়া, তথ্য ব্যবস্থাপনা এবং প্রযুক্তি পরিচালনাকারী কর্তৃপক্ষের ওপর।
সহযোগিতা এখন পুলিশিং, সাইবার নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক শাসনব্যবস্থার ক্ষেত্রেও বিস্তৃত হচ্ছে। বিভিন্ন সরকার অনলাইন কনটেন্ট নিয়ন্ত্রণ, সাইবারনীতি, বিক্ষোভ মোকাবিলা এবং নাগরিক সমাজ নিয়ন্ত্রণের অভিজ্ঞতা পরস্পরের সঙ্গে বিনিময় করছে। রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমগুলোও ইউক্রেন যুদ্ধ, নিষেধাজ্ঞা এবং পশ্চিমা বিশ্বের কথিত দ্বৈত নীতি নিয়ে অনেক সময় একই ধরনের বক্তব্য তুলে ধরছে।
জাতিসংঘেও এই সহযোগিতার প্রভাব দেখা যায়। চীন ও রাশিয়া নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য হিসেবে তাদের ভেটো ক্ষমতা ব্যবহার করে এমন উদ্যোগ ঠেকাতে পারে, যেগুলো তারা নিজেদের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ হিসেবে বিবেচনা করে। বেলারুশ, ইরান ও উত্তর কোরিয়াও ইউক্রেন-সংক্রান্ত বিভিন্ন ভোটে সাধারণত রাশিয়ার অবস্থানের কাছাকাছি থাকে। তবে এর অর্থ এই নয় যে পাঁচটি দেশ সব বিষয়ে স্বয়ংক্রিয়ভাবে একে অন্যের পাশে দাঁড়ায়।
এখানেই এই নেটওয়ার্ক এবং ন্যাটোর মতো আনুষ্ঠানিক জোটের মধ্যে মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। এসব দেশের মধ্যে কোনো কেন্দ্রীয় সামরিক কমান্ড নেই, সমন্বিত অর্থনৈতিক অঞ্চল নেই এবং অভিন্ন সাংগঠনিক কাঠামোও নেই। চীন অর্থনৈতিকভাবে অন্যদের তুলনায় অনেক বেশি শক্তিশালী এবং রাশিয়া বা অন্য কোনো দেশের সংঘাতে সরাসরি জড়িয়ে পড়ার ব্যাপারে বেইজিং যথেষ্ট সতর্ক।
মধ্য এশিয়ায় চীন ও রাশিয়ার স্বার্থের মধ্যে প্রতিযোগিতাও রয়েছে। জ্বালানি আলোচনায় চীন নিজের স্বার্থকে গুরুত্ব দেয়। একই সঙ্গে ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চীনের বাণিজ্যিক সম্পর্ক রাশিয়ার সঙ্গে বাণিজ্যের তুলনায় অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কোরীয় উপদ্বীপে মস্কোর সঙ্গে পিয়ংইয়ংয়ের ঘনিষ্ঠতাও বেইজিংকে অস্বস্তিতে ফেলতে পারে, কারণ সেখানে চীনের প্রধান অগ্রাধিকার হলো স্থিতিশীলতা। আবার ইরান ও রাশিয়াও কিছু ক্ষেত্রে সহযোগিতা করলেও জ্বালানি বাজার ও আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তারের ক্ষেত্রে তাদের মধ্যে প্রতিযোগিতা রয়েছে।
তাই শুধু মতাদর্শ দিয়ে এই সম্পর্কগুলোকে ব্যাখ্যা করা যায় না। পাঁচটি দেশের রাজনৈতিক ব্যবস্থা, কৌশলগত লক্ষ্য ও ভূরাজনৈতিক সংস্কৃতির মধ্যে বড় পার্থক্য রয়েছে। তাদের সহযোগিতার প্রধান চালিকা শক্তি হলো স্বার্থ। নিষেধাজ্ঞা, যুদ্ধ, শাসনব্যবস্থার নিরাপত্তা এবং অর্থনৈতিক প্রয়োজন তাদের একে অন্যের কাছাকাছি নিয়ে এসেছে।
এ ধরনের স্বার্থভিত্তিক সহযোগিতা অবশ্য শুধু এই দেশগুলোর বৈশিষ্ট্য নয়। পশ্চিমা দেশগুলোও নিজেদের কৌশলগত স্বার্থে বিভিন্ন কর্তৃত্ববাদী সরকারকে অস্ত্র, অর্থ ও রাজনৈতিক সমর্থন দিয়েছে। ফলে বর্তমান আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাকে শুধু গণতন্ত্র বনাম কর্তৃত্ববাদের দ্বন্দ্ব হিসেবে দেখলে বাস্তবতার একটি বড় অংশ বাদ পড়ে যায়।
এই পরিবর্তিত আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—ঢাকা কোন পক্ষ নেবে, তা নয়; বরং বাংলাদেশ কতটা কৌশলগত স্বাধীনতা ধরে রাখতে পারবে।
বাংলাদেশের সঙ্গে চীনের বাণিজ্য, অবকাঠামো ও প্রতিরক্ষা সম্পর্ক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রাশিয়া রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের কারণে বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। ভারতের সঙ্গে ভৌগোলিক ও নিরাপত্তাগত সম্পর্কের কারণে দিল্লিকে উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্র, জাপান ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন বাংলাদেশের রপ্তানি, অর্থায়ন, প্রযুক্তি ও উন্নয়ন সহযোগিতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
