8রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ যেন শেষ হওয়ার নামই নিচ্ছে না। যুদ্ধক্ষেত্রে একের পর এক সামরিক সংঘাত, কূটনৈতিক উদ্যোগ আর শান্তির প্রতিশ্রুতির পরও ইউক্রেনের সাধারণ মানুষের জীবনে স্বস্তি ফিরছে না। বরং সামনে আরও ভয়াবহ এক শীতের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। রাশিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় ধ্বংস হচ্ছে বসতবাড়ি, হাসপাতাল, স্কুল, বিদ্যুৎকেন্দ্র ও খাদ্য সরবরাহব্যবস্থা। প্রতিদিনই বাড়ছে মানুষের দুর্ভোগ। যুদ্ধের ময়দানে সামরিক সাফল্য যতটা গুরুত্বপূর্ণ, তার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে সাধারণ মানুষের বেঁচে থাকার লড়াই।
সাম্প্রতিক পরিস্থিতি নিয়ে প্রকাশিত এক বিশ্লেষণে ব্রিটিশ সংবাদপত্র দ্য গার্ডিয়ানের পররাষ্ট্রবিষয়ক কলামিস্ট সাইমন টিসডল লিখেছেন, ইউক্রেনের জনগণ এক নারকীয় শীতের মুখোমুখি হতে যাচ্ছে। যুদ্ধক্ষেত্রে কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি না পেয়ে রাশিয়া এখন সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ওপর হামলা জোরদার করেছে বলে তাঁর বিশ্লেষণে উঠে এসেছে। কিয়েভসহ বিভিন্ন শহরে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে সুপারমার্কেটের সরবরাহকেন্দ্র, ওষুধের দোকান, চিকিৎসাকেন্দ্র এবং পণ্য রাখার গুদাম। ফলে খাবার ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সংকট আরও তীব্র হচ্ছে।
শীতকাল ইউক্রেনের জন্য এমনিতেই কঠিন সময়। যুদ্ধের কারণে বহু মানুষ ঘরবাড়ি হারিয়েছেন। অনেক পরিবারকে নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে এক শহর থেকে অন্য শহরে যেতে হয়েছে। বিদ্যুৎ ও পানি সরবরাহব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হলে এই দুর্ভোগ আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করে। ঘরে আলো নেই, পানির নিশ্চয়তা নেই, отопনব্যবস্থা অচল—এমন পরিস্থিতিতে লাখ লাখ মানুষকে শীতের সঙ্গে লড়াই করতে হতে পারে। যুদ্ধের অভিঘাত তখন শুধু সীমান্ত বা সামরিক ঘাঁটিতে সীমাবদ্ধ থাকে না; তা ছড়িয়ে পড়ে মানুষের রান্নাঘর, হাসপাতালের শয্যা, শিশুর পড়ার টেবিল এবং বৃদ্ধ মানুষের ছোট্ট ঘরটিতে।
রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের নেতৃত্বে পরিচালিত এই যুদ্ধকে মস্কো দীর্ঘদিন ধরে ‘বিশেষ সামরিক অভিযান’ বলে অভিহিত করে আসছে। রুশ সরকারের বক্তব্য, তাদের সামরিক অভিযান পরিকল্পনামাফিক এগোচ্ছে। কিন্তু পশ্চিমা বিশ্লেষকদের অনেকেই এই দাবির সঙ্গে একমত নন। তাঁদের মতে, যুদ্ধের শুরুতে দ্রুত সাফল্যের যে প্রত্যাশা রাশিয়ার ছিল, তা পূরণ হয়নি। ইউক্রেনের প্রতিরোধ, পশ্চিমা সহায়তা এবং যুদ্ধের দীর্ঘায়িত হওয়ার কারণে রাশিয়াকেও বড় ধরনের সামরিক ও অর্থনৈতিক চাপের মুখে পড়তে হয়েছে।
যুদ্ধের ময়দানে প্রত্যাশিত অগ্রগতি না হলে একটি দেশের নেতৃত্ব সাধারণত দুটি পথের একটিকে বেছে নেয়—আলোচনা অথবা আরও কঠোর সামরিক পদক্ষেপ। ইউক্রেনের ক্ষেত্রে রাশিয়া দ্বিতীয় পথেই এগোচ্ছে বলে সমালোচকদের অভিযোগ। সামরিকভাবে কাঙ্ক্ষিত ফল না পাওয়ার পরও যুদ্ধ থামানোর পরিবর্তে বেসামরিক অবকাঠামোতে হামলা জোরদার করা হচ্ছে। এতে ইউক্রেনের প্রতিরোধ ভেঙে পড়বে—এমন ধারণা রুশ নেতৃত্বের মধ্যে কাজ করছে বলে বিশ্লেষণে উঠে এসেছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এ ধরনের হামলা মানুষের মনোবল ভেঙে দেওয়ার বদলে অনেক সময় প্রতিরোধের আকাঙ্ক্ষা আরও বাড়িয়ে দেয়।