বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান স্পষ্টভাবে ঘোষণা দিয়েছেন যে কোনো নারী কখনোই তাঁর দলের সর্বোচ্চ নেতৃত্বের পদে অধিষ্ঠিত হতে পারবেন না। আল–জাজিরাকে দেওয়া একটি দীর্ঘ সাক্ষাৎকারে তিনি এই অবস্থানকে ‘ঈশ্বরপ্রদত্ত জৈবিক পার্থক্য’-এর যুক্তি দিয়ে ব্যাখ্যা করেছেন (আল–জাজিরার সাক্ষাৎকার, ২৯ জানুয়ারি ২০২৬)। কিন্তু এ ধরনের চূড়ান্ত দাবি ইসলামের ভেতরেই গুরুতর ধর্মতাত্ত্বিক ব্যাখ্যাগত এবং নৈতিক প্রশ্ন উত্থাপন করে। শফিকুর রহমানের বক্তব্যের সরাসরি জবাব দেওয়ার আগে ইসলামে নারীর রাজনৈতিক নেতৃত্ব সংক্রান্ত বিতর্কের পেছনে থাকা কুরআনিক ব্যাখ্যাগত কাঠামোয় ফিরে যাওয়া প্রয়োজন।
ইসলামি ব্যাখ্যাগত ঐতিহ্য কখনোই দাবি করেনি যে ঐশী প্রত্যাদেশ বোঝার ক্ষেত্রে একটি একমাত্রিক বা চূড়ান্ত কর্তৃত্ব আছে। প্রাথমিক যুগের মুসলিম পণ্ডিতেরা প্রায়ই তাঁদের মতামতের অস্থায়ী ও মানবিক সীমাবদ্ধতা স্বীকার করতেন এবং বলতেন যে তাঁদের ব্যাখ্যা তাঁদের সর্বোত্তম উপলব্ধি মাত্র আর চূড়ান্ত জ্ঞান একমাত্র আল্লাহর কাছেই রয়েছে (এল ফাদল ২০০১)। শফিকুর রহমানের বক্তব্য এই জ্ঞানগত বিনয়ের ঐতিহ্য থেকে স্পষ্ট বিচ্যুতি। তিনি নারীর রাজনৈতিক নেতৃত্ব নিষিদ্ধ করার পক্ষে কোনো কুরআনিক প্রমাণ উপস্থাপন করেননি কিংবা বিকল্প ব্যাখ্যার সম্ভাবনাও স্বীকার করেননি। বরং নিজের মতকে চূড়ান্ত ও ধর্মীয়ভাবে অনুমোদিত বলে উপস্থাপন করেছেন।
কুরআন নিজেই এ ধরনের সর্বাত্মক নিষেধাজ্ঞাকে সমর্থন করে না। কুরআনে বলা হয়েছে আল্লাহ আদমকে সৃষ্টি করেছেন এবং তাঁর মধ্যে নিজের রূহ সঞ্চার করেছেন (১৫:২৯)। কিন্তু কোথাও বলা হয়নি যে আদমের স্ত্রী যাকে মুসলিম সমাজে সাধারণত হাওয়া নামে চিহ্নিত করা হয় তাকে আদমের পাঁজর থেকে সৃষ্টি করা হয়েছে। বরং কুরআন বারবার জোর দিয়ে বলেছে যে মানবজাতিকে একটি মাত্র নাফস থেকে সৃষ্টি করা হয়েছে এবং সেখান থেকেই তার সঙ্গী সৃষ্টি হয়েছে আর এই দুইজন থেকে অসংখ্য নারী ও পুরুষ বিস্তার লাভ করেছে (৪:১; আরও দেখুন ৬:৯৮; ৭:১৮৯; ৩৯:৬)। এই অস্তিত্বগত ঐক্য লিঙ্গভিত্তিক শ্রেষ্ঠত্বের যে কোনো দাবিকে দুর্বল করে।
একইভাবে কুরআন হাওয়াকে আদমের অবাধ্যতার উসকানিদাতা হিসেবে উপস্থাপন করে না। বরং আদম ও তাঁর স্ত্রী দুজনকেই শয়তানের প্ররোচনার শিকার হিসেবে দেখানো হয়েছে (৭:২০–২২; ২০:১২০–১২১)। লক্ষণীয় বিষয় হলো শয়তান সরাসরি আদমের কাছেই কুমন্ত্রণা দিয়েছিল (২০:১২০) এবং পাপের দায় উভয়ের ওপরই সমানভাবে বর্তায়। কুরআনে কোথাও নারী ও পুরুষের মধ্যে নৈতিক বুদ্ধিবৃত্তিক বা অস্তিত্বগত শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠা করা হয়নি।
তবে পরবর্তী কালের কুরআন ব্যাখ্যায় প্রায়ই ইহুদি–খ্রিস্টান কাহিনির প্রভাব ঢুকে পড়ে। আদম ও হাওয়া ইউসুফ ও জুলেখা কিংবা সুলায়মান ও বিলকিসের গল্পগুলো অনেক সময় বাইবেলভিত্তিক দৃষ্টিভঙ্গিতে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। আল–তাবারি ইবনে আব্বাস ও অন্যদের সূত্রে হাওয়াকে আদমের পাঁজর থেকে সৃষ্ট বলে উল্লেখ করেন যদিও এই ধারণার কোনো কুরআনিক ভিত্তি নেই। ইহুদি ধর্মে ধর্মান্তরিত ব্যক্তিদের বর্ণনায় হাওয়াকে পাপের মূল উৎস হিসেবে দেখানো হয়েছে এবং ঋতুস্রাব ও সন্তান প্রসবের যন্ত্রণাকে শাস্তি হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে যা কুরআনের সাথে অসামঞ্জস্যপূর্ণ।
