খুলনা নগরের খালিশপুর এলাকার প্রভাতী স্কুল মাঠ সোমবার দুপুরে ছিল মানুষের ঢল, স্লোগান আর প্রত্যাশার উত্তাপে মুখর। দীর্ঘ ২২ বছর পর এই জনপদে নির্বাচনী জনসভায় যোগ দিতে আসেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। দুপুর সাড়ে ১২টার কিছু পর মাঠে প্রবেশের মুহূর্তেই করতালি, উচ্ছ্বাস আর ধানের শীষের প্রতীকে রঙিন হয়ে ওঠে পুরো এলাকা। মঞ্চে দাঁড়িয়ে হাত নেড়ে সমর্থকদের শুভেচ্ছা জানান তিনি, আর শুরু করেন প্রায় ২৭ মিনিটের এক বক্তব্য—যার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল নারীর মর্যাদা, রাজনীতির নৈতিকতা, ভোটাধিকার ও রাষ্ট্র পুনর্গঠনের প্রতিশ্রুতি।
বক্তব্যের শুরুতেই তিনি একটি রাজনৈতিক দলের সাম্প্রতিক মন্তব্যের কড়া সমালোচনা করেন। কর্মজীবী নারীদের নিয়ে করা সেই মন্তব্যকে তিনি আখ্যা দেন ‘কলঙ্কজনক’ বলে। কারও নাম উল্লেখ না করে তিনি বলেন, বাংলাদেশের অর্ধেক জনগোষ্ঠী নারী—আর সেই নারীসমাজকে ঘরের ভেতর আটকে রাখার চিন্তাই নাকি প্রকাশ পেয়েছে ওই মন্তব্যে। তাঁর কণ্ঠে ছিল ক্ষোভ ও দৃঢ়তা। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, যেসব নারী জীবিকার তাগিদে কাজ করেন, যেসব মা–বোন পরিবার ও দেশের অর্থনীতিকে সচল রাখছেন, তাঁদের নিয়ে অবমাননাকর শব্দ ব্যবহার করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এই বক্তব্য মাঠে উপস্থিত মানুষের মধ্যে তাৎক্ষণিক সাড়া ফেলে; করতালি আর স্লোগানে প্রতিক্রিয়া জানান অনেকে।
তারেক রহমানের বক্তব্যে উঠে আসে দেশের অর্থনীতিতে নারীদের অবদান। তিনি বলেন, লাখ লাখ নারী পোশাকশিল্পে কাজ করে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে ভূমিকা রাখছেন। নিম্নমধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্ত পরিবারের বহু নারী দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির চাপে সংসার চালাতে স্বামীর পাশাপাশি কাজ করছেন। এই বাস্তবতায় তাঁদের অপমান করা মানে শুধু ব্যক্তিগত অসম্মান নয়, বরং রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ভিত্তিকেই তাচ্ছিল্য করা। ধর্মীয় মূল্যবোধের প্রসঙ্গ টেনে তিনি হজরত বিবি খাদিজা (রা.)–র উদাহরণ দেন—নবী করিম (সা.)–এর সহধর্মিণী ছিলেন একজন সফল ব্যবসায়ী। যারা ইসলাম কায়েমের কথা বলেন, তাদেরই উচিত এই ইতিহাস স্মরণ করা—এমন ইঙ্গিত দেন তিনি।
সাম্প্রতিক বিতর্কে আইডি হ্যাকড হওয়ার অজুহাত প্রসঙ্গেও বক্তব্য দেন তারেক রহমান। তিনি বলেন, ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়ে সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক দল দাবি করেছে যে তাদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের আইডি হ্যাকড হয়েছিল। কিন্তু বিশেষজ্ঞদের মতে, এমনভাবে আইডি হ্যাকড হওয়ার সুযোগ নেই। তাঁর ভাষায়, নির্বাচনের আগে জনগণের সামনে মিথ্যাচার করে তারা নিজেদের প্রকৃত চরিত্র উন্মোচন করছে। যারা নারীদের অসম্মান করে, যারা মিথ্যার আশ্রয় নেয় এবং যারা দীর্ঘদিন ধরে জনগণের ভোটাধিকার হরণ করেছে—তারা কখনো দেশপ্রেমিক বা জনদরদি হতে পারে না।
জনসভায় সবচেয়ে আলোচিত প্রতিশ্রুতিগুলোর একটি ছিল ‘ফ্যামিলি কার্ড’। দেশের প্রতিটি পরিবারকে এই কার্ড দেওয়ার ঘোষণা দিয়ে তিনি বলেন, বাংলাদেশের জনসংখ্যা প্রায় ২০ কোটি, যার অন্তত অর্ধেক নারী। এই বিশাল নারীসমাজকে পেছনে রেখে কোনো বড় পরিকল্পনাই সফল হতে পারে না। বিএনপি সরকার গঠন করলে এই কার্ডের মাধ্যমে নারীদের ধীরে ধীরে স্বাবলম্বী করে তোলা হবে, যাতে তাঁরা কারও ওপর নির্ভরশীল না থাকেন। বক্তব্যের এই অংশে উপস্থিত নারীদের মধ্যে আলাদা এক আগ্রহ লক্ষ করা যায়।
