বাংলাদেশে ফ্যামিলি কার্ড আদৌ সম্ভব কি না—এই প্রশ্নটা আবেগের না, একেবারেই অর্থনীতি, প্রশাসনিক সক্ষমতা আর রাজনৈতিক সদিচ্ছার প্রশ্ন। সংক্ষেপে বললে, তাত্ত্বিকভাবে সম্ভব, কিন্তু শর্তসাপেক্ষে। অর্থনীতি আছে কি না—এই প্রশ্নের উত্তরও হ্যাঁ, তবে সেটি টেকসই হবে কি না, সেটা নির্ভর করবে বাস্তবায়নের ধরন ও কাঠামোর ওপর।
প্রথমে অর্থনীতির কথাই বলা যাক। বাংলাদেশে বর্তমানে জিডিপির আকার ৪৫০ বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি। সামাজিক সুরক্ষা খাতে সরকার ইতোমধ্যেই বছরে জিডিপির প্রায় ২–২.৫ শতাংশ ব্যয় করে। বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতা, ভিজিডি, ভিজিএফ, টিসিবির পণ্য বিতরণ—এসব মিলিয়ে একটি বড় অঙ্কের টাকা ইতোমধ্যেই খরচ হচ্ছে, কিন্তু সমস্যাটি হলো এই খরচ খণ্ডিত, অসংহত এবং অদক্ষ। একই পরিবার কখনো তিনটি সুবিধা পাচ্ছে, আবার প্রকৃত দরিদ্র অনেকেই কিছুই পাচ্ছে না। এই বাস্তবতায় ফ্যামিলি কার্ড যদি বিদ্যমান ভাতা ও খাদ্য সহায়তা কর্মসূচিগুলোকে এক ছাতার নিচে আনে, তাহলে নতুন করে বিশাল অতিরিক্ত অর্থের প্রয়োজন নাও হতে পারে। অর্থাৎ অর্থনীতি পুরোপুরি অক্ষম—এমন কথা বলা যাবে না।
তবে যদি বলা হয়, দেশের চার কোটি পরিবারকে কোনো বাছাই ছাড়াই প্রতি মাসে আড়াই হাজার টাকা দেওয়া হবে, তাহলে সেটি অর্থনীতির ওপর প্রবল চাপ তৈরি করবে। বছরে এই ব্যয় দাঁড়াবে প্রায় ১ লক্ষ ২০ হাজার কোটি টাকার কাছাকাছি, যা বর্তমান সামাজিক নিরাপত্তা বাজেটের তুলনায় অনেক বেশি। বাংলাদেশে রাজস্ব আদায় জিডিপির তুলনায় এখনও কম, কর জিডিপি অনুপাত ৮–৯ শতাংশের ঘরে। ফলে এই অর্থ কোথা থেকে আসবে—সেটা না ভেবে এমন ঘোষণা বাস্তবায়ন করা কঠিন। কিন্তু যদি লক্ষ্যভিত্তিকভাবে নিম্ন ও নিম্ন-মধ্য আয়ের পরিবারকে ধরা হয়, তাহলে হিসাবটি অনেকটাই বাস্তবসম্মত হয়ে ওঠে।
ভারতের রেশন কার্ডের উদাহরণ এখানে গুরুত্বপূর্ণ। ভারতে রেশন কার্ড সফল হয়েছে মূলত তিনটি কারণে। প্রথমত, সেখানে একটি দীর্ঘদিনের খাদ্য বিতরণ ব্যবস্থা ছিল। দ্বিতীয়ত, আধার নম্বরের মাধ্যমে ডিজিটাল পরিচয় ও বায়োমেট্রিক যাচাই সম্ভব হয়েছে। তৃতীয়ত, রাজনৈতিকভাবে এটি সব দলের কাছেই গ্রহণযোগ্য একটি সামাজিক চুক্তিতে পরিণত হয়েছে। বাংলাদেশে এর সঙ্গে তুলনা করলে দেখা যায়—ডিজিটাল পরিচয়ের ক্ষেত্রে জাতীয় পরিচয়পত্র একটি শক্ত ভিত্তি তৈরি করেছে, মোবাইল ব্যাংকিং ও ডিজিটাল লেনদেন ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে, যা সরাসরি নগদ সহায়তা দেওয়াকে তুলনামূলক সহজ করে তোলে। অর্থাৎ প্রযুক্তিগত দিক থেকে বাংলাদেশ ভারতের চেয়ে খুব পিছিয়ে নেই।
কিন্তু বড় সমস্যা প্রশাসনিক সক্ষমতা ও দুর্নীতি। বাংলাদেশের সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো লাভভোগী নির্বাচন। কে দরিদ্র, কে প্রকৃত উপকারভোগী—এই তালিকা তৈরিতে রাজনৈতিক প্রভাব, তদবির আর স্থানীয় ক্ষমতার ব্যবহার নতুন কিছু নয়। ফ্যামিলি কার্ড চালু হলে এই ঝুঁকি আরও বাড়বে, যদি না একটি স্বচ্ছ, কেন্দ্রীয় ও আপডেটযোগ্য ডেটাবেস তৈরি করা যায়। ভারতের রেশন কার্ড ব্যবস্থায়ও দুর্নীতি আছে, কিন্তু সেটি তুলনামূলকভাবে নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়েছে শক্ত নজরদারি ও প্রযুক্তির মাধ্যমে। বাংলাদেশে সেই পর্যায়ে পৌঁছাতে সময় ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার দরকার।
