বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনীতিতে নতুন মুখদের উত্থান অনেক আশা আর প্রত্যাশা তৈরি করেছে। পুরোনো রাজনৈতিক বন্দোবস্ত ভাঙার প্রতিশ্রুতি, দুর্নীতিমুক্ত রাষ্ট্র গড়ার স্লোগান, নৈতিকতার উচ্চতা—এসব মিলিয়ে নতুন রাজনৈতিক নেতৃত্ব নিজেদের আলাদা করে তুলে ধরতে চায়। এই প্রেক্ষাপটে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম দ্রুত আলোচনার কেন্দ্রে চলে আসেন। একসময় যিনি নিজেকে অভাবগ্রস্ত হিসেবে উপস্থাপন করেছেন, আজ তিনি রাষ্ট্রক্ষমতার কেন্দ্রের খুব কাছাকাছি অবস্থান করা একজন নেতা। কিন্তু এই দ্রুত রূপান্তর, তাঁর ঘোষিত আয়–সম্পদ, নাগরিকত্ব বিতর্ক এবং দুর্নীতিবিরোধী উচ্চকণ্ঠ অবস্থানের মধ্যে যে অসংগতিগুলো দেখা যাচ্ছে, সেগুলো প্রশ্ন তোলার জায়গা তৈরি করেছে।
নাহিদ ইসলাম যে রাজনীতি করছেন, তার কেন্দ্রীয় ভাষা হলো দুর্নীতির বিরুদ্ধে আপসহীন অবস্থান। বক্তৃতা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং রাজনৈতিক বিবৃতিতে তিনি বারবার বলেছেন—এই দেশে লুটপাটতন্ত্র, সুবিধাভোগী রাজনীতি আর পুরোনো এলিটদের স্বার্থরক্ষা ভাঙতেই তাঁদের রাজনীতি। তিনি এমন এক নৈতিক অবস্থান তৈরি করেছেন, যেখানে নিজেকে তিনি শুদ্ধতার প্রতীক হিসেবে দাঁড় করান এবং অন্যদের প্রশ্নবিদ্ধ করেন। কিন্তু ঠিক এখানেই প্রশ্ন ওঠে—যিনি সবার আগে আঙুল তোলেন, তাঁর নিজের দিকে তাকানোর দায় কি কম?
নির্বাচনে জমা দেওয়া হলফনামা অনুযায়ী নাহিদ ইসলাম নিজেকে একজন “পরামর্শক” হিসেবে পরিচয় দিয়েছেন এবং তাঁর বার্ষিক আয় দেখানো হয়েছে ১৬ লাখ টাকা। মোট সম্পদের পরিমাণ দেখানো হয়েছে প্রায় ৩২ লাখ টাকার কিছু বেশি। তাঁর নামে কোনো বাড়ি, জমি বা গাড়ি নেই। ব্যাংকে কিছু নগদ অর্থ, হাতে কিছু টাকা, কিছু ইলেকট্রনিক সামগ্রী আর আসবাবপত্র—এই নিয়েই তাঁর সম্পদের হিসাব। তাঁর স্ত্রীর নামে কিছু স্বর্ণালংকার ও নগদ অর্থের কথাও উল্লেখ আছে। একই সঙ্গে তাঁর নামে কিছু ঋণও দেখানো হয়েছে।
কাগজে–কলমে এই হিসাব হয়তো আইনসিদ্ধ। কিন্তু প্রশ্নটা আইনসিদ্ধতা নয়, প্রশ্নটা নৈতিকতা আর স্বচ্ছতার। একজন রাজনৈতিক নেতা যখন দুর্নীতির বিরুদ্ধে সবচেয়ে জোরালো ভাষায় কথা বলেন, তখন তাঁর নিজের আর্থিক অবস্থান শুধু নিয়ম মেনে ঘোষণা করলেই দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। বরং সেই তথ্যগুলো কীভাবে এসেছে, কীভাবে এত অল্প সময়ে তাঁর রাজনৈতিক ও সামাজিক অবস্থানের সঙ্গে মানানসই হলো, সেসব ব্যাখ্যা জনসমক্ষে দেওয়াই নৈতিক রাজনীতির অংশ।
আরও বড় প্রশ্ন তৈরি হয় নাহিদ ইসলামের অতীত বয়ানের সঙ্গে বর্তমান বাস্তবতার তুলনায়। কয়েক বছর আগেও তিনি নিজেকে আর্থিকভাবে সীমাবদ্ধ বলে উল্লেখ করেছেন। ছাত্ররাজনীতি, আন্দোলন, রাষ্ট্র সংস্কারের স্বপ্ন—এসবের মধ্যেই তাঁর পরিচয় সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু আজ তিনি যে রাজনৈতিক পরিসরে দাঁড়িয়ে আছেন, সেখানে শুধু ব্যক্তিগত আয় দিয়ে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড চালানো সহজ নয়। প্রচার, সংগঠন, যোগাযোগ, উপস্থিতি—এসবের পেছনে খরচ হয়। সেই খরচ কোথা থেকে আসে, কীভাবে আসে, তার কোনো ব্যাখ্যা কি তিনি দিয়েছেন? না কি এই প্রশ্নগুলো তুললেই তা “রাজনৈতিক অপপ্রচার” হয়ে যায়?