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইউক্রেন-রাশিয়া সংঘাতের অবসান ঘটাতে মধ্যস্থতার উদ্যোগ নিয়েছেন। তিনি তাঁর বিশেষ প্রতিনিধিদের মস্কো ও কিয়েভে পাঠিয়েছেন। আলোচনার মাধ্যমে যুদ্ধ বন্ধের যে কোনো উদ্যোগ নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু প্রশ্ন হলো, সেই উদ্যোগ কতটা নিরপেক্ষ, কতটা কার্যকর এবং কতটা বাস্তবসম্মত? টিসডলের বিশ্লেষণে ট্রাম্পের ভূমিকা নিয়ে তীব্র সমালোচনা করা হয়েছে। তাঁর মতে, আলোচনার টেবিলে শান্তির কথা বলা হলেও বাস্তবে রাশিয়ার ওপর যথেষ্ট চাপ তৈরি করা যাচ্ছে না। ফলে যুদ্ধ থামানোর বদলে রুশ নেতৃত্বের কাছে বিজয়ের সম্ভাবনা আরও উজ্জ্বল হয়ে উঠছে।
ইউক্রেনের জন্য সবচেয়ে বড় সংকটগুলোর একটি হলো আকাশ প্রতিরক্ষা। স্থলযুদ্ধে রাশিয়ার অগ্রযাত্রা ঠেকাতে ইউক্রেনীয় বাহিনী দীর্ঘদিন ধরে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে। কিন্তু আকাশপথে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা প্রতিহত করা কঠিন হয়ে পড়েছে। আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, ক্ষেপণাস্ত্র এবং অন্যান্য সামরিক সরঞ্জামের ঘাটতি ইউক্রেনের নিরাপত্তাকে দুর্বল করে দিচ্ছে। পশ্চিমা দেশগুলো সহায়তা দিলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় যথেষ্ট নয় বলে ইউক্রেনের পক্ষ থেকে বারবার জানানো হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের নীতির অস্পষ্টতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। ২০২২ সালে রাশিয়ার আগ্রাসনের পর ইউক্রেনকে সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল পশ্চিমা বিশ্ব। কিন্তু যুদ্ধ যত দীর্ঘ হয়েছে, ততই সেই সহায়তার ধারাবাহিকতা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। রাজনৈতিক পরিবর্তন, অভ্যন্তরীণ মতবিরোধ এবং যুদ্ধের ব্যয় নিয়ে বিতর্কের কারণে ইউক্রেনের জন্য পশ্চিমা সমর্থন সব সময় একই রকম থাকেনি। ফলে কিয়েভকে একদিকে রাশিয়ার হামলা মোকাবিলা করতে হচ্ছে, অন্যদিকে মিত্রদের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় থাকতে হচ্ছে।
ইউরোপীয় দেশগুলোও এই সংকটের বাইরে নয়। ইউক্রেনের নিরাপত্তা ইউরোপের সামগ্রিক নিরাপত্তার সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। যুদ্ধ যত দীর্ঘায়িত হচ্ছে, ততই ইউরোপে শরণার্থী, জ্বালানি, অর্থনীতি এবং প্রতিরক্ষা ব্যয়ের চাপ বাড়ছে। রাশিয়ার বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া এবং ইউক্রেনকে সহায়তা অব্যাহত রাখার বিষয়ে ইউরোপীয় দেশগুলোর মধ্যে ঐকমত্য থাকলেও বাস্তব পদক্ষেপের ক্ষেত্রে নানা সীমাবদ্ধতা রয়েছে। বিশেষ করে আকাশ প্রতিরক্ষার মতো ব্যয়বহুল ও গুরুত্বপূর্ণ সরঞ্জাম সরবরাহে ঘাটতি পূরণ করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
তবে ইউক্রেনের সাধারণ মানুষের মনোভাবও বদলাচ্ছে। দীর্ঘদিনের যুদ্ধ মানুষের জীবনে যে ক্লান্তি তৈরি করেছে, তা অস্বীকার করার উপায় নেই। যুদ্ধের শুরুতে অধিকাংশ মানুষ যে কোনো মূল্যে নিজেদের ভূখণ্ড রক্ষার পক্ষে ছিলেন। এখনো বহু ইউক্রেনীয় জমি ছেড়ে দেওয়ার বিরোধিতা করেন। কিন্তু একই সঙ্গে একটি বড় অংশ স্থায়ী নিরাপত্তার নিশ্চয়তা থাকলে যুদ্ধবিরতিতে রাজি হতে চান। এই মনোভাবের পেছনে রয়েছে অসংখ্য মানুষের মৃত্যু, ঘরবাড়ি ধ্বংস, বাস্তুচ্যুতি এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা।
