
আইনের শাসন ও মানবাধিকারের প্রতি শ্রদ্ধাই একটি রাষ্ট্রের সভ্যতার মানদণ্ড। কিন্তু সেই মানদণ্ডে বারবার প্রশ্নের মুখে পড়ছে বাংলাদেশ। মানবাধিকার সংগঠন অধিকারের সর্বশেষ প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এক উদ্বেগজনক চিত্র—মাত্র এক বছরে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন অন্তত ৩৩ জন। সংখ্যাটি শুধু পরিসংখ্যান নয়; এর পেছনে রয়েছে ভেঙে পড়া পরিবার, ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত মানুষ এবং রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার ওপর ক্রমশ হারিয়ে যাওয়া আস্থা।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এই হত্যাকাণ্ডগুলো সংঘটিত হয়েছে। নিহতদের মধ্যে কেউ পুলিশের হাতে, কেউ যৌথ বাহিনীর অভিযানে, কেউ আবার র্যাব, সেনাবাহিনী, বিমানবাহিনী, ডিবি পুলিশ, বিজিবি কিংবা কোস্টগার্ডের হেফাজতে প্রাণ হারিয়েছেন। রাষ্ট্রের যেসব বাহিনীর দায়িত্ব ছিল নাগরিকের জীবন ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, অভিযোগ উঠছে—তারাই হয়ে উঠেছে জীবননাশের কারণ। এই বাস্তবতা দেশের মানবাধিকার পরিস্থিতিকে গভীর সংকটে ঠেলে দিয়েছে।
নিহতদের মৃত্যুর ধরন আরও ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১১ জন মারা গেছেন নির্যাতনের ফলে, ১৬ জনকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে এবং ৬ জনকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে। অর্থাৎ অধিকাংশ ক্ষেত্রেই মৃত্যু হয়েছে সরাসরি শারীরিক সহিংসতার মাধ্যমে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হেফাজতে এমন মৃত্যুর ঘটনা শুধু মানবাধিকারের লঙ্ঘন নয়, এটি সংবিধান ও আইনের মৌলিক নীতিরও পরিপন্থী।
এই পরিস্থিতির পেছনে যে কারণটি বারবার উঠে আসছে, তা হলো দায়মুক্তির সংস্কৃতি। দীর্ঘদিন ধরে নির্যাতন ও হেফাজতে মৃত্যুর ঘটনায় কার্যকর বিচার না হওয়ায় আইন প্রয়োগকারী সংস্থার একটি অংশ কার্যত জবাবদিহির ঊর্ধ্বে থেকে যাচ্ছে। নির্যাতন ও হেফাজতে মৃত্যু (নিবারণ) আইন ২০১৩ থাকলেও এর বাস্তব প্রয়োগ অত্যন্ত দুর্বল। অভিযোগ উঠছে, আইনটি কাগজে থাকলেও মাঠপর্যায়ে এর প্রতিফলন নেই বললেই চলে।
২০২৫ সালের জুলাই মাসে উপদেষ্টা পরিষদ জাতিসংঘের নির্যাতনবিরোধী ঐচ্ছিক প্রটোকল—অপক্যাটে সংযুক্তির প্রস্তাব অনুমোদন করে। আগস্ট থেকে এটি বাংলাদেশে কার্যকরও হয়েছে। তাত্ত্বিকভাবে এটি একটি ইতিবাচক অগ্রগতি। কিন্তু বাস্তবতা হলো, আন্তর্জাতিক চুক্তিতে স্বাক্ষর করলেই পরিস্থিতির আমূল পরিবর্তন ঘটে না। মাঠপর্যায়ে আইন প্রয়োগ, স্বাধীন নজরদারি ও দোষীদের শাস্তি নিশ্চিত না হলে এসব প্রতিশ্রুতি কাগুজে আশ্বাসেই রয়ে যায়।
গত এক বছরে সংঘটিত কয়েকটি ঘটনার বর্ণনা এই বাস্তবতাকেই স্পষ্ট করে। চাঁদপুরের ফরিদগঞ্জ থানা হেফাজতে ছাত্রদল নেতা শাওন কাবি রিজার ওপর নির্যাতনের অভিযোগ উঠে আসে। অভিযোগ অনুযায়ী, চোখ বেঁধে তাকে শারীরিক নির্যাতন করা হয়। অন্যদিকে সুনামগঞ্জের ব্যবসায়ী নাসির মিয়াকে ব্যবসায়িক বিরোধের জেরে গোয়েন্দা পুলিশ তুলে নিয়ে গিয়ে ঢাকায় নির্যাতন করে অর্থ আদায়ের অভিযোগ পাওয়া যায়। এসব ঘটনা বিচ্ছিন্ন নয়, বরং একটি গভীর প্রাতিষ্ঠানিক সমস্যার ইঙ্গিত বহন করে।
নির্যাতনের পাশাপাশি আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যদের বিরুদ্ধে নানা ধরনের দুর্বৃত্তায়নের অভিযোগও উঠে এসেছে। মামলা বাণিজ্য, ব্যবসায়ী তুলে নিয়ে চাঁদা আদায়, আদালতের হাজতখানায় বন্দিদের স্বজনদের কাছ থেকে ঘুষ গ্রহণ, বদলি বাণিজ্য—এসব অভিযোগ নতুন নয়। কিন্তু বছরের পর বছর এসব অভিযোগের কার্যকর বিচার না হওয়ায় তা যেন স্বাভাবিক ঘটনায় পরিণত হয়েছে। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে শুধু ভুক্তভোগীরা নয়, পুরো বিচারব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা।