খুলনা অঞ্চল নিয়ে কথা বলতে গিয়ে তাঁর কণ্ঠে ছিল স্মৃতি আর ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার মিশ্রণ। একসময়কার শিল্পনগরী খুলনাকে তিনি ‘মৃতপ্রায়’ বলে উল্লেখ করেন। বলেন, বিএনপি সরকার গঠন করলে খুলনা, বাগেরহাট ও সাতক্ষীরাকে আবারও জীবন্ত শিল্পাঞ্চলে রূপান্তর করা হবে। নারী–পুরুষ উভয়ের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা হবে, নতুন শিল্প স্থাপন, অবকাঠামো উন্নয়ন ও বিনিয়োগ বৃদ্ধির মাধ্যমে এই অঞ্চলকে অর্থনৈতিকভাবে পুনরুজ্জীবিত করা হবে। তাঁর মতে, নারীসমাজকে স্বাবলম্বী করা, বেকারদের কর্মসংস্থান সৃষ্টি, শিক্ষার সঠিক পরিবেশ এবং উন্নত চিকিৎসাব্যবস্থা নিশ্চিত করাই হবে কাঙ্ক্ষিত বাংলাদেশের ভিত্তি।
বক্তব্যে বারবার ফিরে আসে ভোটাধিকার প্রসঙ্গ। তিনি বলেন, ১২ তারিখের জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে এই জনসভা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। গত ১৫ থেকে ১৬ বছরে বিএনপি বহু আন্দোলন ও সংগ্রাম করেছে। এই সময়ে দলের বহু নেতা–কর্মী গুম, খুন ও হত্যার শিকার হয়েছেন। শুধু বিএনপি নয়, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের হাজার হাজার নেতা–কর্মী গায়েবি মামলা, নির্যাতন ও নিপীড়নের শিকার হয়েছেন। এই দীর্ঘ সময় জনগণ তাঁদের মত প্রকাশের সুযোগ পাননি। তাঁর ভাষায়, শুধু জাতীয় নির্বাচন নয়—স্থানীয় নির্বাচনেও মানুষ ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেননি।
তারেক রহমান স্মরণ করিয়ে দেন ২০২৪ সালের জুলাই মাসের আন্দোলনের কথা। তাঁর মতে, দলমত নির্বিশেষে মানুষ রাজপথে নেমে এসে স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিল। সেই আন্দোলনের মধ্য দিয়েই দেশের মানুষ আবার নিজেদের শক্তি উপলব্ধি করেছে। এখন সময় এসেছে অধিকার আদায়ের। ১২ তারিখে ইনশা আল্লাহ মানুষ সেই অধিকার প্রয়োগ করবে, যা থেকে এক যুগের বেশি সময় ধরে তাদের বঞ্চিত করে রাখা হয়েছিল—এমন আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।
জনসভায় বক্তব্যের এক পর্যায়ে খুলনা, বাগেরহাট ও সাতক্ষীরার বিএনপির প্রার্থীদের হাতে ধানের শীষ তুলে দিয়ে ভোট দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি। বলেন, বিএনপি সরকার গঠন করলে প্রথম দায়িত্ব হবে দেশ পুনর্গঠন। দল-মত, শ্রেণি-পেশা নির্বিশেষে সবাইকে নিয়েই দেশ গড়তে হবে। শুধু একটি শ্রেণিকে নিয়ে কখনোই দেশ পুনর্গঠন সম্ভব নয়। এই পুনর্গঠনের কেন্দ্রে থাকবে গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার ও মানুষের মৌলিক অধিকার।
মাঠজুড়ে উপস্থিত নেতা–কর্মী ও সমর্থকদের চোখেমুখে ছিল দীর্ঘদিনের ক্ষোভ আর প্রত্যাশার ছাপ। অনেকের কাছে এই জনসভা ছিল শুধু একটি নির্বাচনী সমাবেশ নয়, বরং দীর্ঘ সময়ের রাজনৈতিক নীরবতার পর প্রকাশ্যে কথা বলার এক সুযোগ। স্লোগান, করতালি আর আবেগঘন মুহূর্তে জনসভা শেষ হলেও আলোচনা থামেনি। কর্মজীবী নারীদের মর্যাদা, ভোটাধিকার ও রাষ্ট্র পুনর্গঠনের যে বার্তা তারেক রহমান দিলেন, তা খুলনার এই মাঠ পেরিয়ে ছড়িয়ে পড়েছে জাতীয় রাজনীতির বিস্তৃত
আপনার মতামত জানানঃ