ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে যুক্তরাষ্ট্র-ভারত সম্পর্ক এমন এক পরীক্ষার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, যার প্রভাব শুধু দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কেই সীমাবদ্ধ নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে এশিয়ার ভূরাজনৈতিক ভারসাম্য, চীনকে মোকাবিলার কৌশল, রাশিয়ার সঙ্গে ভারতের দীর্ঘদিনের সম্পর্ক এবং নয়াদিল্লির অর্থনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা। ট্রাম্পের নীতিতে ভারতের ওপর বাড়তি শুল্ক, রাশিয়ার কাছ থেকে তেল কেনা নিয়ে চাপ, পাকিস্তানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা এবং চীনের সঙ্গে নতুন করে যোগাযোগ—সব মিলিয়ে ওয়াশিংটনের প্রতি ভারতের আস্থায় টান পড়ার যথেষ্ট কারণ তৈরি হয়েছে। তবু ভারত যুক্তরাষ্ট্র থেকে সরে যাচ্ছে না। বরং নরেন্দ্র মোদি সরকার এমন এক কৌশল বেছে নিয়েছে, যাকে বলা যায় ‘আমেরিকা প্লাস’।
এই কৌশলের অর্থ হলো, যুক্তরাষ্ট্রকে ভারতের প্রধান কৌশলগত ও অর্থনৈতিক অংশীদার হিসেবে ধরে রেখে একই সঙ্গে রাশিয়া, চীন, জাপান, অস্ট্রেলিয়া, ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ অন্যান্য শক্তির সঙ্গে সম্পর্ক আরও বিস্তৃত করা। অর্থাৎ কোনো একটি শক্তির ওপর পুরোপুরি নির্ভর না করে বিভিন্ন শক্তির সঙ্গে সম্পর্ক রেখে নিজের কৌশলগত স্বাধীনতা বজায় রাখা। তবে এর কেন্দ্রবিন্দুতে যুক্তরাষ্ট্রই থেকে যাচ্ছে।
ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের শুরুতে অনেকেই ধারণা করেছিলেন, মোদি-ট্রাম্পের ব্যক্তিগত সম্পর্ক এবারও দুই দেশের সম্পর্ককে বড় ধরনের ধাক্কা থেকে রক্ষা করবে। প্রথম মেয়াদে দুই নেতার মধ্যে ঘনিষ্ঠতা ছিল দৃশ্যমান। ভারতও ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে সম্পর্ককে গুরুত্ব দিয়েছিল। কিন্তু দ্বিতীয় মেয়াদে বাস্তবতা দ্রুত বদলে যায়। বাণিজ্য, রাশিয়া, পাকিস্তান ও চীন—প্রায় প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রেই ওয়াশিংটন ও নয়াদিল্লির স্বার্থের মধ্যে টানাপোড়েন তৈরি হয়।
২০২৫ সালের মে মাসে ভারত-পাকিস্তানের স্বল্পস্থায়ী সামরিক সংঘাতের পর ট্রাম্প সংঘাত থামানোর কৃতিত্ব দাবি করেন। পাকিস্তান বিষয়টিকে স্বাগত জানালেও ভারত স্পষ্ট করে দেয়, এই সংঘাতে ট্রাম্পের মধ্যস্থতার ভূমিকা ছিল না। এরপর পাকিস্তানের সেনাপ্রধানের সঙ্গে ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠতা এবং ইরান-সংক্রান্ত আলোচনায় পাকিস্তানকে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে সামনে আনার ঘটনা নয়াদিল্লির উদ্বেগ আরও বাড়ায়। ভারতের দৃষ্টিতে পাকিস্তান এমন একটি দেশ, যার সঙ্গে সম্পর্ক ঐতিহাসিকভাবে সংঘাতপূর্ণ। ফলে ওয়াশিংটনের ইসলামাবাদমুখী কূটনীতি ভারতের জন্য অস্বস্তির কারণ হওয়াই স্বাভাবিক।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে চীন। প্রথম মেয়াদে ট্রাম্প প্রশাসন এশিয়ায় চীনের প্রভাব মোকাবিলায় ভারত, অস্ট্রেলিয়া, জাপান ও যুক্তরাষ্ট্রকে নিয়ে কোয়াডকে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছিল। কিন্তু দ্বিতীয় মেয়াদে ট্রাম্প চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংয়ের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নে আগ্রহ দেখিয়েছেন। ওয়াশিংটন ও বেইজিংয়ের মধ্যে নিয়মিত যোগাযোগ ও বৈশ্বিক ইস্যুতে সমঝোতার চেষ্টা ভারতের জন্য নতুন হিসাব তৈরি করেছে। কারণ চীনই ভারতের সবচেয়ে বড় দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বী।