এই ধরনের ব্যাখ্যার সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রভাব ছিল গভীর। এতে নারীকে ধূর্ত নৈতিকভাবে দুর্বল ও বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে ঘাটতিপূর্ণ হিসেবে উপস্থাপন করা হয় এবং এর মাধ্যমে বৈষম্যকে ধর্মীয় বৈধতা দেওয়া হয়। বারবারা স্টোওয়াসারের মতে এই ব্যাখ্যাগুলো নারীর নৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক সক্ষমতাকে খাটো করার হাতিয়ার হয়ে ওঠে।
জুলেখার কাহিনির ব্যাখ্যাতেও একই প্রবণতা দেখা যায়। মধ্যযুগীয় ব্যাখ্যাকাররা তাঁকে নিয়ন্ত্রণহীন নারী কামনার প্রতীক হিসেবে চিত্রিত করেছেন যদিও কুরআনের বর্ণনায় ঘটনাটি অনেক বেশি পারস্পরিক। এভাবে নারী চরিত্রকে সার্বজনীনভাবে সন্দেহজনক করে তোলা হয়।
এর বিপরীতে কুরআনে সাবার রানি বিলকিসের চিত্র একটি শক্তিশালী ব্যতিক্রম। সূরা নামলে তাঁকে প্রজ্ঞাবান বিচক্ষণ ও সফল শাসক হিসেবে দেখানো হয়েছে। কিন্তু বহু ব্যাখ্যাকার তাঁর নেতৃত্বের দিকটি উপেক্ষা করেছেন কারণ এটি পুরুষতান্ত্রিক চিন্তার সাথে সাংঘর্ষিক ছিল।
অনেক আলেম পুরুষের সাথে ‘আক্ল’ এবং নারীর সাথে ‘নাফস’ যুক্ত করেছেন যদিও কুরআন এ ধরনের দ্বৈততা সমর্থন করে না। ফাজলুর রহমান দেখিয়েছেন কুরআনে নাফস মানে ব্যক্তি সত্তা। তবুও মধ্যযুগীয় চিন্তায় নারীকে কামপ্রবণ ও পুরুষকে যুক্তিবাদী হিসেবে চিত্রিত করা হয় যা নারীর অধীনতার যুক্তি তৈরি করে।
নারী নেতৃত্ব নিষিদ্ধ করার আরেকটি যুক্তি হলো নারী নামাজে ইমামতি করতে পারে না তাই রাজনৈতিক নেতৃত্বও দিতে পারে না। ফাতিমা মেরনিসি দেখিয়েছেন এই যুক্তির ভিত্তিই ভুল। কুরআনে কোথাও নারী নেতৃত্ব নিষিদ্ধ করা হয়নি বরং বিলকিসের উদাহরণে নারী নেতৃত্বের স্বীকৃতি রয়েছে।
ইতিহাসও দেখায় নবী মুহাম্মদ (সা.)–এর যুগে এবং পরবর্তী সময়ে নারীরা যুদ্ধ নেতৃত্ব দিয়েছেন এবং প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করেছেন। নারীর নেতৃত্ব নিষিদ্ধ করার একমাত্র হাদিসটি বিতর্কিত এবং এর বর্ণনাকারীর বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়েও গুরুতর প্রশ্ন রয়েছে।
কুরআন মানুষের সাথে আল্লাহর সম্পর্ককে উল্লম্ব এবং মানুষের মধ্যে সম্পর্ককে পারস্পরিক ও সমান বলে তুলে ধরে। তাই শফিকুর রহমানের বক্তব্য কোনো চূড়ান্ত ইসলামী সিদ্ধান্ত নয়। এটি তাঁর ব্যক্তিগত বা দলীয় ব্যাখ্যা মাত্র। তিনি কোনো ধর্মীয় কর্তৃত্বের প্রতিনিধিত্ব করেন না এবং ইসলামের বৈচিত্র্যময় আইনি ও নৈতিক ঐতিহ্যের ওপর একক সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়ার অধিকারও তাঁর নেই।
সূত্র: ডেইলি স্টার। অনুবাদ: শুভ্র সরকার।
আপনার মতামত জানানঃ