এই প্রশ্নগুলো আরও জোরালো হয় যখন তাঁর নাগরিকত্ব সংক্রান্ত বিতর্ক সামনে আসে। হাইকোর্টে দায়ের করা একটি রিটে অভিযোগ তোলা হয়েছে যে নাহিদ ইসলাম বিদেশি নাগরিকত্ব গ্রহণ করেছেন, যা থাকলে তিনি জাতীয় নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার যোগ্য নন। এনসিপি এই অভিযোগকে ভিত্তিহীন ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করেছে। নাহিদ ইসলাম নিজেও এটি অস্বীকার করেছেন। কিন্তু প্রশ্নটা এখানে অভিযোগের সত্য–মিথ্যা নয়, প্রশ্নটা হলো—যে নেতা স্বচ্ছতার কথা বলেন, তিনি কি এই ধরনের গুরুতর অভিযোগ উঠলে আগেভাগেই সমস্ত নথি ও ব্যাখ্যা জনসমক্ষে আনতে পারতেন না?
রাজনীতিতে অভিযোগ উঠবে, বিরোধীরা প্রশ্ন তুলবে—এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু নৈতিক রাজনীতির দাবি যারা করেন, তাঁদের মানদণ্ডও স্বাভাবিকের চেয়ে উঁচু হওয়া উচিত। নাগরিকত্ব, আয়, সম্পদ—এসব ব্যক্তিগত বিষয় নয় যখন কেউ রাষ্ট্র পরিচালনায় অংশ নিতে চান। তখন এগুলো জনস্বার্থের বিষয় হয়ে যায়। সেখানে “আইন অনুযায়ী দিয়েছি” বলা যথেষ্ট নয়; সেখানে দরকার আস্থার রাজনীতি।
নাহিদ ইসলামের বক্তব্যে বারবার ফিরে আসে “নতুন রাজনীতি” শব্দবন্ধ। কিন্তু নতুন রাজনীতির মানে কি শুধু নতুন মুখ? নাকি নতুন আচরণ, নতুন জবাবদিহি, নতুন স্বচ্ছতা? পুরোনো রাজনীতির সবচেয়ে বড় অভিযোগ ছিল—ক্ষমতার কাছাকাছি গেলে নেতারা প্রশ্ন এড়িয়ে যান, সমালোচনাকে দমন করেন, আর নিজেদের ক্ষেত্রেই নৈতিক মানদণ্ড শিথিল করেন। নতুন রাজনীতি যদি সেই পথেই হাঁটে, তাহলে পার্থক্যটা কোথায়?
আরও একটি দিক এখানে গুরুত্বপূর্ণ। নাহিদ ইসলাম যে ভাষায় দুর্নীতির বিরুদ্ধে কথা বলেন, তা অনেক সময় সরাসরি অভিযোগমূলক। তিনি অন্যদের নিয়ত, চরিত্র ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। কিন্তু তাঁর নিজের ক্ষেত্রে যখন আয়–সম্পদ বা নাগরিকত্ব নিয়ে প্রশ্ন ওঠে, তখন সেটিকে ষড়যন্ত্র বা অপপ্রচার হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। এই দ্বৈত মানদণ্ডই রাজনৈতিক দ্বিচারিতার জন্ম দেয়।
এখানে কেউ বলছে না যে নাহিদ ইসলাম নিশ্চিতভাবে দুর্নীতিগ্রস্ত। কিন্তু এটাও অস্বীকার করা যায় না যে তাঁর অবস্থান, বক্তব্য এবং ঘোষিত তথ্যের মধ্যে ফাঁক রয়েছে। আর সেই ফাঁক পূরণ করার দায়িত্ব তাঁরই। কারণ যিনি নিজেকে নৈতিকতার মাপকাঠি বানান, তাঁকে অন্যদের চেয়ে বেশি প্রশ্নের মুখে দাঁড়াতে হয়।
বাংলাদেশের রাজনীতি দীর্ঘদিন ধরে “কম খারাপ” বেছে নেওয়ার রাজনীতি। মানুষ নতুনদের দিকে তাকায় এই আশায় যে তারা অন্তত পুরোনোদের মতো হবে না। সেই আশাকে টিকিয়ে রাখতে হলে নতুনদের আচরণেও নতুনত্ব দরকার। স্বচ্ছতার প্রশ্নে আক্রমণাত্মক না হয়ে খোলামেলা হওয়াই শক্তির পরিচয়। প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়া নয়, প্রশ্নের উত্তর দেওয়াই নেতৃত্ব।
আজ নাহিদ ইসলামের সামনে যে প্রশ্নগুলো উঠছে, সেগুলো তাঁকে দুর্বল করার জন্য নয়। বরং এগুলো তাঁর রাজনীতিকে বিশ্বাসযোগ্য করার সুযোগ। কিন্তু সেই সুযোগ তখনই কাজে লাগবে, যখন তিনি বুঝবেন—দুর্নীতির বিরুদ্ধে গলা উঁচু করলেই যথেষ্ট নয়, নিজের আয়–সম্পদ–পরিচয় নিয়েও একই উচ্চতায় দাঁড়াতে হয়।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটা খুব সাধারণ, কিন্তু গভীর—যে নেতা দেশকে স্বচ্ছ রাজনীতির স্বপ্ন দেখান, তিনি কি নিজের ক্ষেত্রেও সেই স্বচ্ছতার সব আলো জ্বালাতে প্রস্তুত? নাকি এখানেও অন্ধকার থেকে যাবে, শুধু ভাষা বদলে যাবে?
এই প্রশ্নের উত্তর শুধু নাহিদ ইসলামের জন্য নয়, পুরো নতুন রাজনৈতিক ধারার ভবিষ্যতের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ।
আপনার মতামত জানানঃ