যুদ্ধের অবসান চাওয়ার এই আকাঙ্ক্ষা শুধু ইউক্রেনের মানুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। রাশিয়ার সাধারণ মানুষও দীর্ঘ সংঘাতের অবসান দেখতে চান। কিন্তু জনগণের এই চাওয়া কতটা গুরুত্ব পাচ্ছে, সেটিই বড় প্রশ্ন। রাজনৈতিক নেতৃত্ব যখন নিজেদের সিদ্ধান্তকে জনগণের নিরাপত্তা ও ভবিষ্যতের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ মনে করে, তখন যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হয়। সাধারণ মানুষকে তখন শুধু যুদ্ধের মূল্য দিতে হয়—প্রাণ দিয়ে, সম্পদ দিয়ে, স্বপ্ন দিয়ে।
ইউক্রেনের সংকটকে আলাদা করে দেখার সুযোগ নেই। গাজা, ইরান এবং বিশ্বের অন্যান্য সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলের পরিস্থিতিও একই প্রশ্ন সামনে নিয়ে আসে: কেন সাধারণ মানুষ বারবার যুদ্ধের শিকার হবে? কেন রাজনৈতিক নেতাদের সিদ্ধান্তের বোঝা বহন করতে হবে নিরপরাধ মানুষকে? কেন আন্তর্জাতিক আইন ও মানবিক মূল্যবোধের কথা বলা হলেও বাস্তবে যুদ্ধাপরাধের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হবে না?
টিসডলের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, আধুনিক বিশ্বের দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতের পেছনে বড় কারণ হলো নিরপেক্ষ ও কার্যকর শান্তিপ্রক্রিয়ার অভাব। জাতিসংঘের মতো আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করা এবং সব পক্ষকে আলোচনার টেবিলে বসানোর জন্য নিরপেক্ষ মধ্যস্থতা জরুরি। কিন্তু বাস্তবে বড় শক্তিগুলোর রাজনৈতিক স্বার্থ, অর্থনৈতিক হিসাব এবং ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতা শান্তির পথকে জটিল করে তুলছে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর গড়ে ওঠা আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার মূল ভিত্তি ছিল আইনের শাসন, রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব এবং আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে বিরোধ নিষ্পত্তি। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই কাঠামো বারবার চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলো যখন নিজেদের স্বার্থে আন্তর্জাতিক আইনকে পাশ কাটায়, তখন অন্য দেশগুলোর জন্যও একই পথ অনুসরণের সুযোগ তৈরি হয়। এর ফলে বিশ্বে এক ধরনের আইনি নৈরাজ্য সৃষ্টি হয়, যেখানে অপরাধীরা শাস্তি এড়িয়ে যেতে পারে।
যুদ্ধের প্রকৃত চিত্র মানুষের সামনে তুলে ধরার ক্ষেত্রেও বড় বাধা রয়েছে। স্বাধীন গণমাধ্যম ও আন্তর্জাতিক তদন্ত কার্যক্রম যখন সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে, তখন সাধারণ মানুষ জানতে পারে না সংঘাতের প্রকৃত ভয়াবহতা। গাজায় আন্তর্জাতিক সাংবাদিকদের প্রবেশে সীমাবদ্ধতা, ইরান-সম্পর্কিত সামরিক অভিযানের তথ্য গোপন রাখা এবং রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমে যুদ্ধের একপাক্ষিক বর্ণনা—সবই তথ্যের স্বাধীনতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করে।
তথ্য গোপন করা শুধু সাংবাদিকতার স্বাধীনতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে না; এটি যুদ্ধের জবাবদিহিকেও দুর্বল করে। মানুষ যদি না জানে কোথায় কী ঘটছে, তাহলে যুদ্ধাপরাধের বিরুদ্ধে জনমত গড়ে ওঠা কঠিন। আর যখন অপরাধের তথ্য চাপা পড়ে যায়, তখন অপরাধীরা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠতে পারে। স্বাধীন গণমাধ্যম, জাতিসংঘের তদন্ত এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর কাজ তাই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ইউক্রেনের যুদ্ধের আরেকটি দিক হলো রাজনৈতিক নেতৃত্বের ব্যর্থতা। দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ শুধু সামরিক ভুলের ফল নয়; এর পেছনে থাকে ভুল রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত, অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস এবং আপসের পথ এড়িয়ে যাওয়ার প্রবণতা। নেতারা যখন নিজেদের প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে গিয়ে বাস্তব পরিস্থিতিকে অস্বীকার করেন, তখন যুদ্ধ আরও দীর্ঘ হয়। জনগণের নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ তখন রাজনৈতিক অহংকারের কাছে গৌণ হয়ে পড়ে।
