নির্বাচন মানেই শুধু ব্যালটে প্রতীক থাকা–না থাকা নয়, নির্বাচন আসলে সমাজের ভেতরে জমে থাকা রাজনৈতিক স্মৃতি, ভয়, অভ্যাস, স্বার্থ আর কৌশলের বহিঃপ্রকাশ। সেই জায়গা থেকেই এবারের নির্বাচনকে দেখলে স্পষ্ট হয়—আনুষ্ঠানিকভাবে নির্বাচনের বাইরে থেকেও আওয়ামী লীগ বাস্তবে ভোটের মাঠে প্রবলভাবে উপস্থিত থাকবে। প্রশ্নটা তাই আওয়ামী লীগ থাকবে কি না, বরং থাকবে কীভাবে।
জুলাইয়ের গণ–অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর যে রাজনৈতিক বাস্তবতা তৈরি হয়েছে, তা বাংলাদেশের ইতিহাসে বিরল। একটি দীর্ঘসময় ক্ষমতায় থাকা দল, যার শিকড় প্রশাসন থেকে শুরু করে গ্রাম–পাড়া পর্যন্ত বিস্তৃত, হঠাৎ করেই নিষিদ্ধ। দলীয় কার্যালয় বন্ধ, প্রতীক বাতিল, শীর্ষ নেতারা বিদেশে, মাঠের নেতা-কর্মীরা অনিশ্চয়তার মধ্যে। কিন্তু রাজনীতি কোনো সুইচ টিপে বন্ধ করা যায় না। বিশেষ করে এমন একটি দলকে, যার ভোটব্যাংক দশকের পর দশক ধরে সামাজিক কাঠামোর ভেতরে প্রোথিত।
আওয়ামী লীগের আনুষ্ঠানিক অনুপস্থিতির অর্থ এই নয় যে তাদের সমর্থকেরা হঠাৎ করে রাজনীতি থেকে অবসর নিয়েছেন। বরং উল্টো বাস্তবতা দেখা যাচ্ছে। গত ১৭ মাসে মাঠের আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীরা যে দুঃসহ সময় পার করেছেন, তা তাঁদের রাজনৈতিক আচরণকে আরও বাস্তববাদী করে তুলেছে। প্রকাশ্যে মিছিল, স্লোগান, নির্বাচন বর্জনের ডাক—এসব এখন তাঁদের কাছে ঝুঁকিপূর্ণ। ফলে ভোট বর্জনের মতো ঘোষণামূলক অবস্থান বাস্তবে খুব কম জায়গাতেই কার্যকর হবে।
বাংলাদেশের ভোটার আচরণ বরাবরই দ্বিমুখী। একদিকে আবেগ ও দলীয় আনুগত্য, অন্যদিকে ব্যক্তিগত নিরাপত্তা ও স্থানীয় বাস্তবতা। আওয়ামী লীগের সমর্থকদের বড় একটি অংশ এখন ঠিক এই দ্বন্দ্বের মাঝখানে দাঁড়িয়ে। তাঁরা জানেন, ভোটকেন্দ্রে না গেলে রাজনীতি থেকে মুছে যাবেন না, কিন্তু গেলে নিজের অস্তিত্ব জানান দেওয়ার একটা সুযোগ থাকবে। এ কারণেই আনুষ্ঠানিকভাবে দল নির্বাচন না করলেও আওয়ামী লীগ–সমর্থিত ভোটারদের একটি বড় অংশ কেন্দ্রে যাবে—এটা প্রায় নিশ্চিত।
এই ভোট কোথায় যাবে, সেটাই এবারের নির্বাচনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। নৌকাবিহীন ব্যালটে আওয়ামী ভোটাররা আর আগের মতো একচোখা সিদ্ধান্ত নেবেন না। তাঁদের সামনে থাকবে তিন ধরনের বিকল্প। প্রথমত, আদর্শগত কাছাকাছি শক্তি। কিন্তু বাম দলগুলো এবারের নির্বাচনকে অনেকটাই প্রতীকী হিসেবে দেখছে। বড় নেতাদের অনেকে মাঠে নামেননি, সংগঠনিক শক্তিও দুর্বল। ফলে এই বিকল্পটি সীমিত।
দ্বিতীয় বিকল্প বিএনপি ও তাদের সমমনা দলগুলো। সাম্প্রতিক সময়ের বক্তব্য-বিবৃতি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, একাত্তর, জাতীয়তাবাদ, রাষ্ট্রীয় ঐক্য—এই বয়ানে বিএনপি সচেতনভাবেই আওয়ামী লীগের শূন্যস্থান পূরণের চেষ্টা করছে। মাঠের বাস্তবতায়ও দেখা যাচ্ছে, আওয়ামী লীগের নিষিদ্ধ থাকা নেতাকর্মীদের আশ্বাস দেওয়া হচ্ছে নিরাপত্তার। কোথাও কোথাও প্রকাশ্যেই বলা হচ্ছে—তাঁদের কেউ হয়রানির শিকার হবেন না। এই বার্তা আওয়ামী ভোটারদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
