বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমানের একটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পোস্টকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন বিতর্ক তৈরি হয়েছে। কর্মজীবী নারীদের নিয়ে অবমাননাকর বক্তব্য দেওয়ার অভিযোগ তুলে তার প্রার্থিতা বাতিলের দাবি জানিয়ে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের কাছে লিখিত আবেদন করেছেন একাধিক নারী নেত্রী।
রোববার নির্বাচন ভবনে গিয়ে তারা সরাসরি প্রধান নির্বাচন কমিশনার এএমএম নাসির উদ্দিনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন এবং তাদের আপত্তির বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে উপস্থাপন করেন। এই আবেদনের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন গণতান্ত্রিক বিপ্লবী পার্টির সাধারণ সম্পাদক মোশরেফা মিশু।
তার বক্তব্য অনুযায়ী, সম্প্রতি ডা. শফিকুর রহমানের ভেরিফায়েড এক্স অ্যাকাউন্ট থেকে প্রকাশিত একটি মন্তব্যে কর্মজীবী নারীদের নিয়ে এমন ভাষা ব্যবহার করা হয়েছে যা অবমাননাকর, কুরুচিপূর্ণ এবং স্পষ্টভাবে নারীবিদ্বেষী। তিনি বলেন, এই মন্তব্য শুধু নারীদের ব্যক্তিগত মর্যাদায় আঘাত করেনি বরং দেশের বিপুলসংখ্যক শ্রমজীবী নারীর শ্রম ও অবদানকে অস্বীকার করার শামিল।
মোশরেফা মিশু আরও জানান, বিতর্ক তৈরি হওয়ার পর সংশ্লিষ্ট দল ওই মন্তব্যকে ‘হ্যাকিং’-এর ফল হিসেবে দাবি করলেও সেই ব্যাখ্যা বিশ্বাসযোগ্য নয়। কারণ ভেরিফায়েড অ্যাকাউন্ট থেকে প্রকাশিত বক্তব্যের ক্ষেত্রে এমন দাবি গ্রহণ করার মতো কোনো স্বচ্ছ তদন্ত বা নির্ভরযোগ্য প্রমাণ এখনো প্রকাশ করা হয়নি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকেও এ বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা আসেনি।
তিনি বলেন, হ্যাকিংয়ের অভিযোগে একজনকে গ্রেপ্তার দেখানো হলেও পরবর্তীতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বক্তব্যে অসামঞ্জস্য দেখা গেছে। একপর্যায়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা স্বীকার করেন যে আটক ব্যক্তির বিরুদ্ধে হ্যাকিংয়ের কোনো নির্দিষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়নি। এর ফলে পুরো বিষয়টি নিয়ে জনমনে সন্দেহ আরও বেড়েছে।
আবেদনকারীরা বলেন, গার্মেন্টস শিল্পসহ দেশের বিভিন্ন উৎপাদন ও সেবা খাতে শ্রমজীবী নারীরা দীর্ঘদিন ধরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে আসছেন। পরিবার, সমাজ এবং জাতীয় অর্থনীতিতে তাদের অবদান অস্বীকার করার সুযোগ নেই। এমন বাস্তবতায় প্রকাশ্যে নারীদের হেয় করে মন্তব্য করা সংবিধানে স্বীকৃত সমতা, মানবাধিকার এবং সামাজিক ন্যায়বিচারের ধারণার সম্পূর্ণ পরিপন্থি।
নারী নেত্রীদের মতে, এই ধরনের বক্তব্য নারীর প্রতি বিদ্বেষ, বৈষম্য এবং সহিংসতার মানসিকতাকে উৎসাহিত করে। এতে নারী শ্রমিকদের নিরাপত্তা ও কর্মপরিবেশ হুমকির মুখে পড়ে। একজন জাতীয় পর্যায়ের রাজনৈতিক নেতার কাছ থেকে এমন দায়িত্বহীন আচরণ সমাজে নেতিবাচক বার্তা দেয় বলেও তারা মন্তব্য করেন।
লিখিত আবেদনে চারটি নির্দিষ্ট দাবি তুলে ধরা হয়। দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে বিতর্কিত বক্তব্য অবিলম্বে প্রত্যাহার করা, কর্মজীবী নারী ও নারী শ্রমিকদের কাছে নিঃশর্ত ক্ষমা চাওয়া, ভবিষ্যতে নারীর মর্যাদা ও শ্রমকে অবমাননা করে কোনো বক্তব্য না দেওয়ার অঙ্গীকার করা এবং নির্বাচন কমিশনের আচরণবিধি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করে সংশ্লিষ্ট প্রার্থীর প্রার্থিতা বাতিল।
এই বৈঠকে নারী অধিকারকর্মী, শ্রমিক আন্দোলনের নেত্রী, রাজনৈতিক সংগঠনের প্রতিনিধি এবং আইনজীবীরাও উপস্থিত ছিলেন। তাদের মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সামিনা লুৎফা, গার্মেন্টস শ্রমিক মুক্তি আন্দোলনের সভাপতি শবনম হাফিজ, এনপিএর মুখপাত্র ফেরদৌস আরা রুমী, নারীর রাজনৈতিক অধিকার ফোরামের সংগঠক নাফিসা রায়হানা এবং আইনজীবী ও অধিকারকর্মী তাবাসসুম মেহেনাজ মিমি উল্লেখযোগ্য।
এই ঘটনার মাধ্যমে নির্বাচনকে ঘিরে রাজনৈতিক আচরণ ও সামাজিক দায়িত্ববোধ নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। নির্বাচন কমিশন এ বিষয়ে কী সিদ্ধান্ত নেয় সেটিই এখন রাজনৈতিক অঙ্গন ও নাগরিক সমাজের নজরে রয়েছে।
আপনার মতামত জানানঃ