বাণিজ্যিক চাপ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। ভারতের সংরক্ষণবাদী বাণিজ্যনীতি এবং রাশিয়ার কাছ থেকে তেল আমদানিকে কেন্দ্র করে ট্রাম্প প্রশাসন ভারতের ওপর উচ্চ শুল্ক আরোপ করেছে। এতে ভারতে এমন ধারণা তৈরি হয়েছে যে যুক্তরাষ্ট্র ভারতের সঙ্গে অন্যায্য আচরণ করছে। বিশেষ করে যখন ওয়াশিংটন ইউরোপের মতো অন্যান্য অংশীদারদের রুশ জ্বালানি আমদানির ক্ষেত্রে তুলনামূলক ছাড় দিয়েছে, তখন নয়াদিল্লির অসন্তোষ আরও বেড়েছে।
ভারতের রাজনৈতিক পরিসরেও এর প্রতিফলন দেখা গেছে। বিরোধী দলগুলো মোদি সরকারের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে অতিরিক্ত নতি স্বীকারের অভিযোগ তুলেছে। রাজনৈতিক মহলের একাংশ এমন কথাও বলতে শুরু করেছে যে যুক্তরাষ্ট্রকে বাদ দিয়ে চীন ও রাশিয়ার সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠ হওয়াই ভারতের জন্য ভালো পথ হতে পারে। কিন্তু মোদি সরকার এখন পর্যন্ত সেই পথে হাঁটেনি।
এর পেছনে রয়েছে দীর্ঘমেয়াদি বাস্তবতা। স্বাধীনতার পর কয়েক দশক ভারতের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক মহলে যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কে গভীর সন্দেহ ছিল। স্নায়ুযুদ্ধের সময়ে পাকিস্তানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সম্পর্ক, চীনের সঙ্গে ওয়াশিংটনের যোগাযোগ এবং ভারতের সোভিয়েতমুখী অবস্থান দুই দেশের সম্পর্ককে দূরে রেখেছিল। কিন্তু স্নায়ুযুদ্ধের অবসানের পর পরিস্থিতি পাল্টাতে শুরু করে।
২০০৫ সালে ভারতের প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশের সময়ে স্বাক্ষরিত বেসামরিক পারমাণবিক চুক্তি দুই দেশের সম্পর্কের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। এরপর ২০১৪ সালে নরেন্দ্র মোদি ক্ষমতায় আসার পর যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ককে আরও কৌশলগত পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। বারাক ওবামা, ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং জো বাইডেন—তিন মার্কিন প্রেসিডেন্টের সঙ্গেই তিনি ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তুলেছেন।
এই দীর্ঘ প্রক্রিয়ার ফলে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক এখন শুধু রাষ্ট্রীয় কূটনীতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। ব্যবসা, প্রযুক্তি, প্রতিরক্ষা, শিক্ষা, গবেষণা এবং প্রবাসী ভারতীয়দের মাধ্যমে দুই দেশের মধ্যে একটি বিস্তৃত যোগাযোগ তৈরি হয়েছে। ভারতের অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত উচ্চাকাঙ্ক্ষার বড় একটি অংশও যুক্তরাষ্ট্রের বাজার ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতার সঙ্গে সম্পর্কিত।
এখানেই ‘আমেরিকা প্লাস’ কৌশলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা। ভারত যুক্তরাষ্ট্রকে বিকল্পহীন মনে করে না, কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের বিকল্প হিসেবে চীন বা রাশিয়াকেও দেখে না। বরং নয়াদিল্লির হিসাব হলো, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখেই অন্য শক্তিগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক ব্যবহার করতে হবে।