ফ্যামিলি কার্ডের বড় সুবিধা হলো এটি খাদ্যনিরাপত্তা ও আয়ের স্থিতি তৈরি করতে পারে। উচ্চ মূল্যস্ফীতির সময় দরিদ্র পরিবার সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। মাসে নির্দিষ্ট অঙ্কের নগদ বা খাদ্য সহায়তা থাকলে অন্তত ন্যূনতম চাহিদা নিশ্চিত করা যায়। এতে অপুষ্টি কমতে পারে, শিশুশিক্ষায় ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে এবং সামাজিক অস্থিরতা কিছুটা হলেও প্রশমিত হয়। বিশেষ করে যদি কার্ডটি পরিবারের নারী প্রধানের নামে হয়, তাহলে নারীর আর্থিক ক্ষমতায়ন বাড়ার সম্ভাবনাও থাকে।
আরেকটি বড় সুবিধা হলো—এই ব্যবস্থা বিভিন্ন ছড়ানো সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিকে একীভূত করতে পারে। বর্তমানে যেসব কর্মসূচিতে প্রশাসনিক খরচ বেশি, লিকেজ বেশি, সেগুলো কমিয়ে একটি ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে সরাসরি সহায়তা দিলে রাষ্ট্রের খরচের দক্ষতা বাড়তে পারে। এটি দীর্ঘমেয়াদে একটি আধুনিক ও লক্ষ্যভিত্তিক কল্যাণব্যবস্থার দিকে বাংলাদেশকে নিয়ে যেতে পারে।
তবে অসুবিধার দিকও কম নয়। সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো এটি যদি রাজনৈতিক জনপ্রিয়তা বাড়ানোর হাতিয়ার হয়ে ওঠে। অর্থনৈতিক বাস্তবতা বিবেচনা না করে যদি ভাতার অঙ্ক নির্ধারণ করা হয়, তাহলে ভবিষ্যতে সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে এই সুবিধা টিকবে কি না—সেই প্রশ্ন উঠবে। আরেকটি সমস্যা হলো মূল্যস্ফীতি। যদি বাজারে উৎপাদন না বাড়িয়ে কেবল নগদ অর্থ বিতরণ করা হয়, তাহলে চাহিদা বাড়বে, কিন্তু সরবরাহ না বাড়লে দাম আরও বাড়তে পারে। এতে ফ্যামিলি কার্ডের সুফল আংশিকভাবে নষ্ট হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে।
এছাড়া একটি বড় সামাজিক প্রশ্নও আছে। দীর্ঘদিন ধরে নগদ সহায়তার ওপর নির্ভরতা তৈরি হলে কর্মসংস্থানমুখী উদ্যোগে আগ্রহ কমে যেতে পারে—এই আশঙ্কা অনেক অর্থনীতিবিদের। যদিও আন্তর্জাতিক গবেষণা বলছে, লক্ষ্যভিত্তিক ও সীমিত নগদ সহায়তা মানুষকে অলস করে না, বরং সঠিক নকশা থাকলে এটি কর্মসংস্থান খোঁজার সক্ষমতা বাড়ায়। কিন্তু নকশা ভুল হলে উল্টো ফলও হতে পারে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, বাংলাদেশে ফ্যামিলি কার্ড অসম্ভব কোনো কল্পনা নয়। ভারতের রেশন কার্ড দেখিয়ে এটি সম্ভব—এই যুক্তি আংশিকভাবে সঠিক, কিন্তু হুবহু অনুকরণ করলেই হবে না। বাংলাদেশের অর্থনীতি এই বোঝা বহন করতে পারে কি না, তা নির্ভর করবে সুবিধার পরিধি, লক্ষ্যভিত্তিক নির্বাচন, প্রশাসনিক স্বচ্ছতা এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন পরিকল্পনার ওপর। এটি যদি বিদ্যমান সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থার সংস্কার হিসেবে আসে, তাহলে এটি একটি বড় ইতিবাচক পদক্ষেপ হতে পারে। আর যদি এটি কেবল নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি হিসেবে আসে, তাহলে ঝুঁকিটাই বড় হয়ে উঠবে।
আপনার মতামত জানানঃ