অর্থাৎ বাংলাদেশের বাস্তবতা এমন যে কোনো একটি শক্তির শিবিরে পুরোপুরি চলে যাওয়ার সুযোগ বা প্রয়োজন—কোনোটিই নেই। বরং আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা যত বেশি বিভক্ত হবে, বাংলাদেশের জন্য তত বেশি সুযোগ ও ঝুঁকি একই সঙ্গে তৈরি হবে।
একদিকে প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তিগুলোর মধ্যে ভারসাম্য রেখে বাংলাদেশ আরও ভালো বাণিজ্যিক ও কূটনৈতিক সুবিধা আদায় করতে পারে। অন্যদিকে অতিরিক্ত নির্ভরতা তৈরি হলে অর্থনৈতিক চাপ, প্রযুক্তিগত অসামঞ্জস্য, ঋণনির্ভরতা এবং ভূরাজনৈতিক চাপের ঝুঁকি বাড়বে।
এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের প্রয়োজন হবে একটি স্বাধীন কৌশলগত অবস্থান। বাংলাদেশকে বড় শক্তিগুলোর প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র না হয়ে নিজস্ব স্বার্থভিত্তিক একটি স্বাধীন রাষ্ট্রীয় কৌশল গড়ে তুলতে হবে। এর জন্য একাধিক দেশের সঙ্গে অংশীদারত্ব বৈচিত্র্যময় করা, সরকারি ক্রয়প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা, প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র চালু রাখা, সংসদীয় ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার নজরদারি জোরদার করা এবং ঋণের স্থায়িত্ব ও নিরাপত্তাগত প্রভাব কঠোরভাবে মূল্যায়ন করা জরুরি।
ডিজিটাল অবকাঠামোর ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ। কোনো বিদেশি প্রযুক্তি বা অবকাঠামো গ্রহণের সময় শুধু দাম বা রাজনৈতিক সম্পর্ক বিবেচনা করলে চলবে না। তথ্যের মালিকানা কার থাকবে, কারা তথ্য ব্যবহারের অধিকার পাবে, তথ্য কোথায় সংরক্ষিত হবে, সাইবার নিরাপত্তা কীভাবে পরীক্ষা করা হবে এবং স্বাধীনভাবে নজরদারি কীভাবে নিশ্চিত করা হবে—চুক্তিতেই এসব বিষয় স্পষ্ট থাকতে হবে।
প্রতিরক্ষা ক্রয়ের ক্ষেত্রেও একই নীতি প্রযোজ্য। কোনো একটি দেশের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা বাংলাদেশের কৌশলগত স্বাধীনতা সীমিত করতে পারে। একইভাবে উন্নয়ন প্রকল্পে অর্থায়নের উৎস বাছাই করার সময় কোনো দেশের সঙ্গে রাজনৈতিক ঘনিষ্ঠতার চেয়ে প্রকল্পের ব্যয়, মান, দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক প্রভাব এবং জাতীয় প্রয়োজনকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
বিশ্ব এখন এমন এক সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, যখন পুরোনো শক্তির ভারসাম্য দ্রুত বদলে যাচ্ছে। চীন ও রাশিয়ার ঘনিষ্ঠতা, ইরান ও উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে রাশিয়ার সামরিক সহযোগিতা, নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে চলার বিকল্প আর্থিক নেটওয়ার্ক এবং প্রযুক্তি ও নিরাপত্তা সহযোগিতার বিস্তার আন্তর্জাতিক রাজনীতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
এই বাস্তবতায় বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে নিরাপদ পথ কোনো এক পক্ষের সঙ্গে নিজেকে সম্পূর্ণভাবে যুক্ত করা নয়। বরং সব বড় শক্তির সঙ্গে সম্পর্ক রেখে নিজের সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতা বজায় রাখা। কূটনৈতিক ভারসাম্য, অর্থনৈতিক বহুমুখীকরণ, স্বচ্ছ প্রতিষ্ঠান, শক্তিশালী নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা এবং জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়ার নীতিই পারে বাংলাদেশকে পরিবর্তিত বিশ্বব্যবস্থায় টিকে থাকতে সাহায্য করতে।
শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের লক্ষ্য হওয়া উচিত কারও শিবিরে যোগ দেওয়া নয়, বরং নিজের জন্য পর্যাপ্ত কৌশলগত জায়গা তৈরি করা। আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলো যখন নিজেদের স্বার্থে নতুন নতুন নেটওয়ার্ক তৈরি করছে, তখন বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ হতে পারে তার স্বাধীন সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা। সেই ক্ষমতা ধরে রাখতে হলে সম্পর্ক রাখতে হবে সবার সঙ্গে, কিন্তু নির্ভরশীল হওয়া যাবে না কারও ওপর অতিরিক্তভাবে।
আপনার মতামত জানানঃ