মাদক মামলার অপব্যবহার নিয়েও গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। কোথাও মিথ্যা মাদক মামলা দিয়ে টাকা আদায়, কোথাও আবার প্রকৃত অপরাধীকে ছেড়ে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এমনকি ধর্ষণচেষ্টা, চাঁদাবাজি, স্বর্ণালঙ্কার ও নগদ অর্থ লুট, হামলার পরও মামলা না নেওয়ার মতো গুরুতর অভিযোগও প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। এসব ঘটনায় সাধারণ মানুষের মনে ভয় ও অসহায়ত্ব বাড়ছে।
আইন প্রয়োগকারী সংস্থার হেফাজতে মৃত্যুর ঘটনাগুলো সবচেয়ে উদ্বেগজনক। ২০২৫ সালে এমন অন্তত ১০ জনের মৃত্যু হয়েছে বলে জানানো হয়েছে। প্রায় সব ক্ষেত্রেই পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়, অভিযুক্ত অসুস্থ হয়ে মারা গেছেন অথবা আত্মহত্যা করেছেন। কিন্তু প্রশ্ন হলো—হেফাজতে থাকা একজন মানুষ কীভাবে নিয়মিতভাবে আত্মহত্যা করে বা হঠাৎ গুরুতর অসুস্থ হয়ে মারা যায়? এসব ঘটনার তদন্ত আবার পুলিশের মাধ্যমেই করানো হয়, যা তদন্তের নিরপেক্ষতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তোলে।
গাজীপুরের টঙ্গীতে নির্মাণ শ্রমিক রনি মিয়ার মৃত্যু কিংবা ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগরে মোহাম্মদ আব্দুল্লাহর মৃত্যুর ঘটনা এই প্রশ্নগুলোকে আরও জোরালো করে। আব্দুল্লাহকে চোর সন্দেহে পিটিয়ে পুলিশ ক্যাম্পে রাখা হয় এবং আদালতে না পাঠিয়ে কয়েক দিন আটকে রাখা হয়। পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় মামলা হলেও এমন নজির খুব কমই দেখা যায় যে দায়ী কর্মকর্তারা দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির মুখোমুখি হন।
মানবাধিকারকর্মীদের মতে, এই সংকটের মূল কারণ হলো জবাবদিহির অভাব। যখন কোনো বাহিনীর সদস্য জানে যে অপরাধ করেও পার পেয়ে যাওয়া সম্ভব, তখন সেই অপরাধ বন্ধ হওয়ার সম্ভাবনা কমে যায়। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে রাজনৈতিক প্রভাব, প্রশাসনিক দুর্বলতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের অভাব।
এই পরিস্থিতির সরাসরি প্রভাব পড়ছে সাধারণ মানুষের জীবনে। থানায় যাওয়াকে মানুষ নিরাপত্তার আশ্রয় হিসেবে নয়, অনেক ক্ষেত্রে ভয়ের জায়গা হিসেবে দেখছে। ন্যায়বিচার পাওয়ার আশা হারিয়ে মানুষ নীরব সহনশীলতার পথে হাঁটছে। এটি একটি রাষ্ট্রের জন্য সবচেয়ে বিপজ্জনক সংকেত।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এই অবস্থা থেকে উত্তরণে কয়েকটি মৌলিক পরিবর্তন জরুরি। প্রথমত, নির্যাতন ও বিচারবহির্ভূত হত্যার প্রতিটি অভিযোগে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করতে হবে। দ্বিতীয়ত, অভিযুক্ত ব্যক্তি যে বাহিনীরই হোক না কেন, তাকে আইনের আওতায় আনতে হবে। তৃতীয়ত, পুলিশ ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থার প্রশিক্ষণে মানবাধিকার ও আইনের শাসনের বিষয়টি বাস্তবভাবে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।
একই সঙ্গে নাগরিক সমাজ ও গণমাধ্যমের স্বাধীন ভূমিকা নিশ্চিত করাও জরুরি। কারণ তথ্য প্রকাশ ও জনমত তৈরি না হলে এই ধরনের অপরাধ অদৃশ্যেই থেকে যায়। রাষ্ট্র যদি সত্যিই আইনের শাসন ও মানবাধিকারের প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হতে চায়, তবে কেবল পরিসংখ্যান প্রকাশ নয়, বাস্তব পরিবর্তন আনাই হবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্ন থেকে যায়—একটি রাষ্ট্র কি তার নাগরিককে নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয়েও দায় এড়িয়ে যেতে পারে? বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের প্রতিটি ঘটনা রাষ্ট্রের বিবেকের ওপর একটি গভীর ক্ষত। এই ক্ষত উপেক্ষা করলে তা একসময় পুরো ব্যবস্থাকেই অকার্যকর করে তুলবে। এখনই সময়, এই অদৃশ্য সহিংসতার বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার। নইলে পরিসংখ্যান আরও বাড়বে, আর ন্যায়বিচার ক্রমেই হয়ে উঠবে অধরা।
আপনার মতামত জানানঃ