জনস হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল গবেষক প্রথমবারের মতো পরীক্ষামূলকভাবে দেখিয়েছেন—এপেরাও কল্পনা ব্যবহার করতে পারে এবং ‘ভান করে খেলা’ বা প্রিটেন্ড প্লে খেলতে সক্ষম, যা এতদিন কেবল মানুষের একচেটিয়া সক্ষমতা বলেই মনে করা হতো। চা-পার্টির মতো সাজানো একাধিক পরীক্ষায় একটি বনোবো ধারাবাহিক ও দৃঢ়ভাবে কাল্পনিক জুস ভর্তি কাপ আর ভান করা আঙুরের অবস্থান অনুসরণ করেছে। এই ফলাফল প্রাণীর বুদ্ধিবৃত্তিক সক্ষমতা নিয়ে দীর্ঘদিনের ধারণাকে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে।
গবেষণাটি ইঙ্গিত দেয়, ‘ভান করা বস্তু’ বোঝার ক্ষমতা অন্তত একটি মানব-সংস্কৃতিতে বেড়ে ওঠা এপের বুদ্ধিবৃত্তিক সম্ভাবনার মধ্যেই রয়েছে। আরও গভীরে গেলে দেখা যায়, এই সক্ষমতার শিকড় হয়তো আজ থেকে ৬ থেকে ৯ মিলিয়ন বছর আগে—মানুষ ও এপের যৌথ বিবর্তনীয় পূর্বপুরুষদের সময় পর্যন্ত বিস্তৃত।
গবেষণার সহলেখক ক্রিস্টোফার ক্রুপেনিয়ে বলেন, “এটা সত্যিই যুগান্তকারী যে তাদের মানসিক জীবন কেবল বর্তমান মুহূর্তেই সীমাবদ্ধ নয়। কল্পনাকে এতদিন মানুষের পরিচয়ের একেবারে কেন্দ্রীয় উপাদান হিসেবে দেখা হতো। কিন্তু যদি এটি আমাদের প্রজাতির একচেটিয়া না হয়, তাহলে সেটি আমাদের আত্মপরিচয় সম্পর্কিত ধারণাকেই রূপান্তরিত করে।”
তিনি আরও বলেন, “জেন গুডল যখন দেখালেন যে শিম্পাঞ্জিরা যন্ত্র বানাতে পারে, তখন ‘মানুষ হওয়া’ বলতে কী বোঝায়—তার সংজ্ঞাই বদলে গিয়েছিল। এই গবেষণাও আমাদের নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে—আমাদের বিশেষত্ব আসলে কোথায়, আর অন্য প্রাণীদের মধ্যে কী ধরনের মানসিক জীবন বিদ্যমান।”
এই গবেষণার ফলাফল আজ সায়েন্স সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়েছে।
মানুষের শিশুদের ক্ষেত্রে দেখা যায়, দুই বছর বয়সের মধ্যেই তারা ভান করে নানা পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে—যেমন চা-পার্টি খেলা। এমনকি ১৫ মাস বয়সী শিশুরাও বিস্ময় প্রকাশ করে, যদি তারা দেখে কেউ খালি কাপ থেকে ‘পান’ করছে, কাপটি ভান করে খালি করার পরও। অথচ অমানুষ প্রাণীদের মধ্যে এই ধরনের প্রিটেন্ড প্লে নিয়ে আগে কোনো নিয়ন্ত্রিত গবেষণা হয়নি, যদিও বনে ও বন্দিদশায় এমন আচরণের কিছু বর্ণনামূলক প্রতিবেদন ছিল।
উদাহরণ হিসেবে, বন্য পরিবেশে কিশোরী মাদি শিম্পাঞ্জিদের কাঠি কোলে নিয়ে মায়ের মতো আচরণ করতে দেখা গেছে। আবার বন্দিদশায় একটি শিম্পাঞ্জিকে বাস্তব কাঠের ব্লক নিয়ে খেলার পর মেঝের ওপর কাল্পনিক ব্লক টানতে দেখা গিয়েছিল।
এই পর্যবেক্ষণগুলো থেকেই ক্রুপেনিয়ে এবং তার সহলেখক আমালিয়া বাস্তোস—যিনি বর্তমানে স্কটল্যান্ডের সেন্ট অ্যান্ড্রুজ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রভাষক—ভাবলেন, বিষয়টি কি নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে পরীক্ষা করা যায়?