তৃতীয় বিকল্প স্থানীয় শক্তিশালী প্রার্থী। বাংলাদেশের রাজনীতিতে স্থানীয় পরিচিতি বরাবরই বড় ফ্যাক্টর। দল নেই, কিন্তু মানুষ আছে। কোথাও যদি মনে হয়, অমুক প্রার্থী জিতলে আমার বা আমার পরিবারের ঝুঁকি কম হবে, উন্নয়ন বা প্রভাব থাকবে—তাহলে সেই প্রার্থীই ভোট পাবে। এখানে দলীয় প্রতীকের চেয়ে বেশি কাজ করে বাস্তব হিসাব।
বেসরকারি জরিপ সংস্থাগুলোর তথ্যও এই বাস্তবতাকেই সমর্থন করে। আগের আওয়ামী লীগ ভোটারদের একটি বড় অংশ বিএনপির দিকে ঝুঁকছেন, আর একটি উল্লেখযোগ্য অংশ এখনো সিদ্ধান্তহীন। এই সিদ্ধান্তহীনতা আসলে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার প্রতিফলন। তারা শেষ মুহূর্তে পরিস্থিতি বুঝে ভোট দেবেন। আর এই শেষ মুহূর্তের ভোটই অনেক আসনের ফল ঘুরিয়ে দিতে পারে।
এখানেই আওয়ামী লীগের প্রকৃত শক্তি। দল নিষিদ্ধ হলেও তাদের ভোটব্যাংক এখনো সক্রিয়। এটি কোনো আদর্শিক ভোটব্যাংক নয়, এটি অভ্যাস, ইতিহাস ও নেটওয়ার্কের ফল। ১৯৯১ সালের পর প্রায় সব নির্বাচনে অংশ নিয়ে আওয়ামী লীগ কখনো সরকার, কখনো বিরোধী দলে থেকেছে। এমনকি বিতর্কিত নির্বাচনেও তারা উল্লেখযোগ্য ভোট পেয়েছে। দীর্ঘ ১৫ বছরের শাসনে জনপ্রিয়তা কমেছে, ক্ষোভ তৈরি হয়েছে—এটা সত্য। কিন্তু সমর্থনের ভিত্তি ভেঙে পড়েনি।
এই কারণেই এবারের নির্বাচনে প্রায় সব দলই আওয়ামী ভোটারদের দিকে তাকিয়ে আছে। প্রকাশ্যে কেউ তা স্বীকার না করলেও মাঠের কৌশলে সেটি স্পষ্ট। সহানুভূতি দেখানো হচ্ছে, নিরাপত্তার আশ্বাস দেওয়া হচ্ছে, এমনকি ভাষার মধ্যেও সাবধানতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। কেউই চায় না আওয়ামী ভোটাররা পুরোপুরি নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ুক বা বিপক্ষে অবস্থান নিক।
আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতৃত্ব বিদেশে বসে নির্বাচন বর্জনের আহ্বান জানালেও মাঠের বাস্তবতা ভিন্ন। স্থানীয় নেতারা জানেন, প্রকাশ্য বর্জন মানে নিজের জন্য বিপদ ডেকে আনা। ফলে অনেক জায়গায় নীরব সমর্থনের কৌশল নেওয়া হচ্ছে। কোথাও ইশারায়, কোথাও ব্যক্তিগতভাবে বলা হচ্ছে—কাকে ভোট দেওয়া তুলনামূলক নিরাপদ। এই নীরব রাজনীতিই এবারের নির্বাচনের সবচেয়ে শক্তিশালী স্রোত।
সব মিলিয়ে বলা যায়, আওয়ামী লীগ এবারের নির্বাচনে নেই—এই কথাটি কাগজে-কলমে সত্য। কিন্তু ভোটের অঙ্কে, ভোটারের মনস্তত্ত্বে এবং ফলাফলের সমীকরণে তারা প্রবলভাবে উপস্থিত। নৌকা না থাকলেও ভোট আছে। প্রতীক নেই, কিন্তু প্রভাব আছে। আর এই প্রভাবই নির্ধারণ করবে কে জিতবে, কে হারবে, আর আগামী দিনের রাজনীতির গতিপথ কোন দিকে যাবে।
আপনার মতামত জানানঃ