এখানেই প্রশ্ন ওঠে, যুদ্ধ থামানোর দায়িত্ব কার? রাশিয়া আগ্রাসন বন্ধ করবে—এটাই প্রথম দাবি। ইউক্রেনের সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দিতে হবে। কিন্তু একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কেও কার্যকর ভূমিকা নিতে হবে। শুধু বিবৃতি, নিন্দা বা প্রতিশ্রুতি দিয়ে যুদ্ধ থামানো সম্ভব নয়। প্রয়োজন বাস্তব কূটনৈতিক উদ্যোগ, মানবিক সহায়তা, যুদ্ধবিরতির জন্য চাপ এবং আন্তর্জাতিক আইনের কার্যকর প্রয়োগ।
টিসডল তাঁর বিশ্লেষণে ন্যাটোর আরও কঠোর ভূমিকার কথা বলেছেন। রাশিয়ার ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান নেওয়া এবং যুদ্ধাপরাধের দায়ে কঠোর বার্তা দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। তবে এই ধরনের পদক্ষেপের সঙ্গে ঝুঁকিও রয়েছে। রাশিয়া ও ন্যাটোর সরাসরি সংঘর্ষের আশঙ্কা ইউক্রেন যুদ্ধকে আরও ভয়াবহ আকার দিতে পারে। তাই শক্ত অবস্থান নেওয়ার পাশাপাশি সংঘাত ছড়িয়ে পড়া ঠেকাতে কূটনৈতিক সতর্কতাও জরুরি।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, ইউক্রেনের সাধারণ মানুষের জীবন রক্ষা করা। রাজনৈতিক নেতাদের কৌশল, সামরিক বাহিনীর পরিকল্পনা কিংবা আন্তর্জাতিক শক্তিগুলোর প্রতিযোগিতার বাইরে মানুষের মৌলিক অধিকার রয়েছে। একটি শিশু যেন নিরাপদে স্কুলে যেতে পারে, একজন রোগী যেন হাসপাতালে চিকিৎসা পায়, একটি পরিবার যেন শীতের রাতে ঘরে আলো জ্বালাতে পারে—এগুলো কোনো রাজনৈতিক সুবিধা নয়, মানবিক অধিকার।
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের অবসান কবে হবে, তা এখনো নিশ্চিত নয়। কিন্তু যুদ্ধ যত দীর্ঘ হবে, ক্ষত তত গভীর হবে। ইউক্রেনের শহরগুলো ধ্বংসস্তূপে পরিণত হবে, আরও মানুষ বাস্তুচ্যুত হবে, আরও পরিবার তাদের প্রিয়জন হারাবে। একই সঙ্গে রাশিয়া, ইউরোপ এবং বিশ্বের অর্থনীতি ও নিরাপত্তার ওপর চাপ বাড়বে। এই পরিস্থিতিতে যুদ্ধের সমাধানকে রাজনৈতিক সাফল্যের প্রতিযোগিতা না বানিয়ে মানবিক দায়িত্ব হিসেবে দেখতে হবে।
পুতিনের যুদ্ধ থামাতে হলে শুধু মস্কোর দিকে তাকিয়ে থাকলে হবে না। ওয়াশিংটন, ব্রাসেলস, জাতিসংঘ এবং বিশ্বের অন্যান্য শক্তিশালী রাষ্ট্রকে নিজেদের ভূমিকা নতুন করে ভাবতে হবে। আলোচনার টেবিলে বসানো, যুদ্ধবিরতির পথ তৈরি করা এবং বেসামরিক মানুষকে সুরক্ষা দেওয়ার জন্য সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। আন্তর্জাতিক আইনকে শক্তিশালী না করলে ইউক্রেনের মতো সংঘাত ভবিষ্যতেও ফিরে আসবে।
ইউক্রেনের সামনে যে কঠিন শীত আসছে, তা শুধু আবহাওয়ার শীত নয়; এটি যুদ্ধ, অনিশ্চয়তা ও মানবিক বিপর্যয়ের শীত। সেই শীতের অন্ধকারে লাখ লাখ মানুষের জীবন যেন হারিয়ে না যায়, সেটিই এখন বিশ্বের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব। পুতিনের এই যুদ্ধ পুরো বিশ্বের যুদ্ধ হয়ে ওঠার আগেই তাকে থামাতে হবে। কারণ যুদ্ধের ময়দানে কোনো পক্ষের বিজয় ঘোষণা করা গেলেও সাধারণ মানুষের পরাজয় কখনো বিজয় হতে পারে না।
সূত্র: প্রথম আলোতে প্রকাশিত সাইমন টিসডলের কলাম, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬।
আপনার মতামত জানানঃ