তারা পরীক্ষার জন্য বেছে নেন কানজি নামের ৪৩ বছর বয়সী এক বনোবোকে, যে যুক্তরাষ্ট্রের ‘এপ ইনিশিয়েটিভ’-এ বসবাস করে। কানজিকে নিয়ে আগে থেকেই শোনা যাচ্ছিল যে সে ভান করা আচরণে অংশ নিতে পারে এবং কথার নির্দেশে ইশারা করে সাড়া দেয়। গবেষকরা শিশুদের চা-পার্টির মতো করে পরীক্ষার আয়োজন করেন—একটি টেবিলের দুই পাশে পরীক্ষক ও কানজি, সামনে রাখা খালি পিচার, কাপ, বাটি ও জার।
প্রথম পরীক্ষায় টেবিলে রাখা হয় দুটি স্বচ্ছ কিন্তু খালি কাপ এবং একটি খালি স্বচ্ছ পিচার। পরীক্ষক পিচারটি কাত করে প্রতিটি কাপে একটু করে ‘কাল্পনিক জুস ঢালেন’। এরপর একটি কাপ থেকে ভান করে জুস ঢেলে ফেলে দেন এবং ভালোভাবে ঝাঁকিয়ে দেখান যে সেটি খালি। তারপর কানজিকে জিজ্ঞেস করা হয়, “জুস কোথায়?”
অধিকাংশ ক্ষেত্রেই কানজি সঠিক কাপটির দিকে ইশারা করে—যেটিতে এখনো ভান করা জুস রয়েছে, এমনকি কাপের অবস্থান বদলে দেওয়ার পরও।
গবেষকেরা নিশ্চিত হতে চেয়েছিলেন, কানজি যেন ভাবছে না যে কাপে সত্যিই জুস আছে, যদিও সে দেখতে পাচ্ছে না। তাই দ্বিতীয় পরীক্ষায় রাখা হয় একটি সত্যিকারের জুসভর্তি কাপ এবং একটি কাল্পনিক জুসের কাপ। যখন কানজিকে জিজ্ঞেস করা হয়, সে কোনটি চায়, প্রায় সব সময়ই সে সত্যিকারের জুসের দিকেই ইশারা করে।
তৃতীয় পরীক্ষায় একই ধারণা প্রয়োগ করা হয় আঙুর দিয়ে। পরীক্ষক একটি খালি পাত্র থেকে ভান করে আঙুর চেখে দেখেন, তারপর সেটি দুইটি জারের একটিতে ‘রাখেন’। পরে একটি জার ভান করে খালি করে কানজিকে জিজ্ঞেস করেন, “আঙুর কোথায়?” এখানেও কানজি সঠিক জারের দিকেই ইঙ্গিত করে।
কানজি কখনোই শতভাগ নিখুঁত ছিল না, কিন্তু সে ধারাবাহিকভাবে সঠিক উত্তর দিয়েছে।
আমালিয়া বাস্তোস বলেন, “ডেটা থেকে যে ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে, তা সত্যিই বিস্ময়কর। মনে হচ্ছে এপেরা তাদের মনে এমন কিছুর ধারণা করতে পারে, যা বাস্তবে সেখানে নেই। কানজি একদিকে কাল্পনিক বস্তুর ধারণা তৈরি করতে পারে, আবার একই সঙ্গে বুঝতেও পারে যে সেটি বাস্তব নয়।”
এই গবেষণা ভবিষ্যতে আরও বিস্তৃত অনুসন্ধানের পথ খুলে দিচ্ছে—অন্যান্য এপ বা এমনকি অন্য প্রাণীরাও কি ভান করে খেলা খেলতে পারে, কিংবা কাল্পনিক বস্তুর অবস্থান অনুসরণ করতে সক্ষম কি না। গবেষকেরা এপদের কল্পনার অন্য দিকগুলোও জানতে চান, যেমন ভবিষ্যৎ সম্পর্কে ভাবার ক্ষমতা বা অন্যের মনের অবস্থা বোঝার সামর্থ্য।
ক্রুপেনিয়ে বলেন, “মানুষের ক্ষেত্রে কল্পনা আমাদের মানসিক জীবনকে গভীর ও সমৃদ্ধ করে। যদি কল্পনার কিছু শিকড় এপদের সঙ্গেও ভাগাভাগি হয়ে থাকে, তাহলে আমাদের এই ধারণা নতুন করে ভাবতে হবে যে অন্য প্রাণীরা কেবল বর্তমান মুহূর্তে আটকে থাকা যান্ত্রিক সত্তা। এই আবিষ্কার আমাদের বাধ্য করে—সমৃদ্ধ ও সুন্দর মানসিক জীবনের অধিকারী এসব প্রাণীর যত্ন নিতে এবং তাদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে।”
আপনার মতামত জানানঃ