রাশিয়ার ক্ষেত্রে ভারতের অবস্থান এর স্পষ্ট উদাহরণ। ২০২৩ সালের পর রাশিয়া ভারতের অন্যতম প্রধান তেল সরবরাহকারী হয়ে ওঠে। প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রেও রাশিয়া এখনো গুরুত্বপূর্ণ। যদিও ভারতের অস্ত্র আমদানিতে রাশিয়ার অংশ আগের তুলনায় কমেছে, বহু পুরোনো সামরিক সরঞ্জাম, প্রযুক্তি ও সরবরাহ ব্যবস্থার কারণে মস্কোর সঙ্গে সম্পর্ক একেবারে ছিন্ন করা ভারতের পক্ষে বাস্তবসম্মত নয়।
চীনের ক্ষেত্রেও একই ধরনের ভারসাম্য দেখা যায়। সীমান্ত সংঘাত দুই দেশের সম্পর্ককে গভীরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করলেও ভারত চীনের সঙ্গে যোগাযোগ পুরোপুরি বন্ধ করেনি। সীমান্তে উত্তেজনা কমানো, বাণিজ্যিক সম্পর্ক পরিচালনা এবং সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ সংঘাতের ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণের জন্য নয়াদিল্লি বেইজিংয়ের সঙ্গে যোগাযোগ অব্যাহত রেখেছে।
ভারতের এই অবস্থানকে অনেকেই ‘বহুপক্ষীয় ভারসাম্য’ বা কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনের অংশ হিসেবে দেখেন। কিন্তু ‘আমেরিকা প্লাস’ ধারণাটি আরও বাস্তবসম্মত ব্যাখ্যা দেয়। কারণ ভারতের কৌশলগত ঝুড়িতে যুক্তরাষ্ট্রের ওজন অন্যদের তুলনায় বেশি।
অর্থনীতির ক্ষেত্রেও বিষয়টি স্পষ্ট। যুক্তরাষ্ট্র ভারতের পণ্য ও সেবার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বাজারগুলোর একটি। চীনের সঙ্গে ভারতের বাণিজ্যের পরিমাণ বড় হলেও তা অনেকটাই একমুখী—চীন ভারতকে বিপুল পরিমাণ শিল্পপণ্য সরবরাহ করে, বিপরীতে ভারত যুক্তরাষ্ট্রের মতো বিশাল বাজার সেখানে পায় না। প্রযুক্তির ক্ষেত্রেও একই বাস্তবতা। উন্নত প্রযুক্তি, গবেষণা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সেমিকন্ডাক্টর, প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি এবং উচ্চপ্রযুক্তির বিনিয়োগে যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্ব ভারতের জন্য অনেক বেশি।
বাণিজ্য কূটনীতিতেও ভারত এই ভারসাম্য বজায় রাখছে। চীনের প্রভাব থাকা আঞ্চলিক বাণিজ্য জোট আরসিইপি থেকে ২০১৯ সালে বেরিয়ে আসার পর ভারত নিউজিল্যান্ড, যুক্তরাজ্য ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক বাড়িয়েছে। অর্থাৎ চীননির্ভর আঞ্চলিক অর্থনৈতিক কাঠামোর বাইরে গিয়ে পশ্চিমা ও ইন্দো-প্যাসিফিক অংশীদারদের সঙ্গে বাজার সম্প্রসারণের চেষ্টা করছে ভারত।
নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্ব আরও বেশি। চীন-ভারত সীমান্তে সংঘাতের পর ভারতের সামরিক পরিকল্পনায় চীনকে মোকাবিলার বিষয়টি প্রধান হয়ে উঠেছে। ভারত মহাসাগরে চীনা নৌবাহিনীর উপস্থিতি বাড়ছে, একই সঙ্গে পাকিস্তানের সঙ্গে বেইজিংয়ের সামরিক সহযোগিতাও গভীর হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা তথ্য, সামরিক প্রযুক্তি, প্রশিক্ষণ এবং যৌথ মহড়া ভারতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ।
কোয়াডও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, জাপান ও অস্ট্রেলিয়ার এই কাঠামোকে নয়াদিল্লি চীনের ক্রমবর্ধমান সামুদ্রিক ও কৌশলগত প্রভাব মোকাবিলার একটি কার্যকর প্ল্যাটফর্ম হিসেবে দেখে। তাই ট্রাম্প প্রশাসনের অনাগ্রহের কারণে কোনো বৈঠক বা কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হলেও ভারত নিজ উদ্যোগে এই কাঠামো সচল রাখার চেষ্টা করেছে।
তবে ‘আমেরিকা প্লাস’ কৌশল যে সীমাহীন, তা নয়। ভারতের সামনে সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হতে পারে যুক্তরাষ্ট্রের অতিরিক্ত অর্থনৈতিক চাপ। রাশিয়ার কাছ থেকে তেল কেনা দেশগুলোর ওপর ১০০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপের মতো প্রস্তাব বাস্তবায়িত হলে ভারত বড় ধরনের অর্থনৈতিক চাপের মুখে পড়তে পারে। এমন পরিস্থিতি শুধু বাণিজ্যকেই ক্ষতিগ্রস্ত করবে না; ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও এর প্রভাব পড়বে।
