বাংলাদেশে জাতীয় সংসদ নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসে ততই রাজনৈতিক কথাবার্তায় একটি শব্দ ঘুরেফিরে সামনে আসে—ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং। রাজনৈতিক দলের নেতারা একে অপরের বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলেন যে কোনো না কোনো পক্ষ আগেভাগেই নির্বাচনের ফল নিজেদের পক্ষে সাজিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে। এই শব্দটি এখন এতটাই পরিচিত যে সরকারি চাকরির পরীক্ষার প্রশ্নপত্রেও এটি জায়গা করে নিয়েছে। কিন্তু সাধারণ মানুষের বড় একটি অংশ এখনও স্পষ্টভাবে জানে না ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং বলতে ঠিক কী বোঝানো হয় এবং বাংলাদেশের নির্বাচনী ইতিহাসে এই অভিযোগের শিকড় কোথায়।
রাজনীতি ও নির্বাচন বিশ্লেষকদের মতে ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং মূলত একটি প্রক্রিয়া যার মাধ্যমে নির্বাচনের নিয়মকানুন ভোটগ্রহণের পরিবেশ প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত এবং ক্ষমতার কাঠামোকে এমনভাবে প্রভাবিত করা হয় যাতে নির্দিষ্ট একটি পক্ষ কাঙ্ক্ষিত ফল পায়। হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনৈতিক বিজ্ঞানী পিপ্পা নরিস এই ধারণাটিকে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেছেন যে নির্বাচনী ব্যবস্থার আনুষ্ঠানিক নিয়মে পরিবর্তন বা সেগুলোর কৌশলগত প্রয়োগ রাজনৈতিক আচরণ এবং ফলাফলে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে। যদিও কিছু দেশে এটি স্থিতিশীলতা আনার যুক্তিতে ব্যবহৃত হয়েছে তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এর মাধ্যমে গণতন্ত্র দুর্বল হয়েছে।
বাংলাদেশে এই শব্দটি নেতিবাচক অর্থেই বেশি ব্যবহৃত হয়। রাজনৈতিক বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমদের মতে এখানে ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং বলতে মূলত ভোট ব্যবস্থাকে ম্যানিপুলেট করার চেষ্টাকেই বোঝানো হয়। ভোটার তালিকায় ভুয়া নাম অন্তর্ভুক্ত করা ভোটকেন্দ্রে বিরোধী সমর্থকদের বাধা দেওয়া ব্যালট বাক্স ছিনতাই আগেভাগে ব্যালট ভরে রাখা গণনার সময় কারচুপি এবং প্রশাসনের পক্ষপাতমূলক ভূমিকা—সব মিলিয়েই এই ধারণাটি গড়ে উঠেছে। তিনি বলেন ক্ষমতাধর দলগুলো এটি করতে সক্ষম হয় আর দুর্বল দলগুলো চাইলেও পারে না।
যদিও ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং শব্দটির ব্যবহার বাংলাদেশে তুলনামূলকভাবে নতুন তবে নির্বাচন প্রভাবিত করার অভিযোগ নতুন নয়। স্বাধীনতার পর প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচন ১৯৭৩ সালেই এই ধরনের অভিযোগ শোনা যায়। সে নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে সরকার গঠন করে এবং শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে সরকার আসবে এতে কারও সন্দেহ ছিল না। তবু সেই নির্বাচন ঘিরে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। গবেষক মহিউদ্দিন আহমদের লেখায় উঠে এসেছে কীভাবে কুমিল্লার একটি আসনে একজন প্রার্থীকে জেতাতে ব্যালট ঢাকায় নিয়ে যাওয়ার মতো ঘটনা ঘটেছিল। ভোটের দিন ফল প্রতিকূল হতে দেখে ব্যালট সেখানেই গণনা না করে অন্যত্র সরিয়ে নেওয়ার অভিযোগ আজও বাংলাদেশের নির্বাচনী ইতিহাসের সবচেয়ে আলোচিত অধ্যায়গুলোর একটি।
এরপর সামরিক শাসনামলে গণভোটের নামে যে প্রক্রিয়া চালু হয়েছিল সেটিও ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের আরেক রূপ বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা। ১৯৭৭ সালে জিয়াউর রহমান এবং ১৯৮৫ সালে হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের শাসন বৈধ করতে যে গণভোট আয়োজন করা হয় তাতে বিপুল শতাংশে ‘হ্যাঁ’ ভোট পড়েছিল। কিন্তু গবেষক ও রাজনীতি বিশ্লেষকদের মতে সাধারণ মানুষ সেখানে প্রকৃত অর্থে ভোট দেওয়ার সুযোগই পায়নি। প্রশাসন ও সামরিক বাহিনীর প্রত্যক্ষ ভূমিকার কারণে সেগুলোকে প্রকৃত নির্বাচন বলা যায় না বলে মত দেন অনেকে।
১৯৮৬ সালের নির্বাচন আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। এ নির্বাচনকে ‘মিডিয়া ক্যু’ বলা হয় কারণ ভোট চলাকালে ও ফল ঘোষণার সময় গণমাধ্যমের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত বিতর্কিত। কয়েকদিন ধরে রেডিও ও টেলিভিশনে সংবাদ বন্ধ থাকা এবং পরে হঠাৎ করে ভিন্ন ফল প্রকাশ পাওয়ায় এই নির্বাচন নিয়ে গভীর সন্দেহ তৈরি হয়। যদিও তখন ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং শব্দটি ব্যবহৃত হয়নি তবু ফলাফল প্রভাবিত করার কৌশল হিসেবে গণমাধ্যম ব্যবহারের বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