এখানেই নরেন্দ্র মোদির রাজনৈতিক অবস্থানের প্রশ্নটি সামনে আসে। এত দিন তাঁর শক্তিশালী রাজনৈতিক অবস্থান যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার সমালোচনাকে অনেকটাই সামলে দিয়েছে। কিন্তু অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপ যদি বাড়ে এবং জনগণের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী মনোভাব তীব্র হয়, তাহলে মোদির জন্য ওয়াশিংটনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বজায় রাখা রাজনৈতিকভাবে কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
তবে তার মানে এই নয় যে ভারত রাতারাতি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করবে। বাস্তবতা বরং উল্টো। চীনের শক্তির মোকাবিলা, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, প্রযুক্তিগত উন্নয়ন এবং সামরিক আধুনিকায়নের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের সহযোগিতা ভারতের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে রাশিয়াকে পুরোপুরি পরিত্যাগ করা ভারতের পক্ষে সহজ নয়, আর চীনের সঙ্গে স্থায়ী সংঘাতও ভারতের স্বার্থে নয়।
তাই ভারতের সামনে সবচেয়ে বাস্তবসম্মত পথ হলো সম্পর্কের এই জটিল ভারসাম্য বজায় রাখা। ওয়াশিংটনের সঙ্গে অংশীদারত্ব ধরে রেখে রাশিয়ার সঙ্গে ঐতিহাসিক সম্পর্ক, চীনের সঙ্গে প্রয়োজনীয় যোগাযোগ এবং জাপান, অস্ট্রেলিয়া ও ইউরোপের সঙ্গে সহযোগিতা বাড়ানো—এই সমন্বিত কৌশলই আপাতত নয়াদিল্লিকে সবচেয়ে বেশি কৌশলগত সুবিধা দিচ্ছে।
ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদ ভারতের জন্য তাই শুধু একটি কূটনৈতিক পরীক্ষা নয়; এটি ভারতের পররাষ্ট্রনীতির দীর্ঘমেয়াদি চরিত্রও স্পষ্ট করে দিচ্ছে। ভারত কোনো একটি শিবিরে পুরোপুরি ঢুকে পড়তে চায় না। আবার যুক্তরাষ্ট্রের মতো শক্তিশালী অংশীদারকেও দূরে ঠেলে দিতে চায় না। বরং প্রয়োজন অনুযায়ী বিভিন্ন শক্তির সঙ্গে সম্পর্ক ব্যবহার করে নিজের স্বার্থকে সর্বোচ্চ পর্যায়ে নেওয়াই নয়াদিল্লির লক্ষ্য।
এই কারণেই ‘আমেরিকা প্লাস’ কৌশলকে শুধু ট্রাম্পকে সামলানোর তাৎক্ষণিক কৌশল হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এটি ভারতের বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক হিসাবের অংশ। যুক্তরাষ্ট্র থাকবে প্রধান অংশীদার, কিন্তু একমাত্র অংশীদার নয়; রাশিয়া থাকবে গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু একমাত্র নির্ভরতা নয়; চীন থাকবে প্রতিদ্বন্দ্বী, কিন্তু যোগাযোগহীন শত্রু নয়।
শেষ পর্যন্ত ভারতের সাফল্য নির্ভর করবে এই সূক্ষ্ম ভারসাম্য কতটা দক্ষতার সঙ্গে ধরে রাখতে পারে তার ওপর। ট্রাম্প যদি চাপ বাড়ান, নয়াদিল্লিকে আরও কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হবে। আর যুক্তরাষ্ট্র-চীন প্রতিদ্বন্দ্বিতা যদি নতুন পর্যায়ে পৌঁছায়, তখন ভারতের কৌশলগত স্বাধীনতার পরীক্ষাও আরও কঠিন হবে। তবে এখন পর্যন্ত ভারতের বার্তা স্পষ্ট—ওয়াশিংটনের সঙ্গে সম্পর্ক নষ্ট করার প্রয়োজন নেই, আবার ওয়াশিংটনের ওপর পুরোপুরি নির্ভর করাও নিরাপদ নয়। নিজের স্বার্থে যত বেশি দরজা খোলা রাখা যায়, ভারতের ‘আমেরিকা প্লাস’ কৌশলের সাফল্য তত বেশি।
আপনার মতামত জানানঃ