১৯৯০ সালে সামরিক শাসনের পতনের পর গণতন্ত্রে উত্তরণের সময় শুরু হয়। ১৯৯১ সালের নির্বাচন ছিল নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত প্রথম নির্বাচন এবং এটিকে তুলনামূলকভাবে গ্রহণযোগ্য ধরা হয়। তবু ক্ষমতায় আসতে না পারা দল আওয়ামী লীগ এই নির্বাচনে সূক্ষ্ম কারচুপির অভিযোগ তোলে। কালো টাকা অদৃশ্য শক্তি এবং ষড়যন্ত্রের কথা তখন উচ্চারিত হয়। এখান থেকেই রাজনৈতিক ভাষায় কারচুপি এবং ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ধারণা আরও জোরালোভাবে ফিরে আসে।
১৯৯৬ সালের ফেব্রুয়ারির একতরফা নির্বাচন এবং পরে জুনের নির্বাচন বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে উত্তেজনাপূর্ণ অধ্যায়গুলোর একটি। জুনের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ জয়ী হলেও বিএনপি ফলাফল মানতে অস্বীকৃতি জানায় এবং এটিকে নজিরবিহীন কারচুপি বলে অভিহিত করে। যদিও আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা নির্বাচনকে অবাধ ও সুষ্ঠু বলেছিলেন তবু দেশের ভেতরে এই বিতর্ক রাজনীতিকে আরও বিভক্ত করে।
২০০১ সালের নির্বাচন বাংলাদেশের নির্বাচনী ইতিহাসে ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং শব্দটির স্থায়ী প্রবেশ ঘটায়। ওই নির্বাচনের পর আওয়ামী লীগ প্রথমবারের মতো সরাসরি অভিযোগ তোলে যে নির্বাচন পূর্বপরিকল্পিতভাবে প্রভাবিত করা হয়েছে। শেখ হাসিনা তখন বলেন জনগণের ভোটের অধিকার কেড়ে নেওয়া হয়েছে এবং ফলাফল তিনি মেনে নেন না। এর পর থেকে প্রায় প্রতিটি নির্বাচনেই পরাজিত পক্ষ এই শব্দটি ব্যবহার করতে শুরু করে।
২০০৮ সালের নির্বাচন অনেকের কাছে সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য মনে হলেও তাতেও প্রশ্ন ওঠে। ভোটার তালিকায় মৃত ও প্রবাসী ব্যক্তিদের নাম থাকা নিয়ে বিতর্ক হয় এবং বিপুল সংখ্যক নাম বাদ দিতে হয়। এরপর দীর্ঘ সময় আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকে এবং ২০১৪ সালের নির্বাচন হয় প্রধান বিরোধী দলের বর্জনের মধ্যে। অর্ধেকের বেশি আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় প্রার্থী নির্বাচিত হওয়ায় এই নির্বাচনকে ‘তামাশার নির্বাচন’ বলা হয়। নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়েও তখন প্রশ্ন ওঠে।
২০১৮ সালের নির্বাচন ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের আলোচনায় নতুন মাত্রা যোগ করে। ভোটের আগের রাতেই ব্যালট ভরে রাখার অভিযোগ গণমাধ্যমে আসে এবং ভোটের দিন অনেক কেন্দ্রে ভোটার উপস্থিতি ছিল কম। নির্বাচন পর্যবেক্ষকদের মতে প্রশাসন আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং অন্যান্য পক্ষের সমন্বিত ভূমিকা এই নির্বাচনকে গভীরভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করে।
২০২৪ সালের নির্বাচনেও একই ধরনের অভিযোগ শোনা যায়। বিরোধী দলের অনুপস্থিতিতে ‘ডামি প্রার্থী’ ধারণা সামনে আসে। ক্ষমতাসীন দলের বিরুদ্ধে নিজেরাই নিজেদের প্রতিদ্বন্দ্বী দাঁড় করানোর অভিযোগ ওঠে। স্থানীয় প্রশাসন আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং গোয়েন্দা সংস্থার তৎপরতা ছিল চোখে পড়ার মতো। ভোটার উপস্থিতি কম ছিল এবং সহিংসতার ঘটনাও ঘটে।
এই দীর্ঘ ইতিহাস দেখায় যে ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং কোনো একক ঘটনার নাম নয় বরং এটি একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। শব্দটি নতুন হলেও নির্বাচন প্রভাবিত করার চর্চা পুরনো। প্রতিটি নির্বাচনের পর পরাজিত পক্ষের অভিযোগ আর ক্ষমতাসীন পক্ষের আত্মপক্ষ সমর্থনের মধ্য দিয়ে এই ধারণাটি আরও শক্ত হয়েছে। ফলে সাধারণ মানুষের আস্থা বারবার প্রশ্নের মুখে পড়েছে। বিশ্লেষকদের মতে ভবিষ্যতে বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন নিশ্চিত করতে হলে শুধু নির্বাচন কমিশনের স্বাধীনতা নয় বরং রাজনৈতিক সদিচ্ছা প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা এবং নাগরিক সচেতনতা একসাথে জরুরি। নইলে ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং শব্দটি কেবল রাজনৈতিক স্লোগান নয় বরং বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার স্থায়ী ক্ষতের নাম হয়েই থেকে যাবে।
আপনার মতামত জানানঃ